hadith book logo

দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী

লেখকঃ আবু আব্দুর রাহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

দশম পরিচ্ছেদ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাললামের বিনয় ও নম্রতা

নম্রতা একটি মহৎ গুণ, এ কারণেই আল্লাহ তাআলা নম্র লোকদের প্রশংসা করেছেন। এরশাদ হচেছঃ

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا ﴿63﴾ الفرقان

‘‘রহমানের বান্দাগণ যখন যমীনের উপর চলে, তখন তারা খুব নম্র হয়ে চলে। আর যখন মুর্খ লোকেরা তাদেরকে সম্বোধন করে, তখন তাদেরকে শান্তির বাণী শুনিয়ে দেয়।’’ [সূরা আল-ফুরকান : ৬৩]

মুসলমান বিনয়ী হলে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদার আসনে উন্নীত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কমে না, ক্ষমা করলে আল্লাহ তাআলা সম্মান বাড়িয়ে দেন, আর বিনয়ী হলে মর্যাদা উঁচু করে দেন।’ [সহীহ মুসলিম : ২৫৮৮]

আর এটি একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানুষের অন্তর প্রশস্ত করে দেয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। নম্র হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলাই দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের মাঝে তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। [শরহে নববী (সহীহ সহীহ মুসলিম এব ব্যাখ্যা গ্রন্থ) : ১৬/১৪২] অপরদিকে যে ব্যক্তি মানুষের উপর অহংকার করে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে অপদস্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। যেমন আবু হুরাইরা রা. ও আবু সায়ীদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অহংকার আললাহর পরিচ্ছদ, গর্ব তার চাদর, আল্লাহ বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি আমার হক নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে, আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেব।’’ [সহীহ মুসলিম : ২৬২০]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অধিক মাত্রায় বিনয়ী। তার বিনয়ের কতিপয় দৃষ্টান্ত নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

(১) আদবা নামক উষ্ট্রীর ঘটনাঃ আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ‘আদবা’ নামে একটি উষ্ট্রী ছিল। তাকে কখনও পরাজিত করা যেত না, একদা কোন এক গ্রাম্য ব্যক্তি তার একটি বাহন এনে সেটিকে পরাজিত করে ফেলল, বিষয়টি মুসলমানদের অনুভূতিকে মারাত্মকভাবে আহত করল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ কোন বস্ত্ত দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বে সেটিকে নিচু করে দেন।’ [সহীহ আল - বুখারী : ৬৫০১]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই হলেন আমাদের জন্যে উত্তম আদর্শ। তিনি মানুষকে দাওয়াত দেয়ার সময় নম্রতা অবলম্বন করতেন।

(২)আবু মাসঊদ রা. কর্তৃক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিনয়ের বর্ণনাঃ আবু মাসঊদ রা. বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে কথা বলার সময় ভয়ে কাপতেছিল। রাসূল তাকে বললেন, ‘তুমি স্বাভাবিক হয়ে কথা বল, কেননা আমি এমন এক মহিলার ছেলে, যে শুকনো গোশ্ত টুকরো টুকরো করে খেয়ে জীবন ধারণ করতো।’ হাকেম রহ. জরীর রা. এর বর্ণনায় কিছুটা বাড়িয়ে বলেছেন, তাহল, অতঃপর জরীর রা. এই আয়াত পাঠ করেছেন :

وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِجَبَّارٍ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآَنِ مَنْ يَخَافُ وَعِيدِ

‘‘তুমি তাদের প্রতি জোর-জবরদস্তিকারী নও। যে আমার শাস্তির ভয় করে তাকে তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও।’’ [সূরা কাফ : ৪৫]

অতএব, সকল মানুষকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করা অতীব জরুরী। তিনি দাওয়াতী ময়দানে ছিলেন খুবই বিনয়ী। তিনি শিশুদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে তাদেরকে সালাম দিতেন। ছোট্ট বালিকা তার হাত ধরে যেখানে ইচছা নিয়ে যেতে পারত। তিনি ঘরে থাকা অবস্থায় পরিবারের খেদমত করতেন। ব্যক্তিগত কারণে কারো উপর প্রতিশোধ নিতেন না। জুতা সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন। বকরী দোহন করতেন। উটকে ঘাস খাওয়াতেন। চাকর-বাকরদের সাথে খাবার খেতেন। মিসকীনদের সাথে উঠাবসা করতেন। বিধবা ও এতিমের সাথে তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য হাটতেন। কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে প্রথমেই সালাম দিতেন। কেউ দাওয়াত দিলে তা অল্প হলেও গ্রহণ করতেন। মোটকথা তিনি নিজেকে অপদস্ত না করে ছিলেন বিনয়ী। অপচয় না করে ছিলেন দানশীল। ছিলেন কোমল হৃদয়ের অধিকারী, মুমিনদের সামনে আপন বাহুকে ঝুকিয়ে দিতেন। [মাদারিজুস সালেকীন : ২/৩২৮]

(৩) অন্য নবীগণকে নিজের উপর মর্যাদা দেয়াঃ এক ব্যক্তি তাকে বলল: يا خير البرية (হে সৃষ্টির সেরা), একথা শুনে তিনি বললেন, ‘তিনি ছিলেন ইব্রাহীম আ.।’ কারো একথা বলা উচিত নয় যে, আমি ইউনুসের চেয়ে উত্তম।’ তিনি নবী রাসূলগনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সকল মানুষের নেতা এতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি নিজেই বলেন: أنا سيد الناس يوم القيامة ‘কিয়ামত দিবসে আমি হবো মানবজাতির নেতা।’ [সহীহ আল - বুখারী : ৩৩৪০, সহীহ মুসলিম : ১৯৪] তা সত্বেও তিনি বিনয় প্রদর্শন করতে যেয়ে এ কথাগুলো বলেছেন।

তার বিনয়ী হওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো, তার দরজায় কোন দারোয়ান থাকতনা, [সহীহ আল - বুখারী : ১২৮৩] তিনি রুগ্ন ব্যক্তিদের ঝাড়-ফুঁক করতেন, তাদের আরোগ্যের জন্যে দুআ করতেন, ছোট শিশুর মাথায় হাত বুলাতেন, তাদের জন্যে দুআ করতেন, [সহীহ আল - বুখারী : ৭২১০] তিনি তার সাহাবীদের জন্যে সুপারিশ করতেন, এবং তিনি বলতেন, ‘তোমরা সুপারিশ কর, প্রতিদান পাবে, আর আল্লাহ তার নবীর যবানে যা চাইবেন তা-ই ফয়সালা করবেন।’ [সহীহ আল - বুখারী : ১৪৩২, সহীহ মুসলিম : ২৬২৭]

আনাস রা. কে তিনি আদর ও স্নেহ করে يا بني (হে ছেলে) বলে ডাক দিতেন। [সহীহ মুসলিম : ২১৫১]

তার বিনয়ী হওয়ার আরেকটি উদাহরণ হলোঃ এক মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিত। এক রাতে সে মারা গেলে লোকজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তাকে দাফন করে ফেলল। আল্লাহর রাসূল তার মৃত্যুর কথা শুনতে পেয়ে বললেন, ‘আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই এ সকল কবরসমূহ কবর বাসীর জন্যে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমার দুআর মাধ্যমে তাদের কবর আলোকিত করে দেন।’ [সহীহ মুসলিম : ৯৫৬]

আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, ‘আমি একটানা দশ বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে ছিলাম, কখনও তিনি আমার কাজে উহ! শব্দও উচ্চারণ করতেন না। যেটি করে ফেলেছি সেটির ব্যাপারে বলতেন না, ‘কেন করেছ?’ আর যেটি করিনি সেটির ব্যাপারে বলতেন না, ‘কেন করনি?’ তিনি ছিলেন মানুষের মাঝে উত্তম চরিত্রের অধিকারী।’ [সহীহ আল - বুখারী : ৬০৩৮]