১
ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ
লেখকঃ ড. মোঃ আব্দুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৩
চ. আইনের দৃষ্টিতেও সার্বভৌমত্ব আল্লাহর :
আইনগত সার্বভৌমত্ব তাঁরই স্বীকার করতে হবে, যার বাস্তব সার্বভৌমত্বের ক্ষমতা ও অধিকার নিখিল বিশ্ব ও গোটা মানব জাতির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর আইনকে যদি সার্বভৌমত্বের মুখপাত্র বলে বিবেচনা করা হয় এবং আইন যদি সার্বভৌম শক্তির নির্দেশ হয়, তবে এরূপ আইনদাতা হবার অধিকার এবং শক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর-ই আছে। মোটকথা প্রভূত্ব-কর্তৃত্ব ও আধিপত্য ও মৌলিক আইন ও বিধান রচনা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ বুনিয়াদী কার্যাবলী সম্পাদনের নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহর তা‘আলার। এ ব্যাপারে কেউ তাঁর শরীক নেই। সে আল্লাহ সর্বদশী, সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ ١٦٣ ﴾ [ البقرة : ١٦٣ ]
‘‘আর তোমাদের ইলাহ তিনি একই সত্তা।’’ [সূরা আল বাকারাহ:৬৩।]
﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ ٥٤ ﴾ [ الاعراف : ٥٤ ]
‘‘জেনে রাখ তাঁর কাজ সৃষ্টি করা এবং বিধান দেওয়া।’’ [সূরা আল আরাফ:৫৪।]
﴿ ٓۚ إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِۖ يَقُصُّ ٱلۡحَقَّۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلۡفَٰصِلِينَ ٥٧ ﴾ [ الانعام : ٥٧ ]
‘‘আল্লাহ ব্যতীত আর কারও নির্দিশ চলে না। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনি শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী।’’ [সূরা আল আনআম:৫৭।]
﴿أَلَا لَهُ ٱلۡحُكۡمُ وَهُوَ أَسۡرَعُ ٱلۡحَٰسِبِينَ ٦٢ ﴾ [ الانعام : ٦٢ ]
‘‘তোমরা জেনে রাখো, সার্বভৌম কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনি হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসেব গ্রহনকারী।’’ [সূরা আল আনআম:৬২।]
﴿ ٓ أَنۡ أَنذِرُوٓاْ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱتَّقُونِ ٢ ﴾ [ النحل : ٢ ]
‘‘(এ হেদায়েত সহকারে) লোকদেরকে সাবধান ও সর্তক করে দাও যে, নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই তাকওয়া অবলম্বন করো।’’ [সূরা আন নাহল:২।]
﴿ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥ ﴾ [ الانبياء : ٢٥ ]
‘‘অবশ্য আমি ছাড়া আর কোনই ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই উপাসনা করো।’’ [সূরা আল আম্বিয়া:২৫।]
﴿ إِنَّمَآ إِلَٰهُكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ وَسِعَ كُلَّ شَيۡءٍ عِلۡمٗا ٩٨ ﴾ [ طه : ٩٨ ]
‘‘তোমাদের ইলাহ তো তিনিই যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি জ্ঞানে সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।’’ [সূরা ত্বা হা :৯৮।]
﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ لَهُ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ ٨ ﴾ [ طه : ٨ ]
‘‘তিনি আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আর সর্বোত্তম গুণবাচক নামগুলি তারই।’’ [সূরা ত্বা হা:৮।]
আল্লাহর এ-সুবিশাল প্রকৃতি রাজ্যে তাঁর প্রদত্ত আইন মেনে চলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের সবাই তাঁর ইচ্ছার অধীন এবং এটাই আইন। এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ স্বাধীন ও সার্বভৌম। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ মানুষের আইন দাতা হতে পারে না। এ কারণে নতুন কোনো আইনের প্রণেতা এবং অনুসারী উভয়েই মহান আল্লাহর অবাধ্য এবং অপরাধী বলে গণ্য।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [ المائدة : ٤٤ ]
‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফির।’’ [সূরা আল মায়িদা:৪৪।]
এই আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা আইনগত সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার নাম ঈমান ও ইসলাম এবং তা অস্বীকার করার নামই নিরেট কুফর।’’
ইসলাম পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার ভিত্তিক জীবন বিধান। কারণ প্রথমত: পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার কিসের দ্বারা ও কিভাবে হয়, সে কথা একমাত্র আল্লাহই নির্ভুলভাবে জানেন। দ্বিতীয়ত, তিনি যেহেতু সকল সৃষ্টির প্রতিপালক, মনিব ও প্রভু তাই সকলের সাথে ন্যায় বিচার করা কেবল তার পক্ষে সম্ভব। একমাত্র তার রচিত বিধানই প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী আবেগ ঝোঁক ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকতে সক্ষম। এ বিধান অজ্ঞতা, ভূল-ত্রুটি বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য থেকে মুক্ত। পক্ষান্তরে প্রবৃত্তি কামনা-বাসনা ঝোঁক ভাবাবেগ ও দুর্বলতায় জর্জরিত মানুষ যে আইন ও বিধান রচনা করে, তাতে অজ্ঞতা ও অক্ষমতা জনিত ত্রুটি তো থাকবেই, অধিকন্তু প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী, আবেগ, ঝোঁক ও দুর্বলতায় তা পরিপূর্ণ থাকবে, চাই আইন রচনাকারী কোনো ব্যক্তি শ্রেণি বা জাতি বা প্রজন্ম যেই হোক না কেন। তাই বিচার বিশ্লেষনে বুঝা যায় যাদের আইন ত্রুটি ও বিচ্যুতির উর্ধ্বে নয় তারা কখনো সার্বভৌমত্বের অধিকারী হতে পারে না, বরং আইনের দৃষ্টিকোণে আল্লাহ সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী। আল্লাহর শরীয়ত মানব জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এ বিধান মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে তার যাবতীয় আকৃতি ও অবস্থা সহকারে সংগঠিত করে, উন্নত করে ও দিক নির্দেশনা দেয়। মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন,
﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧ ﴾ [ المائدة : ٤٧ ]
‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই ফাসিক।’’ [সূরা আল মায়েদা:৪৫।]
﴿ ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [ المائدة : ٤٥ ]
‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালিম।’’৭৯
প্রভুত্ব-কর্তৃত্ব, আধিপত্য ও মৌলিক আইন ও বিধান রচনা রাষ্ট্র-ব্যবস্থার এ বুনিয়াদী-কার্যাবলী সম্পাদনের নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। এ ব্যাপারে কেউ তাঁর শরীক নেই। সেই আল্লাহ সর্বদশী সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান। তাঁর কাছে কোনো মানুষের মনের গোপন রহস্য অজ্ঞাত নয়। বিচার দিনে তিনি মানুষের সকল কার্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব গ্রহন করবেন; তাঁর হিসাব গ্রহন থেকে কেউই রেহাই পাবে না। তাঁর শাস্তি-বিধান থেকে কোনো উকিল, মুখতার, বিচারক, পীর-মাওলানা (নেতা ও রাষ্ট্রপতি)ও মুক্তি পেতে বা দিতে পারে না। বরং সকলেই ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ জীবনব্যাপী কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে আল্লাহই সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী।
কারণ কোনো আইন তখনই কল্যাণকর হয় যখন আইন প্রণেতার মধ্যে দুটি মৌলিক উপাদান পাওয়া যায়:
(ক) পরিব্যাপ্ত জ্ঞানঃ
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিব্যাপ্ত জ্ঞান। একই সাথে তাকে মানুষের সাধারণ স্বভাব ও প্রকৃতিগত বিশেষত্ব ও ভাবধারা সর্ম্পকে জানতে হবে। তাকে ওয়াকিফহাল হতে হবে মানব প্রকৃতি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব ও সূক্ষ্ম প্রবণতা সম্পর্কে, মানুষের মনস্তাত্তিক ও সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞান তথা ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয় সম্পর্কিত তত্ত্বজ্ঞান থাকতে হবে তার নখদর্পণে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কেউ এ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে না। কারণ আল্লাহই হচ্ছেন এ বিশ্বলোকের প্রতিটি অনু-পরমানুর সৃষ্টিকর্তা। এর অংশসমূহ তিনিই সংমিশ্রিত ও সংযুক্ত করে এক একটি বস্তুসত্ত্বার অস্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। ফলে তিনি তাঁর সৃষ্টি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে একমাত্র ওয়াকিফহাল সত্তা। মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ কিসে, আর কিসে রয়েছে অকল্যাণ ইহকাল-পরকালের দৃষ্টিতে, তা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারোরই জানা থাকতে পারে না। অতএব, মানুষের জন্য যথার্থ আইন-বিধান রচনা করাও কেবলমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই সার্বভৌমত্ব একমাত্র তারই মৌলিক আকিদার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ أَلَا يَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ ١٤ ﴾ [ الملك : ١٤ ]
‘‘যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি কি করে জানবেন না? তিনি তো সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যকজ্ঞাত।’’ [সূরা মুলক:১৪।]
(খ) আত্মস্বার্থ চেতনামুক্ত হওয়া:
তাকে হতে হবে প্রকৃতপক্ষেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সকল ব্যক্তিগত খাহেশ, ঝোঁক প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ স্বার্থ চেতনা নিরপেক্ষ আইন-বিধান রচনার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তার সুবিচার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু মানুয যতই ন্যায়বাদী ও সুবিচারক হোক না কেন, তার পক্ষে আত্মস্বার্থ চিন্তা ও নিজস্ব ঝোঁক-প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া কখনই সম্ভব নয়। তাই কোনো মানুষের পক্ষেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুবিচারবাদী আইন রচনা করাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। বরং এ শর্ত কেবলমাত্র আল্লাহর মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে। কেননা সর্ব প্রকার আত্মস্বার্থ চিন্তা ও নিজস্ব ঝোঁক প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র হচ্ছেন কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মানুষের মধ্যে তাঁর কোনো স্বার্থ চিন্তা থাকতে পারে। নির্বিশেষে সকল মানুষ একমাত্র তাঁরই সৃষ্টি। তিনি সকলেরই নির্বিশেষে একমাত্র স্রষ্টা ও মা‘বুদ। অতএ্রব এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, উপরোক্ত দুটি গুণের নিরংকুশ অধিকারী কোনো মানুষ এ দুনিয়ার পাওয়া যেতে পারে না। এ দুটি গুণের পূর্ণমাত্রার অধিকারী হতে পারেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি সর্ব প্রকার অধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত। তাঁর স্বাধীনতা অবাধ। তাঁর উপর নেই কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা কারো নিকট তিনি দায়ী নন। কারো নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য নন তিনি। তিনি চিরঞ্জীব,অক্ষয় ও শাশ্বত। কাজেই সার্বভৌমত্ব তাঁরই।
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ لَا يُسَۡٔلُ عَمَّا يَفۡعَلُ وَهُمۡ يُسَۡٔلُونَ ٢٣ ﴾ [ الانبياء : ٢٣ ]
‘‘তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।’’ [সূরা আল আম্বিয়া:২৩।]
এমনকি আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞান প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ীও সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী হতে পারেন আল্লাহ তা‘আলা। তার মধ্যে Bodin এর সংজ্ঞাটা স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেন, A perpetual, humanly unlimited and unconditional right to make, interpret and execut law অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব হচ্ছে, আইন প্রণয়ন, ব্যাখ্যাদান এবং কার্যকরণের চিরস্থায়ী মানবীয় অসীমাবদ্ধ এবং নিঃর্শত অধিকার।
তাঁর মতে প্রত্যেক সুসংবদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য এরূপ একটি শক্তির অস্তিত্ব একান্তভাবে প্রয়োজন। সার্বভৌমত্বের এসব শর্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো মধ্যে পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? তবে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ তা করতে পারে আল্লাহর আইনের পূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَإِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ ١٦٣ ﴾ [ البقرة : ١٦٣ ]
‘‘আর তোমাদের ইলাহ তিনি একই সত্তা।’’ [সূরা আল বাকারাহ:৬৩।]
﴿أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ ٥٤ ﴾ [ الاعراف : ٥٤ ]
‘‘জেনে রাখ তাঁর কাজ সৃষ্টি করা এবং বিধান দেওয়া।’’ [সূরা আল আরাফ:৫৪।]
﴿ ٓۚ إِنِ ٱلۡحُكۡمُ إِلَّا لِلَّهِۖ يَقُصُّ ٱلۡحَقَّۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلۡفَٰصِلِينَ ٥٧ ﴾ [ الانعام : ٥٧ ]
‘‘আল্লাহ ব্যতীত আর কারও নির্দিশ চলে না। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনি শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী।’’ [সূরা আল আনআম:৫৭।]
﴿أَلَا لَهُ ٱلۡحُكۡمُ وَهُوَ أَسۡرَعُ ٱلۡحَٰسِبِينَ ٦٢ ﴾ [ الانعام : ٦٢ ]
‘‘তোমরা জেনে রাখো, সার্বভৌম কেবলমাত্র (সেই) আল্লাহরই, আর তিনি হচ্ছেন সর্বাধিক দ্রুত হিসেব গ্রহনকারী।’’ [সূরা আল আনআম:৬২।]
﴿ ٓ أَنۡ أَنذِرُوٓاْ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱتَّقُونِ ٢ ﴾ [ النحل : ٢ ]
‘‘(এ হেদায়েত সহকারে) লোকদেরকে সাবধান ও সর্তক করে দাও যে, নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই তাকওয়া অবলম্বন করো।’’ [সূরা আন নাহল:২।]
﴿ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥ ﴾ [ الانبياء : ٢٥ ]
‘‘অবশ্য আমি ছাড়া আর কোনই ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই উপাসনা করো।’’ [সূরা আল আম্বিয়া:২৫।]
﴿ إِنَّمَآ إِلَٰهُكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ وَسِعَ كُلَّ شَيۡءٍ عِلۡمٗا ٩٨ ﴾ [ طه : ٩٨ ]
‘‘তোমাদের ইলাহ তো তিনিই যিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি জ্ঞানে সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।’’ [সূরা ত্বা হা :৯৮।]
﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ لَهُ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ ٨ ﴾ [ طه : ٨ ]
‘‘তিনি আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আর সর্বোত্তম গুণবাচক নামগুলি তারই।’’ [সূরা ত্বা হা:৮।]
আল্লাহর এ-সুবিশাল প্রকৃতি রাজ্যে তাঁর প্রদত্ত আইন মেনে চলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের সবাই তাঁর ইচ্ছার অধীন এবং এটাই আইন। এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ স্বাধীন ও সার্বভৌম। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ মানুষের আইন দাতা হতে পারে না। এ কারণে নতুন কোনো আইনের প্রণেতা এবং অনুসারী উভয়েই মহান আল্লাহর অবাধ্য এবং অপরাধী বলে গণ্য।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [ المائدة : ٤٤ ]
‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই কাফির।’’ [সূরা আল মায়িদা:৪৪।]
এই আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা আইনগত সার্বভৌমত্ব স্বীকার করার নাম ঈমান ও ইসলাম এবং তা অস্বীকার করার নামই নিরেট কুফর।’’
ইসলাম পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার ভিত্তিক জীবন বিধান। কারণ প্রথমত: পরিপূর্ণ ন্যায় বিচার কিসের দ্বারা ও কিভাবে হয়, সে কথা একমাত্র আল্লাহই নির্ভুলভাবে জানেন। দ্বিতীয়ত, তিনি যেহেতু সকল সৃষ্টির প্রতিপালক, মনিব ও প্রভু তাই সকলের সাথে ন্যায় বিচার করা কেবল তার পক্ষে সম্ভব। একমাত্র তার রচিত বিধানই প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী আবেগ ঝোঁক ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকতে সক্ষম। এ বিধান অজ্ঞতা, ভূল-ত্রুটি বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য থেকে মুক্ত। পক্ষান্তরে প্রবৃত্তি কামনা-বাসনা ঝোঁক ভাবাবেগ ও দুর্বলতায় জর্জরিত মানুষ যে আইন ও বিধান রচনা করে, তাতে অজ্ঞতা ও অক্ষমতা জনিত ত্রুটি তো থাকবেই, অধিকন্তু প্রবৃত্তির খেয়ালখুশী, আবেগ, ঝোঁক ও দুর্বলতায় তা পরিপূর্ণ থাকবে, চাই আইন রচনাকারী কোনো ব্যক্তি শ্রেণি বা জাতি বা প্রজন্ম যেই হোক না কেন। তাই বিচার বিশ্লেষনে বুঝা যায় যাদের আইন ত্রুটি ও বিচ্যুতির উর্ধ্বে নয় তারা কখনো সার্বভৌমত্বের অধিকারী হতে পারে না, বরং আইনের দৃষ্টিকোণে আল্লাহ সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী। আল্লাহর শরীয়ত মানব জীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এ বিধান মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগকে তার যাবতীয় আকৃতি ও অবস্থা সহকারে সংগঠিত করে, উন্নত করে ও দিক নির্দেশনা দেয়। মহান আল্লাহ অন্য আয়াতে বলেন,
﴿ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧ ﴾ [ المائدة : ٤٧ ]
‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই ফাসিক।’’ [সূরা আল মায়েদা:৪৫।]
﴿ ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥ ﴾ [ المائدة : ٤٥ ]
‘‘যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদানুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালিম।’’৭৯
প্রভুত্ব-কর্তৃত্ব, আধিপত্য ও মৌলিক আইন ও বিধান রচনা রাষ্ট্র-ব্যবস্থার এ বুনিয়াদী-কার্যাবলী সম্পাদনের নিরংকুশ অধিকার একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। এ ব্যাপারে কেউ তাঁর শরীক নেই। সেই আল্লাহ সর্বদশী সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান। তাঁর কাছে কোনো মানুষের মনের গোপন রহস্য অজ্ঞাত নয়। বিচার দিনে তিনি মানুষের সকল কার্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব গ্রহন করবেন; তাঁর হিসাব গ্রহন থেকে কেউই রেহাই পাবে না। তাঁর শাস্তি-বিধান থেকে কোনো উকিল, মুখতার, বিচারক, পীর-মাওলানা (নেতা ও রাষ্ট্রপতি)ও মুক্তি পেতে বা দিতে পারে না। বরং সকলেই ব্যক্তিগতভাবে নিজ নিজ জীবনব্যাপী কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে আল্লাহই সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী।
কারণ কোনো আইন তখনই কল্যাণকর হয় যখন আইন প্রণেতার মধ্যে দুটি মৌলিক উপাদান পাওয়া যায়:
(ক) পরিব্যাপ্ত জ্ঞানঃ
অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিব্যাপ্ত জ্ঞান। একই সাথে তাকে মানুষের সাধারণ স্বভাব ও প্রকৃতিগত বিশেষত্ব ও ভাবধারা সর্ম্পকে জানতে হবে। তাকে ওয়াকিফহাল হতে হবে মানব প্রকৃতি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব ও সূক্ষ্ম প্রবণতা সম্পর্কে, মানুষের মনস্তাত্তিক ও সমাজতাত্ত্বিক জ্ঞান তথা ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয় সম্পর্কিত তত্ত্বজ্ঞান থাকতে হবে তার নখদর্পণে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কেউ এ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে না। কারণ আল্লাহই হচ্ছেন এ বিশ্বলোকের প্রতিটি অনু-পরমানুর সৃষ্টিকর্তা। এর অংশসমূহ তিনিই সংমিশ্রিত ও সংযুক্ত করে এক একটি বস্তুসত্ত্বার অস্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। ফলে তিনি তাঁর সৃষ্টি নিহিত নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে একমাত্র ওয়াকিফহাল সত্তা। মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ কিসে, আর কিসে রয়েছে অকল্যাণ ইহকাল-পরকালের দৃষ্টিতে, তা একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারোরই জানা থাকতে পারে না। অতএব, মানুষের জন্য যথার্থ আইন-বিধান রচনা করাও কেবলমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই সার্বভৌমত্ব একমাত্র তারই মৌলিক আকিদার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ أَلَا يَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ ١٤ ﴾ [ الملك : ١٤ ]
‘‘যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি কি করে জানবেন না? তিনি তো সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যকজ্ঞাত।’’ [সূরা মুলক:১৪।]
(খ) আত্মস্বার্থ চেতনামুক্ত হওয়া:
তাকে হতে হবে প্রকৃতপক্ষেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সকল ব্যক্তিগত খাহেশ, ঝোঁক প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ স্বার্থ চেতনা নিরপেক্ষ আইন-বিধান রচনার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তার সুবিচার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু মানুয যতই ন্যায়বাদী ও সুবিচারক হোক না কেন, তার পক্ষে আত্মস্বার্থ চিন্তা ও নিজস্ব ঝোঁক-প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া কখনই সম্ভব নয়। তাই কোনো মানুষের পক্ষেই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও সুবিচারবাদী আইন রচনা করাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। বরং এ শর্ত কেবলমাত্র আল্লাহর মধ্যেই পাওয়া যেতে পারে। কেননা সর্ব প্রকার আত্মস্বার্থ চিন্তা ও নিজস্ব ঝোঁক প্রবণতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও পবিত্র হচ্ছেন কেবলমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মানুষের মধ্যে তাঁর কোনো স্বার্থ চিন্তা থাকতে পারে। নির্বিশেষে সকল মানুষ একমাত্র তাঁরই সৃষ্টি। তিনি সকলেরই নির্বিশেষে একমাত্র স্রষ্টা ও মা‘বুদ। অতএ্রব এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, উপরোক্ত দুটি গুণের নিরংকুশ অধিকারী কোনো মানুষ এ দুনিয়ার পাওয়া যেতে পারে না। এ দুটি গুণের পূর্ণমাত্রার অধিকারী হতে পারেন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি সর্ব প্রকার অধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত। তাঁর স্বাধীনতা অবাধ। তাঁর উপর নেই কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা কারো নিকট তিনি দায়ী নন। কারো নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য নন তিনি। তিনি চিরঞ্জীব,অক্ষয় ও শাশ্বত। কাজেই সার্বভৌমত্ব তাঁরই।
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ لَا يُسَۡٔلُ عَمَّا يَفۡعَلُ وَهُمۡ يُسَۡٔلُونَ ٢٣ ﴾ [ الانبياء : ٢٣ ]
‘‘তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে।’’ [সূরা আল আম্বিয়া:২৩।]
এমনকি আধুনিক রাষ্ট্র বিজ্ঞান প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ীও সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী হতে পারেন আল্লাহ তা‘আলা। তার মধ্যে Bodin এর সংজ্ঞাটা স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেন, A perpetual, humanly unlimited and unconditional right to make, interpret and execut law অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব হচ্ছে, আইন প্রণয়ন, ব্যাখ্যাদান এবং কার্যকরণের চিরস্থায়ী মানবীয় অসীমাবদ্ধ এবং নিঃর্শত অধিকার।
তাঁর মতে প্রত্যেক সুসংবদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য এরূপ একটি শক্তির অস্তিত্ব একান্তভাবে প্রয়োজন। সার্বভৌমত্বের এসব শর্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো মধ্যে পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? তবে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ তা করতে পারে আল্লাহর আইনের পূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে।