hadith book logo

মুসলমানদের পতন অতীত বর্তমান (সালাহউদ্দীন আইউবীর আবির্ভাব পূর্ব ইসলামি বিশ্ব ও বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা)

লেখকঃ মুহাম্মদ আল আবদাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩০

৪. এই দুই শাসকের দৃষ্টিতে সংস্কার ও নবায়ন

এ দু’জন মুসলিম শাসকের কিছু কীর্তি উপস্থাপন করার পর আমাদের জন্য এখানে একথা উল্লেখ করা অপরিহার্য যে, তাঁরা যা কিছু করেছেন, অনেক বিবেচনায় তা ইসলাম সংস্কার বা নবায়ন বলে গণ্য। তাঁদের পূর্বে এবং পরে কোন কোন আলেম তাজদীদ বা নবায়নের কাজ করেছেন বটে, কিন্তু তাদের কাজকে পূর্ণাঙ্গ তাজদীদ বলা যায় না। সাধারণত: অবস্থা যাই ছিল, তাই রয়েছে। তবে একজন আলেম ব্যক্তি আক্বীদা পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালান এবং মানুষকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করেন।

আমরা এখানে তাজদীদের কয়েকটি দিক নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো:

এক . জিহাদ সম্পর্কে আলোচনা। শাসক কর্তৃপক্ষ উজির, নেতা এবং গণমানুষের পক্ষ থেকে তা বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা দীর্ঘদিন থেকে পরিত্যক্ত হয়েছে। ফলে উম্মত মরে গেছে এবং তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। এই সুযোগে ইসলামের দুশমন বাতেনী সম্প্রদায় মুসলিম উম্মার উপর চেপে বসেছে ভেতর থেকে এবং বাইরে থেকে। এই সুযোগে রোম তাদের উপর হামলা পরিচালনা শুরু করে দেয়। এরপর আগমন ঘটে ক্রুসেডারদের। তারা মুসলমানদের ভূমি জবর দখল করে নেয়। আমরা নূরুদ্দীন এবং সালাহউদ্দীনের জিহাদী স্পৃহা প্রত্যক্ষ করি, প্রত্যক্ষ করি জিহাদের জন্য তাদের প্রস্ত্ততি, অনুশীলন, সামরিক অস্ত্রের মহড়া এবং দুর্গ আর প্রাচীর নির্মাণ। তাঁরা জনগণকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, ওলামা আর ওয়ায়েজ শ্রেণি তাদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন। এটা জানা কথা যে, জিহাদ উম্মতকে জাগ্রত করে এবং শক্তি সঞ্চয় করে। অবমাননার পর জিহাদ সম্মান আর মর্যাদায় ভূষিত করে। এর প্রমাণের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, বায়তুল মুকাদ্দাস এবং গোটা ফিলিস্তিন অঞ্চল অধিকার করার পর সালাহউদ্দীন দীর্ঘ ৩৬ মস এক্কা শহর অবরোধ করে রাখেন। এ সময় তিনি তাঁবুতে অবস্থান করেন। এক দন্ড শান্তি ছিল না। দুশমনের প্রতিরোধে তিনি প্রতিদিন অশ্বারোহন করে বের হতেন।

দুই . সুবিচারের ভাবধারা প্রচার। ইতিপূর্বে আমির-উজিররা জনগণের সম্পদ আর সম্পত্তি অন্যায়ভাবে করায়াত্ত করতো। শাসক গোষ্ঠী প্রচার করতো যে, এতে জনগণের সন্তুষ্টি আছে। এমনকি তাদের প্রতি রয়েছে জনগণের আনুগত্য। পক্ষান্তরে আমরা দেখতে পাই যে, নুরুদ্দীন মাহমুদের শাসনামলে সেনা প্রধান আসাদুদ্দীন শেরকোহ তার সমস্ত সম্পদ ত্যাগ করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন এবং আদালতে তিনি নুরুদ্দীনের সম্মুখে বসতেও প্রস্ত্তত হন।

তিন . রাষ্ট্রের সম্পদ ভোগ না করা। এ বিষয়টা অতীতের সব রাষ্ট্র আর সরকার থেকে ভিন্ন। নূরুদ্দীনের নিকট কোন উপহার- উপঢৌকন এলে তিনি তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রেরণ করতেন। তাঁর স্ত্রী খরচ দাবি করলে তিনি তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কিছু না দিয়ে হেমসের কয়েকটি দোকান দেখিয়ে দেন। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ইন্তিকালের সময় এক দীনার এবং ৪০ দিরহাম রেখে যান। খোলাফায়ে রাশেদীন এবং উমর ইবনে আব্দুল আজীজের পর এমন কথা আর শোনা যায়নি।

চার . সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ইতিপূর্বের শাসকরা কোন কোন বিষয় মীমাংসার জন্য রাজনৈতিক গুরুদের নিকট প্রেরণ করতেন। শরিয়তের বিধান অনুসৃত হতো না এবং কিছু লোক বিচারের জন্য কাজির দরবারে গমন না করে গমন করতো পুলিশের নিকট এবং তারা নিজেদের আইন অনুযায়ী ফয়লা সা করতো। ঐতিহাসিক আবু শামা বলেন . নূরুদ্দীন যখন মুসেল অধিকার করেন তখন তিনি পুলিশ প্রধানকে নির্দেশ দেন শরিয়তের বিধান ছাড়া যেন কোন মীমাংসা না করা হয়। কাজির নির্দেশ যেন লঙ্ঘন না করা হয়। অতঃপর এই ঐতিহাসিক কাজি ইউসুফ ইবনে রাফে- এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে, নূরুদ্দীন শরিয়ত বিরোধী বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন না।61 তিনি আরো বলেন . তিনি স্বীয় শাসনাধীন কোন অঞ্চলে ট্যাক্স, কাস্টম উিউটি এবং ও-শর আরোপ করেননি। বরং তিনি এ সব কর রহিত করেন।62 অর্থাৎ তিনি মানুষের উপর থেকে জুলুম প্রত্যাহার করেন এবং আল্লাহর হুকুমের বিরোধী আইন বাতিল করেন।

পাঁচ . আলেম সমাজের মর্যাদা। তাঁরা আলেমদেরকে ভালোবাসতেন, তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং তাদেরকে যোগ্য স্থান আর মর্যাদা দান করতেন। তাঁরা মাদ্রাসা চালু করেন, জ্ঞানের চর্চা করেন এবং জ্ঞানের আসরে তাঁরা নিজেরা যোগদান করতেন। বরং সুলতান সালাহউদ্দীন তাঁর দু’সন্তান আলী এবং ওসমানকে সঙ্গে নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় হাফেজ সাফীর আসরে যোগদান করতেন। আলেম কামালুদ্দীন শহরজুরী মন্ত্রিত্বের মর্যাদায় উন্নীত হন। সুলতান সালাহউদ্দীন উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন বিশিষ্ট আলেম ও ওয়ায়েজ ইবনে নাজা হাম্বলী। আর তাঁর উজির কাজি ফাযেল ছিলেন চীপ সেক্রেটারী। তিনি ছিলেন জ্ঞান প্রেমিক। আলেম সমাজকে তিনি ভালোবাসতেন।