১
যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৭
পাপের কাফ্ফারা
কোন বান্দা যখন কোন পাপ করে তখন তাকে ঐ পাপের পরিণাম অবশ্যই ভোগ করতে হয়। তবে আল্লাহ তা‘আলা এমন কিছু কাজ নির্ধারণ করে রেখেছেন, যার দ্বারা বান্দা তার পাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে। যেমন-
১. দুনিয়াতে শাস্তি নির্ধারিত থাকলে তা প্রযোজ্য করা :
দুনিয়াতে কোন হদ্দ বা শাস্তি নির্ধারিত থাকলে তা তার জন্য প্রযোজ্য করা হলে, তা তার জন্য কাফফারাস্বরূপ হয়ে যাবে।
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ مِنَ الَّذِيْنَ شَهِدُوْا بَدْرًا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ وَمِنْ أَصْحَابِهٖ لَيْلَةَ الْعَقَبَةِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : وَحَوْلَهٗ عِصَابَةٌ مِنْ أَصْحَابِهٖ " تَعَالَوْا بَايِعُونِي عَلٰى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا، وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ، وَلَا تَأْتُونَ بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهٗ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ، وَلَا تَعْصُونِي فِي مَعْرُوفٍ، فَمَنْ وَفٰى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذٰلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهٖ فِي الدُّنْيَا فَهْوَ لَهٗ كَفَّارَةٌ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذٰلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللهُ فَأَمْرُهٗ إِلَى اللهِ، إِنْ شَاءَ عَاقَبَهٗ، وَإِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ " . قَالَ فَبَايَعْتُهٗ عَلٰى ذٰلِكَ
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও বাই‘আতে আক্বাবাতে অংশগ্রহণকারী সাহাবী উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। (আকাবার রাতে) রাসূলুল্লাহ ﷺ বক্তব্য দিচ্ছিলেন এবং তাঁর আশপাশে কিছু সংখ্যক সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বলেন, তোমরা আমার হাতে এ কথার উপর শপথ গ্রহণ করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদেরকে মেরে ফেলবে না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবে না এবং কোন ভালো কাজে আল্লাহর অবাধ্য হবে না। যারা এসব অঙ্গীকার পূরণ করবে তার পুরস্কার আল্লাহ দেবেন। আর কেউ যদি উপরোক্ত কাজসমূহ থেকে কোনটিতে জড়িত হয়ে যায়, আর এজন্য যদি আল্লাহর পক্ষ হতে তাকে পৃথিবীতে কোন শাস্তি দেয়া হয়, তবে তার জন্য তা কাফ্ফারা হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কেউ এ ধরণের কোন কাজ করে, আর আল্লাহ তা গোপন করে রাখেন, তাহলে এর পরিণাম আল্লাহর হাতে, আল্লাহ চাইলে তাকে এর জন্য শাস্তি দিতে অথবা ক্ষমা করে দিতে পারেন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতের উপর শপথ গ্রহণ করি। [সহীহ বুখারী, হা/৩৮৯২।]
২. তওবা করা :
যদি বান্দা এমন কোন গোনাহ করে, যার জন্য দুনিয়াতে শরীয়াতের কোন হদ্দ বা শাস্তি নির্ধারিত নেই, তারপর সে ঐ গোনাহ থেকে খালিছভাবে তওবা করে তাহলে তা তার জন্য কাফ্ফারাস্বরূপ হয়ে যাবে। বান্দার তওবা যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সে খালিছভাবে তওবা করে এবং গোনাহের উপর লজ্জিত হয়। অতঃপর সে সেই গোনাহ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, অতীতের গোনাহ থেকে সে ফিরে আসে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এ গোনাহে লিপ্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার এই তওবা কবুল করেন এবং তার গোনাহ ক্ষমা করে দেন।
﴿فَاَمَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسٰۤى اَنْ يَّكُوْنَ مِنَ الْمُفْلِحِيْنَ﴾
যে ব্যক্তি তওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আশা করা যায় সে সাফল্য অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা ক্বাসাস- ৬৭)
﴿مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُوْنَ شَيْئًا﴾
যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। (সূরা মারইয়াম- ৬০)
﴿وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ﴾
আল্লাহ এমনও নয় যে, তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। (সূরা আনফাল- ৩৩)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَالَّذِيْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْاۤ اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوْا لِذُنُوْبِهِمْؕ وَمَنْ يَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوْا عَلٰى مَا فَعَلُوْا وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ﴾
যারা- যখনই কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা নিজেদের জীবনের প্রতি অত্যাচার করে ফেলে, তখনই আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেদের অপরাধসমূহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে (তারাই মুমিন)। আর আল্লাহ ব্যতীত কে আছে, যে অপরাধসমূহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা যা (পাপ) করেছে, তার উপর জেনে-শুনে অটল থাকে না। (সূরা আলে ইমরান- ১৩৫)
উল্লেখিত আয়াত থেকে জানা যায় :
মুসলিমরা কোন পাপকাজ করার পর তাদের অন্তঃকরণ আল্লাহর ভয়ে ব্যকুল ও অস্থির হয়ে উঠে। আর প্রার্থনা করতে থাকে তাঁর নিকট ক্ষমা ও মাগফেরাতের জন্য। সংশোধন হয়ে যায় ভবিষ্যতের আগত দিনগুলোর জন্য।
তারা নিজেদের কোন পাপ কাজের উপর স্থির থাকে না। বরং তা পরিহার করে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং এজন্য তাদের মন-মগজ লজ্জা ও অবমাননার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে উঠে।
কিন্তু মুনাফিকদের মধ্যে এই গুণাবলি আদৌ বর্তমান থাকে না। তারা শরীয়াতের বিপরীত কাজগুলো নফসের কোন আকস্মিক আবেগ উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে করে না। বরং জেনে বুঝে ও সজাগ অনুভূতি নিয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে করে। শরীয়াতের বিরুদ্ধাচরণ করাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নেয়। তাদের অন্তরে তখন তওবা ও ইস্তিগফার দূরের কথা আল্লাহর ভয়-ভীতির নাম-গন্ধও বিদ্যমান থাকে না।
৩. নেক আমল করা :
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আকীদা হলো, বান্দার নেক আমলের মাধ্যমে তার সগীরা গোনাহসমূহ ক্ষমা হয়ে যায়। আর একনিষ্ঠ তওবার মাধ্যমে কবীরা গোনাহ ক্ষমা করা হয়। যদি বান্দা ইখলাছের সাথে নেক আমল করে এবং তার এই আমল কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হয়, তবে তার এই নেক আমলের দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তার পাপকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِؕ اِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِؕ ذٰلِكَ ذِكْرٰى لِلذَّاكِرِيْنَ ﴾
তুমি সালাত কায়েম করো- দিবসের দু’প্রামত্মভাগে ও রজনীর প্রথমাংশে। নিশ্চয় সৎকর্ম অসৎকর্মকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে এটা তাদের জন্য এক উপদেশ। (সূরা হুদ- ১১৪)
﴿عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ - - قَالَ : الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ كَفَّارَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ﴾
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং এক জুমু‘আ থেকে আরেক জুমু‘আ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফ্ফারা স্বরূপ। [সহীহ মুসলিম, হা/৫৭৩।]
কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা :
কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আল্লাহ তা‘আলা সগীরা গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ একটি অনুগ্রহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿اَلَّذِيْنَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَآئِرَ الْاِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ﴾
যারা কবীরা গোনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকে সগীরা গোনাহ ব্যতীত।
(সূরা নাজম- ৩২)
﴿اِنْ تَجْتَنِبُوْا كَبَآئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُّدْخَلًا كَرِيْمًا﴾
তোমাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা গুরুতর তা হতে বিরত থাকলে তোমাদের ছোট গোনাহসমূহ ক্ষমা করব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা নিসা- ৩১)
আমাদের আমলনামায় যদি বড় বড় অপরাধ না থাকে তাহলে আল্লাহ ছোটখাটো অপরাধগুলোকে উপেক্ষা করেন। তবে যদি আমরা বড় বড় অপরাধ করে থাকি, তাহলে তিনি আমাদের ছোটখাটো অপরাধগুলোও হিসাবের মধ্যে গণ্য করবেন এবং সেজন্য পাকড়াও করবেন।
৪. বিপদাপদে পতিত হওয়া :
যখন কোন বান্দার উপর কোন বিপদাপদ আসে এবং সে তাতে ধৈর্যধারণ করে এবং তার নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা চায় তবে এই বিপদের ফলে আল্লাহ তাকে সওয়াব দান করেন এবং তার গোনাহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যদি সে এই বিপদে আরো ক্রোধান্বিত হয়, তবে সে কোন সওয়াবও পায় না এবং তার কোন গোনাহও ক্ষমা করা হয় না।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ قَالَ مَا يُصِيْبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, কোন মুসলিম রোগ যন্ত্রণা, কষ্ট, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, নির্যাতন ও পেরেশানীর শিকার হলে এমনকি তার একটি কাঁটা বিদ্ধ হলেও এর পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। [সহীহ বুখারী, হা/৫৬৪১, ৫৬৭৪২।]
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ مَا يَزَالُ الْبَلَاءُ بِالْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنَةِ فِيْ نَفْسِه وَوَلَدِه وَمَالِه حَتّٰى يَلْقَى اللهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيْئَةٌ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনের সন্তানসন্ততি, ধন-সম্পদ ও নিজের উপর সর্বদা বিপদ আসতে থাকে। এমনকি শেষপর্যন্ত সে এমনভাবে আল্লাহর সাথে মিলিত হয় যে, তার আর কোন গোনাহ বাকি থাকে না। [তিরমিযী, হা/২৩৯৯; সহীহ ইবনে হিববান, হা/২৯২৪।]
১. দুনিয়াতে শাস্তি নির্ধারিত থাকলে তা প্রযোজ্য করা :
দুনিয়াতে কোন হদ্দ বা শাস্তি নির্ধারিত থাকলে তা তার জন্য প্রযোজ্য করা হলে, তা তার জন্য কাফফারাস্বরূপ হয়ে যাবে।
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ مِنَ الَّذِيْنَ شَهِدُوْا بَدْرًا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ وَمِنْ أَصْحَابِهٖ لَيْلَةَ الْعَقَبَةِ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : وَحَوْلَهٗ عِصَابَةٌ مِنْ أَصْحَابِهٖ " تَعَالَوْا بَايِعُونِي عَلٰى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا، وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ، وَلَا تَأْتُونَ بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهٗ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ، وَلَا تَعْصُونِي فِي مَعْرُوفٍ، فَمَنْ وَفٰى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذٰلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهٖ فِي الدُّنْيَا فَهْوَ لَهٗ كَفَّارَةٌ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذٰلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللهُ فَأَمْرُهٗ إِلَى اللهِ، إِنْ شَاءَ عَاقَبَهٗ، وَإِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ " . قَالَ فَبَايَعْتُهٗ عَلٰى ذٰلِكَ
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও বাই‘আতে আক্বাবাতে অংশগ্রহণকারী সাহাবী উবাদা ইবনে সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। (আকাবার রাতে) রাসূলুল্লাহ ﷺ বক্তব্য দিচ্ছিলেন এবং তাঁর আশপাশে কিছু সংখ্যক সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি বলেন, তোমরা আমার হাতে এ কথার উপর শপথ গ্রহণ করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদেরকে মেরে ফেলবে না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়াবে না এবং কোন ভালো কাজে আল্লাহর অবাধ্য হবে না। যারা এসব অঙ্গীকার পূরণ করবে তার পুরস্কার আল্লাহ দেবেন। আর কেউ যদি উপরোক্ত কাজসমূহ থেকে কোনটিতে জড়িত হয়ে যায়, আর এজন্য যদি আল্লাহর পক্ষ হতে তাকে পৃথিবীতে কোন শাস্তি দেয়া হয়, তবে তার জন্য তা কাফ্ফারা হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কেউ এ ধরণের কোন কাজ করে, আর আল্লাহ তা গোপন করে রাখেন, তাহলে এর পরিণাম আল্লাহর হাতে, আল্লাহ চাইলে তাকে এর জন্য শাস্তি দিতে অথবা ক্ষমা করে দিতে পারেন। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতের উপর শপথ গ্রহণ করি। [সহীহ বুখারী, হা/৩৮৯২।]
২. তওবা করা :
যদি বান্দা এমন কোন গোনাহ করে, যার জন্য দুনিয়াতে শরীয়াতের কোন হদ্দ বা শাস্তি নির্ধারিত নেই, তারপর সে ঐ গোনাহ থেকে খালিছভাবে তওবা করে তাহলে তা তার জন্য কাফ্ফারাস্বরূপ হয়ে যাবে। বান্দার তওবা যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সে খালিছভাবে তওবা করে এবং গোনাহের উপর লজ্জিত হয়। অতঃপর সে সেই গোনাহ থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, অতীতের গোনাহ থেকে সে ফিরে আসে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এ গোনাহে লিপ্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার এই তওবা কবুল করেন এবং তার গোনাহ ক্ষমা করে দেন।
﴿فَاَمَّا مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسٰۤى اَنْ يَّكُوْنَ مِنَ الْمُفْلِحِيْنَ﴾
যে ব্যক্তি তওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, আশা করা যায় সে সাফল্য অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা ক্বাসাস- ৬৭)
﴿مَنْ تَابَ وَاٰمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِكَ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُوْنَ شَيْئًا﴾
যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না। (সূরা মারইয়াম- ৬০)
﴿وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ﴾
আল্লাহ এমনও নয় যে, তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করবে, অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। (সূরা আনফাল- ৩৩)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَالَّذِيْنَ اِذَا فَعَلُوْا فَاحِشَةً اَوْ ظَلَمُوْاۤ اَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوْا لِذُنُوْبِهِمْؕ وَمَنْ يَّغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوْا عَلٰى مَا فَعَلُوْا وَهُمْ يَعْلَمُوْنَ﴾
যারা- যখনই কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা নিজেদের জীবনের প্রতি অত্যাচার করে ফেলে, তখনই আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেদের অপরাধসমূহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে (তারাই মুমিন)। আর আল্লাহ ব্যতীত কে আছে, যে অপরাধসমূহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা যা (পাপ) করেছে, তার উপর জেনে-শুনে অটল থাকে না। (সূরা আলে ইমরান- ১৩৫)
উল্লেখিত আয়াত থেকে জানা যায় :
মুসলিমরা কোন পাপকাজ করার পর তাদের অন্তঃকরণ আল্লাহর ভয়ে ব্যকুল ও অস্থির হয়ে উঠে। আর প্রার্থনা করতে থাকে তাঁর নিকট ক্ষমা ও মাগফেরাতের জন্য। সংশোধন হয়ে যায় ভবিষ্যতের আগত দিনগুলোর জন্য।
তারা নিজেদের কোন পাপ কাজের উপর স্থির থাকে না। বরং তা পরিহার করে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায় এবং এজন্য তাদের মন-মগজ লজ্জা ও অবমাননার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে উঠে।
কিন্তু মুনাফিকদের মধ্যে এই গুণাবলি আদৌ বর্তমান থাকে না। তারা শরীয়াতের বিপরীত কাজগুলো নফসের কোন আকস্মিক আবেগ উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে করে না। বরং জেনে বুঝে ও সজাগ অনুভূতি নিয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে করে। শরীয়াতের বিরুদ্ধাচরণ করাকে নিজেদের অভ্যাসে পরিণত করে নেয়। তাদের অন্তরে তখন তওবা ও ইস্তিগফার দূরের কথা আল্লাহর ভয়-ভীতির নাম-গন্ধও বিদ্যমান থাকে না।
৩. নেক আমল করা :
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আকীদা হলো, বান্দার নেক আমলের মাধ্যমে তার সগীরা গোনাহসমূহ ক্ষমা হয়ে যায়। আর একনিষ্ঠ তওবার মাধ্যমে কবীরা গোনাহ ক্ষমা করা হয়। যদি বান্দা ইখলাছের সাথে নেক আমল করে এবং তার এই আমল কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হয়, তবে তার এই নেক আমলের দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা তার পাপকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِّنَ اللَّيْلِؕ اِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِؕ ذٰلِكَ ذِكْرٰى لِلذَّاكِرِيْنَ ﴾
তুমি সালাত কায়েম করো- দিবসের দু’প্রামত্মভাগে ও রজনীর প্রথমাংশে। নিশ্চয় সৎকর্ম অসৎকর্মকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে এটা তাদের জন্য এক উপদেশ। (সূরা হুদ- ১১৪)
﴿عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ - - قَالَ : الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ كَفَّارَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ﴾
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এবং এক জুমু‘আ থেকে আরেক জুমু‘আ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফ্ফারা স্বরূপ। [সহীহ মুসলিম, হা/৫৭৩।]
কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা :
কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকলে আল্লাহ তা‘আলা সগীরা গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ একটি অনুগ্রহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿اَلَّذِيْنَ يَجْتَنِبُوْنَ كَبَآئِرَ الْاِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ﴾
যারা কবীরা গোনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকে সগীরা গোনাহ ব্যতীত।
(সূরা নাজম- ৩২)
﴿اِنْ تَجْتَنِبُوْا كَبَآئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُّدْخَلًا كَرِيْمًا﴾
তোমাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা গুরুতর তা হতে বিরত থাকলে তোমাদের ছোট গোনাহসমূহ ক্ষমা করব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা নিসা- ৩১)
আমাদের আমলনামায় যদি বড় বড় অপরাধ না থাকে তাহলে আল্লাহ ছোটখাটো অপরাধগুলোকে উপেক্ষা করেন। তবে যদি আমরা বড় বড় অপরাধ করে থাকি, তাহলে তিনি আমাদের ছোটখাটো অপরাধগুলোও হিসাবের মধ্যে গণ্য করবেন এবং সেজন্য পাকড়াও করবেন।
৪. বিপদাপদে পতিত হওয়া :
যখন কোন বান্দার উপর কোন বিপদাপদ আসে এবং সে তাতে ধৈর্যধারণ করে এবং তার নিজের ত্রুটির জন্য ক্ষমা চায় তবে এই বিপদের ফলে আল্লাহ তাকে সওয়াব দান করেন এবং তার গোনাহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যদি সে এই বিপদে আরো ক্রোধান্বিত হয়, তবে সে কোন সওয়াবও পায় না এবং তার কোন গোনাহও ক্ষমা করা হয় না।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ قَالَ مَا يُصِيْبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, কোন মুসলিম রোগ যন্ত্রণা, কষ্ট, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, নির্যাতন ও পেরেশানীর শিকার হলে এমনকি তার একটি কাঁটা বিদ্ধ হলেও এর পরিবর্তে আল্লাহ তা‘আলা তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। [সহীহ বুখারী, হা/৫৬৪১, ৫৬৭৪২।]
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ مَا يَزَالُ الْبَلَاءُ بِالْمُؤْمِنِ وَالْمُؤْمِنَةِ فِيْ نَفْسِه وَوَلَدِه وَمَالِه حَتّٰى يَلْقَى اللهَ وَمَا عَلَيْهِ خَطِيْئَةٌ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনের সন্তানসন্ততি, ধন-সম্পদ ও নিজের উপর সর্বদা বিপদ আসতে থাকে। এমনকি শেষপর্যন্ত সে এমনভাবে আল্লাহর সাথে মিলিত হয় যে, তার আর কোন গোনাহ বাকি থাকে না। [তিরমিযী, হা/২৩৯৯; সহীহ ইবনে হিববান, হা/২৯২৪।]