hadith book logo

যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

ঈমানের পরিচয়

اَلْاِيْمَانُ (আল ঈমান) এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বিশ্বাস স্থাপন করা। আর পারিভাষিক অর্থে বিশ্বনবী মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন এবং যেসব বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি বিশবাস স্থাপন করা।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট ঈমান হচ্ছে-

هُوَ التَّصْدِيْقُ الْجَازِمُ وَالْاِقْرَارُ الْكَامِلُ وَالْاِعْتِرَافُ التَّامُ بِوُجُوْدِ اللهِ تَعَالٰى وَرُبُوْبِيَّتِه وَاُلُوْهِيَّتِه وَاَسْمَائِه وَصِفَاتِه وَاِسْتِحْقَاقِه وَحْدَهُ الْعِبَادَةِ وَاطْمِئْنَانِ الْقَلْبِ بِذٰلِكَ اِطْمِئْنَانًا تُرٰى اٰثَارُهٗ فِيْ سُلُوْكِ الْاِنْسَانِ وَ الْاِلْتِزَامُ بِاَوَامِرِ اللهِ تَعَالٰى وَاجْتِنَابُ نَوَاهِيْهِ وَاَنَّ مُحَمَّدَ بْنَ عَبْدِ اللهِ وَ رَسُوْلُ اللهِ وَخَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ وَقُبُوْلِ جَمِيْعِ مَا اَخْبَرَ بِه عَنْ رَّبِّه -جَلَّ وَعَلَا وَعَنْ دِيْنِ الْاِسْلَامِ ومِنَ الْاُمُوْرِ الْغَيْبِيَّةِ وَالْاَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ وَبِجَمِيْعِ مُفْرَدَاتِ الدِّيْنِ وَالْاِنْقِيَادُ لَه بِالطَّاعَةِ الْمُطْلَقَةِ فِيْمَا اَمَرَ بِه وَالْكَفُّ عَمَّا نَهٰى عَنْهُ وَزَجَرَ؛ ظَاهِرًا وَبَاطِنًا وَاِظْهَارُ الْخُضُوْعِ وَالطُّمَانِيْنَةُ لِكُلِّ ذٰلِكَ

ঈমান হচ্ছে, দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দান করা এবং আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্ব, তাঁর রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত এবং নাম ও গুণাবলির পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দেয়া। আল্লাহ তা‘আলাকে ইবাদাতের একমাত্র উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। আর এ স্বীকৃতি এমনভাবে দেয়া যে, অন্তরে তার পূর্ণ নিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকে এবং বান্দার কথাবার্তা ও আচরণে তা প্রকাশিত হয়। আর তাঁর যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকা ও সকল আদেশ পালন করা এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী- এ কথার স্বীকৃতি দেয়া। তিনি তাঁর রবের পক্ষ থেকে দ্বীনে ইসলাম সম্পর্কে, অদৃশ্য বিষয়াবলি সম্পর্কে, শরীয়াতের বিধিবিধান সম্পর্কে এবং দ্বীনের শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে যা কিছু সংবাদ দিয়েছেন তা গ্রহণ করা। তিনি যা কিছু নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যেসব পাপ থেকে নিষেধ করেছেন এবং শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন তা থেকে বিরত থাকা। আর এসব বিধান পালনের ক্ষেত্রে বিনয় ও আন্তরিকতা প্রকাশ করা। [আল ঈমান হাকীকাতুহু, খাওয়ারিমুহু ওয়া নায়াকিযুহু, আবদুর রহমান ইবনে সালেহ আল মাহমুদ, মাকতাবাতুশ শামেলা ।]

তিনটি কাজের সমন্বয়ে ঈমান পূর্ণতা লাভ করে :

১. اَلتَّصْدِيْقُ بِالْجَنَانِ (আত তাসদীকু বিল জানান) তথা অন্তরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ যেসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনতে হবে সেসব বিষয়ের ব্যাপারে অন্তরে এ বিশ্বাস থাকবে যে, এ বিষয়গুলো একেবারে সত্য। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَالَّذِيْ جَآءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِه ۤ أُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُتَّقُوْنَ﴾

আর যে সত্য নিয়ে আসল এবং যারা সে সত্যকে বিশ্বাস করল, তারাই মুত্তাকী। (সূরা যুমার- ৩৩)

২. اَ لْاِقْرَارُ بِاللِّسَانِ (আল ইকরারু বিল লিসান) তথা মুখে ঈমানের ঘোষণা দেয়া। অর্থাৎ ব্যক্তিকে যেসব বিষয়ের উপর ঈমান আনতে হবে, সে বিষয়গুলোর উপর যখন সে আস্থা রাখবে তখন সে মুখেও বলবে যে, আমি এ বিষয়গুলো বিশ্বাস করি। আর এ স্বীকৃতির মাধ্যমেই তাকে মুমিন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে এবং সে মুমিনদের দলভুক্ত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿قُوْلُوْاۤ اٰمَنَّا بِاللهِ وَمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْنَا وَمَاۤ اُنْزِلَ اِلٰۤى اِبْرَاهِيْمَ وَاِسْمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ وَيَعْقُوْبَ وَالْاَسْبَاطِ وَمَاۤ اُوْتِيَ مُوْسٰى وَعِيْسٰى وَمَاۤ اُوْتِيَ النَّبِيُّوْنَ مِنْ رَّبِّهِمْۚ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ اَحَدٍ مِّنْهُمْؗ وَنَحْنُ لَهٗ مُسْلِمُوْنَ﴾

তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা আমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে, আর যা ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাদের বংশধরের প্রতি নাযিল হয়েছিল। আর মূসা ও ঈসাকে যা প্রদান করা হয়েছিল এবং অন্যান্য নবীগণ তাদের রবের পক্ষ হতে যা প্রদত্ত হয়েছিলেন তার প্রতিও ঈমান এনেছি। আমরা নবীদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁরই প্রতি আত্মসমর্পণকারী। (সূরা বাকারা- ১৩৬)

﴿اِنَّ الَّذِيْنَ قَالُوْا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوْا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُوْنَ﴾

নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর তাতে অবিচল থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। (সূরা আহকাফ- ১৩)

৩. اَلْعَمَلُ بِالْاَرْكَانِ (আল ‘আমালু বিল আরকান) তথা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে কাজে বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ যখন কোন ব্যক্তি ঈমানের বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং মুখেও এর স্বীকৃতি দেবে তখন তার উপর এ দায়িত্ব বর্তাবে যে, সে ঈমানের সকল দাবি পূর্ণ করে চলবে। একজন ঈমানদারের কর্তব্য হলো, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল যা আদেশ করেছেন সে তা বাস্তবায়ন করবে এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকবে। কোন ব্যক্তির মাঝে কেবল এ তিনটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটলেই তাকে পূর্ণ ঈমানদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

আল্লাহ তা‘আলা সকল ইবাদাতকেই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

﴿وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيْعَ اِيْمَانَكُمْؕ اِنَّ اللهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ﴾

আল্লাহ এরূপ নন যে, তোমাদের ঈমান বিনষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও করুণাময়। (সূরা বাকারা- ১৪৩)

অত্র আয়াতে ঈমান দ্বারা বাইতুল মাকদিসের দিকে মুখ করে যেসব সালাত আদায় করা হয়েছিল তাকে বুঝানো হয়েছে। এখানে আল্লাহ তা‘আলা সালাতকে ঈমান নামে নামকরণ করেছেন। সুতরাং এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, সকল আমলই ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদের অনেক জায়গায় ঈমানের সাথে নেক আমলকে সম্পৃক্ত করেছেন এবং জান্নাতে যাওয়ার জন্য ঈমান এবং নেক আমল উভয়টিকেই শর্তারোপ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿اِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا – خَالِدِيْنَ فِيْهَا لَا يَبْغُوْنَ عَنْهَا حِوَلًا﴾

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস, আল্লাহর পক্ষ থেকে উপঢৌকনস্বরূপ। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে; আর তারা কখনো জান্নাত থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার বাসনা করবে না। (সূরা কাহফু ১০৭, ১০৮)

﴿اَ لَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ طُوْبٰى لَهُمْ وَحُسْنُ مَآٰبٍ﴾

যারা ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, তাদের জন্য রয়েছে শুভ পরিণাম এবং উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল অর্থাৎ জান্নাত। (সূরা রা‘দ- ২৯)

﴿وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِۤيْ اُوْرِثْتُمُوْهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ﴾

এটাই সেই জান্নাত, যা তোমাদের কর্মের প্রতিদানস্বরূপ তোমাদের অধিকারে দেয়া হয়েছে। (সূরা যুখরুফ- ৭২)

ঈমান ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য হলো, ঈমান ও ইসলাম যখন একসাথে আসে তখন ঈমান বিশ্বাস অর্থে এবং ইসলাম বাহ্যিক আমল অর্থে ব্যবহৃত হয়। আর ঈমান যখন এককভাবে ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হয় ইসলামসহ ঈমান। অর্থাৎ এমন ঈমান, যার মধ্যে বিশ্বাস ও আনুগত্য উভয়টিই বিদ্যমান থাকবে। আর যখন ইসলাম এককভাবে ব্যবহৃত হয় তখন ঈমানসহ ইসলাম বুঝায়।