hadith book logo

ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

লেখকঃ ড. মোঃ আব্দুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৬

ঝ. একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব আল্লাহর

সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার। তাঁর উচ্চতর প্রভুত্ব একচ্ছত্র মালিকানা এবং নিরংকুশ শাসন-ক্ষমতা এ উভয় দিক দিয়েই অখণ্ড, অবিভাজ্য। কোনো ব্যক্তি মানুষ, পার্লামেন্ট বা কোনো রাজশক্তি এ দিক দিয়ে তার অংশীদার হতে পারে না। সুতরাং তিনি গোটা বিশ্ব সাম্রাজ্যের অধিপতি, তার ওপর পরাক্রান্ত, তার উপর সঠিক ক্ষমতার অধিকারী। তাঁকে কোনো কিছুই অক্ষম ও উপায়হীন করে দেয় না। তাঁর উর্ধ্বে কেউ উঠতে পারে না, তাঁর ইচ্ছাকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না বা সীমাবদ্ধও করতে পারে না। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যা চান তাই করেন। তিনি যা চান তা করতে সক্ষম, নিজের উপর তাঁর কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ ও সর্বজয়ী, বিস্ময়কর এ সাত আসমান তাঁর সার্বভৌমত্বের স্বরূপ, তিনি সাত আসমানকে স্তরে স্তরে সুসজ্জিত করেছেন। তাছাড়া সৃষ্টি দেখে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব উপলব্ধি করা যায়, বিশ্বজগতের সৃষ্টিতে পূর্ণতা যেমন কাম্য, তেমনি কাম্য সৌন্দর্যও। বরং এ দুটো আসলে একই জিনিসের এপিঠ ও ওপিঠ মাত্র। কেননা পূর্ণতা যখন শেষ সীমায় উপনীত হয়, তখন তা সৌন্দর্যে পরিণত হয়। বিশ্ব সাম্রাজের ওপর তার যে সর্বময় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিরাজমান, সব কিছুর ওপর যে তার সীমাহীন অধিকার ও ক্ষমতা এবং তার ইচ্ছা যে বাধা-বন্ধনহীন এগুলো তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রমাণ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ تَبَٰرَكَ ٱلَّذِي بِيَدِهِ ٱلۡمُلۡكُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٌ ١ ﴾ [ الملك : ١ ]

‘‘(কতো) মহীয়ান সে পূণ্যময় সত্তা! যার হাতে (রয়েছে) আসমান যমীনের যাবতীয় সার্বভৌমত্ব (এ সৃষ্টি জগতের) সব কিছুর ওপর তিনি একক ক্ষমতাবান।’’ [সূরা মুলক:১।]

এই আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীরবিদগণ বলেন,

‘‘সমস্ত মাখলুকের উপর তাঁরই আধিপত্য রয়েছে, তিনি যা চান তাই করেন। তাঁর হুকুমকে কেউ টলাতে পারে না। তাঁর শক্তি হিকমত এবং ন্যায়পরায়ণতার কারণে কেউ তাঁর কাছে কোনো কৈফিয়ত তলব করতে পারে না। তিনি সবকিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। সুতরাং সার্বভৌমত্বের অধিকারী একমাত্র তিনিই।’’

এ আয়াতের ‘তাবারাক’ শব্দটি ‘বরকত’ শব্দ হতে গৃহীত। শব্দ গঠনের বিশেষ ভঙ্গির দরুন তাতে বিপুলতার অর্থ শামিল রয়েছে। উচ্চতা, বিরাটত্ব, বিপুলতা, প্রাচুর্য, স্থিতিশীলতা, শব্দ গঠনের ফলে অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহ তা‘আলা আসাধারণ মহান ও বিরাট।

‘‘আর ‘আল-মুলকু’ শব্দটি সীমাবদ্ধ অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয় নি। তার প্রকৃত অর্থ সমগ্র সৃষ্টিলোকের ও বিশ্বনিখিলের উপর রাজকীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব। তা ছাড়া এখানে এর অন্য কোনো অর্থ উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহর হস্ত তাঁর একটি বিশেষ গুণ। এর দ্বারা তার হাত সাব্যস্ত হচ্ছে, সাথে সাথে এটা রাজকীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরংকুশ কর্তৃত্বও বুঝাচ্ছে। এ শব্দটির দ্বারা সবকিছু আল্লাহর হাতের অধীন, তার কর্তৃত্ব ও আয়ত্তাধীন হওয়া বুঝাতে পারে।’’৮৮

‘আল-মুলকু’ আক্ষরিক অর্থে এর অর্থ দাঁড়ায়, রাজার শাসন (Kingship) সার্বভৌমত্ব, মালিকানা কিংবা কর্তৃত্ব।

ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো রাজা কিংবা শ্রেণী অথবা সাধারণভাবে জনগনের উপর ন্যস্ত নয়। ‘আল্লাহই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। এ কথা এখানে মুলুক দ্বারা উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ فَسُبۡحَٰنَ ٱلَّذِي بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيۡءٖ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ ٨٣ ﴾ [ يس : ٨٣ ]

‘‘মহান পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর হাতে সবকিছুরই সার্বভৌমত্ব নিহিত।’’ [সূরা ইয়াসিন:৮৩।]

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَكَذَٰلِكَ نُرِيٓ إِبۡرَٰهِيمَ مَلَكُوتَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ ٧٥ ﴾ [ الانعام : ٧٥

‘‘এভাবেই আমরা ইবরাহীমকে আকাশ রাজ্য ও ভূ-মণ্ডলের ওপর প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌমত্বের বিষ্ময়কর দৃশ্যসমূহ দেখিয়েছি।’’৯১