hadith book logo

যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

তাগুতের পরিচয়

طَاغُوْتٌ (তাগুত) শব্দের আভিধানিক অর্থ :

اَلطَّاغُوْتُ (আত তাগুত) শব্দটি طُغْيَانٌ (তুগইয়ান) শব্দ থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ হচ্ছে, সীমালঙ্ঘনকারী, বিপথে পরিচালনাকারী ইত্যাদি। তাগুত একবচন হতে পারে আবার বহুবচনও হতে পারে, পুরুষও হতে পারে আবার মহিলাও হতে পারে।

طُغْيَانٌ (তুগইয়ান) শব্দের অর্থ বন্যাও হয়। নদীর পানি যখন তার তীরের সীমানা অতিক্রম করে উপরে উঠে যায় তখনই তাকে আমরা বন্যা বলি। তদ্রুপ মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে, কেবল তাঁরই ইবাদাত করবে এবং তাঁরই আইন মেনে চলবে- এটিই আল্লাহর বিধান। কিন্তু ঐ মানুষ যখন আল্লাহর দ্বীনের পথ থেকে সরে পড়ে এবং অন্য পথকে বিশ্বাস করে ও অনুসরণ করে তখনই সে সীমালঙ্ঘন করে।

طَاغُوْتٌ (তাগুত) এর পারিভাষিক অর্থ :

আবু ইসহাক বলেন,

كُلُّ مَعْبُوْدٍ مِنْ دُوْنِ اللهِ جِبْتٌ وَطَاغُوْتٌ

অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যসব মাবুদকেই جِبْتٌ (জিবত) এবং طَاغُوْتٌ (তাগুত) বলা হয়। [তাহযীবুল লুহাত, আল আযহারী, মাকতাবাতুশ শামেলা, পৃ:৯২।]

আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদাত করা হয় তারাই তাগুত। আল্লাহর পরিবর্তে যাদের কাছে বিচারাচার নিয়ে যাওয়া হয়, আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকা হয়, যাদের নামে মান্নত করা হয়, পশু জবাই করা হয় এবং যাদের জন্য আল্লাহ তা’আলার বৈশিষ্ট্য এবং ক্ষমতা সাব্যস্ত করা হয় তারাও তাগুত।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন,

اَلطَّاغُوْتُ كُلُّ مَا تَجَاوَزَ بِهِ الْعَبْدُ حَدَّه مِنْ مَعْبُوْدٍ اَوْ مَتْبُوْعٍ اَوْ مُطَاعٍ ، فَطَاغُوْتُ كُلِّ قَوْمٍ مَنْ يَتَحَاكَمُوْنَ اِلَيْهِ غَيْرَ اللهِ وَرَسُوْلِه اَوْ يَعْبُدُوْنَه مِنْ دُوْنِ اللهِ اَوْ يَتْبَعُوْنَه عَلٰى غَيْرِ بَصِيْرَةٍ مِنَ اللهِ اَوْ يُطِيْعُوْنَه فِيْمَا لَا يَعْلَمُوْنَ اَنَّه طَاعَةٌ لِلّٰهِ فَهٰذِه طَوَاغِيْتُ الْعَالَمِ اِذَا تَأَمَّلَتَهَا وَتَأَمَّلَتَ اَحْوَالَ النَّاسِ مَعَهَا رَأَيْتَ اَكْثَرَهُمْ مِنْ عِبَادَةِ اللهِ اِلٰى عِبَادَةِ الطَّاغُوْتِ وَعَنِ التَّحَاكُمِ اِلَى اللهِ وَاِلَى الرَّسُوْلِ اِلَى التَّحَاكُمِ اِلَى الطَّاغُوْتِ وَعَنْ طَاعَتِه وَمُتَابَعَةِ رَسُوْلِه اِلَى الطَّاغُوْتِ وَمُتَابَعَتِه

তাগুত হচ্ছে ঐ সকল উপাস্য, নেতা-নেত্রী, মরুববী যাদের আনুগত্য করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা হয়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে বাদ দিয়ে যাদের কাছে বিচার-ফায়সালা চাওয়া হয় অথবা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদাত করা হয়। অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন দলিল-প্রমাণ ছাড়া যাদের আনুগত্য করা হয়। অথবা আল্লাহর আনুগত্য মনে করে যে সকল গাইরুল্লাহর ইবাদাত করা হয়। এরাই হলো পৃথিবীর বড় বড় তাগুত। তুমি যদি এই তাগুতগুলো এবং মানুষের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য কর তবে অধিকাংশ মানুষকেই দেখতে পাবে যে, তারা আল্লাহর ইবাদাতের পরিবর্তে তাগুতের ইবাদাত করে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কাছে (কুরআন ও সুন্নাহর কাছে) বিচার-ফায়সালা চাওয়ার পরিবর্তে তাগুতের কাছে বিচার-ফায়সালা নিয়ে যায়। আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করার পরিবর্তে তাগুতের আনুগত্য করে। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে তাগুতের নির্দেশ পালন করে। [এ‘লামুল মুওয়াক্কেঈন : ১/৫০।]

মুহাম্মাদ হামেদ আল-ফক্বী (রহ.) বলেন,

اَلَّذِيْ يَسْتَخْلِصُ مِنْ كَلَامِ السَّلَفِ -رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ -: اَنَّ الطَّاغُوْتَ كُلُّ مَا صَرَفَ الْعَبْدَ وَصَدَّهٗ عَنْ عِبَادَةِ اللهِ وَاِخْلَاصِ الدِّيْنِ وَالطَّاعَةِ لِلّٰهِ وَلِرَسُوْلِهٖ، سَوَاءٌ فِيْ ذٰلِكَ الشَّيْطَانُ مِنَ الْجِنِّ وَالشَّيْطَانُ مِنَ الْاِنْسِ , وَالْاَشْجَارُ وَالْاَحْجَارُ وَغَيْرُهَا . وَيَدْخُلُ فِيْ ذٰلِكَ بِلَا شَكٍّ : اَلْحُكْمُ بِالْقَوَانِيْنَ الْاَجْنَبِيَّةِ عَنِ الْاِسْلَامِ وَشَرَائِعِهٖ وَغَيْرِهَا مِنْ كُلِّ مَا وَضَعَهُ الْاِنْسَانُ لِيَحْكُمَ بِهٖ فِي الدِّمَاءِ وَالْفُرُوْجِ وَالْاَمْوَالِ , وَلِيُبْطِلَ بِهَا شَرَائِعَ اللهِ , مِنْ اِقَامَةِ الْحُدُوْدِ وَتَحْرِيْمِ الرِّبَا وَالزِّنَا وَالْخَمْرِ وَنَحْوِ ذٰلِكَ، مِمَّا اَخَذَتْ هٰذِهِ الْقَوَانِيْنَ تَحْلِلِهَا وَتَحْمِيْهَا بِنُفُوْذِهَا وَمُنْفَذِيْهَا . وَالْقَوَانِيْنَ نَفْسُهَا طَوَاغِيْتٌ , وَوَاضِعُوْهَا وَمُرَوِّجُوْهَا طَوَاغِيْتٌ . وَاَمْثَالُهَا مِنْ كُلِّ كِتَابٍ وَضَعَهٗ الْعَقْلُ الْبَشَرِيْ لِيَصْرِفَ عَنِ الْحَقِّ الَّذِيْ جَاءَ بِهٖ رَسُوْلُ اللهِ اِمَّا قَصَدًا اَوْ مِنْ غَيْرِ قَصَدٍ مَنْ وَاضَعَهٗ، فَهُوَ طَاغُوْتٍ

তাগুত সম্পর্কে সালাফদের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে যা জানা যায় তার সারমর্ম হলো : আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য ও ইবাদাত এবং আল্লাহর জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করার পরিবর্তে যাদের আনুগত্য ও ইবাদাত করা হয় অথবা আল্লাহর ইবাদাতের সঙ্গে যাদেরকে মাধ্যম হিসেবে অথবা আল্লাহর অংশীদার হিসেবে আনুগত্য করা হয় তারা সকলেই তাগুত। এ তাগুত জিন শয়তান, মানুষ শয়তান, গাছ, পাথর ইত্যাদি সবই হতে পারে। এমনিভাবে আল্লাহর আইন বাতিল করে মানবরচিত সকল আইন-কানুন অবশ্যই এই তাগুতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহর হুদুদ, হাদ্দুল ক্বিসাস (খুনের বদলে খুন), হাদ্দুস সারিক্বা (চোরের হাত কাটার বিধান), হাদ্দুয যিনা (যিনা-ব্যভিচারের শাস্তি)। এমনিভাবে আল্লাহর হারামকৃত বস্তুকে হালাল করা। যেমন, সুদকে হালাল করে দেয়া, যিনা-ব্যভিচারকে হালাল করে দেয়া। মানবরচিত সকল আইন-কানুন যেমন তাগুত তেমনিভাবে যারা এগুলো তৈরি করেছে, যারা এ সকল মানবরচিত আইনে বিচার-ফায়সালা করে সেসব বিচারক এবং যারা মানবরচিত আইনের বিচার-ফায়সালাকে বাস্তবায়ন করে সে সকল বাহিনী এবং যারা এই মানবরচিত সংবিধান পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে জড়িত তারাও তাগুত। এমনিভাবে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের পরিবর্তে যে সকল আইনের বই রচনা করা হয়েছে সে বইগুলো এবং যারা এগুলো রচনা করেছে চাই তারা জেনে-বুঝে রচনা করুক বা না বুঝে করুক তারা সকলেই রাসূলুল্লাহ ﷺ যে সত্য নিয়ে এসেছিলেন তা হতে লোকদেরকে ফিরিয়ে রাখার কারণে অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য থেকে ফিরিয়ে গায়রুল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্যের দিকে আহবান করার কারণে তাগুত বলে বিবেচিত। [হাশিয়া ফতহুল মুজিদ, পৃ: ২৮২।]

এতক্ষণ পর্যন্ত তাগুতের যেসকল সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তার সারমর্ম হলো, তাগুত বলা হয় আল্লাহর পরিবর্তে যার আনুগত্য করা হয় এবং সে এটা পছন্দ করে। চাই সেটা ইবাদাতের কোন অংশবিশেষ হোক অথবা ইবাদাতের বিশেষ কোন ক্ষেত্রে হোক। তাই নিম্ন বর্ণিত সকলেই তাগুতের অন্তর্ভুক্ত :

 আল্লাহর ভালোবাসার মতো বা তাঁর চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবেসে যার আনুগত্য করা হয় সে তাগুত।

 আল্লাহর আনুগত্য ও বিচার-ফায়সালা মেনে নেয়ার পরিবর্তে যাদের বিচার-ফায়সালা মেনে নেয়া হয় তারা তাগুত।

 আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর নামে মান্নত করা, কুরবানী করা ও পশু জবাই করা ইত্যাদির পরিবর্তে যাদের নামে এগুলো করা হয় তারা তাগুত।

 আল্লাহর বিশেষ ক্ষমতা, বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির ক্ষেত্রে যাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ স্বীকার করা হয়, অথবা আল্লাহর ক্ষমতা, বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির আংশিক অধিকারী স্বীকার করা হয় তারা তাগুত।

 মানবরচিত সংবিধান, আইন-কানুন ও মানবরচিত ইবাদাতের পদ্ধতিও তাগুত।

 সকল প্রকার ফিতনা-ফাসাদ, গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার নেতৃত্ব দানকারী নেতা-নেত্রী তাগুত।

শিরক-বিদ‘আত ও কুরআন-সুন্নাহ বিবর্জিত বিভিন্ন রসম-রেওয়াজের উদ্ভাবক ও পৃষ্ঠপোষকরাও তাগুত।