hadith book logo

ইসলামে সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

লেখকঃ ড. মোঃ আব্দুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩২

সার্বভৌমত্ব প্রয়োগে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি

সার্বভৌমত্ব মূলত একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। কিন্তু মানব সমাজে এ সার্বভৌমত্বের প্রয়োগ হতে পারে মানুষের দ্বারা। মানুষকে পৃথিবীতে ‘প্রতিনিধি’ হিসাবে প্রেরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ এ কাজ করার পন্থা নিরূপণ করে দিয়েছেন। সকল মানুষ একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ এ খিলাফতের দায়িত্ব পালনে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে। এ প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব মানুষের নিকট আমানত। কিন্তু কার্যত সকল মানুষ একত্রিত হয়ে একসাথে এ প্রয়োগীয় সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করতে পারে না বলেই সকলের পক্ষ থেকে এক বা একাধিক ব্যক্তি তা প্রয়োগ করবে।’’১১৪

এ কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন:

প্রথমত: গোটা মানব সমাজকে এক ও অভিন্ন কেন্দ্রবিন্দুতে একত্রিত হতে হবে, তারা অন্যান্য সকল প্রকারের সর্ম্পক ছিন্ন করে নেবে এবং সমগ্র বিশ্বলোক ও তার মধ্যকার সব কিছুর একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রকরূপে সেই এককেই স্বীকার করবে। এই ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি হলো,

﴿ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلٗا رَّجُلٗا فِيهِ شُرَكَآءُ مُتَشَٰكِسُونَ وَرَجُلٗا سَلَمٗا لِّرَجُلٍ هَلۡ يَسۡتَوِيَانِ مَثَلًاۚ ٢٩ ﴾ [ الزمر : ٢٩ ]

‘‘আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। এক ব্যক্তি তো সে, যার মালিকানায় বহু সংখ্যক বাঁকা স্বভাবের মনিব শরীক হয়ে আছে, যারা প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে টানে। আর অপর এক ব্যক্তি পুরাপুরিভাবে একই মনিবের জন্য নিদিষ্ট... এই দুজনের অবস্থা কি একই রকমের হতে পারে?” [সূরা আয যুমার:২৯।]

এ দৃষ্টান্ত থেকে মুমিন ও কাফির এক আল্লাহ অনুগত ও বহু আল্লাহতে বিশ্বাসী মুশরিকের অবস্থা এবং এ দু’য়ের মধ্যকার আসমান-যমীনের পার্থক্য স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে গেছে।

ইউসূফ আলাইহিস সালাম এ একক সার্বভৌমত্বের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন :

﴿ ءَأَرۡبَابٞ مُّتَفَرِّقُونَ خَيۡرٌ أَمِ ٱللَّهُ ٱلۡوَٰحِدُ ٱلۡقَهَّارُ ٣٩ ﴾ [ يوسف : ٣٩ ]

‘‘বিভিন্ন-বিচ্ছিন্ন বহু সংখ্যক রব (সার্বভৌমত্ব) উত্তম নাকি মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহ উত্তম?” [সূরা ইউসূফ:৩৯।]

দ্বিতীয়ত: পুরো সমাজকে আল্লাহর দাসত্বের শৃঙ্খলে গড়ে তুলতে হবে এবং অন্যান্য অসংখ্য তাগুতী শক্তির সার্বভৌমত্বের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত ও স্বাধীন হতে হবে। কেননা আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের নাম করা হয় সার্বভৌম হিসেবে সেগুলি তো নিছক নামমাত্র। এ নামগুলো হয়তো তোমরা তোমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী রেখেছ অথবা তোমাদের পূর্ব পুরুষেরা এ নামগুলো রেখে গেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿ مَا تَعۡبُدُونَ مِن دُونِهِۦٓ إِلَّآ أَسۡمَآءٗ سَمَّيۡتُمُوهَآ أَنتُمۡ وَءَابَآؤُكُم ٤٠ ﴾ [ يوسف : ٤٠ ]

‘‘এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে আর যার যার দাসত্ব তোমরা কর সেগুলি নিছক কতকগুলি নাম মাত্র (সে নামগুলির অন্তরালে ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছুর অস্তিত্ব নেই) এ নাম তোমরা আর তোমাদের বাপ দাদারা রেখে নিয়েছে।’’১১৭

মানব কূলকে বহু সংখ্যক দাসত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সকল নবীসহ সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবীরূপে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাই মানুষকে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং অন্য কারও ইবাদতকে অস্বীকার করতে হবে। আর একমাত্র মহান আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

খলিফা একমাত্র আল্লাহর বিধান অনুসারে শাসন পরিচালনা করবে। এ দিক দিয়ে ইসলাম পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজ-সংস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতির অনুসারী সমাজ নিজেই নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তাঁরা আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে না এবং আল্লাহর বিধান থেকে শাসনকার্য চালায় না। আল্লাহর খলীফাদের চিন্তা-চেতনা তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, তারা সবক্ষেত্রে আল্লাহর প্রতিনিধিরূপে কাজ করে এবং জবাবদিহিতার মনোভাব অন্তরে পোষণ করে। তাই বলা যায় তাঁরা তাদের নিজ ইচ্ছা কামনা-বাসনাকে বাস্তবায়িত করে না, বরং আল্লাহর ইচ্ছা-কামনা-বাসনাকে বাস্তবায়িত করে, আর আল্লাহর ঘোষিত সীমাসমূহের মধ্যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহর যমীনের একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করাই তাদের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে।