১
শাশ্বত জীবন ব্যবস্থা (হক দীন)
লেখকঃ আশ-শাইখ আবদুর রহমান ইবন হাম্মাদ আ-লে উমার • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৫
দ্বিতীয় অধ্যায়: রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে জ্ঞান
হে জ্ঞানবান, যখন আপনি জেনেছেন যে, নিশ্চয় আল্লাহই আপনার রব, যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আপনার কর্মের উপরে আপনাকে পুরস্কার দেয়ার জন্য পুনরুত্থান করাবেন। এখন জেনে নিন যে, নিশ্চয় আল্লাহ আপনার ও সমগ্র মানুষের নিকট রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে পাঠিয়েছেন। আপনাকে তাঁর আনুগত্য করতে ও অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এটিও বলে দিয়েছেন যে, সঠিক ইবাদত সম্পর্কে জানতে হলে সেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আনুগত্য করা ছাড়া এবং তাঁর কাছে প্রেরিত শরী‘আত ব্যতীত আল্লাহর ইবাদতের কোনো রাস্তা নেই।
এ সম্মানিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি ঈমান আনা ও তাঁর অনুসরণ করা সমগ্র মানুষের উপর ওয়াজিব। যিনি সর্বশেষ রাসূল, তিনি সমগ্র মানুষের রাসূল। তিনি ঐ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম); ইয়াহূদী ও খৃষ্টানরা তাদের গ্রন্থ নিয়ে অবাঞ্ছিত খেলা ও পরিবর্তন- পরিবর্ধন শুরু করার পূর্বে যে তাওরাত ও ইঞ্জিল পাঠ করত, তার মধ্যে চল্লিশোর্ধ্ব জায়গায় মূসা (আ) ও ঈসা (আ) যার সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছেন। [শাইখুল ইসলাম আহমদ ইবন তায়মীয়া প্রণীত ‘আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ, এর প্রথম খণ্ড ও আল্লামা মুহাম্মদ ইবনিল কাইয়িম প্রণীত হিদায়াতুল হায়ারা, সীরাতে ইবনি হিশাম, ইবনি কাছিরের ইতিহাস গ্রন্থের নবুওয়াতের অলৌকিক ঘটনাবলী অংশ দ্রষ্টব্য।]
তিনি ঐ সম্মানিত নবী, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের রিসালাতের ধারার সমাপ্তি টেনেছেন। সকল মানুষের কাছে তাঁকে পাঠায়েছেন। তিনি হচ্ছেন, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিব আল-হাশেমী আল কুরাইশী। আল্লাহর নবী ইসমাঈল (আ) ও আল্লাহর নবী ইব্রাহীম (আ) থেকে আগত বংশে পৃথিবীর সবচেয়ে বুনিয়াদী গোত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, সম্ভ্রান্ত ও সবচেয়ে সত্যবাদী। সর্বশেষ এ রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ৫৭০ খৃষ্টাব্দে মক্কা নগরীতে জন্মলাভ করেন। যে রজনীতে তিনি জন্ম লাভ করেন এবং যে সময় তিনি তার মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হন, তখন সুবৃহৎ আলোক রশ্মিতে জগত আলোচিত হয়েছিল। মানুষ থমকে গিয়েছিল। ইতিহাস গ্রন্থ আলোড়িত হয়েছিল। কুরাইশরা মক্কাতে কাবার মধ্যে যে সমস্ত মূর্তিকে পূজা করত সেগুলোর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। পারস্য সম্রাট কিসরার রাজ সিংহাসন কম্পিত হয়েছিল। দশোধিক আলিন্দ ভেঙ্গে পড়েছিল। পারস্যবাসীরা যে অগ্নিকে পূজা করত, তা দীর্ঘ দুই হাজার বৎসর পর্যন্ত অনির্বাপিত এ অগ্নি নিভে গিয়েছিল।
এ সমস্ত ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়াবাসীর জন্য শেষ রাসূলের জন্মের ঘোষণা; তাতে বুঝা গিয়েছিল যে, তিনি অতি নিকটবর্তী সময়ে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যে মূর্তিকে পূজা করত তা ভেঙ্গে ফেলবেন। পারস্য ও রোমবাসীদেরকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকবেন এবং তারা এ সত্য দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করবেন। যদি তারা এ দ্বীন গ্রহণে অবাধ্য হয় তাদের বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা জিহাদ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাদের উপর এদেরকে সাহায্য করবেন। দুনিয়ার মধ্যে নূর স্বরূপ যে দ্বীন, তিনি তার প্রসার ঘটাবেন এ ছিল তারই পূর্বাভাস। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণের পরে বাস্তবে এটাই ঘটেছিল।
তবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর শেষ রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূল ভাইদের চেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে,
প্রথমত: তিনি সর্বশেষ রাসূল, তাঁর পরে আর কোনো রাসূল বা নবী নেই।
দ্বিতীয়ত: তাঁর রিসালাতকে সার্বজনীন করে দেয় হয়েছে, সুতরাং সকল মানুষই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত। যিনি তাঁর আনুগত্য দেখাবেন এবং তাঁকে অনুসরণ করবেন, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আর যিনি তার অবাধ্য হবেন তিনি জাহান্নামে প্রবেশ করবেন। এমনকি ইয়াহূদী ও খৃষ্টানগণও তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য। যে তাঁর অনুসরণ করবে না, তাঁর প্রতি ঈমান আনবে না সে মূসা (আ) ঈসা (আ) ও অন্যান্য নবীদেরকেও অস্বীকার করল। যারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে অনুসরণ করবে না, মূসা (আ), ঈসা (আ) ও অন্যান্য নবীগণের সাথে তাদের কোনো সম্পর্কে নেই। কেননা, আল্লাহ তাদেরকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে সুসংবাদ দেওয়া ও যখন আল্লাহ তাঁকে প্রেরণ করবেন তাদের উম্মতদের ও তাঁকে (মুহাম্মাদ) অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা তিনি যে দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন এটি সেই দ্বীন যা দিয়ে আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন এবং এ সর্বশেষ সম্মানিত রাসূল এর যুগে সেটাকে পরিপূর্ণ ও সহজ করেছেন। সুতরাং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -কে ইসলাম সহ প্রেরণের পরে ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীনকে গ্রহণ করা কারো জন্য বৈধ নয়। কেননা এটি পরিপূর্ণ দ্বীন, যা অন্যান্য সবকিছুকে রহিত করে দিয়েছে। আর এটি এমন দ্বীন যা আল্লাহ হেফাযত করেছেন।
পক্ষান্তরে ইয়াহূদীবাদ ও খৃষ্টবাদ এগুলো তো বিকৃত মতবাদ। আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য যা নাযিল করেছেন সেভাবে তা অবশিষ্ট নেই। অতএব, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অনুসারী প্রত্যেক মুসলিম মূসা, ঈসা ও অন্যান্য সকল নবী (আ) এর অনুসারী বলে গণ্য। আর ইসলামের বাইরের সবাই মূসা, ঈসা (আ) ও অন্যান্য সকল নবীর সাথে কুফরীকারী বা অস্বীকারকারী বলে বিবেচিত। যতই তারা মূসা ও ঈসা (আ) এর অনুসারী বলে দাবী করুক না কেন।
এজন্য ইয়াহূদী ধর্মযাজক ‘আহবার’ ও খৃষ্টান ধর্মযাজক “রুহবানের” মধ্যে যারা জ্ঞানী, ন্যায় নীতিবান, তাদের একটি গোষ্ঠী তাড়াতাড়ি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি ঈমান ও ইসলামে প্রবেশের দিকে ধাবিত হয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু‘জিযা [মু‘জিযাকে কুরআনে ‘আয়াত’ বা নিদর্শন বলা হয়েছে। আর এটা বলাই বিশুদ্ধ। মু‘জিযা শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, কারণ তাতে অলৌকিকত্ব থাকতে হয়।]সমূহ:
সীরাত তথা জীবনী বিশেষজ্ঞগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর রিসালাতের সত্যতা প্রমাণকারী অলৌকিক ঘটনাবলী (মু‘জিযা) গণনা করেছেন। যার পরিমাণ এক হাজারেরও বেশী। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:
নবুয়াতের সিলমোহর, যা তাঁর দুই কাঁধের উপর বিদ্যমান ছিল। সেটি ছিল তিলকের আকৃতিতে। তাতে ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ লেখা ছিল।
গরমের মৌসুমে উত্তপ্ত সূর্যের মধ্যে হাঁটার সময় তাঁকে মেঘের ছায়া দান।
তাঁর হাতের মধ্যে অবস্থিত পাথরের তাসবীহ পাঠ ও তাঁর প্রতি বৃক্ষের সালাম দান।
শেষ যুগে যা অনুষ্ঠিত হবে সে সম্পর্কে তাঁর আগাম গায়েবী কথা জানানো। দেখুন, তিনি যেভাবেই বলেছেন সেভাবে একের পর এক এগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এগুলো ঐ সমস্ত অদৃশ্য জিনিস, যা তাঁর তিরোধানের পর থেকে নিয়ে দুনিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ঘটবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনিও সেগুলো বর্ণনা করেছেন। এর সবগুলোই হাদীস গ্রন্থে ও কিয়ামতের আলামত সম্বলিত গ্রন্থে লেখা রয়েছে। এ বিষয়ে ইবন কাছির প্রণীত ‘আন নিহায়াহ’ ও ‘আল আখবারুল মুশায়া ফী আশরাতিস সা‘আহ এবং কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে বর্ণিত তথ্যাদি বিভিন্ন গ্রন্থ ও হাদীস গ্রন্থের ‘ফিতান ও মালাহিম’ অধ্যায়সমূহ দ্রষ্টব্য।
এ সমস্ত অলৌকিক নির্দশনাবলী তাঁর পূববর্তী নবীগণের অলৌকিক নিদর্শনাবলীরই অনুরূপ। তবে তাঁর জন্য আল্লাহ তা‘আলা এমন এক জ্ঞানসম্মত অলৌকিক নিদর্শন দান করেছেন, যা যুগের ইতিহাসে দুনিয়া সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। যা আল্লাহ অন্য নবীদের কাউকে দান করেন নি। সেটি হচ্ছে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন (আল্লাহর বাণী), যা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহই গ্রহণ করেছেন। সূতরাং কোনো রদবদলকারীর হস্ত এদিকে বাড়ালেও কোনো কিছু করতে সক্ষম হবে না। যদি কেউ এক অক্ষর পরিবর্তনের চেষ্টা করে যা আমরা আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হলেও মুসলিমদের হাতে শত শত বিলিয়ন কুরআনের কপি তো অবশিষ্ট রয়েছে যার একটিও অন্যটি থেকে এমনকি একটি অক্ষরও অন্যটির অক্ষর থেকে পার্থক্য নেই। অপরদিকে তাওরাত ও ইঞ্জিল অসংখ্য। যার একটি কপি হতে অন্যটি ভিন্ন প্রকারের। কেননা, ইয়াহূদী ও খৃষ্টানগণ তাদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে খেলায় মেতেছে যখন তাদের উপরে এ দুটোর সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা একে রদবদল করে ছেড়েছে। অপরদিকে আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্বে অন্য কাউকে নিয়োজিত না করে নিজেই নিজের উপরে দায়িত্ব রেখেছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [ الحجر : ٩ ]
“নিশ্চয় আমি যিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমি এর সংরক্ষণকারী”। (হিজর-৯)
নিশ্চয় আল-কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল এ সম্পর্কে জ্ঞানসম্মত প্রমাণ ও আল্লাহর বাণী থেকে দলীলাদি
কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, এ সম্পর্কে (জ্ঞান সম্মত) প্রমাণাদির মধ্যে অন্যতম প্রমাণ এটি যে, পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের উম্মতদের মত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর মিথ্যারোপকারী কাফির কুরাইশদেরকে আল্লাহ তা‘আলা চ্যালেঞ্জ করেছেন। যখন তারা বলেছিল: কুরআন আল্লাহর বাণী নয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কুরআনের সমতুল্য কিছু রচনা করে আনার জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কুরআন তাদেরই ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, তারা সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধ ভাষী ও তাদের মধ্যে বড় বড় বাগ্মী বক্তা, অলংকার শাস্ত্রবিদ ও তুখোড় কবি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তারা এর মত কিছু আনতে ব্যর্থ হয়েছিল। অতঃপর এ কুরআনের মত দশটি সূরা রচনার জন্য চ্যালেঞ্জ করা হয়। তারা এতেও ব্যর্থ হয়। অতঃপর একটি মাত্র সূরা আনার জন্য চ্যালেঞ্জ করা হয়, তারা তাতেও ব্যর্থ হয়। অতঃপর তারা তাদের ব্যর্থতার কথা জানিয়ে দেয়।
বস্তুত সমগ্র জ্বিন ও মানুষ একে অপরের সহযোগী হয়েও এর সমমানের কিছু আনতে ব্যর্থ হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেন-
﴿ قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨ ﴾ [ الاسراء : ٨٨ ]
“তুমি বল যদি সকল মানুষ ও জ্বিন এ কুরআনের অনুরূপ আনার জন্য একত্রিত হয়, যদিও একে অপরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ কিছুই আনতে সক্ষম হবে না”। (বনী ইসরাইল-৮৮)
যদি কুরআন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা অন্য কোনো মানুষের বাণী হত তাহলে সে ছাড়া তার ভাষাভাষী অন্য শুদ্ধ বাগ্মী, এর অনুরূপ আনতে সমর্থ হত। কিন্তু এটি আল্লাহর বাণী। মানুষের বাণীর তুলনায় আল্লাহর বাণীর মার্যাদা ও মান তেমন সমুচ্চে যেমন সমুচ্চে তাঁর সত্তা মানুষের সত্তা থেকে।
আর যেহেতু আল্লাহর কোনো সদৃশ কিছু নেই তাই তার বাণীরও কোনো সৃদশ নেই। আর এর দ্বারাই পরিষ্কার হয় যে, নিশ্চয় কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর রাসূল। কেননা, আল্লাহর বাণী তাঁর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে পছন্দকৃত রাসূলের মাধ্যম ছাড়া অবতীর্ণ হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّۧنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٗا ٤٠ ﴾ [ الاحزاب : ٤٠ ]
“মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কারো পিতা নন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞানী”। (আহযাব- ৪০)
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٢٨ ﴾ [ سبا : ٢٨ ]
“আর আমরা তোমাকে সমগ্র মানুষের কাছে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শণকারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না”। (সাবা-২৮)
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧ ﴾ [ الانبياء : ١٠٧ ]
“আর আমরা তো তোমাকে কেবল সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছি”। (আম্বিয়া-০৭)
আয়াতসমূহের সারমর্মঃ
প্রথম আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেন যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমগ্র মানব জাতির নিকটে তাঁর রাসূল। তিনি সর্বশেষ নবী, যার পরে আর কোনো নবী নেই। তাঁকে তিনি সর্বশেষ রাসূল হিসাবে রিসালাত বহনকারী মনোনীত করেছেন। কেননা, তিনি জানেন, এ বিষয়ে তিনিই (মুহাম্মাদ) হচ্ছেন যোগ্য ব্যক্তি।
অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো এরশাদ করেন, তিনি তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সাদা-কালো, আরব-অনারব সকল মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। নিশ্চয় অধিকাংশ মানুষই সত্যকে জানে না; সে জন্য তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মুহাম্মাদ এর অনুসরণ না করে কাফির হয়েছে।
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সম্বোধন করেন ও বলেন, নিশ্চয় তিনি তাকে নিখিল বিশ্বের জন্য রহমত করে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর রহমত, যা দ্বারা আল্লাহর মানুষদের উপর দয়া ও করুণা করেছেন। যে তার প্রতি ঈমান আনবে, তাকে অনুসরণ করবে, সে তার রহমতকে গ্রহণ করল। তার জন্য জান্নাত অবধারিত। আর যে মুহাম্মাদ এর উপর ঈমান আনবে না, তাঁকে অনুসরণ করবে না, সে আল্লাহর রহমতকে ফিরিয়ে দিল। সে জাহান্নামের কঠোর শাস্তির হকদার হল।
এ সম্মানিত রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি ঈমান আনা ও তাঁর অনুসরণ করা সমগ্র মানুষের উপর ওয়াজিব। যিনি সর্বশেষ রাসূল, তিনি সমগ্র মানুষের রাসূল। তিনি ঐ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম); ইয়াহূদী ও খৃষ্টানরা তাদের গ্রন্থ নিয়ে অবাঞ্ছিত খেলা ও পরিবর্তন- পরিবর্ধন শুরু করার পূর্বে যে তাওরাত ও ইঞ্জিল পাঠ করত, তার মধ্যে চল্লিশোর্ধ্ব জায়গায় মূসা (আ) ও ঈসা (আ) যার সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছেন। [শাইখুল ইসলাম আহমদ ইবন তায়মীয়া প্রণীত ‘আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ, এর প্রথম খণ্ড ও আল্লামা মুহাম্মদ ইবনিল কাইয়িম প্রণীত হিদায়াতুল হায়ারা, সীরাতে ইবনি হিশাম, ইবনি কাছিরের ইতিহাস গ্রন্থের নবুওয়াতের অলৌকিক ঘটনাবলী অংশ দ্রষ্টব্য।]
তিনি ঐ সম্মানিত নবী, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের রিসালাতের ধারার সমাপ্তি টেনেছেন। সকল মানুষের কাছে তাঁকে পাঠায়েছেন। তিনি হচ্ছেন, মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিব আল-হাশেমী আল কুরাইশী। আল্লাহর নবী ইসমাঈল (আ) ও আল্লাহর নবী ইব্রাহীম (আ) থেকে আগত বংশে পৃথিবীর সবচেয়ে বুনিয়াদী গোত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, সম্ভ্রান্ত ও সবচেয়ে সত্যবাদী। সর্বশেষ এ রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ৫৭০ খৃষ্টাব্দে মক্কা নগরীতে জন্মলাভ করেন। যে রজনীতে তিনি জন্ম লাভ করেন এবং যে সময় তিনি তার মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হন, তখন সুবৃহৎ আলোক রশ্মিতে জগত আলোচিত হয়েছিল। মানুষ থমকে গিয়েছিল। ইতিহাস গ্রন্থ আলোড়িত হয়েছিল। কুরাইশরা মক্কাতে কাবার মধ্যে যে সমস্ত মূর্তিকে পূজা করত সেগুলোর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। পারস্য সম্রাট কিসরার রাজ সিংহাসন কম্পিত হয়েছিল। দশোধিক আলিন্দ ভেঙ্গে পড়েছিল। পারস্যবাসীরা যে অগ্নিকে পূজা করত, তা দীর্ঘ দুই হাজার বৎসর পর্যন্ত অনির্বাপিত এ অগ্নি নিভে গিয়েছিল।
এ সমস্ত ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়াবাসীর জন্য শেষ রাসূলের জন্মের ঘোষণা; তাতে বুঝা গিয়েছিল যে, তিনি অতি নিকটবর্তী সময়ে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যে মূর্তিকে পূজা করত তা ভেঙ্গে ফেলবেন। পারস্য ও রোমবাসীদেরকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকবেন এবং তারা এ সত্য দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করবেন। যদি তারা এ দ্বীন গ্রহণে অবাধ্য হয় তাদের বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা জিহাদ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাদের উপর এদেরকে সাহায্য করবেন। দুনিয়ার মধ্যে নূর স্বরূপ যে দ্বীন, তিনি তার প্রসার ঘটাবেন এ ছিল তারই পূর্বাভাস। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণের পরে বাস্তবে এটাই ঘটেছিল।
তবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর শেষ রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে তাঁর পূর্ববর্তী রাসূল ভাইদের চেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে,
প্রথমত: তিনি সর্বশেষ রাসূল, তাঁর পরে আর কোনো রাসূল বা নবী নেই।
দ্বিতীয়ত: তাঁর রিসালাতকে সার্বজনীন করে দেয় হয়েছে, সুতরাং সকল মানুষই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত। যিনি তাঁর আনুগত্য দেখাবেন এবং তাঁকে অনুসরণ করবেন, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আর যিনি তার অবাধ্য হবেন তিনি জাহান্নামে প্রবেশ করবেন। এমনকি ইয়াহূদী ও খৃষ্টানগণও তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য। যে তাঁর অনুসরণ করবে না, তাঁর প্রতি ঈমান আনবে না সে মূসা (আ) ঈসা (আ) ও অন্যান্য নবীদেরকেও অস্বীকার করল। যারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে অনুসরণ করবে না, মূসা (আ), ঈসা (আ) ও অন্যান্য নবীগণের সাথে তাদের কোনো সম্পর্কে নেই। কেননা, আল্লাহ তাদেরকে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে সুসংবাদ দেওয়া ও যখন আল্লাহ তাঁকে প্রেরণ করবেন তাদের উম্মতদের ও তাঁকে (মুহাম্মাদ) অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা তিনি যে দ্বীন নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন এটি সেই দ্বীন যা দিয়ে আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন এবং এ সর্বশেষ সম্মানিত রাসূল এর যুগে সেটাকে পরিপূর্ণ ও সহজ করেছেন। সুতরাং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) -কে ইসলাম সহ প্রেরণের পরে ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীনকে গ্রহণ করা কারো জন্য বৈধ নয়। কেননা এটি পরিপূর্ণ দ্বীন, যা অন্যান্য সবকিছুকে রহিত করে দিয়েছে। আর এটি এমন দ্বীন যা আল্লাহ হেফাযত করেছেন।
পক্ষান্তরে ইয়াহূদীবাদ ও খৃষ্টবাদ এগুলো তো বিকৃত মতবাদ। আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য যা নাযিল করেছেন সেভাবে তা অবশিষ্ট নেই। অতএব, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অনুসারী প্রত্যেক মুসলিম মূসা, ঈসা ও অন্যান্য সকল নবী (আ) এর অনুসারী বলে গণ্য। আর ইসলামের বাইরের সবাই মূসা, ঈসা (আ) ও অন্যান্য সকল নবীর সাথে কুফরীকারী বা অস্বীকারকারী বলে বিবেচিত। যতই তারা মূসা ও ঈসা (আ) এর অনুসারী বলে দাবী করুক না কেন।
এজন্য ইয়াহূদী ধর্মযাজক ‘আহবার’ ও খৃষ্টান ধর্মযাজক “রুহবানের” মধ্যে যারা জ্ঞানী, ন্যায় নীতিবান, তাদের একটি গোষ্ঠী তাড়াতাড়ি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি ঈমান ও ইসলামে প্রবেশের দিকে ধাবিত হয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু‘জিযা [মু‘জিযাকে কুরআনে ‘আয়াত’ বা নিদর্শন বলা হয়েছে। আর এটা বলাই বিশুদ্ধ। মু‘জিযা শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, কারণ তাতে অলৌকিকত্ব থাকতে হয়।]সমূহ:
সীরাত তথা জীবনী বিশেষজ্ঞগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর রিসালাতের সত্যতা প্রমাণকারী অলৌকিক ঘটনাবলী (মু‘জিযা) গণনা করেছেন। যার পরিমাণ এক হাজারেরও বেশী। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:
নবুয়াতের সিলমোহর, যা তাঁর দুই কাঁধের উপর বিদ্যমান ছিল। সেটি ছিল তিলকের আকৃতিতে। তাতে ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ লেখা ছিল।
গরমের মৌসুমে উত্তপ্ত সূর্যের মধ্যে হাঁটার সময় তাঁকে মেঘের ছায়া দান।
তাঁর হাতের মধ্যে অবস্থিত পাথরের তাসবীহ পাঠ ও তাঁর প্রতি বৃক্ষের সালাম দান।
শেষ যুগে যা অনুষ্ঠিত হবে সে সম্পর্কে তাঁর আগাম গায়েবী কথা জানানো। দেখুন, তিনি যেভাবেই বলেছেন সেভাবে একের পর এক এগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এগুলো ঐ সমস্ত অদৃশ্য জিনিস, যা তাঁর তিরোধানের পর থেকে নিয়ে দুনিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ঘটবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনিও সেগুলো বর্ণনা করেছেন। এর সবগুলোই হাদীস গ্রন্থে ও কিয়ামতের আলামত সম্বলিত গ্রন্থে লেখা রয়েছে। এ বিষয়ে ইবন কাছির প্রণীত ‘আন নিহায়াহ’ ও ‘আল আখবারুল মুশায়া ফী আশরাতিস সা‘আহ এবং কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে বর্ণিত তথ্যাদি বিভিন্ন গ্রন্থ ও হাদীস গ্রন্থের ‘ফিতান ও মালাহিম’ অধ্যায়সমূহ দ্রষ্টব্য।
এ সমস্ত অলৌকিক নির্দশনাবলী তাঁর পূববর্তী নবীগণের অলৌকিক নিদর্শনাবলীরই অনুরূপ। তবে তাঁর জন্য আল্লাহ তা‘আলা এমন এক জ্ঞানসম্মত অলৌকিক নিদর্শন দান করেছেন, যা যুগের ইতিহাসে দুনিয়া সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। যা আল্লাহ অন্য নবীদের কাউকে দান করেন নি। সেটি হচ্ছে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন (আল্লাহর বাণী), যা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহই গ্রহণ করেছেন। সূতরাং কোনো রদবদলকারীর হস্ত এদিকে বাড়ালেও কোনো কিছু করতে সক্ষম হবে না। যদি কেউ এক অক্ষর পরিবর্তনের চেষ্টা করে যা আমরা আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হলেও মুসলিমদের হাতে শত শত বিলিয়ন কুরআনের কপি তো অবশিষ্ট রয়েছে যার একটিও অন্যটি থেকে এমনকি একটি অক্ষরও অন্যটির অক্ষর থেকে পার্থক্য নেই। অপরদিকে তাওরাত ও ইঞ্জিল অসংখ্য। যার একটি কপি হতে অন্যটি ভিন্ন প্রকারের। কেননা, ইয়াহূদী ও খৃষ্টানগণ তাদের ধর্মগ্রন্থ নিয়ে খেলায় মেতেছে যখন তাদের উপরে এ দুটোর সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ দিয়েছিলেন; কিন্তু তারা একে রদবদল করে ছেড়েছে। অপরদিকে আল্লাহ কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্বে অন্য কাউকে নিয়োজিত না করে নিজেই নিজের উপরে দায়িত্ব রেখেছেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [ الحجر : ٩ ]
“নিশ্চয় আমি যিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমি এর সংরক্ষণকারী”। (হিজর-৯)
নিশ্চয় আল-কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল এ সম্পর্কে জ্ঞানসম্মত প্রমাণ ও আল্লাহর বাণী থেকে দলীলাদি
কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল, এ সম্পর্কে (জ্ঞান সম্মত) প্রমাণাদির মধ্যে অন্যতম প্রমাণ এটি যে, পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের উম্মতদের মত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর মিথ্যারোপকারী কাফির কুরাইশদেরকে আল্লাহ তা‘আলা চ্যালেঞ্জ করেছেন। যখন তারা বলেছিল: কুরআন আল্লাহর বাণী নয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে কুরআনের সমতুল্য কিছু রচনা করে আনার জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কুরআন তাদেরই ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, তারা সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধ ভাষী ও তাদের মধ্যে বড় বড় বাগ্মী বক্তা, অলংকার শাস্ত্রবিদ ও তুখোড় কবি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তারা এর মত কিছু আনতে ব্যর্থ হয়েছিল। অতঃপর এ কুরআনের মত দশটি সূরা রচনার জন্য চ্যালেঞ্জ করা হয়। তারা এতেও ব্যর্থ হয়। অতঃপর একটি মাত্র সূরা আনার জন্য চ্যালেঞ্জ করা হয়, তারা তাতেও ব্যর্থ হয়। অতঃপর তারা তাদের ব্যর্থতার কথা জানিয়ে দেয়।
বস্তুত সমগ্র জ্বিন ও মানুষ একে অপরের সহযোগী হয়েও এর সমমানের কিছু আনতে ব্যর্থ হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেন-
﴿ قُل لَّئِنِ ٱجۡتَمَعَتِ ٱلۡإِنسُ وَٱلۡجِنُّ عَلَىٰٓ أَن يَأۡتُواْ بِمِثۡلِ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانِ لَا يَأۡتُونَ بِمِثۡلِهِۦ وَلَوۡ كَانَ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٖ ظَهِيرٗا ٨٨ ﴾ [ الاسراء : ٨٨ ]
“তুমি বল যদি সকল মানুষ ও জ্বিন এ কুরআনের অনুরূপ আনার জন্য একত্রিত হয়, যদিও একে অপরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ কিছুই আনতে সক্ষম হবে না”। (বনী ইসরাইল-৮৮)
যদি কুরআন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বা অন্য কোনো মানুষের বাণী হত তাহলে সে ছাড়া তার ভাষাভাষী অন্য শুদ্ধ বাগ্মী, এর অনুরূপ আনতে সমর্থ হত। কিন্তু এটি আল্লাহর বাণী। মানুষের বাণীর তুলনায় আল্লাহর বাণীর মার্যাদা ও মান তেমন সমুচ্চে যেমন সমুচ্চে তাঁর সত্তা মানুষের সত্তা থেকে।
আর যেহেতু আল্লাহর কোনো সদৃশ কিছু নেই তাই তার বাণীরও কোনো সৃদশ নেই। আর এর দ্বারাই পরিষ্কার হয় যে, নিশ্চয় কুরআন আল্লাহর বাণী ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর রাসূল। কেননা, আল্লাহর বাণী তাঁর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে পছন্দকৃত রাসূলের মাধ্যম ছাড়া অবতীর্ণ হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّۧنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٗا ٤٠ ﴾ [ الاحزاب : ٤٠ ]
“মুহাম্মাদ তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কারো পিতা নন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে জ্ঞানী”। (আহযাব- ৪০)
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ ٢٨ ﴾ [ سبا : ٢٨ ]
“আর আমরা তোমাকে সমগ্র মানুষের কাছে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শণকারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না”। (সাবা-২৮)
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧ ﴾ [ الانبياء : ١٠٧ ]
“আর আমরা তো তোমাকে কেবল সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছি”। (আম্বিয়া-০৭)
আয়াতসমূহের সারমর্মঃ
প্রথম আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেন যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমগ্র মানব জাতির নিকটে তাঁর রাসূল। তিনি সর্বশেষ নবী, যার পরে আর কোনো নবী নেই। তাঁকে তিনি সর্বশেষ রাসূল হিসাবে রিসালাত বহনকারী মনোনীত করেছেন। কেননা, তিনি জানেন, এ বিষয়ে তিনিই (মুহাম্মাদ) হচ্ছেন যোগ্য ব্যক্তি।
অপর আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরো এরশাদ করেন, তিনি তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সাদা-কালো, আরব-অনারব সকল মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। নিশ্চয় অধিকাংশ মানুষই সত্যকে জানে না; সে জন্য তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মুহাম্মাদ এর অনুসরণ না করে কাফির হয়েছে।
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সম্বোধন করেন ও বলেন, নিশ্চয় তিনি তাকে নিখিল বিশ্বের জন্য রহমত করে পাঠিয়েছেন। তিনি আল্লাহর রহমত, যা দ্বারা আল্লাহর মানুষদের উপর দয়া ও করুণা করেছেন। যে তার প্রতি ঈমান আনবে, তাকে অনুসরণ করবে, সে তার রহমতকে গ্রহণ করল। তার জন্য জান্নাত অবধারিত। আর যে মুহাম্মাদ এর উপর ঈমান আনবে না, তাঁকে অনুসরণ করবে না, সে আল্লাহর রহমতকে ফিরিয়ে দিল। সে জাহান্নামের কঠোর শাস্তির হকদার হল।