hadith book logo

দয়া ও ভালোবাসার অনন্য বিশ্ব নবী

লেখকঃ আবু আব্দুর রাহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: শিশুদের প্রতি তার সোহাগ এবং তাদের আনন্দদান

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল ক্ষেত্রে মানবতার পূর্ণ শিখরে উপনীত হয়েছেন এই মহৎগুণের মধ্যে রয়েছে শিশুদের প্রতি তার সুন্দর ব্যবহার, যাতে রয়েছে সকলের জন্য আদর্শ। এ পর্যায়ে সাধারণত কেউ উপনীত হতে পারে না। মনোবিজ্ঞানীরাও না, তবে এ সত্ত্বেও মুসলমানের উচিত যতটুকু সম্ভব তার আদেশের অনুকরণ করা। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সোহাগ ও কৌতুক করা। এগুলোর কিছু দৃষ্টান্ত স্বরূপ ও সংক্ষিপ্ত আকারে নিম্নে তুলে ধরা হলো :

প্রথম দৃষ্টান্তঃ

মাহমুদ বিন রুবাই এর সাথে তার কৌতুক:

মাহমুদ রা. বলেন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এক বারের পানি ছিটানোর কথা; ‘তিনি আমার চেহারায় বালতি থেকে পানি ছিটিয়েছেন তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর যা আমার এখনো মনে আছে।’ [সহীহ আল - বুখারী ৭৭ , সহীহ মুসলিম ৪৫৬/১]

তিনি এটা করেছেন কৌতুকরত বা বরকত স্বরূপ, যেমনটি তিনি সাহাবীদের সন্তানদের সাথে করতেন। শেখ বিন বায বলেন, ‘এটা কৌতুক ও উত্তম চরিত্রের অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।’

দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত :

শিশুদের সাথে তার সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ ও কৌতুকঃ

জাবের বিন সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলের সাথে ফজরের নামাজ পড়লাম অতঃপর তিনি বাড়ির দিকে বের হলেন আমিও তার সাথে বের হলাম। পথিমধ্যে তার সাথে কিছু বাচ্চাদের সাক্ষাৎ হল। তিনি তাদের এক এক করে প্রত্যেকের উভয় গালে হাত বুলাতে লাগলেন।’ মাহমুদ রা. বলেন, ‘তিনি আমার উভয় গালে হাত বুলালেন আমি তার হাতের হিম শীতল সুগন্ধি উপলব্ধি করলাম। যেন তার হাতের সাথে সুগন্ধি ব্যবসায়ীর সামগ্রীর ছোঁয়া লেগেছে।’ [সহীহ মুসলিম ২৩২৯]

তৃতীয় দৃষ্টান্তঃ

বিভিন্ন সময় হাসান ও হুসাইন এর সাথে তার আদর পূর্ণ ব্যবহারঃ

১। আবু হুরাইরাহ রা. বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান বিন আলীকে চুম্বন করেন তখন তার নিকট আকরাহ বিন হাবেস তামীমী বসা ছিলো। আকরাহ বলল, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে তাদের কাউকে আমি চুম্বন করি না।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।’ [সহীহ আল - বুখারী ৫৯৯৭]

২। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘এক গ্রাম্য লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আসল এবং বলল তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের চুমো খাও আমরা তাদের চুমো খাই না।’ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার অন্তরে দয়া উদ্রেক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, যদি আল্লাহ তাআলা তা ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন।’ [সহীহ আল - বুখারী ৫৯৯৮, সহীহ মুসলিম ২৩১৭]

৩। হাসান ও হুসাইন রা. রাসূলের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন। এ ব্যাপারে ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের সম্পর্কে বলতে শুনেছি, ‘তারা আমার পৃথিবীর সুগন্ধিময় দুটি ফুল।’ [সহীহ আল - বুখারী ৫৯৯৪]

অর্থাৎ- আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের দান করেছেন এবং তাদের দিয়ে সম্মানিত করেছেন। সন্তানদেরকে চুম্বন করা হয় এবং সুঘ্রাণ নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে সুগন্ধময় ফুলের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

৪। আবু বকরাহ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিম্বারে আরোহণ অবস্থায় তার খুতবা শুনেছি, আর হাসান তার পাশে ছিল। তিনি একবার মানুষের দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার তার দিকে তাকাচ্ছেন এবং বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার এ সন্তান হল নেতা। সম্ভবত আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুসলমানদের বিশাল দু দলের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন।’ [সহীহ আল - বুখারী ৩৭৪৬]

পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুআবিয়া ও তার সাথিদের এবং আলী বিন আবু তালেব রা. এর অনুসারীদের ও তার সাথিদের মাঝে মীমাংসা করেন। অতএব তিনি খেলাফত মুআবিয়ার জন্য ছেড়ে দেন। ফলে আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা মুসলমানদের রক্ত হেফাযত করেন।

৫। বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ‘আমি হাসান বিন আলীকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাঁধে দেখেছি এবং বলতে দেখেছি, ‘হে আল্লাহ আমি তাকে ভালোবাসি। অতএব আপনিও তাকে ভালোবাসবেন।’ [সহীহ আল - বুখারী ৩৭৪৯]

চতুর্থ দৃষ্টান্ত:

সেজদা অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিঠে বাচ্চার আরোহণ :

শাদ্দাদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন মাগরিব বা এশার নামাজ পড়ানোর জন্য। হাসান বা হুসাইনকে তিনি বহন করছিলেন। অতঃপর তিনি সামনে গেলেন এবং তাকে রাখলেন। এরপর তিনি নামাজের মধ্যে একটি দীর্ঘ সেজদা করলেন। আমার পিতা বলেন যে, ‘আমি আমার মাথা উত্তোলন করলাম আর দেখতে পেলাম সেজদাহরত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাঁধে একটি শিশু। আমি আমার সেজদায় ফিরে আসলাম। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ সম্পন্ন করলেন তখন লোকেরা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই আপনি নামাজের মধ্যে একটা দীর্ঘ সেজদা করেছেন, যে কারণে আমরা মনে করলাম হয়তো কোন কিছু হয়েছে অথবা আপনার কাছে ওহী আসছে।’ তিনি বললেন, ‘এগুলোর কোনটাই হয়নি। তবে আমার একটি সন্তান আমার পিঠে আরোহণ করেছিলো, তাই আমি তার প্রয়োজন পূরণ না করে তাড়াহুড়ো করতে অপছন্দ করলাম।’ [নাসায়ী ১১৪২, আহমাদ ৪৯৩/৩]

পঞ্চম দৃষ্টান্ত:

উসামার প্রতি তার ভালোবাসা :

উসামা বিন যায়েদ রা. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ধরে তার এক রানে বসাতেন আর হাসানকে বসাতেন অন্য রানে। অতঃপর তাদের একত্র করতেন এবং বলতেন,

‘হে আললাহ! তুমি তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, কেননা আমি তাদের প্রতি দয়া করি।’ [সহীহ আল - বুখারী ৬০০৩]

অন্য বর্ণনায় এসেছে

‘হে আললাহ! আমি তাদের ভালোবাসি সুতরাং আপনিও তাদের ভালোবাসুন।’

ষষ্ঠ দৃষ্টান্ত :

নামাজরত অবস্থায় যয়নব রা. এর মেয়েকে কোলে তুলে নেয়াঃ

আবু কাতাদাহ থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়া অবস্থায় উমামা বিনতে যয়নবকে বহন করছিলেন, যখন তিনি সেজদা করতেন তখন তাকে রেখে দিতেন। আর যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে কোলে তুলে নিতেন।’ [সহীহ আল - বুখারী ৫১৬]

সপ্তম দৃষ্টান্ত :

উম্মে খালেদের সাথে হাবশী ভাষায় কৌতুকঃ

এ ব্যাপারে উম্মে খালেদ বিনতে খালেদ বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন। আমি আমার বাবার সাথে রাসূলের নিকট আসলাম, তখন আমার গায়ে হলুদ বর্ণের জামা ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘‘ছানাহ! ছানাহ!’’ এটি হাবশী ভাষার শব্দ যার অর্থঃ চমৎকার! চমৎকার!

তিনি বলেন- ‘অতঃপর আমি নবুওয়তের মোহর নিয়ে খেলা করতে গেলাম। আমাকে আমার পিতা ধমক দিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তাকে ধমক দিও না।’ অতঃপর বলেন ‘ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর আবার ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর।’ আব্দুল্লাহ বলেন অতঃপর সে যতদিন জীবিত ছিল ততদিন বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। [সহীহ আল - বুখারী ৩০৭১] অর্থাৎ বর্ণনাকারী তার দীর্ঘ জীবনের কথা বুঝিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, উম্মে খালেদের মত আর কেহ এত দীর্ঘ জীবন লাভ করেনি।



অষ্টম দৃষ্টান্তঃ

শিশু বাচ্চারা কাঁদার সময় তার নামাজ পড়া সংক্ষিপ্ত করাঃ

তিনি কোন শিশু বাচ্চার কাঁদার আওয়াজ শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। এ ব্যাপারে আবু কাতাদাহ তার পিতা হতে ও তার পিতা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যখন আমি নামাজে দাঁড়াই ইচ্ছা থাকে নামাজ দীর্ঘ করব। কিন্তু যখন কোন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি, তখন তার মায়ের কষ্ট হবে ভেবে আমি নামাজ সংক্ষেপ করি।’ [সহীহ আল - বুখারী ৭০৭]

নবম দৃষ্টান্তঃ

শিশু বাচ্চাদের তার সালাম দেয়াঃ

আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি শিশু বাচ্চাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের সালাম দিতেন। এবং বলতেন, ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি করতেন।’ [সহীহ আল - বুখারী ৬২৪৭, সহীহ মুসলিম ১৭০৮/৪]

দশম দৃষ্টান্তঃ

আবু উমায়ের সাথে তার কৌতুকঃ

আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে প্রিয় ছিল আমার এক ভাই, তার নাম আবু উমায়ের। আমার মনে আছে, সে যখন এমন শিশু যে মায়ের বুকের দুধ ছেড়েছে মাত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আসতেন এবং বলতেন ‘হে আবু উমায়ের! কি করেছে তোমার নুগায়ের?’ নুগায়ের হল এমন একটি ছোট পাখি যার সাথে আবু উমায়ের খেলা করত। নুগায়ের মারা গিয়েছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নুগায়েরের জন্য চিন্তিত দেখলেন এবং তার সাথে খেলা করলেন। [সহীহ আল - বুখারী ৬২০৩]

একাদশ দৃষ্টান্তঃ

তার ডান পার্শ্বে অবস্থানের কারণে বড়দের পূর্বে শিশুদের প্রদান করা

তার ডান পাশের শিশু ছেলেকে বড়দের আগে শরবত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে সাহল বিন সাআদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এক পেয়ালা শরবত আনা হল। তার থেকে তিনি শরবত পান করলেন এবং তার ডান পাশে ছিল দলের সবচেয়ে ছোট একটি ছেলে, আর বড়রা ছিল তার বাম পার্শ্বে। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হে ছেলে তুমি কি আমাকে অনুমতি দেবে যে, আমি তা বড়দের আগে দেব?’

ছেলেটি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে আমি অন্য কাউকে আমার উপর প্রাধান্য দেব না।’ অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দিলেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তুমি কি আমাকে অনুমতি দেবে এদের দেয়ার।’ ছেলেটি বলল, ‘না। আল্লাহর কসম! হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছ থেকে কিছু লাভ করার ব্যাপারে অন্য কাউকে প্রাধান্য দেব না। বর্ণনাকারী বলেন অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার হাত ভরে দিলেন।’ [সহীহ আল - বুখারী ২৩৫১]

দ্বাদশ দৃষ্টান্তঃ

রাসূলের কোলে শিশুদের প্রস্রাব

উম্মে কায়স বিনতে মিহসান থেকে বর্ণিত, তিনি তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে রাসূলের দরবারে আসলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তার কোলে রাখলেন, সে তার কোলে প্রস্রাব করে দিল। তারপর তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন এবং পানি ছিঁটিয়ে দিলেন এবং তা ধৌত করেননি। [সহীহ আল - বুখারী ২২৩]

এ ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যা দ্বারা শিশুদের সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উত্তম আচরণ, সুন্দর ব্যবহারের বিষয়গুলোর বর্ণনা রয়েছে।