hadith book logo

অধ্যয়ন ও জ্ঞানসাধনা

লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬০

তৃতীয় অন্তরায়: ইলম ও উস্তাদের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন করা

ইলম থেকে বঞ্চিত এবং তা থেকে উপকৃত হতে ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, ইলম ও উস্তাদের সঙ্গে যোগসূত্র ছিন্ন করা। অতীত ও বর্তমানে এধরনের বহু ঘটনার উদাহরণ পাওয়া যায়। ইলম ও উস্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু দরসের সময়ের সঙ্গে নয়; বরং আজীবন তা বজায় রাখতে হয়। আর শিক্ষা সমাপনের পর কিংবা পড়াশোনার সময়েও এক দরস থেকে আরেক দরসের মাঝখানে যে বিশাল সময় থাকে তা অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় কিংবা গালগল্পের মধ্যে কাটিয়ে দিলে আস্তে আস্তে ইলমের মহব্বত ও আকর্ষণ কমে যায়। এভাবে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে জাগতিক কাজে। এভাবে ইলমের প্রতি অমনোযোগীতা ও বিকর্ষণ সৃষ্টি হয়। যা তাকে শেষ পর্যন্ত পথহারা করে ছাড়ে। অনেক মেধাবী ছাত্রের শুধু একারণে ইলম থেকে বঞ্চিত হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে।

আজ আমাদের অবস্থা এতই শোচনীয় যে, রাস্তাঘাটে সাধারণ লোকদের সঙ্গে বসে গল্পগুজব করা, অপ্রয়োজনে রাস্তার পাশে বসে চা খাওয়ার নামে প্রচুর সময় ব্যয় করার মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আমাদের পূর্বসূরী পুণ্যবানদের অবস্থা কি তাই ছিল? ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা পাওয়া যায়, যাতে এ কথার উল্লেখ রয়েছে যে, তারা শুধু ইলমের জন্য দুনিয়ার হাজার রকমের স্বাদ-আহ্লাদ ও সুখকর বস্তু পরিহার করে চলেছেন। তারা ইলমের মধ্যে এত স্বাদ খুঁজে পেয়েছিলেন যে যাবতীয় পার্থিব সুখকে তারা দু’পায়ে মাড়াতেন আকুণ্ঠচিত্তে। জনৈক কবি এক আলেমের শানে এরূপ একটি ঘটনার কাব্যিক বিন্যাস করেছেন। একবার এক সুন্দরী ও চরিত্রবান দাসী আসল এক আলেমের কাছে। কিন্তু তিনি তার দিকে ভ্রূক্ষেপও করলেন না। বরং বললেন-

فقلت ذريني واتركيني ## ولي في طلاب العلم والفضل والتقى

فإنّني شغلت بتحصيل العلوم وكشفها ## غنى عن غناء الغانيات وعرفها

‘আমাকে ছাড়ো। আমার তো ইলম অন্বেষণ ও ইলমচর্চার কাজ রয়েছে। আমি ইলম অর্জন ও এর রহস্য উদঘাটনেই ব্যস্ত থাকতে বেশি পছন্দ করি। আর এটাই আমার জন্য গায়িকার গান এবং দাসীর সঙ্গস্বাদ পূর্ণ করে দেয়।’

মোটকথা, ইলমের স্বাদ ও পিপাসা স্বভাবজাত অভ্যাসে পরিণত না করা পর্যন্ত অন্যদিকে মনোনিবেশ করা যাবে না। এভাবে অভ্যাস গড়ে উঠলে একদিন এমন আসবে, যেদিন দুনিয়ার হাজারও পার্থিব উপকরণ সামনে আসা সত্ত্বেও সেদিকে মন যাবে না।

নিঃসন্দেহে এটি একটি কঠিন কাজ। কিন্তু রোগ তো সারাতে হবে! মানুষ রোগমুক্তির জন্য কত সুখ সম্ভারই না ত্যাগ করে! সুস্বাদু খাবার, প্রভাতের মৃদমন্দ স্নিগ্ধ ও কোমল হাওয়ায় সুখকর ঘুম ত্যাগ করে ব্যায়াম করে, আরো কত কি! তবে নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের মহা রোগ মূর্খতার জন্য কেন তুমি কিছু কষ্ট স্বীকার করতে পারবে না? আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘মূর্খতা এমন এক রোগ, যা রোগীকে কখন খুন করে ফেলে তা রোগী নিজেও টের পায় না।’ তিনি আরো বলেন,

والجهل داء قاتل وشفاؤه علم من القرآن أو من سنة

أمران في الترتيب متفقان وطبيب ذاك العــــالم الرباني

‘মূর্খতা হচ্ছে খুনী রোগ। আর এর শেফা হচ্ছে সর্বসম্মতভাবে দুটি বিষয়, কুরআন ও সুন্নাহর ইলম। আর ডাক্তার হচ্ছেন আলেমে রব্বানী।’