hadith book logo

বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলা‌ইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ (ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এর যাদুল মা‘আদ হতে সংক্ষেপিত)

লেখকঃ ড. আহমাদ ইবন উসমান আল-মাযইয়াদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৮

(১৬) ইসলামের দাওয়াত প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালার বিবরণ [যাদুল মা‘আদ: ৩/১১-৪৪।]

১. তিনি দিনে ও রাত্রে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন, তিনি নবুওয়াতের প্রথমভাগে তিন বছর মক্কায় গোপনীয়ভাবে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করেন, অতঃপর আল্লাহর বাণী:

﴿ فَٱصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٩٤ ﴾ [ الحجر : ٩٤ ]

‘‘তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছো, তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর।” [সূরা হিজর, আ: ৯৪।] এই আয়াত অবতীর্ণ হলে তিনি প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগ আরম্ভ করেন এবং আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করেন নি, বরং ছোট -বড়, স্বাধীন-ক্রীতদাস, নারী-পুরুষ ও জ্বিন-ইনসান সবাইকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন।

২. মক্কায় তাঁর সাহাবীদের উপর নিপীড়ন কঠোরতর হয়ে উঠলে তিনি তাদেরকে হাবশায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেন।

৩. তিনি তায়েফ গমন করেন এ আশায় যে, তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর সাহায্য করবে, তাই তিনি সেখানে পৌঁছে তাদেরকে দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দেন, কিন্তু তিনি সাহায্য-সহযোগিতাকারীরূপে কাউকে পেলেন না, বরং তারা তাঁকে সর্বাপেক্ষা কঠিন কষ্ট দিলো এবং তারা তাঁর সাথে এরূপ মন্দ আচরণ করলো যা তিনি তাঁর নিজের কাওম থেকেও পান নি। অবশেষে তারা তায়েফ থেকে তাঁকে মক্কার দিকে বহিষ্কার করলো, অতঃপর তিনি মুত‘আম ইবনে আদীর আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন।

৪. তিনি মক্কায় দশ বছর পর্যন্ত প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকেন, তিনি প্রত্যেক বছর হজ্জের মৌসুমে নতুন উদ্যমে ইসলামের দাওয়াত শুরু করতেন এবং হাজীদের তাঁবুতে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং ‘ওকায, মাজিন্নাহ ও যিল-মজায’ প্রভৃতি মেলা মৌসুমে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, এমনকি তিনি আরবের বিভিন্ন গোত্র ও তাদের অবস্থান-স্থল প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করে তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতেন।

৫. অতঃপর মিনার পাহাড়ী এলাকার ‘আকাবা’য় মদীনার ‘খাযরাজ’ গোত্রের ছয় জন লোকের সাথে দেখা হয়, তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়, অতঃপর তারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে লোকদেরকে ইসলামের পথে দাওয়াত দিতে থাকে, ফলে মদীনার ঘরে ঘরে দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ে, বস্তুত মদীনায় এমন কোনো ঘর বাকী ছিল না যাতে ইসলাম প্রবেশ করেনি।

৬. পরবর্তী বছর হজ্জ মৌসুমে তাদের ১২ জন লোক আসে, তিনি তাদেরকে মিনার ‘আকাবা’র কাছে বাই‘আত চান। তারা আল্লাহর রাসূলের নিকট বাই‘আত করেন। সে বাই‘য়াতের দফাসমূহ ছিল: তারা তাঁর কথা শুনবে এবং মানবে, তাঁর জন্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করবে, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে বারণ করবে, আল্লাহর জন্য দাওয়াতের কথা বলবে, এ ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তারা করবে না, তারা তাঁর সাহায্য করবে এবং নিজেদের প্রাণ, সন্তান-সন্তুতি এবং পরিবারের হেফযতের মতোই তাঁর হেফাযত করবে এবং পুরষ্কার স্বরূপ তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। অতঃপর তারা মদীনায় ফিরে যায়, তখন তিনি তাদের সাথে ‘আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতূম ও মুস্‘আব ইবনে ওমাইর, রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা-কে কুরআন শিক্ষা ও আল্লাহর দিকে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানের জন্যে মদীনায় প্রেরণ করেন, ফলে তাদের দাওয়াতে অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল উছাইদ ইবনে হুদাইর ও সা‘দ ইবনে মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা।

৭. অতঃপর তিনি মুসলিমদের মদীনায় হিজরত করে চলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন, তখন মুসলিমগণ দ্বীন রক্ষার্থে জন্মভুমি মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত শুরু করে, অবশেষে তিনি ও তাঁর সাথী আবু বকর হিজরত করেন।

৮. তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করেন। তখন তাদের সংখ্যা ছিল ৯০ জন পুরুষ।”

(ক) শান্তিচুক্তি-সন্ধি, নিরাপত্তা প্রদান ও দূতদের সাথে ব্যবহার প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা [যাদুল মা‘আদ: ৩/১১২।]

১. সহীহ্ সনদে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “সকল মুসলিমের অঙ্গীকার জনিত দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ একই ধরনের। ফলে তাদের সাধারণ ব্যক্তিরাও তা মেনে চলতে বাধ্য। অর্থাৎ একজন কোনো অঙ্গীকার বা চুক্তি করলে সকলে তা মেনে চলবে।” [বুখারী, মুসলিম।] তিনি আরো বলেন: “যার সাথে কোনো জাতির সন্ধি-চুক্তি রয়েছে, সে যেন চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হওয়া অবধি চুক্তি ভঙ্গ না করে। আর সে যেন সে সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই তার ব্যতিক্রম না করে। অথবা সন্ধি-চুক্তি তাদের দিকে এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলে যেন সে ও অপরপক্ষ এতে সমান সমান হয়ে যায়।” [আবু দাউদ, তিরমিযী।] তিনি আরও বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো লোককে তার জানের নিরাপত্তা দেওয়ার পর তাকে হত্যা করল, আমি সে হত্যাকারীর সাথে সম্পর্কছিন্নকারী।” [ইবনে মাজাহ্।]

৩. যখন ‘মুছাইলামাতুল কায্যাব-এর দু’জন দূত তাঁর নিকট এসে তার ব্যাপারে কথা-বার্তা বললো, তখন তিনি বলেন: “যদি না নিয়ম হচ্ছে দূতদেরকে হত্যা করা হয় না, নচেৎ আমি তোমাদের উভয়ের গর্দান উড়িয়ে দিতাম।” [আবু দাউদ।] তাই তাঁর আদর্শ এভাবে জারী হয় যে, কোনো প্রেরীত- দুতকে হত্যা না করা।” সে থেকে রাসূলের নিয়ম চলে আসছে যে, কোনো দূতকে হত্যা করা হয় না।

৪. কোনো প্রেরিত দূত তাঁর নিকট এসে ইসলাম গ্রহণ করলে, তিনি তাকে বাধা দিয়ে রেখে দিতেন না, বরং তাকে স্বদেশে ফিরিয়ে দিতেন।

৫. সাহাবীদের কেউ তাঁর অনুমতি ছাড়া শত্রুদের সাথে এমন কোনো সন্ধি-চুক্তি করলে যাতে মুসলিমদের কোনো ক্ষতি নেই, তখন তিনি তা অনুমোদন করে দিতেন।

৬. তিনি কুরাইশদের সাথে দশ বছর যাবৎ যুদ্ধ বন্ধের উপর শান্তি -চুক্তি করেন এ শর্তে যে, কুরাইশদের কোনো লোক মুসলিম হয়ে তাঁর নিকট আসলে তিনি তাকে ফিরিয়ে দেবেন, কিন্তু তাঁর নিকট থেকে কেউ আশ্রয় লাভের জন্যে কুরাইশদের নিকট চলে গেলে তারা তাকে ফেরত পাঠাবে না, তবে আল্লাহ্ তাআলা মুহাজির মহিলাদেরকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি রহিত করে দেন এবং তাদেরকে পরীক্ষা করার নির্দেশ প্রদান করেন, ফলে যে মু’মিনা বলে জানতে পারা যাবে, তাকে কাফেরদের নিকট ফেরত পাঠানো হবে না। [“এই প্রসঙ্গে সূরা মুমতাহিনার ১০-১৩ নং আয়াত নাযিল হয়।’’ অনুবাদক]

৭. তিনি মুসলিমদের প্রতি এ মর্মে নির্দেশ জারী করেন, যে নারী মুসলিম হয়ে হিজরত করে মদীনায় এসে যায়, তার কাফের স্বামী মাহর হিসেবে যা কিছু তার পিছনে ব্যয় করেছে, তা তাকে ফেরত দেওয়া হবে, আবার মুসলিমের স্ত্রী কাফেরদের নিকট চলে গেলে অনুরূপ মুসলিম স্বামীদেরকে মাহর ইত্যাদি ফেরত দেওয়া কাফেরদের উপর জরুরী ছিল। কিন্তু কাফেরগণ যদি তা ফেরত না দেয় এবং মুসলিমগণ এর প্রতিশোধ নিতে চায়, তবে কাফেরদের প্রাপ্য মাহর মুসলিমদের প্রাপ্য পরিমাণে আটক করে আটককৃত মাহর থেকে মুসলিম স্বামীকে তার ব্যয়কৃত অর্থের পরিমাণ দেওয়া হবে।

৮. কুরাইশদের কোনো পুরুষ মুসলিম হয়ে তাঁর কাছে চলে আসলে, অতঃপর হোদায়বিয়ার শর্তানুযায়ী তারা তাকে ধরে নিতে আসলে তিনি তাদেরকে বাধা দিতেন না, তবে ফেরত যাওয়ার জন্য আগন্তুক ব্যক্তির উপর না জবরদস্তি করতেন, আর না ফেরত যাওয়ার আদেশ দিতেন। যদি কোনো নির্যাতিত মুসলিম তাদের কাউকে হত্যা করে কিংবা তাদের মাল লুন্ঠন করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হতো এবং এসে তাঁর সাথে মিলিত না হতো, তখন তিনি তাতে অসম্মতি প্রকাশ করতেন না এবং কুরাইশদের জন্য তিনি তার জিম্মাদার হন নি [“যেমন আবু বছির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও তার সঙ্গীদের ঘটনা।’’ অনুবাদক।]

৯. তিনি খায়বরবাসীদের সাথে সন্ধি-চুক্তি করেন যখন তিনি তাদের উপর যুদ্ধে বিজয়ী হন এ শর্তে যে, তারা খায়বর নগরী হতে বহিষ্কৃত হবে এবং নিজেদের সাথে সাওয়ারীর উপর যতটা সম্ভব ধন-সম্পদ নিয়ে যাবে, তবে স্বর্ণ-রূপা ও সমরাস্ত্র আল্লাহর রাসূলের জন্য রেখে যাবে।

১০. তিনি খায়বরের কৃষিভূমি এই শর্তে সেখানকার অধিবাসী ইয়াহূদীদেরকে বর্গা-বন্দোবস্ত দেন যে, তারা এতে চাষ করে ফসল উৎপন্ন করবে, বিনিময়ে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক লাভ করবে এবং তিনি যতোদিন চাইবেন তাদেরকে খায়বরে থাকার সুযোগ দেবেন, আবার যখনই তিনি ইচ্ছা করবেন তাদেরকে বহিষ্কার করবেন, তাই তিনি প্রত্যেক বছর উৎপন্ন ফসলাদি অনুমান করে বন্টন করার জন্য লোক প্রেরণ করতেন, সে অনুমান করে মুসলিমদের অংশ নির্ধারণ করে নিতো এবং ইয়াহূদীরা তাদের অংশ নিয়ে নিতো।”

(খ) রাজা-বাদশাহ ও আমীরদেরকে ইসলামের দাওয়াত এবং তাঁদের প্রতি দূত ও চিঠি প্রেরণ প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা [যাদুল মা‘আদ’ ৩/১৪১।]:

১. রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুদায়বিয়া থেকে ফিরে আসার পর বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও আমীরদের নামে চিঠি পাঠান এবং তাদের প্রতি দূত প্রেরণ করেন। তিনি রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের প্রতি দাওয়াতী পত্র পাঠান এবং দেহইয়াতুল কালবী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-কে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করার ইচ্ছা করেছিল, কিন্তু পরিশেষে ইসলাম গ্রহণ করেনি।

২. তিনি হাবশার বাদশাহ নাজাশীর প্রতি চিঠি ও দূত প্রেরণ করেন, ফলে বাদশাহ্ নাজাশী ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হন।

৩. তিনি আবু মূসা আশ্‘আরী ও মু‘আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে ইসলামের দাওয়াতের জন্যে ‘ইয়ামেন দেশে’ প্রেরণ করেন, ফলে তাঁদের দাওয়াতে অধিকাংশ ইয়ামেনবাসী স্বেচ্ছায় যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করে।”

(গ) মুনাফিকদের প্রসঙ্গে প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা [যাদুল মা‘আদ, ৩/১৪৩।]:

১. রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের প্রকাশ্য অবস্থাকে গ্রহণ করতেন এবং গোপনীয় রহস্যকে আল্লাহর উপর সোপর্দ করতেন, তাদের বিরুদ্ধে দলীল-প্রমাণ দিয়ে জেহাদ করতেন, তাদেরকে উপেক্ষা করে চলতেন, তাদের প্রতি কঠোরতা করতেন এবং তাদের সাথে হৃদয়স্পর্শী কথা বলতেন।

২. তিনি তাদের অন্তঃকরণ নিজের দিকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে তাদের হত্যা করেননি, ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এক মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিতে চাইলে তিনি উত্তরে বলেন : না, লোকেরা যেন একথা বলতে না পারে যে, মুহাম্মাদ তো নিজের সাথীদেরকে হত্যা করছে।” [বুখারী ও মুসলিম।]