hadith book logo

ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

লেখকঃ ড. মোঃ আব্দুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

গ. সার্বভৌমত্ব আল্লাহর জন্য বিশেষিত :-

সার্বভৌমত্ব যে আল্লাহর জন্য বিশেষিত তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি, শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা বিশ্লেষনের মাধ্যমে। সাধারণভাবে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের জনগণ অথবা রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে মনে করা হয়। কোথাও কোথাও সার্বভৌম ক্ষমতা মনে করা হয় আইন পরিষদ বা সংসদকে। সার্বভৌম ক্ষমতা হলো সর্বময় ক্ষমতা। অথচ ইসলামে আইন প্রণয়ন, শাসন ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্ষমতার মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহ। এ ব্যাপারে অন্য কারো অংশীদারিত্ব কখনই স্বীকার করা হয় না।

আল্লাহ আল-কুরআনে বলেন:

﴿ قُلِ ٱللَّهُمَّ مَٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِي ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ ٞ ٢٦ ﴾ [ ال عمران : ٢٦ ]

‘‘বলে দাও (হে মুহাম্মদ)। আপনি রাজত্বের মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন, আর যার নিকট থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। আপনি যাকে খুশী সম্মানিত করেন, আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। সমুদয় কল্যাণ আপনারই হাতে।’’ [সূরা আলে ইমরান:২৬।]

কুরআনে আরো এসেছে,

﴿ وَقُلِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِي لَمۡ يَتَّخِذۡ وَلَدٗا وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ شَرِيكٞ فِي ٱلۡمُلۡكِ وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ وَلِيّٞ مِّنَ ٱلذُّلِّۖ وَكَبِّرۡهُ تَكۡبِيرَۢا ١١١ ﴾ [ الاسراء : ١١١ ]

‘‘বলুন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোনো সন্তান রাখেন না তাঁর সার্বভৌমত্ব কোনো শরীক আছে এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোনো সাহায্যকারী প্রয়োজন হতে পারে না। সুতরাং আপনি তাঁর মাহাত্ন বর্ণনা করতে থাকুন।” [সূরা ইসরা:১১১।]

আল্লাহর পরিচয় প্রসঙ্গে আরো বলা হয়েছে:

﴿ قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ ١ مَلِكِ ٱلنَّاسِ ٢ إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ ٣ ﴾ [ الناس : ١، ٤ ]

‘‘বলুন! (হে মাহাম্মদ): আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রভু মানুষের শাসক এবং মানুষের উপাস্যের নিকট। ’’ [সূরা নাস:১-৪।]

সার্বভৌমত্ব যে আল্লাহর জন্য বিশেষিত অন্য কোনো ক্ষমতাসীন শাসকের জন্য নয় তা আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারি। বিজ্ঞান এমন কতিপয় দৃষ্টান্ত মানব জাতির কাছে উপস্থাপন করেছেন, যা প্রমাণিত করেছে, ক্ষমতাসীন কোনো শাসকের পক্ষে এমনভাবে মানব জাতির জন্য কল্যাণকর কিছু করা সম্ভব নয়। এমনকি এসব করার কল্পনাও করতে পারে না।

তাই বলতে পারি, একত্ববাদের বিশ্বাস থেকে যে সত্যটি প্রকাশিত হয় তাহলো সমস্ত বস্তুর উপর সৃষ্টিকর্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। দুনিয়ার সাধারণ ক্ষমতা বলে আমরা যা বুঝে থাকি এর প্রতিটি তাঁরই ক্ষমতার পরিচায়ক এবং তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন। সুতরাং সার্বভৌমত্ব আল্লাহর জন্য বিশেষিত।

মহান আল্লাহ আরো বলেন,

﴿ أَلَمۡ تَرَوۡاْ أَنَّ ٱللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَأَسۡبَغَ عَلَيۡكُمۡ نِعَمَهُۥ ظَٰهِرَةٗ وَبَاطِنَةٗۗ وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يُجَٰدِلُ فِي ٱللَّهِ بِغَيۡرِ عِلۡمٖ وَلَا هُدٗى وَلَا كِتَٰبٖ مُّنِيرٖ ٢٠ ﴾ [ لقمان : ٢٠ ]

‘‘তোমরা কি দেখ না আল্লাহ, নভোমণ্ডল ও ভু-মণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছে? এমন লাকও আছে; যার জ্ঞান, পথ নির্দেশও উজ্জল কিতাব ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বাকবিতণ্ডা করে।’’ [সূরা লুকমান:২০।]

উপরোক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, মানবমন গভীর অনুভূতি ও আবেগ সহকারে যতবার প্রকৃতি জগতে আল্লাহর অসীম কুদরতসমূহ দর্শন করবে ও আল্লাহর অনুগ্রহসমূহের প্রতি চিন্তা ও গবেষণায় নিয়োজিত হবে ততবারই তা নতুন নতুন রূপ নিয়ে তার কাছে প্রকাশিত হবে। মানুষ যখন গভীর মনোনিবেশ সহকারে আকাশ ও যমীনের আল্লাহ তা‘আলার অন্তহীন সৃষ্টি এবং এর তাৎপর্য চিন্তা করে, তখন সে বুঝতে পারে যে, এর বিস্ময়কর অপরূপ কলাকৌশল সে তার সমগ্র জীবন গবেষণা করে শেষ করতে পারবে না। যতবার মানুষ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, ততবারই তা নতুনরূপে নতুন সাজে তার সামনে ভেসে উঠবে। মানুষ অবাক ও বিস্ময়ের সাথে এ প্রকৃতির রূপ সুধা পান করবে। তার অবস্থা ও অস্তিত্বকে হৃদয়ের সকল অনুভূতি, আবেগ. উচ্চাস ও মুগ্ধ দৃষ্টি দিয়ে উপভোগ করবে। বিশেষিত তা এগুলোই প্রমাণিত করে।