hadith book logo

প্রাথমিক তাওহীদ শিক্ষা

লেখকঃ ডঃ আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মাদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৭

ঘ- ক্বিয়ামতের আলামত:

ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা ওয়াজিব। ক্বিয়ামত আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই। এর নির্দিষ্ট সময় আল্লাহ্‌ ব্যতীত কেউ জানে না, তিনি (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) এ বিষয়টি সকল মানুষ থেকে গোপন রেখেছেন। তিনি (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:

﴿يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً يَسْأَلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللَّهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ﴾ [ الأعراف : ১৮৭[

অর্থ: আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কিয়ামত কখন অনুতি হবে? বলে দিন এর খবর তো আমার পালনকর্তার কাছেই রয়েছে। তিনিই তা অনাবৃত করে দেখাবেন নির্ধারিত সময়ে। আসমান ও যমীনের জন্য সেটি অতি কঠিন বিষয়। যখন তা তোমাদের উপর আসবে অজান্তেই এসে যাবে। আপনাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, যেন আপনি তার অনুসন্ধানে লেগে আছেন। বলে দিন, এর সংবাদ বিশেষ করে আল্লাহর নিকটই রয়েছে। কিন্তূ তা অধিকাংশ লোকই উপলব্ধি করে না। সূরাহ্‌ আল্‌ আ'রাফ আয়াত ১৮৭।

ক্বিয়ামতের আলামত, সঙ্কেত ও নিদর্শন সম্পর্কে রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে অনেক হাদীস আছে। সহীহ্‌ সূত্রে পাওয়া যায় রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ক্বিয়ামতের কিছু ছোট আলামতের সংবাদ দিয়েছেন।

যার অধিকাংশ মানুষের দুর্নীতি, পারস্পারিক গোলযোগ এবং আল্লাহর সঠিক পথ থেকে তাদের পদস্খলনের সাথে সম্পৃক্ত।

ক্বিয়ামতের কিছু ছোট আলামত জিবরীল  এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ক্বিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন এ ব্যাপারে প্রশ্নকৃত প্রশ্নকারী থেকে অধিক জ্ঞাতনন। জিবরীল  বলেছিলেন, তাহলে এর আলামত বা নিদর্শন সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিন? তখন রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন:

﴿قَالَ أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ رَبَّتَهَا وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ﴾ ( صحيح مسلم - ১/ ৮৭(

অর্থ: দাসী তার মালিককে জন্ম দিবে (মায়ের সাথে ছেলে মেয়েরা দাসীর মতো আচরণ করবে বা যুদ্ধ বিগ্রহ বেশী হওয়ার কারণে সন্তান ও পিতা-মাতার খোজ থাকবে না, ফলে সন্তানেরা মায়ের মালিক হবে), জুতা ও বস্ত্রহীন গরীব ছাগল চারণকারীরা বাড়ি বা বিল্ডিং নিয়ে একে অপরের উপর গর্ব করবে। (বুখারী ও মুসলিম)।

এক ব্যক্তি রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ক্বিয়ামত কখন সংঘটিত হবে? রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন:

﴿إِذَا ضُيِّعَتْ الْأَمَانَةُ فَانْتَظِرْ السَّاعَةَ قَالَ كَيْفَ إِضَاعَتُهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِذَا أُسْنِدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرْ السَّاعَةَ﴾ ( صحيح البخاري ২০/১৪৯)

অর্থ: যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন তুমি ক্বিয়ামতের অপেক্ষা করবে। সাহাবী বললেন: কিভাবে আমানত নষ্ট হবে?

তিনি (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: যখন অযোগ্য ব্যক্তিকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে তখন তুমি ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর। সহীহুল বুখারী ২০/১৪৯।

ক্বিয়ামতের বড় আলামত বা নিদর্শন:

ইহা ক্বিয়ামতের নিকটবর্তী সেই আলামতসমূহ যার পরেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। আর তা কর্তিত পুঁতির মালার (কাঠির) ন্যায় ধারাবাহিকভাবে আসতে থাকবে।

সহীহ্‌ হাদীসে এরূপ দশটি আলামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হুযাইফাহ্‌ বিন উসাইদ্‌ আল্‌ গিফারী  বর্ণিত হাদীসে এসেছে তিনি বলেন:

﴿اطَّلَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْنَا وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ فَقَالَ مَا تَذَاكَرُونَ قَالُوا نَذْكُرُ السَّاعَةَ قَالَ إِنَّهَا لَنْ تَقُومَ حَتَّى تَرَوْنَ قَبْلَهَا عَشْرَ آيَاتٍ فَذَكَرَ الدُّخَانَ وَالدَّجَّالَ وَالدَّابَّةَ وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَنُزُولَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَأَجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَثَلَاثَةَ خُسُوفٍ خَسْفٌ بِالْمَشْرِقِ وَخَسْفٌ بِالْمَغْرِبِ وَخَسْفٌ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنْ الْيَمَنِ تَطْرُدُ النَّاسَ إِلَى مَحْشَرِهِمْ﴾ ) صحيح مسلم - (১৪ / ৯৪)

অর্থ: রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন আমাদের উপর উঁকি মেরে দেখলেন আমরা পরস্পর কোন বিষয়ে আলোচনা করছি। তিনি বললেন: তোমরা কি আলোচনা করছো? তাঁরা বললেন: আমরা ক্বিয়ামতের আলোচনা করছি। রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: দশটি আলামত দেখার আগে ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না।

আর সেগুলো হল: ধোঁয়া, দাজ্জাল, দাব্বাহ্‌ (চতুষ্পদ জন্তুর বহির্গমন), পশ্চিম দিগন্ত হতে সূর্য উদিত হওয়া, ঈসা বিন মারইয়ামের অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজের বের হওয়া, তিনটি ভূমি ধস: প্রাচ্যে, পাশ্চাত্যে এবং আরব উপদ্বীপে।

আর সর্বশেষে ইয়ামান থেকে এক আগুন বের হবে যা মানুষদেরকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। সহীহ্‌ মুসলিম। উদাহরণসরূপ আমরা একটি বড় আলামত সম্পর্কে আলোচনা করবো, সেটি হল:

দাজ্জালের প্রকাশ:

দাজ্জাল হলো কুফরী, পথ ভ্রষ্টতা এবং ফিতনার মূল। সকল নাবী আলাইহিমুস্‌ সালাম নিজ নিজ উম্মতকে দাজ্জালের ব্যাপারে সতর্ক ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। নবীগণ তাঁদের উম্মতের নিকট দাজ্জালের সকল গুণাগুণ এবং আলামত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ব্যাপারে তাঁর উম্মতকে এমনভাবে সতর্ক ও তার আলামত বর্ণনা করেছেন যা চক্ষুস্মান ব্যক্তির নিকটে গোপন থাকতে পারে না।

আনাস  রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

﴿مَا مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا وَقَدْ أَنْذَرَ أُمَّتَهُ الْأَعْوَرَ الْكَذَّابَ أَلَا إِنَّهُ أَعْوَرُ وَإِنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ وَمَكْتُوبٌ بَيْنَ عَيْنَيْهِ ك ف ر﴾ ) صحيح مسلم -১৪/ ১৫৮)

অর্থ: প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতকে এক চোখ কানা দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন। জেনে রেখো দাজ্জালের এক চোখ কানা, কিন্তু তোমাদের রব (পালনকর্তা) কানা নয়। আর দাজ্জালের দুই চোখের মাঝে (কপালে) কাফ; ফা; র; তথা কাফের লেখা থাকবে। বুখারী ও মুসলিম। আবূ হুরাইরাহ্‌  থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

﴿أَلَا أُحَدِّثُكُمْ حَدِيثًا عَنْ الدَّجَّالِ مَا حَدَّثَ بِهِ نَبِيٌّ قَوْمَهُ إِنَّهُ أَعْوَرُ وَإِنَّهُ يَجِيءُ مَعَهُ بِمِثَالِ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ فَالَّتِي يَقُولُ إِنَّهَا الْجَنَّةُ هِيَ النَّارُ وَإِنِّي أُنْذِرُكُمْ كَمَا أَنْذَرَ بِهِ نُوحٌ قَوْمَهُ﴾ ( صحيح البخاري - (১১ / ১২১)

অর্থ: আমি কি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে সেই হাদীস বলব না যা প্রত্যেক নাবী তাঁর জাতিকে বলেছেন ? দাজ্জালের এক চোখ কানা হবে। তার সাথে জান্নাত ও জাহান্নাহামের অনুরুপ জান্নাত-জাহান্নাম থাকবে। দাজ্জাল যেটাকে জান্নাত বলবে সেটা মূলত জাহান্নাম। আমি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করছি যেমন নূহ্‌  তাঁর জাতিকে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। বুখারী ও মুসলিম। ইল্ম (জ্ঞান) ও আমল ব্যাতীত দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচা সম্ভব নয়।

ইল্‌ম হল: এ জ্ঞান থাকা যে দাজ্জাল শরীর বিশিষ্ট খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করে। তার অপূর্ণতা হলো এক চোখ কানা হবে। তার উভয় চোখের মাঝে (কপালে) কাফের লেখা থাকবে।

আমল হল: প্রত্যেক সালাতের শেষ তাশাহুদে আল্লাহর নিকটে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা, সূরা আল্‌ কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করা। কেননা রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

﴿مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْف عُصِمَ مِنْ الدَّجَّالِ﴾ ( صحيح مسلم - (৪ / ২৩৮)

অর্থ: যে ব্যক্তি সূরাহ্‌ আল্‌ কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করল সে দাজ্জাল থেকে মুক্তি পাবে। সহীহ্‌ মুসলিম।