hadith book logo

জান্নাতের পথ

লেখকঃ মুহাম্মাদ মুনিরুজ্জামান বিন আশরাফ আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭

মুত্তাকী হয়ে জান্নাত লাভের উপায়

১. জ্ঞান অর্জন।

জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া কোন কাজই করা যায় না, কোন কিছুই হওয়া যায় না। এজন্য ইমাম বুখারী সহীহ বুখারীতে একটা অধ্যায় এনেছেন ‘‘কথা ও কাজের পূর্বে জ্ঞান’’ এবং এই জ্ঞান অবশ্যই কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান। মুত্তাকী হতে হলে একজন ব্যক্তিকে প্রথমেই কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

يَرْفَعِ اللهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْ وَالَّذِيْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা আরো উন্নত করে দেবেন। (সূরা ৫৮/মুজাদালাহঃ ১১)

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ اِنَّمَا يَتَذَكَّرُ اُولُو الْاَلْبَابِ

বল, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? শুধুমাত্র জ্ঞানী লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। (সূরা ৪৯/যুমারঃ ৯)

كَذٰلِكَ اِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَآءُ

নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই তাঁকে ভয় করে থাকে। (সূরা ৩৫/ ফাতিরঃ ২৮)

তবে সর্বপ্রথম কুরআনের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমের প্রথম দিকে বলেছেন,

ذٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَۚ فِيْهِۚ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ

এটা সেই কিতাব (আল কুরআন), যাতে কোন সন্দেহ নেই; এটা মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শক। (সূরা২/বাকারাঃ২)

অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

هٰذَا بَيَانٌ لِّلنَّاسِ وَهُدًى وَّمَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِيْنَ

এটা (আল কুরআন) মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হিদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ। (সূরা ৩/আলে ইমরানঃ ১৩৮)

فَاِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ الْمُتَّقِيْنَ وَتُنْذِرَ بِه قَوْمًا لُّدًّا

আর আমি তো তোমার ভাষায় এটা (আল কুরআন)কে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তুমি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ দিতে পার এবং তর্কপ্রিয় জাতিদেরকে এর দ্বারা সতর্ক করতে পার। (সূরা ১৯/মারিয়ামঃ ৯৭)

وَلَقَدْ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكُمْ اٰيَاتٍ مُّبَيِّنَاتٍ وَّمَثَلًا مِّنَ الَّذِيْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِيْنَ

আর নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে নাযিল করেছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ এবং তোমাদের পূর্বে যারা চলে গেছে তাদের দৃষ্টান্ত ও মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।

(সূরা ২৪/নূরঃ ৩৪)

কুরআনুল কারীমের এসব আয়াত থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারি যে- কোন ব্যক্তি, কোন মুমিন, কোন মুসলিমকে মুত্তাকী হতে হলে প্রথমেই আল্লাহ প্রদত্ত উপদেশমালা সম্বলিত সহায়িকা (Guideline/Syllabus) মহাগ্রন্থ আল কুরআনুল মাজীদ বুঝে বুঝে পড়তে হবে। একজন সার্জিক্যাল ডাক্তার সার্জিক্যালের বই যেভাবে বুঝে বুঝে পড়েন, একজন ইঞ্জিনিয়ার তার ইঞ্জিনিয়ারিং বই বা যে কোন পেশায় সফল হওয়া ব্যক্তিকে তার ব্যবহারিক পাঠ্যবই যেভাবে বুঝে বুঝে পড়তে হয়, একজন ব্যক্তিকে মুত্তাকী হতে হলে মহাগ্রন্থ আল কুরআন সেভাবে এমনকি তার চেয়েও ভালভাবে বুঝে বুঝে পড়তে হবে। পড়ার মাধ্যমে এই গ্রন্থের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আল কুরআনের আদেশ নিষেধ ভালভাবে মেনে চলার জন্য সহীহ হাদীসের কিতাবগুলোও বুঝে বুঝে পড়তে হবে। এভাবেও বলা যেতে পারে যে, একজন ডাক্তারের যেমন তার সিলেবাসের বই না বুঝে পড়ে ডাক্তার হওয়া সম্ভব নয়, তেমনি একজন ব্যক্তিকে আল কুরআনুল হাকীম না বুঝে পড়লে তার পক্ষে মুত্তাকী হওয়া সম্ভব নয়। বরং কেউ যদি কোন ব্যক্তি সম্পর্কে বলে যে, লোকটা মুত্তাকী কিন্তু সে কুরআন বুঝে না বা কুরআন বুঝে বুঝে পড়ে না, তাহলে সেটা কেবল হাস্যকর বলেই বিবেচিত হবে।

২. শিরকমুক্ত ঈমান ও বিশুদ্ধ আকীদার অধিকারী হওয়া।

কুরআন ও সহীহ হাদীসের কিতাব বুঝে বুঝে পড়ার মাধ্যমে ঈমান ও আকীদা পরিশুদ্ধ করতে হবে। শিরকমুক্ত ঈমানের অধিকারী হতে হবে। নির্ভরযোগ্য কিতাব এ ব্যাপারে আপনার সহায়ক হতে পারে। ‘ইমাম পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত ‘আকীদাহ’, ‘শিরক’ ও ‘যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্থ হয়’ কিতাবসমূহ পড়া যেতে পারে।

৩. বিশুদ্ধ আমল করা।

কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে শিরকমুক্ত ঈমান ও বিশুদ্ধ আকীদার সাথে সাথে একজন ব্যক্তিকে মহান আল্লাহর ফরজ ইবাদতগুলো নিষ্ঠার সাথে, সময়মত ও রাসূল ﷺ এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে। যেমন প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়, নেসাব পরিমাণ মালের অধিকারী হলে যাকাত প্রদান, রমজান মাসে সিয়াম পালন, হজ্জ করার সামর্থ থাকলে হজ্জ করা, পর্দা করা, পিতা-মাতার সেবা করা ইত্যাদি। এসব প্রতিটি বিষয়েই কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘ইমাম পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত বিষয়ভিত্তিক কিতাবসমূহ পাঠ করা যেতে পারে।

৪. হারাম ছেড়ে দেয়া ও হালাল উপার্জন করা।

মুত্তাকী হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো হালাল ভক্ষণ। হারাম উপার্জন ও হারাম কাজ ছেড়ে দিতে হবে। হালাল উপার্জনের মাধ্যমে হালাল ভক্ষণ এবং হালাল কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকতে হবে।

৫. গুনাহের কাজ ছেড়ে দেয়া, নেকীর কাজে অগ্রগামী হওয়া।

মুত্তাকী হওয়ার জন্য আরেকটি জরুরী বিষয় হলো গুনাহ তথা পাপের কাজ ছেড়ে দিতে হবে। খাটিভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। নেকীর কাজে অগ্রগামী হতে হবে। নেকীর কাজগুলো অবশ্যই কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত ও রাসূল ﷺ এর পদ্ধতিতে হতে হবে।

৬. প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা।

প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করতে হবে। সব সময় মনে রাখতে হবে, আমি যা কিছু করছি, যা কিছু বলছি সকল অবস্থায় আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এ বিষয়ে মুত্তাকীদের জন্য কুরআনে বর্ণিত আয়াতসমূহ অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

৭. নিয়মিত যিকির-আযকার করা, তওবা-ইস্তেগফার করা ও বিশুদ্ধ দু’আ-দরুদ পড়া।

সর্বদা রাসূল ﷺ এর দেখানো ও শেখানো পদ্ধতিতে যিকির করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রচলিত, বিভিন্ন পীরের দেয়া পদ্ধতি, দলীলবিহীন পদ্ধতি, হালকায় জিকির ইত্যাদি বিদআতী যিকির পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিদআত করলে নেকীতো হবেই না, বরং গুনাহ হবে। মুত্তাকী হওয়ার পরিবর্তে সে ব্যক্তি পাপী বলে সাব্যস্ত হবে। মুত্তাকী হওয়ার জন্য প্রতিদিন বেশি বেশি তওবা-এস্তেগফার করতে হবে। কুরআন ও সহীহ সুন্নায় উল্লেখিত বিশুদ্ধ দু’আ-মুনাজাত করতে হবে। এক্ষেত্রেও দলীলবিহীন পদ্ধতি, মনগড়া পদ্ধতি, পীর-বুযুর্গ ও মুরুববীদের পদ্ধতি, বিদআতী পদ্ধতি অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

৮. নফল ইবাদত করা।

ফরজ ও সুন্নত ইবাদতসমূহ নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করার পাশাপাশি কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত নফল ইবাদত তথা নফল সালাত, নফল সিয়াম পালন করতে হবে এবং নফল দান-সদকা করতে হবে। এক্ষেত্রেও দলীলবিহীন আমল পরিত্যাগ করতে হবে।

৯. বাইরে কম বের হওয়া, পরিবারকে সময় দেয়া।

চারদিকে অশ্লীলতা, পাপাচার ও নেশা ছড়িয়ে পড়েছে। চাকচিক্যতা আর কথার ফুলজুড়িতে শয়তান নিজে এবং তার অনুগত মানুষদের দ্বারা বাহারী সৌন্দর্য প্রদর্শন করে মানুষদেরকে পাপের দিকে টেনে নিচ্ছে। এমতাবস্থায় যত কম বাইরে বের হওয়া যায় ততই মঙ্গল। বরং পরিবারকে সময় দিন। এটাই রাসূল ﷺ এর সুন্নত। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূল ﷺ ঘরের কাজ করতেন, পরিবারকে সময় দিতেন, আযান হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন।

১০. সাধ্যানুযায়ী নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে দাওয়াতী কাজ করা।

সাধ্যানুযায়ী নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর দলীল ভিত্তিক দাওয়াতী কাজ করতে হবে। এ কাজ অবশ্যই রাসূল ﷺ এর পদ্ধতিতে হতে হবে। দলীলবিহীন এবং ব্যক্তিবিশেষের তৈরি পদ্ধতি অবশ্যই পরিহার করতে হবে। নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশী, ঘর-সংসার, পরিবার, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য ও হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা ছেড়ে দূরে গিয়ে জাল জয়ীফ হাদীস আর বুযুর্গ মুরুববীদের মিথ্যা কাহিনী ও স্বপ্নের দাওয়াত দেয়া পরিত্যাগ করতে হবে। যখন যেখানে যেভাবে থাকেন সেখানেই আপনার আশেপাশের লোকজনদের মাঝে কুরআন ও সহীহ হাদীসের দলীল উল্লেখ করে দাওয়াত দিতে হবে। এজন্য প্রথমে নিজে কুরআন ও সহীহ হাদীস বুঝে বুঝে পড়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যাচাই বাছাই না করে এবং সহীহ হাদীস অনুযায়ী দাওয়াত না দিলে, সওয়াব না হয়ে বরং গুনাহ হবে।

১১. আত্মশুদ্ধি অর্জন ও আত্মসমালোচনা করতে হবে।

মুত্তাকী হওয়ার জন্য এ দুটি কাজও অতীব জরুরী। আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে কুরআন ও সহীহ হাদীসের জ্ঞানই আপনার আত্মশুদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে। আত্মশুদ্ধি অর্জনেও বিভিন্ন তরীকা ও পীর-বুযুর্গ-মুরুববীদের পদ্ধতি অবশ্যই পরিহার করতে হবে। অন্যের সমালোচনা না করে প্রথমে নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। প্রথমে দেখতে হবে কুরআন ও সহীহ হাদীসের সাথে আমার কতটুকু সম্পর্ক আছে। আমি কুরআন হাদীস কতটুকু পড়ি, বুঝি, আমল করি; আগে নিজের হিসাব নিজে মিলাতে হবে।

১২. জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত থাকা।

সর্বোপরি এই ফিতনার যুগে মুত্তাকী হতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে অবশ্যই জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত থাকতে হবে। কেননা মুত্তাকী হওয়ার একটা বড় উপায় হলো নিজেকে জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত রাখা। দ্বীন ইসলামের সঠিক জ্ঞানই কেবল আপনাকে সকল প্রকার ফিতনা থেকে দূরে রাখতে পারে। তাই দুনিয়া যতটুকু না করলেই নয় ততটুকু করা এবং সকল প্রকার গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখার পর যতটুকু অবসর পাওয়া যাবে ততটুকুই কুরআন, সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী বই পড়ার মাধ্যমে নিজেকে কুরআন-সুন্নার জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ‘ইমাম পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত কিতাবসমূহ আপনার জন্য অনেকখানি সহায়ক হবে।