hadith book logo

বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলা‌ইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ (ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এর যাদুল মা‘আদ হতে সংক্ষেপিত)

লেখকঃ ড. আহমাদ ইবন উসমান আল-মাযইয়াদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

(৯) যাকাত ও দান-সদকা প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালার বিবরণ [যাদুল মা‘আদ : ২/৫।]

(ক) যাকাত প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা: -

১. যাকাতের সময়-সীমা, পরিমাণ ও নেসাব এবং যাকাত কার উপর ফরয হবে এবং যাকাতের হকদার কারা? এসব বিষয়ে তাঁর আদর্শমালা সর্বাধিক পুর্ণাঙ্গ। যাতে ধনী-দরিদ্র উভয়ের কল্যাণের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা হয়েছে এবং ধনীদের সম্পদে সেই পরিমাণ যাকাত ফরয করা হয়েছে যদ্বারা ফকীরের প্রয়োজন পূরণ হয়, কারো প্রতি অবিচার করা ছাড়া।

২. যখন তিনি কোনো ব্যক্তিকে যাকাতের হকদার বলে জ্ঞাত হতেন, তখন তাকে যাকাতের মাল থেকে প্রদান করতেন, আর অপরিচিত কোনো ব্যক্তি যার অবস্থা সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত নন তাঁর নিকট যাকাতের মাল চাইলে, তিনি তাকে এ কথা বলার পর প্রদান করতেন যে, যাকাতের মালে ধনী ও সক্ষম উপার্জনকারী ব্যক্তির কোনো অংশ নেই।

৩. তাঁর আদর্শ ছিল যাকাতের মাল ধনীদের থেকে সংগ্রহ করে সে দেশের দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা, অতঃপর কিছু অতিরিক্ত হলে তাঁর নিকট মদীনায় নিয়ে আসলে তিনি তা বন্টন করে দিতেন।

৪. তিনি শুধু প্রকাশ্য মাল যথা চতুস্পদ জন্তু ও জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত সংগ্রহ করার জন্যে দূত প্রেরণ করতেন।

৫. তিনি উৎপাদিত শস্যের অনুমান করার জন্যে লোক প্রেরণ করতেন, যিনি খেজুর বাগানের খেজুর ও আঙ্গুরের লতায় আঙ্গুর অনুমান করতো, অতঃপর কত ওসক্ব হবে [১ ওসক্ব = ৬০ নববী সা‘, আর ১ সা’ = প্রায় আড়াই কেজি, সুতরাং ৫ ওসক্ব = ৭৫০ কেজি নেসাব পূর্ণ হলে।’’ অনুবাদক] অনুমান করে সেই পরিমান যাকাত নির্ধারণ করতো।

৬. তাঁর আদর্শ ছিল না ঘোড়া-গাধা, খচ্ছর এবং ক্রীতদাসের যাকাত গ্রহণ করা, অনুরূপ সব্জী, ফল-ফসলাদি যেগুলো তোলা-ওজন করা হয় না এবং গুদামজাত করা হয় না, কিন্তু তিনি আঙ্গুর ও পাকা খেজুরের যাকাত সংগ্রহ করতেন, তা তাজা হোক কিংবা শুষ্ক হোক এতে কোনো পার্থক্য করেন নি।

৭. তাঁর আদর্শ ছিল না মানুষের উত্তম-উত্তম মালগুলো যাকাত হিসেবে নিয়ে নেওয়া, বরং তিনি মধ্যম মাল গ্রহণ করতেন।

৮. তিনি সদকা গ্রহণকারী ফকীরকে তার সদকা বিক্রয় করতে নিষেধ করতেন, কিন্তু ধনীর জন্য সদকার মাল ভক্ষণ করা জায়েয করেন যদি ফকীর তাকে তা হাদিয়্যাস্বরূপ প্রদান করে থাকে।

৯. তিনি কখনো মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার্থে সদকার মাল থেকে পরিশোধ করার শর্তে ঋণ গ্রহণ করতেন, আবার কখনো সদকার মাল থেকে পরিশোধ করার শর্তে ঋণ গ্রহণ করতেন, আবার কখনো সদকার মাল তার মালিকদের নিকট হতে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতেন।

১০. কোনো ব্যক্তি যাকাতের মাল নিয়ে এলে তিনি তার জন্য এ বলে দু‘আ করতেন: হে আল্লাহ ! তার এবং তার উটের মধ্যে বরকত দান কর।” [সুনানে নাসাঈ।]

আবার কখনো বলতেন :

( اللهم صَلِّ عَلَيْهِ )

‘হে আল্লাহ ! তুমি তার প্রতি সালাত পেশ কর।” [বুখারী ও মুসলিম।]

(খ) যাকাতুল ফিৎরা প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা: [যাদুল মা‘আদ : ২/১৮।]

১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সা‘ করে খেজুর, যব, পনির ও কিশমিশ হতে সদকায়ে ফিৎরা আদায় করা ফরয করেন [নববী সা‘ = প্রায় আড়াই কেজি।’’ অনুবাদক।]।

২. তাঁর আদর্শ ছিল সদকায়ে ফিৎর ঈদের সালাতের পূর্বে আদায় করা। তিনি ঘোষণা করেন: “যে কেউ তা ঈদের সালাতের আগে আদায় করে তা হবে মাক্ববুল যাকাতুল ফিৎর, আর যে কেউ তা সালাতের পরে আদায় করে, তা হবে শুধুমাত্র এক প্রকার দান-খায়রাত।” [আবু দাউদ।]

৩. তাঁর আদর্শ ছিল সদকাতুল ফিৎর বিশেষভাবে অভাবগ্রস্তদের মাঝে বন্টন করা, অর্থাৎ তিনি তা যাকাতের হকদার আট প্রকারের উপর বন্টন করেন নি।

(গ) নফল সদকা-খায়রাত প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা: [যাদুল মা‘আদ : ২/২১।]

১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় মালিকানায় মানুষের মাঝে সর্বাধিক দানশীল ছিলেন, তিনি আল্লাহ্ প্রদত্ত নে‘আমতে সন্তুষ্ট হয়ে অধিক কামনা করতেন না এবং আল্লাহ প্রদত্ত নে‘আমতকে নগণ্য মনে করতেন না।

২. কেউ তাঁর নিকট কোনো কিছু চাইলে, তিনি তাকে তা প্রদান করতেন কম হোক কিংবা বেশী হোক।

৩. তিনি দান করে দানগ্রহণকারী অপেক্ষা অধিক খুশী হতেন।

৪. তিনি কোনো অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি দেখলে তাকে নিজের উপর প্রাধান্য দিতেন, কখনো স্বীয় খাদ্যদ্রব্য প্রদান করে, আবার কখনো স্বীয় পোষাক প্রদান করে।

৫. তাঁর উদারতা ও দানশীলতা দেখে তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ নিজেদের উপর কাবু হারিয়ে ফেলতো।

৬. তিনি বিভিন্ন প্রকারের দান-খায়রাত করতেন, কখনো উপহারের মাধ্যমে, আবার কখনো সদকার মাধ্যমে, আবার কখনো উপঢৌকনের মাধ্যমে, আবার কখনো কোনো বস্তু ক্রয় করে বিক্রেতাকে ব্যবসা-পণ্য ও মূল্য উভয়টি দান করে, কখনো তিনি কোনো বস্তু ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে তার চেয়ে অধিক পরিশোধ করতেন, আবার কখনো তিনি উপহার গ্রহণ করে তার চেয়ে অধিক প্রতিদান দিতেন।”