hadith book logo

ইসলামে মানবাধিকার

লেখকঃ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

ইসলামে জাতভেদ নেই; শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ‘তাকওয়া’

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আবির্ভাব ঘটল। তার নিকট ওহীর মারফত ইসলামী শরীয়ত আসল। তাকে নির্দেশ দেয়া হল হকের দাওয়াত উচ্চকিত করার। হুকুম দেয়া হল, সর্ব প্রথম নিজ পরিবার ও প্রিয়জনদেরকে তারপর বিশ্ববাসীকে সতর্ক করার জন্য। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর রিসালাতকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে নির্ধারণ করে ঘোষণা করলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

“আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আম্বিয়া/১০৭]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সমাজে আগমন করেছিলেন, সেখানে শ্রেণী সংঘাত চরম আকারে বিদ্যমান ছিল। এ গোত্র ওই গোত্র থেকে শ্রেষ্ঠ, এরা ওদের চেয়ে উঁচুস্তরের, ওদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অন্যদের উপর বেশী ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠিগত স্তরভেদ ও শ্রেণী সংঘাতের মাধ্যমে মানুষে মানুষে উঁচু-নিচু স্তর সৃষ্টি করে রাখা হয়েছিল। এই পরিস্থিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক মহান বার্তা নিয়ে আগমন করলেন। আর তা হল,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّـهِ

“হে মানব,আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু।” [সূরা হুজুরাত/১৩]

উক্ত ঘোষণার মাধ্যমে লিঙ্গ, বর্ণ, বংশ, গোত্র, দেশ, অঞ্চল ইত্যাদিকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ না করে সে ব্যক্তিকেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো হয়েছে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু।

এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ رَبَّكُمْ وَاحِدٌ، وَإِنَّ أَبَاكُمْ وَاحِدٌ، أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى عَجَمِيٍّ، وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ، إِلَّا بِالتَّقْوَى

“হে মানুষেরা, তোমাদের স্রষ্টা এক, তোমাদের পিতা এক। তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ছাড়া কোন অনারবের উপর আরবীর কিংবা আরবীর উপর অনারেবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই অথবা কৃষ্ণাঙ্গের উপর শেতাঙ্গের কিংবা শেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্টত্ব নেই।” [মুসনাদে আহম ৩৪/৪৭৪, বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান ৭/১২৩, হিলয়া, আবু নাঈম ৩/১০০)]

তিনি আরও বলেছেন, “সব মানুষ সমান চিরুনীর দাঁতের মত। তবে ইবাদতের দিক দিয়ে একে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে।” [মুসনাদ কুযায়ী ১/১৪৫, কিতাবুল আমসাল ফিল হাদীস, আল আসবাহানী পৃষ্ঠা নং ২০৩ (এটি আরও বর্ণনা করেছেন ইবনে আদী তার যুয়াফা কিতাবে এবং এটিকে মাউযু (বানোয়াট) হাদীস হিসেবে হুকুম দিয়েছেন। ইবনুল জাওযী এই হাদীসটিকে তার আল মাউযূআত (বানোয়াট হাদীস) কিতাবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম আলবানী রহ. এটিকে অত্যন্ত দূর্বল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।-অনুবাদক)] এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ কথা হল, এ হাদীসটি প্রযোজ্য আল্লাহর হুকুম-আহকাম প্রয়োগ হওয়ার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ শরীয়তের হুকুম দেয়ার ক্ষত্রে আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষকে সম ভাবে সম্বোধন করেছেন। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ, স্বাধীন-দাস, ধনী-গরীব এর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ গ্রহণ করতে সকল মানুষকে সমভাবে আহবান জানানো হয়েছে। সব মানুষই আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশিত। সব মানুষকেই যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করতে হবে...। সুতরাং শরীয়তের নির্দেশের ক্ষেত্রে সকল মানুষের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ সমতা রয়েছে।