১
যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৪
২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনার অর্থ হলো, তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা, তারা আল্লাহর সৃষ্ট জীব, আল্লাহ তাদেরকে তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাদেরকে যে সম্মান দিয়েছেন, তাদেরকে সেই সম্মান দেয়া। তারা আল্লাহর বান্দা বা দাস। তারা আল্লাহর নির্দেশের বাইরে কোন কাজ করেন না।
ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি :
আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে নূর হতে সৃষ্টি করেছেন। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- : خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُوْرٍ وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ اٰدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে নির্ধূম অগ্নিশিখা হতে। আর আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু হতে যে সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৬৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫১৯৪।]
ফেরেশতাদের সংখ্যা :
ফেরেশতাদের সংখ্যা অত্যধিক। তাদের প্রকৃত পরিসংখ্যান আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া আর কেউ জানে না। কুরআনে এসেছে,
﴿وَمَا يَعْلَمُ جُنُوْدَ رَبِّكَ اِلَّا هُوَ﴾
আর তোমার প্রতিপালকের বাহিনীর সংখ্যা তিনি ছাড়া কেউ জানে না। (সূরা মুদ্দাসি্সর- ৩১)
হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ : اَلْبَيْتُ الْمَعْمُوْرُ فِي السَّمَاءِ السَّابِعَةِ ، يَدْخُلُهٗ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُوْنَ أَلْفَ مَلَكٍ ، ثُمَّ لَا يَعُوْدُوْنَ إِلَيْهِ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সপ্তম আকাশে বায়তুল মামুরে ৭০,০০০ (সত্তর হাজার) ফেরেশতা প্রত্যহ প্রবেশ করে। তারপর (আধিক্যের কারণে যারা একবার প্রবেশ করে) তাদের কেউ দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পায় না। [সহীহ মুসলিম, হা/৪২৯।]
অন্য হাদীসে রয়েছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- : يُؤْتٰى بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لَهَا سَبْعُوْنَ اَلْفَ زِمَامٍ مَعَ كُلِّ زِمَامٍ سَبْعُوْنَ اَلْفَ مَلَكٍ يَجُرُّوْنَهَا
আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, জাহান্নামকে এভাবে উপস্থিত করা হবে। সেদিন তাতে ৭০ হাজার লাগাম লাগানো থাকবে। প্রতিটি লাগামের সাথে ৭০ হাজার ফেরেশতা থাকবে তাঁরা তাকে টেনে নিয়ে যাবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৩৪৩; তিরমিযী, হা/২৫৭৩।]
প্রধান প্রধান কয়েকজন ফেরেশতা :
১। জিবরাঈল (আঃ), যিনি আল্লাহর বাণী রাসূলগণের নিকট পৌঁছিয়ে থাকেন।
২। মীকাঈল (আঃ), যিনি আল্লাহর আদেশে জীবিকা বণ্টন করে থাকেন।
৩। মালাকুল মাওত (আঃ), যিনি জীবের রূহ কবজ করার কাজে নিয়োজিত আছেন।
৪। ইসরাফীল (আঃ), আল্লাহর আদেশ পেলে তিনি শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন। আর তখনই কিয়ামত আরম্ভ হবে।
৫। কিরামান কাতিবীন : মানুষের দৈনন্দিন ভালো-মন্দ কার্য লিপিবদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
৬। মুনকার-নাকীর : কবরে মৃত ব্যক্তিকে তার মাবুদ, রাসূল ও ধর্ম সম্বন্ধে প্রশ্ন করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্য :
১. আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে শক্তিশালী ও বড় আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।
২. আল্লাহ ফেরেশতাদের জন্য দুই, তিন ও চার বা ততোধিক ডানা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
৩. তাদের পানাহারের প্রয়োজন হয় না। তারা বিবাহ করেন না, তাদের সন্তানও হয় না।
৪. ফেরেশতারা অন্তরবিশিষ্ট ও জ্ঞানী।
৫. তাদের নিজস্ব আকৃতি ছাড়াও অন্য আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে।
৬. তারা অক্লান্তভাবে আল্লাহর ইবাদাতে সর্বদা রত থাকেন।
ফেরেশতাদের কার্যাবলি :
ফেরেশতারা আল্লাহর গুণগান করে ও আরশ বহন করে :
﴿اَلَّذِيْنَ يَحْمِلُوْنَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهٗ يُسَبِّحُوْنَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُوْنَ بِهٖ﴾
যারা আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা প্রশংসার সাথে তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। (সূরা মু’মিন- ৭)
ফেরেশতারা আল্লাহর ইবাদাতে ক্লান্ত হয় না :
﴿وَلَه مَنْ فِى السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِؕ وَمَنْ عِنْدَهٗ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِهٖ وَلَا يَسْتَحْسِرُوْنَ﴾
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে সবই তাঁর। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা অহংকারবশে তাঁর ইবাদাত করা হতে বিমুখ হয় না এবং ক্লামিত্মও বোধ করে না। (সূরা আম্বিয়া- ১৯)
﴿اِنَّ الَّذِيْنَ عِنْدَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِهٖ وَيُسَبِّحُوْنَهٗ وَلَهٗ يَسْجُدُوْنَ﴾
যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে তারা অহংকারে তাঁর ইবাদাত হতে বিমুখ হয় না, বরং তারা তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তাঁরই নিকট সিজদাবনত হয়। (সূরা আ‘রাফ- ২০৬)
ফেরেশতারা আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে :
﴿يُسَبِّحُوْنَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُوْنَ﴾
তারা দিনে ও রাত্রে (সর্বদায়) তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, আর তারা এতে শৈথিল্য করে না। (সূরা আম্বিয়া- ২০)
ফেরেশতারা আল্লাহর জন্য সিজদা করে :
﴿وَلِلّٰهِ يَسْجُدُ مَا فِى السَّمَاوَاتِ وَمَا فِى الْاَرْضِ مِنْ دَآبَّةٍ وَّالْمَلَآئِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ﴾
আকাশমন্ডলী ও জমিনের মধ্যে যেসব জীবজন্তু আছে সকলেই আল্লাহকে সিজদা করে। আর ফেরেশতাগণও (তাঁকে সিজদা করে) এবং তারা অহংকার করে না। (সূরা নাহল- ৪৯)
আল্লাহ ফেরেশতাদের দ্বারা মানুষকে সাহায্য করেন :
﴿اِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ اَنِّيْ مُمِدُّكُمْ بِاَلْفٍ مِّنَ الْمَلَآئِكَةِ مُرْدِفِيْنَ﴾
স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তোমাদেরকে জবাব দিয়েছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে পর পর আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করব। (সূরা আনফাল- ৯)
মৃত্যুর ফেরেশতা প্রাণীর জান কবজ করে :
﴿قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِيْ وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ اِلٰى رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْنَ﴾
আপনি বলে দিন, তোমাদের (জীবন হরণের) দায়িত্বে নিয়োজিত মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের জীবন হরণ করবে। তারপর তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়ে নেয়া হবে। (সূরা সাজদা- ১১)
তাছাড়াও ফেরেশতারা রাসূলগণের উপর অহী অবতীর্ণ করার দায়িত্ব পালন করেন। বৃষ্টিবর্ষণ ও মেঘ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। আদম সন্তানের কর্ম লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেন। আদম সন্তানকে হেফাযত করার দায়িত্ব পালন করেন। মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবানের দায়িত্ব পালন করেন। জরায়ুতে বীর্য সঞ্চার, মানুষের রিযিক, কর্ম ও সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেন। তারা মানুষকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উত্তর অনুযায়ী শান্তি বা শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন। তারা জান্নাত ও জাহান্নামের পাহারাদারী করেন। তারা শিংগায় ফুৎকারের দায়িত্ব পালন করবেন।
মানুষের যাবতীয় আমল সংরক্ষণের জন্য সর্বদা দুজন ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন :
﴿اِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِيْنِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيْدٌ ‐ مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ﴾
দুই গ্রহণকারী (ফেরেশতা) তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। (সূরা কাফ- ১৭, ১৮)
﴿وَاِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِيْنَ ‐ كِرَامًا كَاتِبِيْنَ ‐ يَعْلَمُوْنَ مَا تَفْعَلُوْنَ﴾
অবশ্যই তোমাদের জন্য নিয়োজিত রয়েছে তত্ত্বাবধায়কগণ ও সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানে তোমরা যা কর। (সূরা ইনফিতার : ১০-১২)
ফেরেশতাদের ব্যাপারে করণীয় :
ফেরেশতারা যা অপছন্দ করেন তা হতে দূরে থাকতে হবে। কারণ আদম সন্তানরা যাতে কষ্ট পায় তারাও তাতে কষ্ট পান।
عَنْ أَبِى طَلْحَةَ عَنِ النَّبِىِّ - - قَالَ لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيْهِ كَلْبٌ وَلَا صُوْرَةٌ
আবু তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় ফেরেশতারা ঐ ঘরে প্রবেশ করে না, যাতে কুকুর ও ছবি রয়েছে। [সহীহ বুখারী, হা/৩৩২২; সহীহ মুসলিম, হা/৫৬৩৬; তিরমিযী, হা/২৮০৪; ইবনে মাজাহ, হা/৩৬৪৯; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৫৭৫৫; সুনানে নাসাঈ, হা/৫৩৬২;]
ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনতে হবে :
﴿لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوْا وُجُوْهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلَآئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّيْنَ ﴾
তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল পূর্ব দিকে ফেরাও বা পশ্চিম দিকে ফেরাও, তাতে কোন পুণ্য নেই। বরং পুণ্য রয়েছে তার মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করে। (সূরা বাক্বারা- ১৭৭)
যে ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করে সে পথভ্রষ্ট হবে :
﴿وَمَنْ يَّكْفُرْ بِاللهِ وَمَلَآئِكَتِهٖ وَكُتُبِهٖ وَرُسُلِهٖ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا ۢبَعِيْدًا﴾
যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতকে প্রত্যাখ্যান করবে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। (সূরা নিসা- ১৩৬)
ফেরেশতাদের সাথে শত্রুতা করা কুফরী :
﴿مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِّلّٰهِ وَمَلَآئِكَتِهٖ وَرُسُلِهٖ وَجِبْرِيْلَ وَمِيْكَالَ فَاِنَّ اللهَ عَدُوٌّ لِّلْكَافِرِيْنَ﴾
যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর রাসূলগণ, জিবরাঈল এবং মিকাঈলের সাথে শত্রুতা করে, নিশ্চয় আল্লাহ এরূপ কাফিরদের শত্রু। (সূরা বাক্বারা- ৯৮)
ফেরেশতাগণ নূরের তৈরি :
আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে নূর হতে সৃষ্টি করেছেন। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- : خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُوْرٍ وَخُلِقَ الْجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ اٰدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে নির্ধূম অগ্নিশিখা হতে। আর আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু হতে যে সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৬৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫১৯৪।]
ফেরেশতাদের সংখ্যা :
ফেরেশতাদের সংখ্যা অত্যধিক। তাদের প্রকৃত পরিসংখ্যান আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া আর কেউ জানে না। কুরআনে এসেছে,
﴿وَمَا يَعْلَمُ جُنُوْدَ رَبِّكَ اِلَّا هُوَ﴾
আর তোমার প্রতিপালকের বাহিনীর সংখ্যা তিনি ছাড়া কেউ জানে না। (সূরা মুদ্দাসি্সর- ৩১)
হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ : اَلْبَيْتُ الْمَعْمُوْرُ فِي السَّمَاءِ السَّابِعَةِ ، يَدْخُلُهٗ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُوْنَ أَلْفَ مَلَكٍ ، ثُمَّ لَا يَعُوْدُوْنَ إِلَيْهِ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সপ্তম আকাশে বায়তুল মামুরে ৭০,০০০ (সত্তর হাজার) ফেরেশতা প্রত্যহ প্রবেশ করে। তারপর (আধিক্যের কারণে যারা একবার প্রবেশ করে) তাদের কেউ দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পায় না। [সহীহ মুসলিম, হা/৪২৯।]
অন্য হাদীসে রয়েছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ -- : يُؤْتٰى بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ لَهَا سَبْعُوْنَ اَلْفَ زِمَامٍ مَعَ كُلِّ زِمَامٍ سَبْعُوْنَ اَلْفَ مَلَكٍ يَجُرُّوْنَهَا
আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, জাহান্নামকে এভাবে উপস্থিত করা হবে। সেদিন তাতে ৭০ হাজার লাগাম লাগানো থাকবে। প্রতিটি লাগামের সাথে ৭০ হাজার ফেরেশতা থাকবে তাঁরা তাকে টেনে নিয়ে যাবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৩৪৩; তিরমিযী, হা/২৫৭৩।]
প্রধান প্রধান কয়েকজন ফেরেশতা :
১। জিবরাঈল (আঃ), যিনি আল্লাহর বাণী রাসূলগণের নিকট পৌঁছিয়ে থাকেন।
২। মীকাঈল (আঃ), যিনি আল্লাহর আদেশে জীবিকা বণ্টন করে থাকেন।
৩। মালাকুল মাওত (আঃ), যিনি জীবের রূহ কবজ করার কাজে নিয়োজিত আছেন।
৪। ইসরাফীল (আঃ), আল্লাহর আদেশ পেলে তিনি শিঙ্গায় ফুঁক দেবেন। আর তখনই কিয়ামত আরম্ভ হবে।
৫। কিরামান কাতিবীন : মানুষের দৈনন্দিন ভালো-মন্দ কার্য লিপিবদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
৬। মুনকার-নাকীর : কবরে মৃত ব্যক্তিকে তার মাবুদ, রাসূল ও ধর্ম সম্বন্ধে প্রশ্ন করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্য :
১. আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদেরকে শক্তিশালী ও বড় আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।
২. আল্লাহ ফেরেশতাদের জন্য দুই, তিন ও চার বা ততোধিক ডানা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।
৩. তাদের পানাহারের প্রয়োজন হয় না। তারা বিবাহ করেন না, তাদের সন্তানও হয় না।
৪. ফেরেশতারা অন্তরবিশিষ্ট ও জ্ঞানী।
৫. তাদের নিজস্ব আকৃতি ছাড়াও অন্য আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে।
৬. তারা অক্লান্তভাবে আল্লাহর ইবাদাতে সর্বদা রত থাকেন।
ফেরেশতাদের কার্যাবলি :
ফেরেশতারা আল্লাহর গুণগান করে ও আরশ বহন করে :
﴿اَلَّذِيْنَ يَحْمِلُوْنَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهٗ يُسَبِّحُوْنَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُوْنَ بِهٖ﴾
যারা আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারপাশে রয়েছে, তারা প্রশংসার সাথে তাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। (সূরা মু’মিন- ৭)
ফেরেশতারা আল্লাহর ইবাদাতে ক্লান্ত হয় না :
﴿وَلَه مَنْ فِى السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِؕ وَمَنْ عِنْدَهٗ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِهٖ وَلَا يَسْتَحْسِرُوْنَ﴾
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা আছে সবই তাঁর। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা অহংকারবশে তাঁর ইবাদাত করা হতে বিমুখ হয় না এবং ক্লামিত্মও বোধ করে না। (সূরা আম্বিয়া- ১৯)
﴿اِنَّ الَّذِيْنَ عِنْدَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ عَنْ عِبَادَتِهٖ وَيُسَبِّحُوْنَهٗ وَلَهٗ يَسْجُدُوْنَ﴾
যারা তোমার প্রতিপালকের সান্নিধ্যে রয়েছে তারা অহংকারে তাঁর ইবাদাত হতে বিমুখ হয় না, বরং তারা তাঁরই পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং তাঁরই নিকট সিজদাবনত হয়। (সূরা আ‘রাফ- ২০৬)
ফেরেশতারা আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে :
﴿يُسَبِّحُوْنَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُوْنَ﴾
তারা দিনে ও রাত্রে (সর্বদায়) তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে, আর তারা এতে শৈথিল্য করে না। (সূরা আম্বিয়া- ২০)
ফেরেশতারা আল্লাহর জন্য সিজদা করে :
﴿وَلِلّٰهِ يَسْجُدُ مَا فِى السَّمَاوَاتِ وَمَا فِى الْاَرْضِ مِنْ دَآبَّةٍ وَّالْمَلَآئِكَةُ وَهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُوْنَ﴾
আকাশমন্ডলী ও জমিনের মধ্যে যেসব জীবজন্তু আছে সকলেই আল্লাহকে সিজদা করে। আর ফেরেশতাগণও (তাঁকে সিজদা করে) এবং তারা অহংকার করে না। (সূরা নাহল- ৪৯)
আল্লাহ ফেরেশতাদের দ্বারা মানুষকে সাহায্য করেন :
﴿اِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ اَنِّيْ مُمِدُّكُمْ بِاَلْفٍ مِّنَ الْمَلَآئِكَةِ مُرْدِفِيْنَ﴾
স্মরণ করো, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে তখন তিনি তোমাদেরকে জবাব দিয়েছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে পর পর আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করব। (সূরা আনফাল- ৯)
মৃত্যুর ফেরেশতা প্রাণীর জান কবজ করে :
﴿قُلْ يَتَوَفَّاكُمْ مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِيْ وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ اِلٰى رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْنَ﴾
আপনি বলে দিন, তোমাদের (জীবন হরণের) দায়িত্বে নিয়োজিত মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের জীবন হরণ করবে। তারপর তোমাদেরকে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়ে নেয়া হবে। (সূরা সাজদা- ১১)
তাছাড়াও ফেরেশতারা রাসূলগণের উপর অহী অবতীর্ণ করার দায়িত্ব পালন করেন। বৃষ্টিবর্ষণ ও মেঘ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। আদম সন্তানের কর্ম লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেন। আদম সন্তানকে হেফাযত করার দায়িত্ব পালন করেন। মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবানের দায়িত্ব পালন করেন। জরায়ুতে বীর্য সঞ্চার, মানুষের রিযিক, কর্ম ও সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেন। তারা মানুষকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উত্তর অনুযায়ী শান্তি বা শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন। তারা জান্নাত ও জাহান্নামের পাহারাদারী করেন। তারা শিংগায় ফুৎকারের দায়িত্ব পালন করবেন।
মানুষের যাবতীয় আমল সংরক্ষণের জন্য সর্বদা দুজন ফেরেশতা নিয়োজিত রয়েছেন :
﴿اِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِيْنِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيْدٌ ‐ مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَيْهِ رَقِيْبٌ عَتِيْدٌ﴾
দুই গ্রহণকারী (ফেরেশতা) তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। (সূরা কাফ- ১৭, ১৮)
﴿وَاِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِيْنَ ‐ كِرَامًا كَاتِبِيْنَ ‐ يَعْلَمُوْنَ مَا تَفْعَلُوْنَ﴾
অবশ্যই তোমাদের জন্য নিয়োজিত রয়েছে তত্ত্বাবধায়কগণ ও সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানে তোমরা যা কর। (সূরা ইনফিতার : ১০-১২)
ফেরেশতাদের ব্যাপারে করণীয় :
ফেরেশতারা যা অপছন্দ করেন তা হতে দূরে থাকতে হবে। কারণ আদম সন্তানরা যাতে কষ্ট পায় তারাও তাতে কষ্ট পান।
عَنْ أَبِى طَلْحَةَ عَنِ النَّبِىِّ - - قَالَ لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيْهِ كَلْبٌ وَلَا صُوْرَةٌ
আবু তালহা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় ফেরেশতারা ঐ ঘরে প্রবেশ করে না, যাতে কুকুর ও ছবি রয়েছে। [সহীহ বুখারী, হা/৩৩২২; সহীহ মুসলিম, হা/৫৬৩৬; তিরমিযী, হা/২৮০৪; ইবনে মাজাহ, হা/৩৬৪৯; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৫৭৫৫; সুনানে নাসাঈ, হা/৫৩৬২;]
ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনতে হবে :
﴿لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوَلُّوْا وُجُوْهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ اٰمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَالْمَلَآئِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّيْنَ ﴾
তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল পূর্ব দিকে ফেরাও বা পশ্চিম দিকে ফেরাও, তাতে কোন পুণ্য নেই। বরং পুণ্য রয়েছে তার মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করে। (সূরা বাক্বারা- ১৭৭)
যে ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করে সে পথভ্রষ্ট হবে :
﴿وَمَنْ يَّكْفُرْ بِاللهِ وَمَلَآئِكَتِهٖ وَكُتُبِهٖ وَرُسُلِهٖ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا ۢبَعِيْدًا﴾
যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতকে প্রত্যাখ্যান করবে, সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। (সূরা নিসা- ১৩৬)
ফেরেশতাদের সাথে শত্রুতা করা কুফরী :
﴿مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِّلّٰهِ وَمَلَآئِكَتِهٖ وَرُسُلِهٖ وَجِبْرِيْلَ وَمِيْكَالَ فَاِنَّ اللهَ عَدُوٌّ لِّلْكَافِرِيْنَ﴾
যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর রাসূলগণ, জিবরাঈল এবং মিকাঈলের সাথে শত্রুতা করে, নিশ্চয় আল্লাহ এরূপ কাফিরদের শত্রু। (সূরা বাক্বারা- ৯৮)