hadith book logo

ইসলামে মানবাধিকার

লেখকঃ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৬

ইসলামে অমুসলিমদের অধিকার:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সকল কাফিরদের প্রত্যেককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। বরং আল্লাহ তায়ালা কুরআনে অমুসলিমদেরকে তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন যদি তারা হারবী না হয় অর্থাৎ যদি তারা ইসলামের প্রতি প্রকাশ্য শত্রুতা পোষণ না করে বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ - إِنَّمَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ قَاتَلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَأَخْرَجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ وَظَاهَرُوا عَلَى إِخْرَاجِكُمْ أَنْ تَوَلَّوْهُمْ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

“ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি,তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ কারীদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেছে এবং বহিস্কার কার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই জালেম।” [সূরা মুমতাহিনা/ ৮-৯]

সুতরাং ইসলামী শরীয়তে জিম্মি কাফিরের অধিকার প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সে কাফির বলে তার মানবাধিকার হজম করে ফেলার কোন সুযোগ নাই। বরং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তা নির্ধারিত করেছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ قَتَلَ قَتِيلًا مِنْ أَهْلِ الذِّمَّةِ لَمْ يَجِدْ رِيحَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامً

“যে ব্যক্তি কোন জিম্মি (মুসলিমদের জিম্মা বা নিরাপত্তায় থাকা) ইহুদী-খৃষ্টান বা আহলে কিতাবগণ। হত্যা করল সে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না। অথচ চল্লিশ বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।” [মুসনাদ আহমদ ১১/২৫৬, ইবনে মাজাহ হা/২৬৮৬, নাসাঈ ফিল মুজতাবা ৮/২৫, নাসাঈ ফিল কুবরা ৮৭৪২, হাকিম ২/১২৬, বায়হাকী ফিস সুনান ৯/২০৫, ইবনে আবী শায়বা ৯/৪২৬]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন,

مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا

“যে ব্যক্তি মুয়াহিদ তথা চুক্তিবদ্ধভাবে মুসলিম দেশে বসবাসকারী অমুসলিমকে হত্যা করল সে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না। অথচ চল্লিশ বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।” [সহীহুল বুখারী হা/৩১৬৬]

যে কোন জিম্মি কাফেরকে নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মুসলমানকেও সচেষ্ট থাকতে হবে। কারণ, সে ইসলামী সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আইনগতভাবে নিরাপত্তা প্রাপ্ত। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে তার জান-মাল, সম্ভ্রম-মর্যাদার প্রতি কোনরূপ অবিচার করা যাবে না। কারণ, ইসলামী শরীয়তে তার অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত। কুরআন ও হাদীসে জিম্মি, মুয়াহিদ এবং মুস্তামিন এর অধিকার সংক্রান্ত অনেক সুষ্পষ্ট বক্তব্য বিদ্যমান রয়েছে। মুসলিম পণ্ডিতগণও এ মর্মে বহু বক্তব্য পেশ করেছেন।

- হারবী তথা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত অমুসলিমদের ব্যাপারে বহু বিধিবিধান রয়েছে। যেমন, যদি যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে কোন যুদ্ধরত কাফিরকে মুসলিমগণ পাকড়াও করে নিয়ে আসে তবে তাকে সম্মান করতে হবে। অনুরূপভাবে গ্রেফতারকৃতদের মাঝে যদি নবজাতক, শিশু, মহিলা বা বৃদ্ধ মানুষ থাকে তবে তাদেরকে হত্যা করা যাবে না। এমন উদাহরণ আরও রয়েছে।

পক্ষান্তরে ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্মমতে এদের সকলকে হত্যা করার আইন আছে। যেমন, মূসা আ. এর শরীয়তে যুদ্ধাবস্থায় যাদেরকেই পাকড়াও করা হবে তাদের সকলে হত্যা করতে হবে। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত এবং এদেরকে হত্যা না করার মধ্যেই কল্যাণ নিহীত রয়েছে। তাই ইসলামী শরীয়তের আইন হল, শুধু সে অমসুলিমকেই হত্যা করা হবে যে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। কিন্তু সে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হলে তার জন্য রয়েছে অনেক বিধিবিধান ।

ইসলামী দেশে একজন অমুসলিমের বিভিন্ন অধিকার রয়েছে। যেমন, সে ঘরের মধ্য যা ইচ্ছা করুক কিন্তু প্রকাশ্যে-জনসম্মুখে যা মনে চায় তাই করতে পারবে না। বাইরে জনসম্মুখে কোন ইসলামের হারাম বা নিষিদ্ধ কোন কাজ করতে পারবে না। অনুরূপভাবে প্রকাশ্যে সে তার ধর্মীয় কার্যক্রম করতে পারবে না। এ সব বিধান মুয়াহিদ (চুক্তিবদ্ধভবে মুসলিম দেশে বসবাসকারী অমুসলিম), মুস্তামিন (ইসলামী সরকারের নিরাপত্তা নিয়ে নিজ দেশ থেকে আগমণকারী অমুসলিম) এর জন্যও প্রযোজ্য।

কিন্তু জিম্মির ব্যাপারে আইন আরও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। যেমন যদি তারা মুসলিমদের বিজিত অঞ্চলের অধিবাসী হয়। আর সে দেশে তাদের গির্জা থাকে (যেমন, শাম, ইরাক ও মিসরের গির্জা সমূহ) তাহলে সে ব্যাপারে বিস্তারিত আইন রয়েছে।

কিন্তু সাধারণভাবে মুসলিম দেশে তারা জনসম্মুখে তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করতে পারবে না। অনুরূপভাবে তারা মুসলিম দেশে প্রকাশ্যে ক্রুশ ঝুলাতে পাবে না বা মন চাইলেই যেখানে খুশি মদপান, জিনা-ব্যাভিচার ইত্যাদি করতে পারবে না।

কেউ যদি তার ঘরের মধ্যে মদ পান করতে চায় তাহলে গোপনীয়তা রক্ষা করে সেটা তার করার অধিকার রয়েছে। তার বাড়িতে সে যা ইচ্ছা করতে পারে। এটা তার অধিকার এবং ইসলামী শরীয়ত তার এ অধিকার সংরক্ষণ করবে। কিন্তু ইসলামী দেশে প্রকাশ্যে ইসলামী শরীয়ত বিরোধী কিছু করতে পারবে না। সে যদি গোপনে কিছু করে তবে আমরা সেটা তল্লাশী করতে যাবো না।

অনুরূপভাবে তারা তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করার অধিকার রাখে। যেমন, কতিপয় ব্যাবসায়ী উমর রা. এর নিকট মদীনায় থাকার অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকে সেখানে থাকার সুযোগ দিলেন। তবে তিনি তাদেরকে তিন দিনের অতিরিক্ত থাকার অনুমতি দিলেন না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদী-খৃষ্টানদেরকে আরব উপদ্বীপে রাখতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। তবে মক্কা-মদীনা ছাড়া অন্যত্র তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। ইসলাম তাদেরকে এই অর্থনৈতিক অধিকার প্রদান করেছে।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রতিভাত হয়েছে যে, ইসলাম বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষকে অর্থনৈতিক অধিকার, সমতা এবং ইনসাফপূর্ণ বিধান দিয়েছে। এগুলোর অনন্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদার যুগে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্যে।