hadith book logo

আহমদ দীদাত রচনাবলি - ফজলে রাব্বী ও মুহাম্মদ গোলাম মোস্তাফা

লেখকঃ আহমদ দীদাত • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৫

আরব ও ইসরাঈলঃ সংঘাত না সমঝোতা অধ্যায় একঃ আরব ও ইসরাইল

( یَـٰبَنِیۤ إِسۡرَ  ٰ⁠ ۤءِیلَ ٱذۡكُرُوا۟ نِعۡمَتِیَ ٱلَّتِیۤ أَنۡعَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ وَأَنِّی فَضَّلۡتُكُمۡ عَلَى ٱلۡعَـٰلَمِینَ )

হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ কর যা দিয়ে আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছিলাম এবং বিশ্বে সবার উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।

– কুরআন ২: ৪৭

১৯৮২ সালের কোন এক সময় ডাক্তার ই লোটেম ও এই পুস্তকের লেখকের মধ্যে যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার উপর ভিত্তি করে এই পুস্তকটির নামকরণ করা হয়েছে। বিতর্কের বিষয়বস্তু ইহুদীরাই নির্ধারণ করেছিল। পরবর্তী অধ্যায়ে “বিচার মানি কিন্তু তালগাছটি আমার” এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

একটি দৃশ্যে একজন মুসলমান মহিলা তার ছোট্ট দাউদকে ইসরাইলি সৈন্যের হাত থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। আরেকটি দৃশ্যে দেখানো হয়েছে একজন ইহুদীর পৌত্র নাৎসি জার্মানির হাত থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছে। তার জীবনের লক্ষ্য যেন লেখা রয়েছে তার হেলমেটে হত্যার জন্য জন্ম। পার্থক্য এটুকু যে তার বাহুতে স্বস্তিকা চিহ্ন নেই। ভাগ্যের কী পরিহাস, একদিন যে ছিল অত্যাচারিত সে আজ হয়েছে অত্যাচারী।

একবার বিদেশ যাত্রাকালে, আমার যা চিরকালের অভ্যাস কিছু একটা পড়ার জন্য অস্থির। হাতের কাছে ইংরেজি খবরের কাগজ ম্যাগাজিন যা পাচ্ছিলাম তাই একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। টাইম, নিউজ উইক প্রভৃতি পত্র-পত্রিকা দেখছিলাম। হঠাৎ একটি পত্রিকার দিকে চোখ পড়ল, সেখানে লেখা “জর্দান সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানা আবশ্যক”। আমাদের চাচাতো ভাই ইহুদীদের ধূর্তামীর প্রশংসা না করে পারা যায় না। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিক্ষার আছে। তারা মানব জাতির জন্য আল্লাহর গিনিপিগ। বাইবেল ও কুরআন থেকে তাদের ইতিহাস জানা যায়। তাদের গর্ব ঔদ্ধত্য, একগুয়েমি পরিহার করুন। কারণ এর ফলে তারা বারংবার স্বাধীনতা হারিয়েছে। তাদের ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং তাদের সুপরিকল্পনা বিষয়ে তাদের অনুসরণ করুন, অথবা তাদেরকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করুন। কারণ এই গুণাবলির দ্বারাই তারা ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ দ্বিতীয়বার লাভ করেছে।

সেই বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য দুর্ধর্ষ ইহুদী জাতি এবং ইহুদীবাদী খ্রিস্টানদেরকে বুঝ দেওয়া। এমনকি ফিলিস্তিনীদেরকে বোঝানো যে জর্দানই প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তীন। ইহুদীরা ফিলিস্তিন দেশের উপর যে জবরদস্তি চালিয়েছে তা থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্য দিকে সরানোর চেষ্টা। গাজা এবং পশ্চিম তীরের মানুষগুলির উপর ইহুদীদের লোভ ও লালসা চরিতার্থ করার জন্য যে ভয়াবহ নির্যাতন চলছে সেই বিষয় থেকে দৃষ্টি অপসারিত করে বিশ্ব যেন জর্দান বিষয় নিয়ে বিতর্কে মত্ত হয়। উদ্দেশ্য জঘন্য প্রকৃতির, কিন্তু পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী।

ধারণাটি আমার মস্তিষ্কে স্থির হয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকদিনের মধ্যে সুযোগ এসে গেল। আল্লাহ সকল সুযোগের স্রষ্টা।

পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি

আমি ইহুদী অত্যাচারের ছবি স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে পেলাম। আমার দৃষ্টি ইহুদী নিষ্ঠুরতার ফলে যে মজলুম তাকে ঘিরেই আমার মানসলোকে আবর্তিত হচ্ছিল। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘ইয়া আল্লাহ, এই মানুষগুলো আর কতদিন এমন নির্যাতন সহ্য করবে?’

সাধারণত আমার চোখে অশ্রু আসে না। কিন্তু এই ছবির বাস্তবতা আমার বিবেককে ভীষণভাবে নাড়া দিল। আমার বোধশক্তি ভোতা হয়ে গেল। আমি ভেঙ্গে পড়ে কাঁদতে লাগলাম। আমি জানতাম কারো অন্তরে বিন্দুমাত্র মায়া মহব্বত যদি থাকে সেও আমার মতো অনুভব করবে। তখন আমার ইচ্ছা হল প্রকৃত ফটোগ্রাফ সংগ্রহ করা দরকার, কারণ সংবাদপত্রের মুদ্রিত ছবি ততটা স্পষ্ট নয়। আমি সেই সংবাদপত্রের বার্তা সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করে ফটোটি সংগ্রহ করলাম। এটা ছিল সাদা কালো ছবি। পরবর্তীকালে এর রঙ্গীন ছবিটিও সংগ্রহ করেছিলাম। এতে আমার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল, অতঃপর দিন ও রাত্রির মতো একটার পর একটা কাজ চলতে লাগল।

( وَٱلَّذِینَ جَـٰهَدُوا۟ فِینَا لَنَهۡدِیَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِینَ )

যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ অবশ্যই সকর্মপরায়ণদের সঙ্গে থাকেন।

– কুরআন ২৯: ৬৯

রচনা প্রতিযোগিতা

প্রথম সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা সেই ছবিটি ইহুদীবাদ প্রভান্বিত খ্রিস্টান মিডিয়ায় প্রকাশ করা। অসহায় ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে কি নৃশংস অত্যাচার ও নিপীড়ন তাদের জারজ সন্তানরা চালাচ্ছে তা প্রকাশ করা। ফিলিস্তিনীদের অপরাধ যে তাদের জাতি ও সংস্কৃতি ভিন্ন। এবং তারা সহজে বিচ্ছিন্ন ও নিশ্চিহ্ন হবে না। কিন্তু ইহুদীরা মনে প্রাণে সেটাই চায়।

হিটলারের হলোকাস্ট থেকে রক্ষা পেয়ে যে সকল ইহুদী বর্তমানে ইসরাইলের বাসিন্দা হয়েছে তাদের বংশধরদের ফিলিস্তিনীদের প্রতি যে নিষ্ঠুর নীতি ও আচরণ তাকে যথেষ্ট প্রচার করার জন্য একটি রচনা প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা করা হল এবং রাখা হল নগদ পুরস্কারের ব্যবস্থা।

প্রতিযোগীদের বলা হল যে, “ভীতির চেহারা” নামে একটি ছবির বিকল্প নামকরণ করতে হবে ও ঐ ছবি সম্পর্কে তার নিজের মনোভাব নিজের ভাষায় লিখতে হবে। ছবিটির ছোট শিশুটির চোখে যে ভয়, মায়ের মুখে যে অসহায় আর্তি, ফিলিস্তিনী তরুণ মেয়েটির চোখে-মুখে যে ভীতি-এ সব কিছু মিলিয়ে এক ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। যে কেউ এ ছবি দেখলে বুঝতে পারবে। পরবর্তীকালে এই ছবিটির একটি রঙিন কপি পেয়েছিলাম। এ রঙিন ছবিটি দেখে অস্ট্রিও-জার্মান ইহুদী লিওপোল্ড ওই ছবির দিকে আঙ্গুল তুলে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলেন। তার সেই চিৎকার ছিল যেন ইহুদীদের হৃদয় ও আত্মার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা। তিনি আপন জাতিকে ভৎসনা করেছিলেন।

সেই ছবি ও তার বর্ণনা যদি কাউকে বিচলিত না করে তবে বুঝতে হবে তার হৃদয় বলে কিছু নেই।

ইহুদীর প্রতিক্রিয়া

আমাদের বিজ্ঞাপন প্রচারের খবর ইতোমধ্যে ইহুদীদের কানে পৌঁছে গেছে। তাদের যারা এজেন্ট ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল তাদের মাধ্যমে যথাস্থানে খবর পৌঁছে গেল। অনেকগুলি পত্রিকার বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হল। যেসব পত্রিকায় এই বিজ্ঞাপন বের হয়েছিল তার বিরুদ্ধে দারুণ হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। আমাদেরকে ইহুদী বিরোধী, সেমেটিক বিরোধী আখ্যায়িত করা হল। ইহুদীদের সঙ্গে কোন বিষয়ে মতবিরোধ হলে আমাদের চাচাতো ভাই ইহুদীরা তাকে সেমাইট বিরোধী বলে অতি সহজেই আখ্যায়িত করে। আর এ কথা বললে খ্রিস্টান জগতে জাদুর মত কাজ করে। তারা সবাই তখন এদের বিরুদ্ধে এক পায়ে খাড়া হয়ে যায়। খ্রিস্টানদের মনে তখন একই সঙ্গে মনে পড়ে হিটলারের কথা, হলোকাস্টের কথা, মনে পড়ে ইহুদীদের দ্বারা লক্ষ লক্ষ নিরীহ নারী পুরুষ শিশু হত্যার কথা।

প্রতি বছর ইস্টারের সময় সারা বিশ্বের খ্রিস্টানরা মাতম করত ‘ইহুদী মার’ বলে, যীশু হত্যাকারী ওরা, আমাদের ঈশ্বরকে হত্যা করেছে। হাজার বছরের হত্যা ও লুণ্ঠন এখন খ্রিস্টানদের বিবেককে ব্যথিত করছে। সেমাইট ‘বিরোধী’ কথাটি উচ্চারণ করলেই ইহুদীদের প্রতিটি অপরাধ জাদুর মত ঢেকে ফেলে। ইহুদীদের প্রতিটি অপকর্মের প্রতি পশ্চিমা জগত চোখ বন্ধ করে থাকে কারণ তাদের ভয় যে তাদেরকেও সেমাইট বিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হবে। ইসরাইলরা মনে করে তাদের পালক পিতা ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট রাম্বো রিগান কোন পাপ করতে পারে না বলে তারা চিরকাল নিষ্কলুষ। ইহুদী লবির হাত থেকে আমেরিকার প্রশাসন কোনদিন মুক্ত হতে পারবে কিনা সন্দেহ।