hadith book logo

যা হবে মরণের পরে

লেখকঃ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৯

গীবতকারী ও চুগলখোরের কঠিন অবস্থাঃ [- মানুষের অজান্তে দোষ বর্ণনার নাম গীবত। যদিও উক্ত দোষ তার মাঝে বর্তমান থাকে। চুগলখোর ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যে মানুষের মাঝে ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বর্ণনা করে। গীবতকারী ও চুগলখোরের মধ্যে পার্থক্য এই যে চুগলখোরের মধ্যে ঝগড়া লাগানোর ইচ্ছা থাকে। আর গীবতকারীর মধ্যে তা থাকা শর্ত নয়। বর্তমানে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে এই অপরাধটিতে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষভাবে মহিলাগণ একাজে বেশী লিপ্ত হয়। সমাজে ব্যাপকভাবে এর চর্চা থাকার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে। একারণেই আমি এই পুস্তিকাটিতে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করেছি যাতে করে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিগণ সতর্ক হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের সকলকে গীবতকারীদের অনিষ্টতা হতে হেফাজত করুন। আমীন।]

গীবতকারী ও চুগলখোরেরা মানুষের মধ্যে বিচ্ছেদ ও ঝগড়া সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বর্ণনা করে থাকে। মানুষের পারস্পরিক ভালবাসাকে শত্রুতায় পরিণত করে। তারা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক এবং বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী। তাদেরকে আপনি দেখতে পাবেন একজনের কাছে একরকম এবং অন্যজনের কাছে অন্যরকম চেহারা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। তারা নিজেদের ইচ্ছা মত যখন যা খুশী তাই বলে থাকে। আল্লাহ তায়াহলা তাদেরকে ধমকি দিয়ে বলেনঃ

وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ

অর্থঃ প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ। (সূরা হুমাজাহঃ ১) তারা নিজেদের কথা এবং কাজের মাধ্যমে মানুষের দোষ বর্ণনা করে থাকে। তারা ক্রোধ ও ঘৃণার হকদার। কারণ তারা মিথ্যা, গীবত, চুগলখোরী, খিয়ানত, হিংসা এবং ধোকা থেকে বিরত হয়না। এজন্যই কবরের আজাবের অন্যতম কারণ হলো চুগলখোরী করা। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَائِطٍ مِنْ حِيطَانِ الْمَدِينَةِ أَوْ مَكَّةَ فَسَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ يُعَذَّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ ثُمَّ دَعَا بِجَرِيدَةٍ فَكَسَرَهَا كِسْرَتَيْنِ فَوَضَعَ عَلَى كُلِّ قَبْرٍ مِنْهُمَا كِسْرَةً فَقِيلَ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَ فَعَلْتَ هَذَا قَالَ لَعَلَّهُ أَنْ يُخَفَّفَ عَنْهُمَا مَا لَمْ تَيْبَسَا أَوْ إِلَى أَنْ يَيْبَسَا

অর্থঃ একদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনা বা মক্কার কোন একটি বাগানের পাশদিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তথায় তিনি দুহজন এমন মানুষের আওয়াজ শুনতে পেলেন যাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাদেরকে আযাব দেয়া হচ্ছে অথচ বড় কোন অপরাধের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি বললেনঃ তাদের একজন পেশাব করার সময় আড়াল করতোনা। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগাত। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি কাঁচা খেজুরের শাখা আনতে বললেন। অতঃপর উক্ত খেজুরের শাখাটিকে দুহভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেক কবরের উপর একটি করে রেখে দিলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞেস করা হলো আপনি কেন এরকম করলেন? উত্তরে তিনি বললেনঃ হয়ত খেজুরের শাখা দুহটি জীবিত থাকা পর্যন্ত তাদের কবরের আযাব হালকা করা হবে। [- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ওযু]

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمُشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلَاءِ يَا جِبْرِيلُ قَالَ هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ

অর্থঃ যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তারা নখগুলো দিয়ে তাদের মুখমন্ডল ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরীল! এসমস্ত লোক কারা? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশ্‌ত ভক্ষণ করত এবং তাদের মান-সম্মান নষ্ট করত। অর্থাৎ তারা মানুষের গীবত ও চুগলখোরী করত। [- আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ কিতাবুল আদাব।]

কাতাদা (রঃ) বলেনঃ আমাদেরকে বলা হয়েছে কবরের আযাবের এক তৃতীয়াংশ হবে গীবতের কারণে, এক তৃতীয়াংশ পেশাব থেকে সাবধান না থাকার কারণে এবং এক তৃতীয়াংশ চুগলখোরীর কারণে। যেহেতু গীবতকারী এবং চুগলখোর মিথ্যা কথাও বলে থাকে তাই সে মিথ্যাবাদীর শাস্তিও ভোগ করবে। সামুরা বিন জুন্দুব (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্বপ্নের দীর্ঘ হাদীছে এসেছে,

فَأَتَيْنَا عَلَى رَجُلٍ مُسْتَلْقٍ لِقَفَاهُ وَإِذَا آخَرُ قَائِمٌ عَلَيْهِ بِكَلُّوبٍ مِنْ حَدِيدٍ وَإِذَا هُوَ يَأْتِي أَحَدَ شِقَّيْ وَجْهِهِ فَيُشَرْشِرُ شِدْقَهُ إِلَى قَفَاهُ وَمَنْخِرَهُ إِلَى قَفَاهُ وَعَيْنَهُ إِلَى قَفَاهُ قَالَ وَرُبَّمَا قَالَ أَبُو رَجَاءٍ فَيَشُقُّ قَالَ ثُمَّ يَتَحَوَّلُ إِلَى الْجَانِبِ الْآخَرِ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ مَا فَعَلَ بِالْجَانِبِ الْأَوَّلِ فَمَا يَفْرُغُ مِنْ ذَلِكَ الْجَانِبِ حَتَّى يَصِحَّ ذَلِكَ الْجَانِبُ كَمَا كَانَ ثُمَّ يَعُودُ عَلَيْهِ فَيَفْعَلُ مِثْلَ مَا فَعَلَ الْمَرَّةَ الْأُولَى

অতঃপর আমরা এমন এক লোকের কাছে উপস্থিত হলাম যাকে চিৎকরে শায়িত অবস্থায় রাখা হয়েছে। একজন লোক লোহার কেঁচী হাতে নিয়ে তার মাথার পাশে দাড়িয়ে আছে। দাড়ানো ব্যক্তি শায়িত ব্যক্তির মুখের একদিকে সেই কেঁচী প্রবেশ করিয়ে পিছনের দিকে ঘাড় পর্যন্ত চিরে ফেলছে। নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করিয়ে অনুরূপ করা হচ্ছে এবং চোখের ভিতর প্রবেশ করিয়েও অনুরূপ করা হচ্ছে। একদিকে চিরে শেষ করে অন্যদিকেও অনুরূপ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় দিকে চিরে শেষ করার সাথে সাথে প্রথম দিক আগের মত হয়ে যাচ্ছে। আবার প্রথম দিকে নতুন করে চিরা হচ্ছে। হাদীছের শেষাংশে এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কি অপরাধের কারণে তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? জিবরীল (আঃ) বললেনঃ এই ব্যক্তি হলো এমন লোক যে সকাল বেলা ঘর থেকে বের হয়েই মিথ্যা কথা বলত এবং সে মিথ্যা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তো। [- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত তা’বীর।]

হাদীছে চোগলখোরের কঠিন শাস্তির কথা এসেছে। হুযায়ফা (রাঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন,

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ

অর্থঃ চুগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। [- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল আদাব।] আম্মার বিন ইয়াসির (রাঃ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন,

مَنْ كَانَ لَهُ وَجْهَانِ فِي الدُّنْيَا كَانَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لِسَانَانِ مِنْ نَارٍ

অর্থঃ যে ব্যক্তি দুনিয়াতে দুহজনের নিকট দুহরকম কথা বলবে কিয়ামতের দিন তার আগুনের দুহটি জিহ্‌বা হবে। [- আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ কিতাবুল আদাব।] ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত,

سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ مَنْ حَالَتْ شَفَاعَتُهُ دُونَ حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ فَقَدْ ضَادَّ اللَّهَ وَمَنْ خَاصَمَ فِي بَاطِلٍ وَهُوَ يَعْلَمُهُ لَمْ يَزَلْ فِي سَخَطِ اللَّهِ حَتَّى يَنْزِعَ عَنْهُ وَمَنْ قَالَ فِي مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيهِ أَسْكَنَهُ اللَّهُ رَدْغَةَ الْخَبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَ

অর্থঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যার সুপারিশ আল্লাহর নির্ধারিত কোন দন্ডবিধি বাস্তবায়ন করার প্রতিরোধ হয়ে দাড়াল সে আল্লাহর সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হল। যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে অন্যায়ভাবে কারো সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হল সে তা থেকে বিরত থাকার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর ক্রোধের ভিতরে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোন মুমিন সম্পর্কে এমন কথা বলবে যা তার ভিতরে নেই সে যদি তা বর্জন করতঃ তাওবা না করে মৃত্যু বরণ করে আল্লাহ তাকে রাদাগাতুল খাবালে [- জাহান্নামীদের শরীরের পুঁজ ও পঁচা ঘামের নাম রাদাগাতুল খাবাল।] প্রবেশ করাবেন। তার উক্ত কথার প্রায়ঃশিচত্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করবে। [- আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ কিতাবুল আক্বযীয়া।]

আয়েশা (রাঃ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন যে,

مَنْ أَكَلَ لَحْمَ أخِيْهِ فِىْ الدُّنْيَا قُرِّبَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ كُلْهُ كَمَا أَكَلْتَهُ حَيًّا فَيَأْكُلُهُ وَ يَكْلَحُ وَيَصِيْحُ

যে ব্যক্তি দুনিয়াতে তার ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে (গীবত করবে) কিয়ামতের দিন গীবতকারীর সামনে গীবতকৃত ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় উপস্থিত করা হবে এবং বলা হবে তুমি এখন মৃত অবস্থায় তার গোশত ভক্ষণ কর। যেমনভাবে জীবিতাবস্থায় তার গোশত ভক্ষণ করতে। অতঃপর সে অতি অনিচ্ছা সত্বেও চিৎকার করতে করতে তা ভক্ষণ করবে। [- ফাতহুল বারী।]