hadith book logo

প্রাথমিক তাওহীদ শিক্ষা

লেখকঃ ডঃ আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মাদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

ঙ- পূনরুত্থান:

ক্বুরআন, সুন্নাহ্‌, মানুষের জ্ঞান ও অবিকৃত মন-মানসিকতা পূনরুত্থানে বিশ্বাসের প্রমাণ বহণ করে। তাই আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে কবরস্থিতদেরকে আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) ক্ববর হতে পূরুত্থান করবেন। প্রত্যেক শরীরে আত্মা ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং সকল মানুষ আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামীনের সামনে দন্ডায়মান হবে। আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:

﴿ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَمَيِّتُونَ (১৫) ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ﴾ [ المؤمنون [

অর্থ: এরপর তোমরা মৃত্যুবরণ করবে, অতঃপর ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পুনরুত্থিত হবে। সূরাহ্‌ আল্‌ মু'মিনূন আয়াত ১৫-১৬। নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

{ يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا }

অর্থ: ক্বিয়ামতের দিন মানুষদেরকে জুতা, বস্ত্র ও খাৎনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত করা হবে। বুখারী ও মুসলিম।

সকল মুসলিমগণ পুনরুত্থান সাব্যস্তে ঐক্যমত, বাস্তবতার চাহিদাও তাই। কেননা, হিক্‌মত তো এটাই চায় যে আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) সৃষ্টিজীবের জন্য একটা প্রত্যাবর্তনস্থল করবেন যাতে তিনি তাদেরকে রাসূলদের মাধ্যমে দেওয়া দায়িত্বের প্রতিদান দিবেন। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন:

﴿أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ ﴾ [ المؤمنون : ১১৫[

অর্থ: তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? সূরাহ্‌ আল মু'মিনূন আয়াত ১১৫।

অসম্ভব মনে করে কাফেররা মৃত্যু পরবর্তী পূনুরুত্থানকে অস্বীকার করে। এ ধারণা ভুল, শরীয়ত, অনুভূতি এবং জ্ঞান এ ধারণার বাতিল হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করে। শরীয়তের দলীল: আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:

﴿زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾ [ التغابن : ৭[

অর্থ: কাফেররা দাবী করে যে, তারা কখনও পুনরুত্থিত হবে না। বলুন, অবশ্যই হবে। আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমাদেরকে অবহিত করা হবে যা তোমরা করতে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। সূরাহ্‌ আত্‌ তাগাবুন আয়াত ৭।

অন্য স্থানে মহান রব্বুল আলামীন বলেন:

﴿وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَأْتِينَا السَّاعَةُ قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتَأْتِيَنَّكُمْ عَالِمِ الْغَيْبِ لَا يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَلَا أَصْغَرُ مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرُ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ﴾ [ سبأ : ৩[

অর্থ: কাফিররা বলে আমাদের উপর ক্বিয়ামত আসবে না। বলুন: কেন আসবে না? আমার পালনকর্তার শপথ-অবশ্যই আসবে। তিনি অদৃশ্য সমপর্কে জ্ঞাত। নভোমন্ডলে ও ভূ-মন্ডলে তাঁর আগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু, না তদপেক্ষা ক্ষুদ্র এবং না বৃহৎ-সব কিছু আছে সুসপষ্ট কিতাবে। সূরাহ্‌ সাবা আয়াত ৩। পুনরুত্থান সত্যের ব্যাপারে সকল আসমানী কিতাব একমত।

অনুভূতির দলীল: আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁর বান্দাদেরকে দুয়িাতেই মৃতকে জীবিত করে দেখিয়েছেন। সূরাতুল বাক্বারাতে এ ব্যাপারে পাঁচটি দৃষ্টান্ত রয়েছে, প্রথমটি আমরা উল্লেখ করছি: তা হলো যখন মূসা  এর জাতি তাঁকে বলেছিল: আল্লাহ্‌ তাআ'লাকে স্পষ্টভাবে না দেখা পর্যন্ত আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনব না, অতঃপর আল্লাহ্‌ তাদেরকে মৃত্যু দানকরতঃ পুণরায় জীবিত করেন। এ ক্ষেত্রেই আল্লাহ্‌ বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করে বলেন:

﴿وَإِذْ قُلْتُمْ يَا مُوسَى لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً فَأَخَذَتْكُمُ الصَّاعِقَةُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ (৫৫) ثُمَّ بَعَثْنَاكُمْ مِنْ بَعْدِ مَوْتِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴾ [ البقرة : ৫৫ ، ৫৬[

অর্থ: আর যখন তোমরা বললে, হে মূসা , কস্মিনকালেও আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখতে পাব। বস্তূতঃ তোমাদিগকে পাকড়াও করল বিদ্যুৎ। অথচ তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।

তারপর মরে যাবার পর তোমাদিগকে আমি তুলে দাঁড় করিয়েছি, যাতে করে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নাও। সূরাহ্‌ আল্‌ বাক্বারাহ্‌ আয়াত ৫৫-৫৬।

অন্যান্য দৃষ্টান্তের মধ্যে দ্বিতীয়টি হল: ঐ নিহিত ব্যক্তি যার ব্যাপারে বানী ইসরাঈলরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছিল। তখন আল্লাহ্‌ তায়ালা তাদেরকে একটা গাভী জবাই করে তার কিছু অংশ দিয়ে মৃত ব্যক্তিকে প্রহার করতে বললেন, যাতে মৃত ব্যক্তি (জীবিত হয়ে) তার হত্যাকারী সম্পর্কে তাদেরকে সংবাদ দেয়।

তৃতীয়টি হল: ঐ সমপ্রদায়ের ঘটনা যারা মৃত্যু ভয়ে তাদের ঘর থেকে পলায়ন করেছিল। ফলে আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) তাদেরকে মৃত্যু দিয়ে পূণরায় জীবিত করেন। চতুর্থ দৃষ্টান্ত হল: ঐ ব্যক্তির ঘটনা যে একটা মৃত গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন সে ঐ গ্রামের পূণরায় জীবিত হওয়াকে অসম্ভব মনে করল। তখন আল্লাহ্‌ তাকে একশত বৎসর মৃত রেখে আবার জীবিত করলেন। পঞ্চমটি হলো ইবরাহীম  এর পাখি জীবিত করার ঘটনা। বিস্তারিত দেখুন সূরাহ্‌ আল্‌ বাক্বারাহ্‌ আয়াত: ৭৩, ২৪৩, ২৫৯, ২৬০

পূনরুত্থান সম্ভবপর হওয়ার জ্ঞানগত দলীল দুইভাগে বিভক্ত:

প্রথমটি হল: আল্লাহ্‌ তায়ালা আসমান যমীন ও তার মধ্যবর্তী বস্তুসমূহের সৃষ্টিকর্তা। তিনিই (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) প্রথমবার এগুলো সৃষ্টি করেছেন। আর যিনি শুরুতেই এসব কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম তিনি পূনরায় তা সৃষ্টি করতে অক্ষম নন। বরং তার জন্য তখন এটা আরো সহজ হবে। আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:

﴿وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾ [ الروم : ২৭[

অর্থ: তিনিই প্রথমবার সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, অতঃপর তিনি পুণরায় সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্যে সহজ। আকাশ ও পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মর্যাদা তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরাহ্‌ আর্‌ রুম আয়াত ২৭।

হাড্ডি ক্ষয় প্রাপ্ত ও পচে যাওয়ার পর তা পূনরায় জীবিত করাকে যারা অস্বীকার করে তাদের প্রতিবাদ করতঃ আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) আদেশ দিয়ে বলেছেন:

﴿قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ﴾ [ يس : ৭৯[

অর্থ: বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত। সূরাহ্‌ ইয়াসীন আয়াত ৭৯।

দ্বিতীয়টি হল: যমীন মৃত ও শুষ্ক হয়ে তাতে কোন সবুজ ঘাস, গাছ-পালা থাকে না। এরপর আল্লাহ্‌ তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। ফলে তা জীবিত হয়ে সবুজ আকার ধারণ করতঃ আন্দোলিত হয়ে উঠে এবং তাতে সকল প্রকার সুন্দর উদ্ভিদ গজায়। যিনি যমীনকে মরে যাওয়ার পর জীবিত করতে সক্ষম তিনি অন্য সকল মৃতকেও জীবিত করতে সক্ষম। আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:

﴿وَنَزَّلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً مُبَارَكًا فَأَنْبَتْنَا بِهِ جَنَّاتٍ وَحَبَّ الْحَصِيدِ (৯) وَالنَّخْلَ بَاسِقَاتٍ لَهَا طَلْعٌ نَضِيدٌ (১০) رِزْقًا لِلْعِبَادِ وَأَحْيَيْنَا بِهِ بَلْدَةً مَيْتًا كَذَلِكَ الْخُرُوجُ﴾ [ق : ৯ ১১[

অর্থ: আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তদ্বারা বাগান ও শস্য উদগত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। এবং লম্বমান খর্জুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জুর, বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এমনিভাবে পুনরুত্থান ঘটবে। সূরাহ্‌ আল্‌ ক্বাফ আয়াত ৯-১১।

প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তিই জানে, যিনি বড় জিনিষ করতে সক্ষম তিনি তার চেয়ে ছোট জিনিষ করতে অধিক সক্ষম। আসমান-যমীন এত বড়, প্রশস্ত এবং তার সৃষ্টি বৈচিত্রময় হওয়া সত্বেও মহান আল্লাহই আসমান যমীনকে পূর্ব নমুনা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। ফলে এটা স্পষ্টভাবে প্রমান হয় যে হাড্ডি পচে যাওয়ার পরও তা থেকে পূণরায় মানুষ সৃষ্টি করা আল্লাহর জন্য অত্যন্ত সহজ। আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:

﴿أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ بَلَى وَهُوَ الْخَلَّاقُ الْعَلِيمُ﴾ [ يس : ৮১[

অর্থ: যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ, (সক্ষম) এবং তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। সূরাহ্‌ ইয়াসীন আয়াত ৮১।