১
মুসলমানদের পতন অতীত বর্তমান (সালাহউদ্দীন আইউবীর আবির্ভাব পূর্ব ইসলামি বিশ্ব ও বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা)
লেখকঃ মুহাম্মদ আল আবদাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৮
২. সুলতান নূরুদ্দীন মাহমুদ
আমরা যদি সুলতান নূরুদ্দীনের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রভাব আর জিহাদ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে চাই- তিনি এবং সালাহউদ্দীন ছিলেন স্ব স্ব সময়ে জিহাদ নবায়নের আদর্শ, তা হলে আমাদেরকে উল্লেখ করতে হয় ঐতিহাসিক শিহাবুদ্দীন আবদুর রহমান ইবনে ইসমাঈল আল-মাকদেসী আশ শাফেয়ির উক্তি। যাঁর উপাধি ছিল আবু শামা। নূরুদ্দীন এবং সালাহউদ্দীনের শাসনামলের গুরুত্বের কারণ উল্লেখ প্রসঙ্গে নূরুদ্দীন সম্পর্কে তিনি বলেন . তার শাসনামল অনেক আগের হলেও তাঁর শাসনকালের প্রভাব দর্শন করে এবং তাঁর সম্পর্কে শ্রবণ করে আমি চমৎকৃত হয়েছি। তাঁর পরে যিনি ছিলেন সেরা শাসক, অর্থাৎ সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী। তাঁর সম্পর্কে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি। এরা দু’জন অর্থাৎ সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গি এবং সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ছিলেন অতীত কালের খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব এবং ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের মতো। জীবন চরিত আর চরিত্র মাধুর্যের দিক থেকে এরা দু’জন ছিলেন উত্তম শাসক। তবে কৃতিত্ব পূর্ববর্তী ব্যক্তিত্বের অর্থাৎ নুরুদ্দীন জঙ্গির। কারণ, এসব কল্যাণের মূল উৎস ছিলেন তিনি। সুবিচার, সুশাসন, ন্যায়নীতি আর জিহাদ দ্বারা তিনি গোটা দেশে কল্যাণের পথ উন্মুক্ত করে তোলেন। তবে সালাহউদ্দীন অধিক জিহাদ করেন এবং বেশি দেশ জয় করেন। তিনি নিজে ধৈর্য ধারণ করেন এবং অন্যদেরকে ধৈর্যের দীক্ষা দান করেন। ফলে আল্লাহ তাঁর হাতে বিরাট বিজয় সাধন করান। তিনিই হচ্ছেন সেই বীর সৈনিক, যাঁর হাতে আল্লাহ বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের অধিকারে এনে দেন।1
হিজরী ৫১১ সনে ইরাকে নূরুদ্দীনের জন্ম হয়। পিতার সঙ্গে তিনি ইরাক, মুসেল এবং শাম দেশের নানা অঞ্চল ঘুরে বেড়ান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি হন পিতার স্থলাভিষিক্ত। তিনি হালব অঞ্চলে সুন্নাহর প্রচার প্রসার ঘটান। বেদআতের পরিবর্তন সাধন করেন। রাফেযী মতবাদের মূলোৎপাটন সাধন করেন এবং অনেক দ্বীনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদ- মাদ্রাসার জন্য তিনি ওয়াকফের প্রচলন করেন এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ধর্মীয় গ্রন্থ ব্যাপক অধ্যয়ন করতেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। নিয়মিত জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। কুরআন মজীদ নিয়ম অনুযায়ী তিলাওয়াত করতেন। হালাম-হারামের বিধান কঠোরভাবে মেনে চলতেন এবং হারাম খাওয়া থেকে বিরত থাকতেন। ব্যয়ের ক্ষেত্রে তিনি সৎ পন্থা মেনে চলতেন। খাদ্য- দ্রব্য এবং পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও তিনি সতর্ক ছিলেন। তাঁর মুখে কখনো মন্দ কথা উচ্চারিত হতে শোনা যায়নি।2
তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর বলেন .
আমি ইসলামের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কালের রাজা- বাদশাহদের জীবনী অধ্যয়ন করেছি। বর্তমান কাল পর্যন্ত সমস্ত শাসকদের জীবনী আমি অধ্যয়ন করে দেখেছি। খোলাফায়ে রাশেদীন এবং ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের পর তাঁর চেয়ে সুন্দর চরিত্রের কারো সম্পর্কে আমি জানতে পারিনি।3
খোদাভীতি এবং দুনিয়া ত্যাগের নীতি তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। বৈধভাবে খরিদ করা অন্ন বস্ত্র ছাড়া অন্য কিছু তিনি ব্যবহার করতেন না। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গনিমতের অংশ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করতেন না। মুসলমানদের ধনভান্ডার থেকে তিনি এক কপর্দকও নিতেন না। একবার তাঁর স্ত্রী অভাব অনটনের অভিযোগ করে বেশি খোরপোশ দাবি করলে তাঁর চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করে। তিনি বলেন . আমি কোথা থেকে তার দাবি পূরণ করব? তার প্রেমে আমি জাহান্নামের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি না। অতঃপর তিনি বলেন . হেমস শহরে আমার জন্য তিনটা দোকান নির্দিষ্ট আছে। এ দোকানগুলো থেকে সে ইচ্ছা মতো পণ্য গ্রহণ করতে পারে।4
তাঁর দরবারের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর সম্পর্কে বলেন . একদিন আমি তাঁর সঙ্গে ‘আররাহার’ প্রান্তরে ছিলাম। সূর্যের তাপ ছিল আমাদের পৃষ্ঠের উপর। আমরা যতই অগ্রসর হই, ততই সূর্যের প্রখর তাপ আমাদের উপর পতিত হয়। আমরা যখন প্রত্যাবর্তন করি, তখন আমাদের ছাড়া পেছনে পতিত হয়। অশ্ব হাঁকিয়ে পেছনে তাকিয়ে তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বলেন . তুমি কি জান, কেন আমি অশ্ব হাঁকাই আর পেছনে তাকাই? আমি বললাম . না। তিনি বললেন . আমার মনে হয়েছে যে, পৃথিবীতে আমরা যে অবস্থায় আছি, তাতে বুঝা যায় যে, যে ব্যক্তি দুনিয়া তালাশ করে, দুনিয়া তার থেকে পলায়ন করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে পলায়ন করে, দুনিয়ার তার পেছনে ছুটে চলে। আবু শামা বলেন . যে শাসনকর্তা এমন চিন্তা করতে পারেন, তাঁর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্টি হন।5 ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর বলেন . রাত্রিবেলা বেশির ভাগ সময় তিনি নামাজে রত থাকতেন। দোয়া- ইস্তিগফার করতেন। অশ্বারোহনের পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থায় কাটতো। কবির ভাষায় .
جمع الشجاعة والخشوع لربه ما أحسن المحراب في المحراب
বীরত্ব আর বিনয়ের সমাবেশ ঘটান তিনি আপন পালন কর্তার জন্য! মিহরাবের অভ্যন্তরে মিহরাব কতইনা চমৎকার।6
হানাফি মাজহাবের ফিকাহ সম্পর্কে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন, তাই বলে তাঁর মধ্যে গোঁড়ামি বা পক্ষপাতিত্ব ছিল না। সকল ব্যাপারে ইনসাফই ছিল তাঁর ভূষণ। বাস্তবিক পক্ষে ইনসাফ আর ন্যায় নীতি অনুসরণ করা, খাদ্য- পানীয় এবং পরিধেয় বস্ত্রের ক্ষেত্রে হারাম বর্জন করার রীতি শাসক শ্রেণির জন্য তিনিই নবায়ন করেন। তাঁর পূর্বে শাসক শ্রেণি ছিল জাহেলি যুগের অনুসারী। উদর পূর্তি আর যৌন ক্ষুধা নিবৃত্ত করাই ছিল তাদের একমাত্র চিন্তা। ন্যায়-অন্যায় এবং ভালো মন্দ কিছুই তারা চিনত না। সুবিচারের দৃষ্টিতে দেখতে গেলে তিনি ছিলেন চরিত্রের দিক থেকে সর্বোত্তম শাসক। শাম দেশ, জাযিরা এবং মিসরে তাঁর শাসনকালে তিনি ট্যাক্স, কাষ্টম ডিউটি এবং ওশর রহিত করেন।7
দেশে সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য তিনি একটা বিচারণীয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিচারালয় স্থাপনের কারণ ছিল এই যে, তাঁর নিয়োজিত শাসকবর্গ আর সেনাবাহিনীর কর্তা ব্যক্তিরা প্রতিবেশীদের উপর জুলুম করলে সকলে কাজি কামালুদ্দীনের নিকট অভিযোগ দায়ের করে। কাজি কোন কোন ক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেও আসাদুদ্দীন শেরকোহ এর ক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। সুলতান নূরুদ্দীন এ বিষয়ে অবগত হতে পেরে এ বিচারালয় স্থাপন করেন। আসাদুদ্দীন এ সম্পর্কে জানতে পারলে সুলতান তার আমলাদের উদ্দেশ্যে বলেন . খোদার কসম করে বলছি, তোমাদের কারো কারণে আমাকে বিচারালয়ে উপস্থিত হতে হলে আমি অবশ্যই তাকে শুলিবিদ্ধ করব। যাও এবং নিজেদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করে ফেলো। প্রতিপক্ষকে রাজি করো এবং ভালো ভাবে মীমাংসা কর।8 তখন তারা বলল . আমরা এটা করলে লোকেরাতো দাবি জোরদার করবে। তিনি বলেন . নূরুদ্দীনকে সালিশের পিতার চোখে দেখার চেয়ে আমার হাত থেকে আমার মালিকানাধীন সমস্ত কিছু ছুটে যাওয়াটা আমার নিকট অতি সহজ। নূরুদ্দীন সপ্তাহে দু’দিন এ বিচারালয়ে বসতেন। আসাদুদ্দীন শেরকোহ এর অবস্থা সম্পর্কে জানতে পের তিনি আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতার সেজদা আদায় করেন।9
মুসলিম দেশগুলোতে তাঁর কল্যাণমূলক কাজ অনেক। তিনি শাম দেশে নগর প্রাচীর নির্মাণ করেন এবং তা অতিশয় মজবুত করে তৈয়ার করেন। হালব শহর এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এবং দামেশকে তিনি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তিনি দ্বীনদার ব্যক্তিদেরকে সুউচ্চ মহলে স্থান দিতেন। এজন্য আমির ওমরারা তাঁকে হিংসার চোখে দেখতো। তাঁর দরবারের অন্যতম আমির শায়েখ কুতুবুদ্দীন নীশাপুরী প্রসঙ্গটা তাঁর নিকট উপস্থাপন করলে সুলতান তাকে বলেন . তুমি যার বিরুদ্ধে কথা বলছো, সেতো পুণ্য করছে। তার সমস্ত পদস্খলন ক্ষমা করা হচ্ছে। আর তা হচ্ছে জ্ঞান ও দীন আর তুমি এবং তোমার সঙ্গীদের মধ্যে তুমি যা বলছ, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে। কিন্তু মাফ করানোর মতো কোন পুণ্য কর্ম তোমাদের নেই। তোমাদের নেক কাজ না থাকলেও আমি তোমাদের বদ কর্ম বহন করছি। তার মন্দ কর্ম যদি সত্যিই থেকে থাকে তবে কি আমি তা বহন করব না? অথচ তারতো নেক কাজ রয়েছে। তবে খোদার কসম করে বলছি, তুমি যা বলছ, আমি তা বিশ্বাস করি না। তুমি পুনরায় যদি তার সম্পর্কে খারাপ কথা বলো তবে আমি নিশ্চিত তোমাকে শিক্ষা দিবো।10
তিনি এমনই নির্লোভ- নিস্পৃহ এবং খোদা ভীরু ছিলেন যে, নানা দেশের রাজা- বাদশাহরা তাঁর নিকট যেসব উপঢৌকন প্রেরণ করতেন, তিনি সেসব থেকে সামান্য অংশও ব্যবহার করতেন না। সেসব তিনি প্রেরণ করতেন বিচারপতিদের কমিটির নিকট। তাঁরা সেসব জিনিস বিক্রয় করে তার মূল্য বিরান মসজিদ সংস্কারের কাজে ব্যয় করতেন। মসজিদের মিম্বারে তাঁর জন্য দোয়া করার সময় তাঁর বড় বড় উপাধি ব্যবহার না করার জন্য তিনি খতিবদেরকে নির্দেশ দেন। তাঁর বর্ণনা প্রসঙ্গে আল- ইমাদ আল- ইসফাহানী বলেন . তিনি হচ্ছেন সে ব্যক্তি, যিনি শাম দেশে ইসলামের গৌরব ফিরিয়ে আনেন; অথচ ইতিপূর্বে সেখানে কুফরির প্রাধান্য ছিল। তিনি আশ্রয় স্থল উন্মুক্ত করেন এবং শরীফ সম্ভ্রান্ত রমণীদেরকে মুক্ত করেন।11 মুসেলের কর্তৃত্ব লাভের সময় তিনি পুলিশ বাহিনী প্রধানকে নির্দেশ দেন কাজির নির্দেশ অনুযায়ী শরিয়ত সম্মত পন্থায় যেন সব কাজ সম্পন্ন করা হয়। ইতিপূর্বে রাজনীতির বিবেচনায় সমস্ত কার্য সম্পন্ন করা হতো।12 শাস্তি প্রয়োগে কঠোরতা আরোপের দাবি করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটা হবে শরিয়ত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা।
নূরুদ্দীনের শাসনামলে আলেম সমাজ
সুলতান নূরুদ্দীন যে সংস্কার সাধন করতে চাইতেন, তাতে আলেম সমাজের বিরাট ভূমিকা ছিল। সে কারণে তিনি আলেম দের জন্য ক্ষেত্র প্রশস্ত করে তাদেরকে বড় বড় সুযোগ- সুবিধাও দান করেন। এ জন্য আলেমগন দলে দলে তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং তিনিও কঠিন কাজে আলেমদের নিকট থেকে সহায়তা চাইতেন।
শাফেয়ি মাদ্রাসা থেকে যেসব আলিমের উদ্ভব হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কাজি কামালুদ্দীন শহরজুরী। তাঁর আসল নাম ছিল মুহাম্মদ ইবনে আবু মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন বাগদাদে ইমাদুদ্দীন জঙ্গির দূত। পরবর্তীকালে সিরিয়ায় তিনি নূরুদ্দীনের সরকারে যোগদান করেন এবং কাজিদের নিয়োগকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি মন্ত্রীর পদে উন্নীত হন এবং শাম দেশে কর্তৃত্বের অধিকারী হন। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ ফিকাহবিদ, নামকরা কবি এবং বীর বাহাদুর ব্যক্তি, বড় কুটনীতিক এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষজ্ঞ।13
তাদের মধ্যে আর একজন হচ্ছে বিশিষ্ট হাম্বলী ওয়ায়েজ আলী ইবনে ইবরাহিম ইবনে নাজা। তিনি বাগদাদে আগমন করত: ফিকাহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। হাদীসে রও জ্ঞান লাভ করত: স্বদেশ ভূমি দামেশকে তিনি ফিরে যান। হিজরী ৫৬৪ সনে তিনি বাগদাদে নূরুদ্দীনের দূতের দায়িত্ব পালন করেন। সুলতান সালাহউদ্দীনের নিকট তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল।14
তাহাদের মধ্যে অপরজন হচ্ছে শাফেয়ি মাজহাবের অন্যতম ইমাম কাজি আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু আসরূন। নূরুদ্দীনের শাসনামলে তিনি গাযালিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা দান শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি হালবে গমন করলে নূরুদ্দীন তাঁর জন্য একটা মাদ্রাসা স্থাপন করেন। হেমসেও অপর একটা মাদ্রাসা স্থাপন করেন। হিজরী ৫৮৫ সনে তাঁর ইন্তিকাল হয়। 16
নূরুদ্দীন মাহমুদের জিহাদ
সুলতান নূরুদ্দীন মাহমুদের নিকট জিহাদ কোন সাময়িক সমাধান ছিল না, অথচ স্থান- কাল-পাত্রের দাবি অনুযায়ী জিহাদের কোন সুযোগও ছিল না; বরং মূল ব্যাপার ছিল জিহাদের জন্য প্রস্ত্ততি এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। সুলতান নূরুদ্দীন সুলতান কুলিম আরসালান সেলজুকীকে তিরস্কার করেন, যিনি রোম দেশের প্রতিবেশী আনাযুল দেশের মালিতা, সীবাস এবং আকছারা অঞ্চল শাসন করতেন। তিরস্কার করেন এজন্য যে, মুসলিম দেশের উপর তিনি কর্তৃত্ব করতে চাইলেও রোমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্ত্তত নয়। তিনি বলেন, তুমি রোম দেশের প্রতিবেশী। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে প্রস্ত্তত নও। তোমার দেশ মুসলিম জাহানের একটা বিরাট অংশ। আমার সঙ্গে জিহাদে যোগদান করা তোমার জন্য অপরিহার্য।17
ক্রুসেডারদের সঙ্গে জিহাদের এক অভিপ্রায়ে তিনি তদীয় ভ্রাতা মুসেল অঞ্চলের শাসনকর্তা কুতুবুদ্দীন এবং ‘কাইফা’ ও ‘মর্দিন’ দুর্গের অধিপতির নিকট বাণী পাঠান। এরা সে বাণীর জবাবও দেন। কাইফা দুর্গের অধিপতির সঙ্গীরা তাকে বলেন . কোন বিষয়ে তুমি সংকল্প করেছ? তিনি বললেন, বসে থাকার ব্যাপারে। কারণ, নূরুদ্দীন নিজেকে এবং অন্যদেরকেও ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চায়।18 ফলে তারাও তার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করে। পরদিন উপস্থিত হলে মুজাহিদদেরকে প্রস্ত্তত করার নির্দেশ দেন। তখন তারা তাকে বলে: যা প্রকাশ পেয়েছে তা বাদে? গতকাল আমরা তোমার থেকে পৃথক হয়েছি এক অবস্থায়, আজ আমরা তার বিপরীত দেখতে পাচ্ছি। তিনি বললেন . নুরুদ্দীন আমার সঙ্গে এমন রীতি অবলম্বন করেছে; আমি তার সাহায্য না করলে জনগণ আমার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যায়। কারণ, তিনি আবেদ যাহিদ তথা সাধু সজ্জনকে লিখে দিয়েছেন, যা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মুসলমানরা ফিরিঙ্গিদের নিকট থেকে যা কিছু লাভ করেছে। তিনি তাদের নিকট দোয়া চান এবং তাদের নিকট দাবি করেন, যাতে মুসলমানদেরকে গাজিদের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফলে তারা বসে বসে ক্রন্দন করে, আমার উপর লা’নত করে এবং আমার জন্য বদ দোয়া করে। সুতরাং তার দিকে ছুটে যাওয়া কর্তব্য।19
বানইয়াসের ঘটনা এবং তার দুর্গ জয় করা কালে তার সঙ্গে আপন ভাই নছরুদ্দীনও ছিলেন। একটা তীর বিদ্ধ হয়ে তাঁর এক চক্ষু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নূরুদ্দীন তাকে দেখে বললেন . তোমার জন্য পুরস্কার প্রস্ত্তত করে রাখা হয়েছে, তা যদি তোমার নিকট প্রকাশ পেতো তাহলে তুমি অপর চক্ষুটিও হারাবার কথা কামনা করতে। এ বিজয়কালে তার সঙ্গে মুঈনুদ্দীন আনর এর পুত্রও ছিল, যিনি বানইয়াস দুর্গ ফিরিঙ্গিদের হাতে অর্পণ করেন। তখন নূরুদ্দীন তাকে বলেন . এই বিজয়ে মুসলমানদের জন্য একটা আনন্দ, কিন্তু তোমার জন্য দুটা আনন্দ। তিনি বললেন . তা কীভাবে? বললেন . কারণ, আজ আল্লাহ তোমার পিতার দেহকে অগ্নি থেকে শীতল করেছেন।20
নূরুদ্দীনের বিজয় অভিযান
ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে তার জীবনের প্রাথমিক ঘটনাবলীতে দামেশকের শাসনকর্তা মুঈনুদ্দীন আনর এর সঙ্গে বা‘লা বাক্ক শহরে সাক্ষাৎকালে ত্রিপোলীর ক্রুসেডার শাসকের নিকট থেকে তার কাছে একটা পত্র আসে। তাতে ‘আল-আরীমা’ দুর্গ অধিকার করার জন্য এ পত্রে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ- অনুপ্রাণিত করা হয়। নূরুদ্দীনের নিকট এ দাবি বেশ কঠিন ঠেকায়। তিনি এবং মুঈনুদ্দীন দুর্গ অবরোধ করত: তা অধিকার করেন। হিজরী ৫৪৩ সনে নূরুদ্দীন শাম দেশের বছরা অঞ্চল সফর করেন। সেখানে ফিরিঙ্গিরাও একত্র হয় শাম দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল দখল করার অভিপ্রায় নিয়ে। সেখানে তাদের মুখোমুখি হয় এবং ঘোরতর যুদ্ধ হয়। অতঃপর আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেন, আর ফিরিঙ্গিদের করে পরাজিত।21 হিজরী ৫৪৪ সনে হারেম দুর্গে অভিযান চালিয়ে তার আশ পাশ ধ্বংস ও লুঠপাট করা হয়। অতঃপর সেখান থেকে ‘আম্ব’ দুর্গ অভিমুখে রওয়ানা করে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এতে মুসলমানরা বিজয় লাভ করে এবং আন্তাকিয়ার শাসনকর্তা এ সংঘর্ষে নিহত হয়। অতঃপর নূরুদ্দীন ‘ফামিয়া’ দুর্গ অভিমুখে রওয়ানা হন। তিনি দুর্গ অবরোধ করে সন্ধি সূত্রে তা অধিকার করেন।22
হিজরী ৫৪৬ সনে নূরুদ্দীন ফিরিঙ্গিদের অন্যতম শয়তান ‘জসলিন'কে বন্দী করেন। এরপর তিনি তিলবাসীর, আইনতাব, এজাজ, মিরয়াস ইত্যাদি দুর্গ অধিকার করে নেন। হালব এর বিভিন্ন অঞ্চলে এসব দুর্গ অবস্থিত। হিজরী ৫৪৯ সনে দামেশক তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। নূরুদ্দীন দীর্ঘকাল থেকে এজন্য পরিকল্পনা করে আসছিলেন। কারণ তার অবস্থান ছিল ক্রুসেডারদের পথে। একা দামেশক ছিল দুর্বল। শক্তি প্রয়োগে তা অধিকার করার চেষ্টা করা হলে তা অধিকার করা ক্রুসেডারদের নিকট আশ্রয় চাইতে বাধ্য করবে। অথচ নূরুদ্দীন রক্তপাত ঘটাতে চান না। এ কারণে মুজীরুদ্দীনের বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। দামেশকবাসী শহর তাঁর নিকট অর্পণ করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর এ অভিযান চালানো হয়। ফলে কোন উল্লেখযোগ্য লড়াই ছাড়াই তিনি দামেশক নগরীতে প্রবেশ করেন। আর মুজীরুদ্দীনকে হেমস নগর দান করেন।
হিজরী ৫৫৯ সনে ‘হারেম’ দুর্গ জয় করা হয়। এটা ছিল ক্রুসেডারদের সঙ্গে নূরুদ্দীনের বড় যুদ্ধগুলোর অন্যতম। এই যুদ্ধে ফিরিঙ্গিরা অশ্বারোহী বাহিনী আর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অংশগ্রহণ করে। সকলের আগে ছিল এন্তাকিয়ার শাসক বুরনুস (বায়মন্ড), ত্রিপোলীর শাসক ‘কিমহ’ এবং জসলিন তনয়। নূরুদ্দীন ‘হারেম’ দুর্গের বাইরে তাদেরকে টেনে আনতে সক্ষম হন এবং তাদের উপর চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন। আমির শাসক আর বাদশাহরা সকলে তার সম্মুখে বন্দী হয়ে আসে।
হিজরী ৫৬০ সনে তিনি ‘আল মানিতারা’ দুর্গ জয় করেন এবং তাতে বিপুল পরিমাণ গনিমতের মাল হস্তগত হয়। হিজরী ৫৬২ সনে নূরুদ্দীন ‘‘ছাফিতা’ এবং ‘আল-আরীমা’ দুর্গ অধিকার করেন।
মিশর-সিরিয়া ঐক্য
সুলতান মাহমুদের অন্তর থেকে একথা মুছে যায়নি যে, মিশর- সিরিয়ার ঐক্যই সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ, যার উপর নির্ভর করে ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করা। মিসরে ওবায়দী শাসকদের উজির শাওর সাদী তাঁর নিকট আশ্রয় চাইলে এজন্য উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়। হৃত ওযারতীর পদ ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁর সহযোগিতা চাওয়া হয়। এ প্রস্তাবে নূরুদ্দীন দ্রুত সাড়া দেন এবং আসাদুদ্দীন শেরকোহ এর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এই শর্তে যে, নূরুদ্দীন মিশরের এক তৃতীয়াংশের দখল লাভ করবেন। নূরুদ্দীনের সৈন্যরা কায়রো শহরে প্রবেশ করে। তারা মন্ত্রী শাওরকে তার হারানো পদে পুনর্বহাল করে। কিন্তু শাওর চুক্তি লঙ্ঘন করে শেরকোহ এর নিকট মিশর ত্যাগের দাবি জানায়। সে ক্রুসেডারদের নিকট সাহায্য কামনা করে। ক্রুসেডাররা এটাকে একটা সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে। তখন আসাদুদ্দীন কোন রকম ক্ষয়- ক্ষতি ছাড়া ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। কিন্তু তার মনে ছিল শাওরকে শিক্ষা দান করার জন্য পুনরায় মিসরে ফিরে আসা। হিজরী ৫৬২ সনে আসাদুদ্দীন পূর্ণ প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে মিসরে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করেন এবং কায়রোর পশ্চিমে শিবির স্থাপন করেন। মিশরীয়দেরকে সঙ্গে নিয়ে ফিরিঙ্গিদের সহযোগিতায় শাওর এর সমর্থকদেরকে তিনি চরমভাবে পরাজিত করেন। অথচ এ সময় তার সঙ্গে মাত্র দু’হাজার অশ্বারোহী বাহিনী ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অতঃপর মিশরীয়রা অর্থের বিনিময়ে তার সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হয়। তাদের সঙ্গে চুক্তি করে তিনি সিরিয়ায় ফিরে যান। এ সময় ফিরিঙ্গিরা শাওর এবং তার সরকারের নিকট স্থান লাভ করে এবং কয়েকটি শর্তে চুক্তি করে। এসব শর্তের মধ্যে একটা ছিল এই যে, কায়রোয় তাদের একটা গ্যারিসন থাকবে। তারা মুসলমানদের মধ্যে শক্ত হয়ে বসে এবং মিশর অধিকার করার জন্য ফিলিস্তিন থেকে ক্রুসেডারদেরকে ডেকে আনে। কাফিররা মিশর অধিকার করে নেবে বলে নূরুদ্দীন ভীষণ ভয় পান। আসাদুদ্দীন তৃতীয় বারের মতো প্রস্ত্ততি নেন এবং ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহউদ্দীনকেও সঙ্গে নেন। অথচ তিনি সঙ্গে যেতে রাজি নন।
عَسَى أَنْ تَكْرَهُوْا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌلَكُمْ
‘হতে পারে, কোন জিনিস তোমরা অপছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য মঙ্গলকর।’
মিশর থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য শাওর ক্রুসেডারদেরকে রাজি করান। তারা এতে সাড়া দেয়। কিন্তু আসাদুদ্দীন এবার মিসরে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। শাওর ছল চাতুরীর আশ্রয় নেয়া শুরু করে নূরুদ্দীনের সৈন্যদেরকে দূরে রাখার জন্য এবং আসাদুদ্দীনও তার লোকজনকে আয়ত্ত করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পুত্র কামেল গোপনে তাকে ইঙ্গিত দেয় তা না করার জন্য। তখন শাওর তাকে বলে . আমি তা না করলে আমাদের সকলকে হত্যা করা হবে। পুত্র বলে . মুসলিম অবস্থায় ইসলামি রাষ্ট্রে আমাদের নিহত হওয়া ফিরিঙ্গিদের বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে উত্তম। কিন্তু শাওর তার বিশ্বাসঘাতকতায় জিদ ধরে। আসাদুদ্দীনের সৈন্যরা তা বুঝতে পেরে তাকে হত্যার ব্যাপারে একমত হয়। তারা তার উৎপাত থেকে স্বস্তি পায়। শান্তি পায় মিশরও। পরে আসাদুদ্দীন মিশরের ওবায়দী সরকারের মন্ত্রী হয়। আযেদ ছিল মিসরে ওবায়দীদের সর্বশেষ মন্ত্রী। তার হাতে কোন ক্ষমতা ছিল না। শেরকোহের মন্ত্রিত্ব লাভ ছিল মিশরকে সুন্নাহর দিকে ফেরার পথে প্রথম পদক্ষেপ। মন্ত্রিত্ব লাভের দু’মাস পর তিনি ইন্তিকাল করে। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করেন। তিনি মিসরে ওবায়দীদের পতন ঘটান। নূরুদ্দীনের পীড়াপীড়ির পর আযেদের নামে খুতবা পড়া বাদ দিয়ে আববাসীয় খলিফার নামে খুতবা চালু করা হয় । মিসরবাসীদের ভয়ে সালাহউদ্দীন প্রথমে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাবে সাড়া দিলে কেউ তার বিরোধিতা করেনি এবং কেউ এ ব্যাপারে গুঁতাগুঁতিও করেনি। এভাবে মিশরকে সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সিরিয়ার সঙ্গে মিশরের ঐক্য স্থাপন করা হয়। নূরুদ্দীন যে মোবারক জিহাদের সূচনা করেন, এ ছিল তারই পদক্ষেপ। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন। মুজাহিদ শাসক সুলতান সালাহউদ্দীন এ পদক্ষেপ পূর্ণ করেন।
অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক হুমকির মোকাবিলা করার জন্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য স্থাপনের চিন্তা -যদিও তার সূচনা পার্শ্ববর্তী দেশ দ্বারা হোক না কেন- হচ্ছে এক বিরাট পদক্ষেপ। বিশেষ করে এ ঐক্য যখন প্রতিষ্ঠিত হয় সুষ্ঠু ভিত্তির উপর। এই ঐক্যের বিপরীত হচ্ছে শতধা বিভক্ত হওয়া এবং সংকীর্ণ অঞ্চলে ভাগ হওয়ার জন্য উসকানি দেয়া। শরিয়ত অনুযায়ী মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। বর্তমানে এই ঐক্য অতীতের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। আজ গোটা বিশ্ব নানা ব্লকে বিভক্ত, যাতে একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে চ্যালেঞ্জের জন্য শক্তি সঞ্চয় কতে পারে। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যায় ডুবে থেকে মুসলিম জাহান কেমন করে এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে? নিষ্ঠাবান ঐক্যের আহবায়করা এগিয়ে না এলে বর্তমান বাস্তবতায় ঐক্য অর্জিত হবে না। কারণ, পরবর্তীকালের ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য তারাই হচ্ছেন সবচেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তি। অবশ্য অন্যদের ঐক্যের আহবানের মধ্যে সংশয় আর পঙ্কিলতা রয়েছে।
হিজরী ৫১১ সনে ইরাকে নূরুদ্দীনের জন্ম হয়। পিতার সঙ্গে তিনি ইরাক, মুসেল এবং শাম দেশের নানা অঞ্চল ঘুরে বেড়ান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি হন পিতার স্থলাভিষিক্ত। তিনি হালব অঞ্চলে সুন্নাহর প্রচার প্রসার ঘটান। বেদআতের পরিবর্তন সাধন করেন। রাফেযী মতবাদের মূলোৎপাটন সাধন করেন এবং অনেক দ্বীনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদ- মাদ্রাসার জন্য তিনি ওয়াকফের প্রচলন করেন এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ধর্মীয় গ্রন্থ ব্যাপক অধ্যয়ন করতেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। নিয়মিত জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। কুরআন মজীদ নিয়ম অনুযায়ী তিলাওয়াত করতেন। হালাম-হারামের বিধান কঠোরভাবে মেনে চলতেন এবং হারাম খাওয়া থেকে বিরত থাকতেন। ব্যয়ের ক্ষেত্রে তিনি সৎ পন্থা মেনে চলতেন। খাদ্য- দ্রব্য এবং পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও তিনি সতর্ক ছিলেন। তাঁর মুখে কখনো মন্দ কথা উচ্চারিত হতে শোনা যায়নি।2
তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর বলেন .
আমি ইসলামের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কালের রাজা- বাদশাহদের জীবনী অধ্যয়ন করেছি। বর্তমান কাল পর্যন্ত সমস্ত শাসকদের জীবনী আমি অধ্যয়ন করে দেখেছি। খোলাফায়ে রাশেদীন এবং ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের পর তাঁর চেয়ে সুন্দর চরিত্রের কারো সম্পর্কে আমি জানতে পারিনি।3
খোদাভীতি এবং দুনিয়া ত্যাগের নীতি তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। বৈধভাবে খরিদ করা অন্ন বস্ত্র ছাড়া অন্য কিছু তিনি ব্যবহার করতেন না। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গনিমতের অংশ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করতেন না। মুসলমানদের ধনভান্ডার থেকে তিনি এক কপর্দকও নিতেন না। একবার তাঁর স্ত্রী অভাব অনটনের অভিযোগ করে বেশি খোরপোশ দাবি করলে তাঁর চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করে। তিনি বলেন . আমি কোথা থেকে তার দাবি পূরণ করব? তার প্রেমে আমি জাহান্নামের আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি না। অতঃপর তিনি বলেন . হেমস শহরে আমার জন্য তিনটা দোকান নির্দিষ্ট আছে। এ দোকানগুলো থেকে সে ইচ্ছা মতো পণ্য গ্রহণ করতে পারে।4
তাঁর দরবারের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাঁর সম্পর্কে বলেন . একদিন আমি তাঁর সঙ্গে ‘আররাহার’ প্রান্তরে ছিলাম। সূর্যের তাপ ছিল আমাদের পৃষ্ঠের উপর। আমরা যতই অগ্রসর হই, ততই সূর্যের প্রখর তাপ আমাদের উপর পতিত হয়। আমরা যখন প্রত্যাবর্তন করি, তখন আমাদের ছাড়া পেছনে পতিত হয়। অশ্ব হাঁকিয়ে পেছনে তাকিয়ে তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বলেন . তুমি কি জান, কেন আমি অশ্ব হাঁকাই আর পেছনে তাকাই? আমি বললাম . না। তিনি বললেন . আমার মনে হয়েছে যে, পৃথিবীতে আমরা যে অবস্থায় আছি, তাতে বুঝা যায় যে, যে ব্যক্তি দুনিয়া তালাশ করে, দুনিয়া তার থেকে পলায়ন করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়া থেকে পলায়ন করে, দুনিয়ার তার পেছনে ছুটে চলে। আবু শামা বলেন . যে শাসনকর্তা এমন চিন্তা করতে পারেন, তাঁর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্টি হন।5 ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর বলেন . রাত্রিবেলা বেশির ভাগ সময় তিনি নামাজে রত থাকতেন। দোয়া- ইস্তিগফার করতেন। অশ্বারোহনের পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থায় কাটতো। কবির ভাষায় .
جمع الشجاعة والخشوع لربه ما أحسن المحراب في المحراب
বীরত্ব আর বিনয়ের সমাবেশ ঘটান তিনি আপন পালন কর্তার জন্য! মিহরাবের অভ্যন্তরে মিহরাব কতইনা চমৎকার।6
হানাফি মাজহাবের ফিকাহ সম্পর্কে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন, তাই বলে তাঁর মধ্যে গোঁড়ামি বা পক্ষপাতিত্ব ছিল না। সকল ব্যাপারে ইনসাফই ছিল তাঁর ভূষণ। বাস্তবিক পক্ষে ইনসাফ আর ন্যায় নীতি অনুসরণ করা, খাদ্য- পানীয় এবং পরিধেয় বস্ত্রের ক্ষেত্রে হারাম বর্জন করার রীতি শাসক শ্রেণির জন্য তিনিই নবায়ন করেন। তাঁর পূর্বে শাসক শ্রেণি ছিল জাহেলি যুগের অনুসারী। উদর পূর্তি আর যৌন ক্ষুধা নিবৃত্ত করাই ছিল তাদের একমাত্র চিন্তা। ন্যায়-অন্যায় এবং ভালো মন্দ কিছুই তারা চিনত না। সুবিচারের দৃষ্টিতে দেখতে গেলে তিনি ছিলেন চরিত্রের দিক থেকে সর্বোত্তম শাসক। শাম দেশ, জাযিরা এবং মিসরে তাঁর শাসনকালে তিনি ট্যাক্স, কাষ্টম ডিউটি এবং ওশর রহিত করেন।7
দেশে সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য তিনি একটা বিচারণীয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিচারালয় স্থাপনের কারণ ছিল এই যে, তাঁর নিয়োজিত শাসকবর্গ আর সেনাবাহিনীর কর্তা ব্যক্তিরা প্রতিবেশীদের উপর জুলুম করলে সকলে কাজি কামালুদ্দীনের নিকট অভিযোগ দায়ের করে। কাজি কোন কোন ক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেও আসাদুদ্দীন শেরকোহ এর ক্ষেত্রে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। সুলতান নূরুদ্দীন এ বিষয়ে অবগত হতে পেরে এ বিচারালয় স্থাপন করেন। আসাদুদ্দীন এ সম্পর্কে জানতে পারলে সুলতান তার আমলাদের উদ্দেশ্যে বলেন . খোদার কসম করে বলছি, তোমাদের কারো কারণে আমাকে বিচারালয়ে উপস্থিত হতে হলে আমি অবশ্যই তাকে শুলিবিদ্ধ করব। যাও এবং নিজেদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করে ফেলো। প্রতিপক্ষকে রাজি করো এবং ভালো ভাবে মীমাংসা কর।8 তখন তারা বলল . আমরা এটা করলে লোকেরাতো দাবি জোরদার করবে। তিনি বলেন . নূরুদ্দীনকে সালিশের পিতার চোখে দেখার চেয়ে আমার হাত থেকে আমার মালিকানাধীন সমস্ত কিছু ছুটে যাওয়াটা আমার নিকট অতি সহজ। নূরুদ্দীন সপ্তাহে দু’দিন এ বিচারালয়ে বসতেন। আসাদুদ্দীন শেরকোহ এর অবস্থা সম্পর্কে জানতে পের তিনি আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতার সেজদা আদায় করেন।9
মুসলিম দেশগুলোতে তাঁর কল্যাণমূলক কাজ অনেক। তিনি শাম দেশে নগর প্রাচীর নির্মাণ করেন এবং তা অতিশয় মজবুত করে তৈয়ার করেন। হালব শহর এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এবং দামেশকে তিনি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তিনি দ্বীনদার ব্যক্তিদেরকে সুউচ্চ মহলে স্থান দিতেন। এজন্য আমির ওমরারা তাঁকে হিংসার চোখে দেখতো। তাঁর দরবারের অন্যতম আমির শায়েখ কুতুবুদ্দীন নীশাপুরী প্রসঙ্গটা তাঁর নিকট উপস্থাপন করলে সুলতান তাকে বলেন . তুমি যার বিরুদ্ধে কথা বলছো, সেতো পুণ্য করছে। তার সমস্ত পদস্খলন ক্ষমা করা হচ্ছে। আর তা হচ্ছে জ্ঞান ও দীন আর তুমি এবং তোমার সঙ্গীদের মধ্যে তুমি যা বলছ, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে। কিন্তু মাফ করানোর মতো কোন পুণ্য কর্ম তোমাদের নেই। তোমাদের নেক কাজ না থাকলেও আমি তোমাদের বদ কর্ম বহন করছি। তার মন্দ কর্ম যদি সত্যিই থেকে থাকে তবে কি আমি তা বহন করব না? অথচ তারতো নেক কাজ রয়েছে। তবে খোদার কসম করে বলছি, তুমি যা বলছ, আমি তা বিশ্বাস করি না। তুমি পুনরায় যদি তার সম্পর্কে খারাপ কথা বলো তবে আমি নিশ্চিত তোমাকে শিক্ষা দিবো।10
তিনি এমনই নির্লোভ- নিস্পৃহ এবং খোদা ভীরু ছিলেন যে, নানা দেশের রাজা- বাদশাহরা তাঁর নিকট যেসব উপঢৌকন প্রেরণ করতেন, তিনি সেসব থেকে সামান্য অংশও ব্যবহার করতেন না। সেসব তিনি প্রেরণ করতেন বিচারপতিদের কমিটির নিকট। তাঁরা সেসব জিনিস বিক্রয় করে তার মূল্য বিরান মসজিদ সংস্কারের কাজে ব্যয় করতেন। মসজিদের মিম্বারে তাঁর জন্য দোয়া করার সময় তাঁর বড় বড় উপাধি ব্যবহার না করার জন্য তিনি খতিবদেরকে নির্দেশ দেন। তাঁর বর্ণনা প্রসঙ্গে আল- ইমাদ আল- ইসফাহানী বলেন . তিনি হচ্ছেন সে ব্যক্তি, যিনি শাম দেশে ইসলামের গৌরব ফিরিয়ে আনেন; অথচ ইতিপূর্বে সেখানে কুফরির প্রাধান্য ছিল। তিনি আশ্রয় স্থল উন্মুক্ত করেন এবং শরীফ সম্ভ্রান্ত রমণীদেরকে মুক্ত করেন।11 মুসেলের কর্তৃত্ব লাভের সময় তিনি পুলিশ বাহিনী প্রধানকে নির্দেশ দেন কাজির নির্দেশ অনুযায়ী শরিয়ত সম্মত পন্থায় যেন সব কাজ সম্পন্ন করা হয়। ইতিপূর্বে রাজনীতির বিবেচনায় সমস্ত কার্য সম্পন্ন করা হতো।12 শাস্তি প্রয়োগে কঠোরতা আরোপের দাবি করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটা হবে শরিয়ত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা।
নূরুদ্দীনের শাসনামলে আলেম সমাজ
সুলতান নূরুদ্দীন যে সংস্কার সাধন করতে চাইতেন, তাতে আলেম সমাজের বিরাট ভূমিকা ছিল। সে কারণে তিনি আলেম দের জন্য ক্ষেত্র প্রশস্ত করে তাদেরকে বড় বড় সুযোগ- সুবিধাও দান করেন। এ জন্য আলেমগন দলে দলে তাঁর নিকট আগমন করতেন এবং তিনিও কঠিন কাজে আলেমদের নিকট থেকে সহায়তা চাইতেন।
শাফেয়ি মাদ্রাসা থেকে যেসব আলিমের উদ্ভব হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কাজি কামালুদ্দীন শহরজুরী। তাঁর আসল নাম ছিল মুহাম্মদ ইবনে আবু মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন বাগদাদে ইমাদুদ্দীন জঙ্গির দূত। পরবর্তীকালে সিরিয়ায় তিনি নূরুদ্দীনের সরকারে যোগদান করেন এবং কাজিদের নিয়োগকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি মন্ত্রীর পদে উন্নীত হন এবং শাম দেশে কর্তৃত্বের অধিকারী হন। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ ফিকাহবিদ, নামকরা কবি এবং বীর বাহাদুর ব্যক্তি, বড় কুটনীতিক এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষজ্ঞ।13
তাদের মধ্যে আর একজন হচ্ছে বিশিষ্ট হাম্বলী ওয়ায়েজ আলী ইবনে ইবরাহিম ইবনে নাজা। তিনি বাগদাদে আগমন করত: ফিকাহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। হাদীসে রও জ্ঞান লাভ করত: স্বদেশ ভূমি দামেশকে তিনি ফিরে যান। হিজরী ৫৬৪ সনে তিনি বাগদাদে নূরুদ্দীনের দূতের দায়িত্ব পালন করেন। সুলতান সালাহউদ্দীনের নিকট তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল।14
তাহাদের মধ্যে অপরজন হচ্ছে শাফেয়ি মাজহাবের অন্যতম ইমাম কাজি আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু আসরূন। নূরুদ্দীনের শাসনামলে তিনি গাযালিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষা দান শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি হালবে গমন করলে নূরুদ্দীন তাঁর জন্য একটা মাদ্রাসা স্থাপন করেন। হেমসেও অপর একটা মাদ্রাসা স্থাপন করেন। হিজরী ৫৮৫ সনে তাঁর ইন্তিকাল হয়। 16
নূরুদ্দীন মাহমুদের জিহাদ
সুলতান নূরুদ্দীন মাহমুদের নিকট জিহাদ কোন সাময়িক সমাধান ছিল না, অথচ স্থান- কাল-পাত্রের দাবি অনুযায়ী জিহাদের কোন সুযোগও ছিল না; বরং মূল ব্যাপার ছিল জিহাদের জন্য প্রস্ত্ততি এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। সুলতান নূরুদ্দীন সুলতান কুলিম আরসালান সেলজুকীকে তিরস্কার করেন, যিনি রোম দেশের প্রতিবেশী আনাযুল দেশের মালিতা, সীবাস এবং আকছারা অঞ্চল শাসন করতেন। তিরস্কার করেন এজন্য যে, মুসলিম দেশের উপর তিনি কর্তৃত্ব করতে চাইলেও রোমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্ত্তত নয়। তিনি বলেন, তুমি রোম দেশের প্রতিবেশী। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে প্রস্ত্তত নও। তোমার দেশ মুসলিম জাহানের একটা বিরাট অংশ। আমার সঙ্গে জিহাদে যোগদান করা তোমার জন্য অপরিহার্য।17
ক্রুসেডারদের সঙ্গে জিহাদের এক অভিপ্রায়ে তিনি তদীয় ভ্রাতা মুসেল অঞ্চলের শাসনকর্তা কুতুবুদ্দীন এবং ‘কাইফা’ ও ‘মর্দিন’ দুর্গের অধিপতির নিকট বাণী পাঠান। এরা সে বাণীর জবাবও দেন। কাইফা দুর্গের অধিপতির সঙ্গীরা তাকে বলেন . কোন বিষয়ে তুমি সংকল্প করেছ? তিনি বললেন, বসে থাকার ব্যাপারে। কারণ, নূরুদ্দীন নিজেকে এবং অন্যদেরকেও ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করতে চায়।18 ফলে তারাও তার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করে। পরদিন উপস্থিত হলে মুজাহিদদেরকে প্রস্ত্তত করার নির্দেশ দেন। তখন তারা তাকে বলে: যা প্রকাশ পেয়েছে তা বাদে? গতকাল আমরা তোমার থেকে পৃথক হয়েছি এক অবস্থায়, আজ আমরা তার বিপরীত দেখতে পাচ্ছি। তিনি বললেন . নুরুদ্দীন আমার সঙ্গে এমন রীতি অবলম্বন করেছে; আমি তার সাহায্য না করলে জনগণ আমার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যায়। কারণ, তিনি আবেদ যাহিদ তথা সাধু সজ্জনকে লিখে দিয়েছেন, যা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মুসলমানরা ফিরিঙ্গিদের নিকট থেকে যা কিছু লাভ করেছে। তিনি তাদের নিকট দোয়া চান এবং তাদের নিকট দাবি করেন, যাতে মুসলমানদেরকে গাজিদের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফলে তারা বসে বসে ক্রন্দন করে, আমার উপর লা’নত করে এবং আমার জন্য বদ দোয়া করে। সুতরাং তার দিকে ছুটে যাওয়া কর্তব্য।19
বানইয়াসের ঘটনা এবং তার দুর্গ জয় করা কালে তার সঙ্গে আপন ভাই নছরুদ্দীনও ছিলেন। একটা তীর বিদ্ধ হয়ে তাঁর এক চক্ষু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নূরুদ্দীন তাকে দেখে বললেন . তোমার জন্য পুরস্কার প্রস্ত্তত করে রাখা হয়েছে, তা যদি তোমার নিকট প্রকাশ পেতো তাহলে তুমি অপর চক্ষুটিও হারাবার কথা কামনা করতে। এ বিজয়কালে তার সঙ্গে মুঈনুদ্দীন আনর এর পুত্রও ছিল, যিনি বানইয়াস দুর্গ ফিরিঙ্গিদের হাতে অর্পণ করেন। তখন নূরুদ্দীন তাকে বলেন . এই বিজয়ে মুসলমানদের জন্য একটা আনন্দ, কিন্তু তোমার জন্য দুটা আনন্দ। তিনি বললেন . তা কীভাবে? বললেন . কারণ, আজ আল্লাহ তোমার পিতার দেহকে অগ্নি থেকে শীতল করেছেন।20
নূরুদ্দীনের বিজয় অভিযান
ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে তার জীবনের প্রাথমিক ঘটনাবলীতে দামেশকের শাসনকর্তা মুঈনুদ্দীন আনর এর সঙ্গে বা‘লা বাক্ক শহরে সাক্ষাৎকালে ত্রিপোলীর ক্রুসেডার শাসকের নিকট থেকে তার কাছে একটা পত্র আসে। তাতে ‘আল-আরীমা’ দুর্গ অধিকার করার জন্য এ পত্রে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ- অনুপ্রাণিত করা হয়। নূরুদ্দীনের নিকট এ দাবি বেশ কঠিন ঠেকায়। তিনি এবং মুঈনুদ্দীন দুর্গ অবরোধ করত: তা অধিকার করেন। হিজরী ৫৪৩ সনে নূরুদ্দীন শাম দেশের বছরা অঞ্চল সফর করেন। সেখানে ফিরিঙ্গিরাও একত্র হয় শাম দেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল দখল করার অভিপ্রায় নিয়ে। সেখানে তাদের মুখোমুখি হয় এবং ঘোরতর যুদ্ধ হয়। অতঃপর আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেন, আর ফিরিঙ্গিদের করে পরাজিত।21 হিজরী ৫৪৪ সনে হারেম দুর্গে অভিযান চালিয়ে তার আশ পাশ ধ্বংস ও লুঠপাট করা হয়। অতঃপর সেখান থেকে ‘আম্ব’ দুর্গ অভিমুখে রওয়ানা করে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এতে মুসলমানরা বিজয় লাভ করে এবং আন্তাকিয়ার শাসনকর্তা এ সংঘর্ষে নিহত হয়। অতঃপর নূরুদ্দীন ‘ফামিয়া’ দুর্গ অভিমুখে রওয়ানা হন। তিনি দুর্গ অবরোধ করে সন্ধি সূত্রে তা অধিকার করেন।22
হিজরী ৫৪৬ সনে নূরুদ্দীন ফিরিঙ্গিদের অন্যতম শয়তান ‘জসলিন'কে বন্দী করেন। এরপর তিনি তিলবাসীর, আইনতাব, এজাজ, মিরয়াস ইত্যাদি দুর্গ অধিকার করে নেন। হালব এর বিভিন্ন অঞ্চলে এসব দুর্গ অবস্থিত। হিজরী ৫৪৯ সনে দামেশক তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। নূরুদ্দীন দীর্ঘকাল থেকে এজন্য পরিকল্পনা করে আসছিলেন। কারণ তার অবস্থান ছিল ক্রুসেডারদের পথে। একা দামেশক ছিল দুর্বল। শক্তি প্রয়োগে তা অধিকার করার চেষ্টা করা হলে তা অধিকার করা ক্রুসেডারদের নিকট আশ্রয় চাইতে বাধ্য করবে। অথচ নূরুদ্দীন রক্তপাত ঘটাতে চান না। এ কারণে মুজীরুদ্দীনের বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। দামেশকবাসী শহর তাঁর নিকট অর্পণ করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর এ অভিযান চালানো হয়। ফলে কোন উল্লেখযোগ্য লড়াই ছাড়াই তিনি দামেশক নগরীতে প্রবেশ করেন। আর মুজীরুদ্দীনকে হেমস নগর দান করেন।
হিজরী ৫৫৯ সনে ‘হারেম’ দুর্গ জয় করা হয়। এটা ছিল ক্রুসেডারদের সঙ্গে নূরুদ্দীনের বড় যুদ্ধগুলোর অন্যতম। এই যুদ্ধে ফিরিঙ্গিরা অশ্বারোহী বাহিনী আর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অংশগ্রহণ করে। সকলের আগে ছিল এন্তাকিয়ার শাসক বুরনুস (বায়মন্ড), ত্রিপোলীর শাসক ‘কিমহ’ এবং জসলিন তনয়। নূরুদ্দীন ‘হারেম’ দুর্গের বাইরে তাদেরকে টেনে আনতে সক্ষম হন এবং তাদের উপর চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন। আমির শাসক আর বাদশাহরা সকলে তার সম্মুখে বন্দী হয়ে আসে।
হিজরী ৫৬০ সনে তিনি ‘আল মানিতারা’ দুর্গ জয় করেন এবং তাতে বিপুল পরিমাণ গনিমতের মাল হস্তগত হয়। হিজরী ৫৬২ সনে নূরুদ্দীন ‘‘ছাফিতা’ এবং ‘আল-আরীমা’ দুর্গ অধিকার করেন।
মিশর-সিরিয়া ঐক্য
সুলতান মাহমুদের অন্তর থেকে একথা মুছে যায়নি যে, মিশর- সিরিয়ার ঐক্যই সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ, যার উপর নির্ভর করে ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করা। মিসরে ওবায়দী শাসকদের উজির শাওর সাদী তাঁর নিকট আশ্রয় চাইলে এজন্য উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়। হৃত ওযারতীর পদ ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁর সহযোগিতা চাওয়া হয়। এ প্রস্তাবে নূরুদ্দীন দ্রুত সাড়া দেন এবং আসাদুদ্দীন শেরকোহ এর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন এই শর্তে যে, নূরুদ্দীন মিশরের এক তৃতীয়াংশের দখল লাভ করবেন। নূরুদ্দীনের সৈন্যরা কায়রো শহরে প্রবেশ করে। তারা মন্ত্রী শাওরকে তার হারানো পদে পুনর্বহাল করে। কিন্তু শাওর চুক্তি লঙ্ঘন করে শেরকোহ এর নিকট মিশর ত্যাগের দাবি জানায়। সে ক্রুসেডারদের নিকট সাহায্য কামনা করে। ক্রুসেডাররা এটাকে একটা সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে। তখন আসাদুদ্দীন কোন রকম ক্ষয়- ক্ষতি ছাড়া ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। কিন্তু তার মনে ছিল শাওরকে শিক্ষা দান করার জন্য পুনরায় মিসরে ফিরে আসা। হিজরী ৫৬২ সনে আসাদুদ্দীন পূর্ণ প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে মিসরে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করেন এবং কায়রোর পশ্চিমে শিবির স্থাপন করেন। মিশরীয়দেরকে সঙ্গে নিয়ে ফিরিঙ্গিদের সহযোগিতায় শাওর এর সমর্থকদেরকে তিনি চরমভাবে পরাজিত করেন। অথচ এ সময় তার সঙ্গে মাত্র দু’হাজার অশ্বারোহী বাহিনী ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অতঃপর মিশরীয়রা অর্থের বিনিময়ে তার সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হয়। তাদের সঙ্গে চুক্তি করে তিনি সিরিয়ায় ফিরে যান। এ সময় ফিরিঙ্গিরা শাওর এবং তার সরকারের নিকট স্থান লাভ করে এবং কয়েকটি শর্তে চুক্তি করে। এসব শর্তের মধ্যে একটা ছিল এই যে, কায়রোয় তাদের একটা গ্যারিসন থাকবে। তারা মুসলমানদের মধ্যে শক্ত হয়ে বসে এবং মিশর অধিকার করার জন্য ফিলিস্তিন থেকে ক্রুসেডারদেরকে ডেকে আনে। কাফিররা মিশর অধিকার করে নেবে বলে নূরুদ্দীন ভীষণ ভয় পান। আসাদুদ্দীন তৃতীয় বারের মতো প্রস্ত্ততি নেন এবং ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহউদ্দীনকেও সঙ্গে নেন। অথচ তিনি সঙ্গে যেতে রাজি নন।
عَسَى أَنْ تَكْرَهُوْا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌلَكُمْ
‘হতে পারে, কোন জিনিস তোমরা অপছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য মঙ্গলকর।’
মিশর থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য শাওর ক্রুসেডারদেরকে রাজি করান। তারা এতে সাড়া দেয়। কিন্তু আসাদুদ্দীন এবার মিসরে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। শাওর ছল চাতুরীর আশ্রয় নেয়া শুরু করে নূরুদ্দীনের সৈন্যদেরকে দূরে রাখার জন্য এবং আসাদুদ্দীনও তার লোকজনকে আয়ত্ত করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পুত্র কামেল গোপনে তাকে ইঙ্গিত দেয় তা না করার জন্য। তখন শাওর তাকে বলে . আমি তা না করলে আমাদের সকলকে হত্যা করা হবে। পুত্র বলে . মুসলিম অবস্থায় ইসলামি রাষ্ট্রে আমাদের নিহত হওয়া ফিরিঙ্গিদের বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে উত্তম। কিন্তু শাওর তার বিশ্বাসঘাতকতায় জিদ ধরে। আসাদুদ্দীনের সৈন্যরা তা বুঝতে পেরে তাকে হত্যার ব্যাপারে একমত হয়। তারা তার উৎপাত থেকে স্বস্তি পায়। শান্তি পায় মিশরও। পরে আসাদুদ্দীন মিশরের ওবায়দী সরকারের মন্ত্রী হয়। আযেদ ছিল মিসরে ওবায়দীদের সর্বশেষ মন্ত্রী। তার হাতে কোন ক্ষমতা ছিল না। শেরকোহের মন্ত্রিত্ব লাভ ছিল মিশরকে সুন্নাহর দিকে ফেরার পথে প্রথম পদক্ষেপ। মন্ত্রিত্ব লাভের দু’মাস পর তিনি ইন্তিকাল করে। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করেন। তিনি মিসরে ওবায়দীদের পতন ঘটান। নূরুদ্দীনের পীড়াপীড়ির পর আযেদের নামে খুতবা পড়া বাদ দিয়ে আববাসীয় খলিফার নামে খুতবা চালু করা হয় । মিসরবাসীদের ভয়ে সালাহউদ্দীন প্রথমে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাবে সাড়া দিলে কেউ তার বিরোধিতা করেনি এবং কেউ এ ব্যাপারে গুঁতাগুঁতিও করেনি। এভাবে মিশরকে সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সিরিয়ার সঙ্গে মিশরের ঐক্য স্থাপন করা হয়। নূরুদ্দীন যে মোবারক জিহাদের সূচনা করেন, এ ছিল তারই পদক্ষেপ। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন। মুজাহিদ শাসক সুলতান সালাহউদ্দীন এ পদক্ষেপ পূর্ণ করেন।
অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক হুমকির মোকাবিলা করার জন্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য স্থাপনের চিন্তা -যদিও তার সূচনা পার্শ্ববর্তী দেশ দ্বারা হোক না কেন- হচ্ছে এক বিরাট পদক্ষেপ। বিশেষ করে এ ঐক্য যখন প্রতিষ্ঠিত হয় সুষ্ঠু ভিত্তির উপর। এই ঐক্যের বিপরীত হচ্ছে শতধা বিভক্ত হওয়া এবং সংকীর্ণ অঞ্চলে ভাগ হওয়ার জন্য উসকানি দেয়া। শরিয়ত অনুযায়ী মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। বর্তমানে এই ঐক্য অতীতের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। আজ গোটা বিশ্ব নানা ব্লকে বিভক্ত, যাতে একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে চ্যালেঞ্জের জন্য শক্তি সঞ্চয় কতে পারে। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যায় ডুবে থেকে মুসলিম জাহান কেমন করে এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে? নিষ্ঠাবান ঐক্যের আহবায়করা এগিয়ে না এলে বর্তমান বাস্তবতায় ঐক্য অর্জিত হবে না। কারণ, পরবর্তীকালের ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য তারাই হচ্ছেন সবচেয়ে যোগ্যতর ব্যক্তি। অবশ্য অন্যদের ঐক্যের আহবানের মধ্যে সংশয় আর পঙ্কিলতা রয়েছে।