hadith book logo

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

লেখকঃ মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৫

অমুসলিম মাতা-পিতার প্রতি আচরণ

সন্তানের ইসলাম গ্রহণের পরও যদি মাতা-পিতা কুফর ও শিরকের পংকিলতায় নিমজ্জিত থাকে এবং তাকে কুফরীতে ফিরে আসতে বাধ্য করে, তবে কোনক্রমেই তাদের কথা মানা ও তাদের আনুগত্য করা যাবে না । কেননা আল্লাহর নাফরমানীমুলক কাজে কোন মানুষের আনুগত্য করা হালাল নয়। তবে অবশ্যই মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণ করে যেতে হবে।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا

মাতা-পিতা যদি আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য তোমার উপর চাপ প্রয়োগ করে- যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই- তাহলে অবশ্যই তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ার জীবনে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। আর তাদের আনুগত্য করবে যারা আমার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। [২ সুরা লুকমানঃ ১৫]

মাতা-পিতা সমতানকে কুফরী করার জন্য যত কঠিন চাপ প্রয়োগ করুক না কেন, তাদের কথা মানা ও তাদের আনুগত্য করা যাবে না। তবে তাদের সাথে অবশ্যই সদ্ব্যবহার ও সুন্দর আচরণ করে যেতে হবে ।

আবু বাকর (রা) এর কন্যা আসমা (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আমার মা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট এসেছিলেন। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আরয করলাম, আমার মা আমার নিকট এসেছেন, তিনি ইসলাম থেকে বিমুখ রয়েছেন। আমি কি তাঁর সাথে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন হ্যাঁ, মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করো। [১ সহিহ আল বুখারী, ২খ, পৃ. ৮৮৪; সহিহ মুসলিম, কিতাবুয যাকাত ২খ, পৃ. ৬৯৬;]

আবু হুরাইরা (রা) মুসলমান হওয়ার পরও দীর্ঘদিন যাবত তাঁর মা শিরকে নিমজ্জিত ছিলেন। তিনি মাকে সর্বদা শিরকের পরিণাম সম্পর্কে সর্তক করতেন এবং ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতেন। আর তাঁর মাও সর্বদা অস্বীকৃতি জানাতে থাকতেন। তা সত্বেও আবু হুরাইরা (রা) তাঁর মায়ের ইজ্জত- সম্মান, খেদমত ও আনুগত্যে কোন প্রকার ত্রুটি করেননি।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার মা মুশরিক থাকা অবস্থায় আমি তাঁকে সর্বদা ইসলাম গ্রহণ করার দাওয়াত দিতাম। একদিন আমি তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আমাকে এমন কিছু কথা শুনালেন, আমার অন্তর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। আমি ক্রন্দনরত অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি সব সময় আমার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকি, তিনি সব সময় তা অস্বীকার করতে থাকেন। আজ আমি তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি রাগান্বিত হয়ে আপনার শানে বেয়াদবী করে বসেন এবং আপনাকে গালমন্দ করেন। আমি তা সহ্য করতে পারিনি। আপনি আল্লাহর দরবারে দুআ করুর, যেন তিনি আবু হুরাইরার মাকে হেদায়েত নসীব করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি আবু হুরাইরার মাকে হেদায়েত করুন। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লমের দুআর সুসংবাদ নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমি বাড়ি পৌছে দেখি ঘরের দরজা বনদ্ধ। তিনি আমার পায়ের শব্দ শুনে ভেতর থেকে বললেন, আবু হুরাইরা অপেক্ষা কর। আমি পানি পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, তিনি তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করে দোপাট্টা পরিধান করে উড়না পরা ছাড়াই দরজা খুলে দিলেন। অতঃপর বললেন; আবু হুরাইরা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল। আমি আনন্দে ক্রন্দনরত অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনাকে সুসংবাদ শুনাতে এসেছি। আল্লাহ তাআলা আপনার দুআ কবুল করেছেন। তিনি আবু হুরাইরার মাকে হেদায়েত নসীব করেছেন। একথা শুনে তিনি খুশি হলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুনগান করলেন এবং আমাকে নসিহত করলেন।

এরপর আমি আরয করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি দুআ করুন যেন আল্লাহ আমাকে এবং আমার মাকে সকল মুমিনের প্রিয় বানিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করলেনঃ ইয়া আল্লাহ! আবু হুরাইরা ও তার মায়ের প্রতি ভালবাসা সকল মুমিনের অন্তরে সৃষ্টি করে দিন এবং তাদের উভয়ের অন্তরে সকল মুসলমানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিন। এ দুআর পর যে মুসলমানই আমাকে দেখেছে অথবা আমার কথা শুনেছে সেই আমাকে ভালোবেসেছে। [১ সহিহ মুসলিম, ফাযায়িল অধ্যায়, অনুঃ আবু হুরাইরা (রা)- এর ফযিলত। হাদিস নং ২৪৯১]