hadith book logo

যেসব কারণে ইবাদাত বরবাদ হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

ইসলামে বিদআতের সুযোগ নেই

দ্বীনে কোন নতুন জিনিস উদ্ভাবন করার কোন অধিকারই কারো থাকতে পারে না। বস্তুত দ্বীন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তাতে কোন জিনিসের বৃদ্ধি করা বা কোন নতুন জিনিসকে দ্বীন মনে করে তদানুযায়ী আমল করা- আমল করলে সওয়াব হবে বলে মনে করাই হচ্ছে বিদআতের মূল কথা। যে বিষয়েই এরূপ অবস্থা হবে, তা-ই হচ্ছে বিদআত। কেননা এরূপ করা হলে আল্লাহ দ্বীনকে পূর্ণ করে দেয়ার পরও মনে করা হচেছ যে, তা পূর্ণ নয়। এ ভাবধারা কুরআনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন,

﴿اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا﴾

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। (সূরা মায়েদা- ৩)

এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন হিসেবে ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। তাতে বিন্দুমাত্র অসম্পূর্ণতা নেই। অতএব তা মানবজাতির জন্য চিরকালের যাবতীয় দ্বীনি প্রয়োজন পূরণে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম। সুতরাং এ দ্বীনের অনুসরণকারীদের এমন কোন প্রয়োজন হবে না যে, তাদেরকে এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোন দ্বীন বা বিধিবিধানের দিকে তাকাতে হবে অথবা এতে অতিরিক্ত কোনকিছু সংযুক্ত করতে হবে। কেননা এতে মানুষের সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, এতে কোন অপ্রয়োজনীয় বিধান নেই। অতএব এতে কোন কিছু বৃদ্ধি করা যেতে পারে না, আবার তা থেকে কোন কিছু বাদও দেয়া যাবে না। আর ইবাদাতের ক্ষেত্রে সওয়াবের কাজ বলে এমন সব অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করা, যা নবী ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে চালু হয়নি, তা দেখতে যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন তা স্পষ্ট বিদআত এবং উপরোক্ত আয়াতের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইবাদাতের কাজকর্মে যদি মনগড়া নিয়ম, শর্ত ও অনুষ্ঠানাদিকে বরদাশত করে নেয়া হয়, তাহলে তাতে নতুন নতুন জিনিস এত বেশি শামিল হয়ে যাবে যে, পরে কোন্টি আসল আর কোন্টি নকল- তা নির্দিষ্ট করাই সম্ভব হবে না। অতীত কালের নবীদের উম্মতদের দ্বারা নবীর উপস্থাপিত দ্বীন বিকৃত হয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ এটাই। তারা নবীর প্রবর্তিত ইবাদাতে মনগড়াভাবে নতুন জিনিস শামিল করে নিয়েছিল। ফলে কিছুকাল পর আসল দ্বীনকেই হারিয়ে ফেলেছিল। হাদীসে এসেছে,

عَنْ الْعِرْبَاضِ بْنَ سَارِيَةَ يَقُوْلُ : وَعَظَنَا رَسُوْلُ اللهِ مَوْعِظَةً , ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُوْنُ ، وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوْبُ ، فَقُلْنَا : يَا رَسُوْلَ اللهِ ، اِنَّ هٰذِهٖ لَمَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ ، فَمَا تَعْهَدُ اِلَيْنَا ؟ قَالَ : قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا ، لَا يَزِيْغُ عَنْهَا بَعْدِيْ اِلَّا هَالِكٌ ، فَمَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيْرًا ، فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِيْ ، وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّيْنَ ، عَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ ، وَعَلَيْكُمْ بِالطَّاعَةِ ، وَاِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا ، فَاِنَّمَا الْمُؤْمِنُ كَالْجَمَلِ الْاَنِفِ ، حَيْثُمَا قِيْدَ انْقَادَ

ইরবায ইবনে সারিয়া (রাঃ) বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের নিকট গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজ করলেন এবং উপদেশ দিলেন। তার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবে উপস্থিত লোকদের চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। তাদের অন্তর নরম হয়ে গেল এবং কেঁপে উঠল। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর মতো বক্তব্য দিলেন। তাহলে আমাদের প্রতি আপনি কী নির্দেশ দিচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমি তোমাদেরকে এমন এক উজ্জ্বল আদর্শের উপর রেখে যাচ্ছি, যার দৃষ্টিতে সত্য রাত ও দিনের মতোই উদ্ভাসিত। আমার চলে যাওয়ার পর যে-ই এর বিরোধিতা করবে সে-ই ধ্বংস হবে। আর আমার পর যে জীবিত থাকবে সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমাদের উচিত হবে আমার এবং আমার খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতকে অাঁকড়ে ধরা। তোমরা দাঁত দ্বারা কামড় দিয়ে এই সুন্নাতকে অাঁকড়ে ধরবে। আর তোমরা আনুগত্য করবে যদিও কোন হাবশী গোলামকে তোমাদের নেতা বানানো হয়। কেননা মুমিন হচ্ছে বাধা উটের মতো, সে যেখানেই যায় আনুগত্যশীল হয়। [ইবনে মাজাহ, হা/৪৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৮২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৩৩; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/১৫০২৩।]

নবী করীম ﷺ বিশ্ব-মানবতাকে এক উজ্জ্বল পথের দিশা দিয়ে যাওয়ার জন্যই এসেছিলেন। তিনি পূর্ণ মাত্রায় তাঁর এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আর তাতে তিনি কোনরূপ অপূর্ণতা রেখে যাননি। এ কারণে ইমাম মালেক (রহ.) বলেন,

مَنْ قَالَ : اِنَّ فِيْ الْاِسْلَامِ بِدْعَةٌ حَسَنَةٌ فَقَدْ زَعَمَ اَنَّ مُحَمَّدًا خَانَ الرِّسَالَةِ؛ لِاَنَّ اللهَ تَعَالٰى يَقُوْلُ : ﴿ اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا﴾ ثُمَّ قَالَ : مَا لَمْ َيُكُنْ دِيْنًا يَوْمَئِذٍ فَاِنَّهٗ لَا يَكُوْنُ الْيَوْمُ دِيْنًا

যে ব্যক্তি বলবে যে, ইসলামে বিদআতে হাসানাহ-র অস্তিত্ব রয়েছে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে, নবী ﷺ রিসালাতের দায়িত্ব পালনে খিয়ানত করেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘‘আজ আমি দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিয়েছি এবং আমার নিয়ামতকে তোমাদের উপর পূর্ণ করেছি। আর আমি ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে দিয়ে সন্তুষ্টি রয়েছি।’’ [সূরা মায়েদা- ৩।] এরপর তিনি বলেন, যেসব কাজ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে দ্বীন হিসেবে স্বীকৃত ছিল না সেসব কাজ আজও দ্বীন হিসেবে স্বীকৃত হবে না। [শারহুস সুনানে আবু দাউদ লি আবদুল মুহসিন আল আববাদ, ২৬/২৯২।] অর্থাৎ যে ইবাদাত নবী ও সাহাবায়ে কেরাম করেননি সেই ইবাদাত আর কেউ আবিষ্কার করতে পারে না।

কুরআনে এ কথাই বলা হয়েছে,

﴿يَاۤ اَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوْا فِيْ دِيْنِكُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَى اللهِ اِلَّا الْحَقَّ﴾

হে আহলে কিতাব, তোমরা নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং ঈসার ঘটনা নিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া কোনকিছুই (মিথ্যা) বলো না। (সূরা নিসা- ১৭১)

অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে সম্বোধন করে দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে ও ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। কেননা ইয়াহুদিরা তাদের নবীর মৃত্যুর পরপরই দ্বীনের ব্যাপারে বাড়বাড়ি শুরু করে দিয়েছিল। এমনকি শেষ পর্যন্ত তারা তাদের আসল দ্বীন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর খ্রিস্টানরা ঈসা (আঃ) কে তাদের প্রভুর আসনে বসিয়ে দিয়েছিল। আর এসবই ছিল তাদের আলেমদের উদভাবিত বিদআতের ফল। তাদের নানা ধরণের উদ্ভাবিত বিদআতের মধ্যে সন্ন্যাসবাদও ছিল এক ধরনের বিদআত। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন,

﴿وَرَهْبَانِيَّةَنِ ابْتَدَعُوْهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ اِلَّا ابْتِغَآءَ رِضْوَانِ اللهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا﴾

সন্ন্যাসবাদ (সংসারত্যাগী) তো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রবর্তন করে নিয়েছিল। অথচ আমি তাদেরকে এর বিধান দেইনি, কিন্তু এটাও তারা যথাযথভাবে পালন করেনি। (সূরা হাদীদ- ২৭)

অতএব দ্বীনকে যথাযথভাবে গ্রহণ করাই মুমিনের অবশ্য কর্তব্য। তাতে নিজ থেকে কিছু বাড়িয়ে দেয়া বা কোন কিছু বাদ দিয়ে কমানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কাজ। এমনকি আল্লাহর দ্বীনে যে কাজের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সে কাজকে ঠিক ততটুকু গুরুত্ব না দিয়ে কম-বেশি করা নিতান্ত বাড়াবাড়ি। এমন কোন কাজকে দ্বীনের কাজ হিসেবে চালিয়ে দেয়া, যা আদৌ দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়- তা সুস্পষ্টভাবে দুষণীয় ও মারাত্মক অপরাধ।