১
যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২১
তাওহীদের শর্তাবলি
তাওহীদ তথা لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) এর কতগুলো শর্ত আছে। এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা এবং এ শর্তগুলো পূরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। এটা এজন্য যে, কারো মাঝে তাওহীদের কোন শর্ত না পাওয়া গেলে তার মধ্যে ঈমান ও ইসলামের মূল ভিত্তিই পাওয়া যাবে না। যেমন সালাত সহীহ হওয়ার শর্তাবলির মধ্যে যদি কোন একটি শর্ত না পাওয়া যায় তাহলে সালাত বাতিল বলে গণ্য হবে। তাওহীদের কয়েকটি শর্ত নিচে আলোচনা করা হলো :
১. اَلْعِلْمُ (জ্ঞান)
তাওহীদের প্রথম শর্ত হলো তাওহীদের কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর জ্ঞান অর্জন করা। ‘লা-ইলাহা’ বলে কাকে বর্জন করতে হবে? কীভাবে বর্জন করতে হবে এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ বলে কাকে গ্রহণ করতে হবে? কীভাবে গ্রহণ করতে হবে? এ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَاعْلَمْ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْۢبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِؕ وَاللهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ﴾
(হে নবী!) জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো (সত্যিকার) মাবুদ নেই। অতএব তুমি নিজের এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের গোনাহের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমাপ্রার্থনা করো। আল্লাহ তোমাদের তৎপরতার খবর রাখেন এবং (শেষ) ঠিকানা সম্পর্কেও জানেন। (সূরা মুহাম্মাদ- ১৯)
আল্লাহ এক এবং একমাত্র তিনিই ইবাদাতের হকদার- এ কথা না জানা বান্দার ইসলাম গ্রহণযোগ্য হওয়ার পথে বিরাট অন্তরায়। এ কারণেই তাওহীদের ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা বান্দার ইসলাম কবুলের জন্য শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿هٰذَا بَلَاغٌ لِّلنَّاسِ وَلِيُنْذَرُوْا بِهٖ وَلِيَعْلَمُوْاۤ اَنَّمَا هُوَ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ وَّلِيَذَّكَّرَ اُولُو الْاَ لْبَابِ﴾
এটা মানুষের জন্য উপদেশবাণী। যাতে তারা এর দ্বারা সতর্ক করে এবং জেনে নেয় যে, প্রকৃতপক্ষে ইলাহ একজনই। আর জ্ঞানীরা যেন এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। (সূরা ইবরাহীম- ৫২)
উপরোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, لِيَعْلَمُوْاۤ اَنَّمَا هُوَ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ (যাতে তারা জেনে নেয় যে, প্রকৃতপক্ষে ইলাহ একজনই)।
এখানে জানার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসব আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণ হয় যে, মানুষের উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব হচ্ছে আল্লাহকে জানা। উপরোক্ত আয়াত দ্বারা আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, সবচেয়ে বড় ফরয হচ্ছে, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-এর জ্ঞানার্জন করা। আর সবচেয়ে বড় মূর্খতা হচ্ছে, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-এর জ্ঞান না থাকা।
যে ব্যক্তি ‘‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-এর সাক্ষ্য দিল আবার গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর ইবাদাতও করল, তার এ সাক্ষ্যের কোন মূল্য নেই, যদিও সে সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে এবং ইসলামের কিছু কাজকর্ম করে।
২. اَلصِّدْقُ (সত্যতা)
একজন মুমিনকে তাওহীদের কালিমায় সত্যবাদী হতে হবে। সে মুখে কালিমা উচ্চারণ করার পর যদি অন্তরে তার বিপরীত ধারণা পোষণ করে তবে সে মুমিন হতে পারবে না। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
﴿اِذَا جَآءَكَ الْمُنَافِقُوْنَ قَالُوْا نَشْهَدُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُ اللهِؕ وَاللهُ يَعْلَمُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُهٗ وَاللهُ يَشْهَدُ اِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ لَكَاذِبُوْنَ﴾
যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসত তখন তারা বলত, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আপনি আল্লাহর রাসূল আর আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, আপনি তাঁর রাসূল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী। (সূরা মুনাফিকূন- ১)
এখানে মুনাফিকরা নবী ﷺ কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কথাটাকে তাকিদ দিয়ে বলেছে ‘‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি’’। আর সাক্ষ্য বলা হয় আন্তরিক বিশ্বাসসহ কোন কথা বলাকে। যেহেতু তারা আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে কথাটি বলেনি, এ কারণে ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি’ তাদের এ কথাটি বলা মিথ্যা হয়েছে। অতএব বর্তমানেও কোন ব্যক্তি যদি নিজেকে মুসলিম হিসেবে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী বলে দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে এর সত্যতা প্রমাণ করে না, তাহলে সে ব্যক্তিও মুনাফিক বলে বিবেচিত হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّقُوْلُ اٰمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِيْنَ﴾
মানুষের মধ্যে এমনও লোক আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ এবং বিচার দিনের উপর ঈমান এনেছি; অথচ তারা ঈমানদার নয়। (সূরা বাক্বারা- ৮)
কালিমা দ্বারা যা বুঝানো হয়েছে সে ক্ষেত্রে বান্দার অন্তরে কোন ধরণের দ্বিধা ও সন্দেহ থাকতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِه ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوْا وَجَاهَدُوْا بِاَمْوَالِهِمْ وَاَنْفُسِهِمْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ﴾
তারাই সত্যিকার মুমিন, যারা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন করেছে, এরপর এতে কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং আল্লাহর পথে তাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্যবাদী। (সূরা হুজুরাত- ১৫)
৩. اَ لْاِخْلَاصُ (একনিষ্ঠতা)
কালিমার দাবি অনুযায়ী বানদার সকল ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত করাই হচ্ছে ইখলাস। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَاۤ اُمِرُوْاۤ اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَآءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ﴾
তাদেরকে এছাড়া অন্য কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। আর এটাই হচ্ছে সঠিক ধর্ম। (সূরা বায়্যিনাহ- ৫)
﴿اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَ﴾
আমি তোমার প্রতি এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। অতএব তুমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করো। (সূরা যুমার- ২)
﴿اَ لَا لِلّٰهِ الدِّيْنُ الْخَالِصُ ﴾
জেনে রেখো, একনিষ্ঠ ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই জন্য। (সূরা যুমার- ৩)
﴿فَادْعُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ ﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে তাঁর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয়ে ডাকো। (সূরা মু’মিন- ১৪)
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, কালিমায় বিশ্বাসী হওয়ার পর পূর্ণ ইখলাছ ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দাসত্ব করতে হবে।
৪. اَلْقَبُوْلُ (গ্রহণ করা)
‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- এ কালিমাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে হবে। কোন ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ জানল এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসও করল, কিন্তু গ্রহণ করল না, তাহলে সে মুমিন বলে বিবেচিত হবে না। মক্কার কাফির-মুশরিকরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ ভালো করেই জানত। আন্তরিকভাবে বিশ্বাসও করত; কিন্তু অহংকারবশত গ্রহণ করত না। ফলে তারা কাফির-মুশরিকই রয়ে গেল। তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ জেনে-বুঝে প্রত্যাখ্যান করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿اِنَّهُمْ كَانُوْاۤ اِذَا قِيْلَ لَهُمْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ يَسْتَكْبِرُوْنَ – وَيَقُوْلُوْنَ اَئِنَّا لَتَارِكُوْاۤ اٰلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنٍ﴾
যখন তাদেরকে বলা হতো, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই, তখন তারা অহংকার করত এবং বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে পরিত্যাগ করব? (সূরা সাফফাত- ৩৫, ৩৬)
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যখন তাদেরকে বলা হতো যে, ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ’ তথা আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তখন তারা বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে ছেড়ে দেব। অথচ তাদেরকে দেব-দেবী, মূর্তি-প্রতীমা ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়নি। কিন্তু তারা ‘লা ইলাহা’ থেকে ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে, এর মাধ্যমে আমাদের সকল দেব-দেবীকে বর্জন করে শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।
৫. اَلْاِنْقِيَادُ (সমর্পণ করা)
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ -এর অর্থ জানা, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং বাস্তবে ইবাদাতের মাধ্যমে তা গ্রহণ করার পর ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ -এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। এ সমর্পণ হবে সকল প্রকার তাগুতের সাথে কুফরি করার মাধ্যমে। আর এর বাস্তব পরীক্ষা হবে তখন, যখন কুরআন-সুন্নাহর কোন বিষয় তার পার্থিব স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। সে মুহূর্তে যদি নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাহলে সে মুমিন। আর যদি পার্থিব স্বার্থ রক্ষার জন্য কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশকে অবজ্ঞা করে তাহলে সে মুমিন নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتّٰى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْا فِۤيْ اَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا ﴾
না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের ঝগড়া-বিবাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে। অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং তা মেনে না নেয়। (সূরা নিসা- ৬৫)
এ নির্দেশটি কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর হবে। নবী ﷺ আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু এনেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী যে পদ্ধতিতে কাজ করেছেন, তা চিরস্থায়ীভাবে মুসলিমদের জন্য চূড়ান্ত ফায়সালাকারী সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি মানা ও না মানার উপরই কোন ব্যক্তির মুমিন হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। যে কোন বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নেয়া এবং এতে কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ না করা ঈমানের পরিচয়। যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহর ফায়সালার উপর আত্মসমর্পন করবে না সে মুমিন হতে পারবে না।
এ সকল শর্তের সমাবেশ ব্যতীত একজন বান্দা কুফরি ও মুনাফিকী থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।
১. اَلْعِلْمُ (জ্ঞান)
তাওহীদের প্রথম শর্ত হলো তাওহীদের কালিমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর জ্ঞান অর্জন করা। ‘লা-ইলাহা’ বলে কাকে বর্জন করতে হবে? কীভাবে বর্জন করতে হবে এবং ‘ইল্লাল্লাহ’ বলে কাকে গ্রহণ করতে হবে? কীভাবে গ্রহণ করতে হবে? এ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَاعْلَمْ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْۢبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُؤْمِنَاتِؕ وَاللهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ﴾
(হে নবী!) জেনে রেখো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো (সত্যিকার) মাবুদ নেই। অতএব তুমি নিজের এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের গোনাহের জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমাপ্রার্থনা করো। আল্লাহ তোমাদের তৎপরতার খবর রাখেন এবং (শেষ) ঠিকানা সম্পর্কেও জানেন। (সূরা মুহাম্মাদ- ১৯)
আল্লাহ এক এবং একমাত্র তিনিই ইবাদাতের হকদার- এ কথা না জানা বান্দার ইসলাম গ্রহণযোগ্য হওয়ার পথে বিরাট অন্তরায়। এ কারণেই তাওহীদের ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা বান্দার ইসলাম কবুলের জন্য শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿هٰذَا بَلَاغٌ لِّلنَّاسِ وَلِيُنْذَرُوْا بِهٖ وَلِيَعْلَمُوْاۤ اَنَّمَا هُوَ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ وَّلِيَذَّكَّرَ اُولُو الْاَ لْبَابِ﴾
এটা মানুষের জন্য উপদেশবাণী। যাতে তারা এর দ্বারা সতর্ক করে এবং জেনে নেয় যে, প্রকৃতপক্ষে ইলাহ একজনই। আর জ্ঞানীরা যেন এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। (সূরা ইবরাহীম- ৫২)
উপরোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, لِيَعْلَمُوْاۤ اَنَّمَا هُوَ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ (যাতে তারা জেনে নেয় যে, প্রকৃতপক্ষে ইলাহ একজনই)।
এখানে জানার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসব আয়াত দ্বারা এটাই প্রমাণ হয় যে, মানুষের উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব হচ্ছে আল্লাহকে জানা। উপরোক্ত আয়াত দ্বারা আরো প্রমাণিত হয়েছে যে, সবচেয়ে বড় ফরয হচ্ছে, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-এর জ্ঞানার্জন করা। আর সবচেয়ে বড় মূর্খতা হচ্ছে, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-এর জ্ঞান না থাকা।
যে ব্যক্তি ‘‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’-এর সাক্ষ্য দিল আবার গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর ইবাদাতও করল, তার এ সাক্ষ্যের কোন মূল্য নেই, যদিও সে সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে এবং ইসলামের কিছু কাজকর্ম করে।
২. اَلصِّدْقُ (সত্যতা)
একজন মুমিনকে তাওহীদের কালিমায় সত্যবাদী হতে হবে। সে মুখে কালিমা উচ্চারণ করার পর যদি অন্তরে তার বিপরীত ধারণা পোষণ করে তবে সে মুমিন হতে পারবে না। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন,
﴿اِذَا جَآءَكَ الْمُنَافِقُوْنَ قَالُوْا نَشْهَدُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُ اللهِؕ وَاللهُ يَعْلَمُ اِنَّكَ لَرَسُوْلُهٗ وَاللهُ يَشْهَدُ اِنَّ الْمُنَافِقِيْنَ لَكَاذِبُوْنَ﴾
যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসত তখন তারা বলত, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আপনি আল্লাহর রাসূল আর আল্লাহ ভালো করেই জানেন যে, আপনি তাঁর রাসূল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী। (সূরা মুনাফিকূন- ১)
এখানে মুনাফিকরা নবী ﷺ কে আল্লাহর রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কথাটাকে তাকিদ দিয়ে বলেছে ‘‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি’’। আর সাক্ষ্য বলা হয় আন্তরিক বিশ্বাসসহ কোন কথা বলাকে। যেহেতু তারা আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে কথাটি বলেনি, এ কারণে ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি’ তাদের এ কথাটি বলা মিথ্যা হয়েছে। অতএব বর্তমানেও কোন ব্যক্তি যদি নিজেকে মুসলিম হিসেবে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী বলে দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে এর সত্যতা প্রমাণ করে না, তাহলে সে ব্যক্তিও মুনাফিক বলে বিবেচিত হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّقُوْلُ اٰمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الْاٰخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِيْنَ﴾
মানুষের মধ্যে এমনও লোক আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ এবং বিচার দিনের উপর ঈমান এনেছি; অথচ তারা ঈমানদার নয়। (সূরা বাক্বারা- ৮)
কালিমা দ্বারা যা বুঝানো হয়েছে সে ক্ষেত্রে বান্দার অন্তরে কোন ধরণের দ্বিধা ও সন্দেহ থাকতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِه ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوْا وَجَاهَدُوْا بِاَمْوَالِهِمْ وَاَنْفُسِهِمْ فِيْ سَبِيْلِ اللهِؕ اُولٰٓئِكَ هُمُ الصَّادِقُوْنَ﴾
তারাই সত্যিকার মুমিন, যারা আল্লাহ ও রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন করেছে, এরপর এতে কোন সন্দেহ পোষণ করেনি এবং আল্লাহর পথে তাদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্যবাদী। (সূরা হুজুরাত- ১৫)
৩. اَ لْاِخْلَاصُ (একনিষ্ঠতা)
কালিমার দাবি অনুযায়ী বানদার সকল ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত করাই হচ্ছে ইখলাস। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَاۤ اُمِرُوْاۤ اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ حُنَفَآءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ﴾
তাদেরকে এছাড়া অন্য কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। আর এটাই হচ্ছে সঠিক ধর্ম। (সূরা বায়্যিনাহ- ৫)
﴿اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَ﴾
আমি তোমার প্রতি এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। অতএব তুমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করো। (সূরা যুমার- ২)
﴿اَ لَا لِلّٰهِ الدِّيْنُ الْخَالِصُ ﴾
জেনে রেখো, একনিষ্ঠ ইবাদাত একমাত্র আল্লাহরই জন্য। (সূরা যুমার- ৩)
﴿فَادْعُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ ﴾
সুতরাং তোমরা আল্লাহকে তাঁর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয়ে ডাকো। (সূরা মু’মিন- ১৪)
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, কালিমায় বিশ্বাসী হওয়ার পর পূর্ণ ইখলাছ ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দাসত্ব করতে হবে।
৪. اَلْقَبُوْلُ (গ্রহণ করা)
‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- এ কালিমাকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে হবে। কোন ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ জানল এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসও করল, কিন্তু গ্রহণ করল না, তাহলে সে মুমিন বলে বিবেচিত হবে না। মক্কার কাফির-মুশরিকরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ ভালো করেই জানত। আন্তরিকভাবে বিশ্বাসও করত; কিন্তু অহংকারবশত গ্রহণ করত না। ফলে তারা কাফির-মুশরিকই রয়ে গেল। তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর অর্থ জেনে-বুঝে প্রত্যাখ্যান করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
﴿اِنَّهُمْ كَانُوْاۤ اِذَا قِيْلَ لَهُمْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا اللهُ يَسْتَكْبِرُوْنَ – وَيَقُوْلُوْنَ اَئِنَّا لَتَارِكُوْاۤ اٰلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَّجْنُوْنٍ﴾
যখন তাদেরকে বলা হতো, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই, তখন তারা অহংকার করত এবং বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে পরিত্যাগ করব? (সূরা সাফফাত- ৩৫, ৩৬)
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যখন তাদেরকে বলা হতো যে, ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ’ তথা আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তখন তারা বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে ছেড়ে দেব। অথচ তাদেরকে দেব-দেবী, মূর্তি-প্রতীমা ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়নি। কিন্তু তারা ‘লা ইলাহা’ থেকে ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে, এর মাধ্যমে আমাদের সকল দেব-দেবীকে বর্জন করে শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।
৫. اَلْاِنْقِيَادُ (সমর্পণ করা)
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ -এর অর্থ জানা, এর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং বাস্তবে ইবাদাতের মাধ্যমে তা গ্রহণ করার পর ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ -এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। এ সমর্পণ হবে সকল প্রকার তাগুতের সাথে কুফরি করার মাধ্যমে। আর এর বাস্তব পরীক্ষা হবে তখন, যখন কুরআন-সুন্নাহর কোন বিষয় তার পার্থিব স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। সে মুহূর্তে যদি নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাহলে সে মুমিন। আর যদি পার্থিব স্বার্থ রক্ষার জন্য কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশকে অবজ্ঞা করে তাহলে সে মুমিন নয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
﴿فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتّٰى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْا فِۤيْ اَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا ﴾
না, তোমার প্রতিপালকের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের ঝগড়া-বিবাদের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে। অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং তা মেনে না নেয়। (সূরা নিসা- ৬৫)
এ নির্দেশটি কেবল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর হবে। নবী ﷺ আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু এনেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী যে পদ্ধতিতে কাজ করেছেন, তা চিরস্থায়ীভাবে মুসলিমদের জন্য চূড়ান্ত ফায়সালাকারী সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি মানা ও না মানার উপরই কোন ব্যক্তির মুমিন হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। যে কোন বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নেয়া এবং এতে কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ না করা ঈমানের পরিচয়। যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহর ফায়সালার উপর আত্মসমর্পন করবে না সে মুমিন হতে পারবে না।
এ সকল শর্তের সমাবেশ ব্যতীত একজন বান্দা কুফরি ও মুনাফিকী থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।