১
যেসব কারণে ইবাদাত বরবাদ হয়
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৭
মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে জীবিতদের করণীয়
কোন মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে জীবিতদের উপর যেসব কাজ করণীয় হয়ে দাঁড়ায় তা নবী ﷺ এর সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত আছে, যা নিচে উল্লেখ করা হলো,
১. কারো মৃত্যুর সংবাদ শোনার সাথে সাথে নিচের দু‘আ পাঠ করা :
اِنَّا لِلّٰهِ وَاِنَّا اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি ওয়াইন্না ইলাইহি রা-জি‘উন।
অর্থ : আমরা আল্লাহর জন্যই আর আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।
(সূরা বাকারা- ১৫৬)
কোন মুসলিমের মৃত্যুর সংবাদে হাদীসে নিচের দু‘আটিও পাঠ করার কথা বলা হয়েছে,
اِنَّا لِلّٰهِ وَاِنَّا اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ ‐ اَللّٰهُمَّ أْجُرْنِىْ فِىْ مُصِيْبَتِىْ وَاخْلُفْ لِىْ خَيْرًا مِّنْهَا
উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি ওয়াইন্না ইলাইহি রা-জি‘উন। আল্লা-হুম্মা’জুরনী ফীমুসীবাতী ওয়াখ্লুফলী খায়রাম মিনহা।
অর্থ : আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর নিকটই আমাদের প্রত্যাবর্তন। হে আল্লাহ! আমার বিপদে আমাকে প্রতিদান দাও এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করো।
উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যদি কোন মুসলিমের উপর কোন বিপদ আসে এবং উক্ত দু‘আ পড়ে, তাহলে আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করবেন। [সহীহ মুসলিম, হা/২১৬৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৬৭৭; তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩৪৯০;।]
২. শোকের আঘাতের শুরুতেই ধৈর্যধারণ করা :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : يَقُوْلُ اللهُ تَعَالٰى مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِيْ جَزَاءٌ اِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهٗ مِنْ اَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهٗ اِلَّا الْجَنَّةُ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কোন মু’মিন ব্যক্তির প্রিয়জনকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়ার সময় সে যদি ধৈর্যধারণ করে, তবে অবশ্যই জান্নাত তার বিনিময় হবে। [সহীহ বুখারী, হা/৬৪২৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৩৮২; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৫৪৮।]
৩. মৃত ব্যক্তির জন্য অযথা কান্নাকাটি না করে দু‘আ করা :
عَنْ اَبِيْ بُرْدَةَ ، عَنْ اَبِيْهِ ، قَالَ : لَمَّا أُصِيْبَ عُمَرُ ، جَعَلَ صُهَيْبٌ يَقُوْلُ وَاَخَاهُ فَقَالَ عُمَرُ اَمَا عَلِمْتَ اَنَّ النَّبِيَّ قَالَ : اِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذَّبُ بِبُكَاءِ الْحَىِّ
আবু বুরদা (রহ.) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন উমর (রাঃ) মুমূর্ষ অবস্থায় ছিলেন তখন সুহাইব (রাঃ) বলতে লাগলেন, হায় ভাই! হায় ভাই! তখন উমর (রাঃ) বললেন, তুমি কি জান না যে, নবী ﷺ বলেছেন, জীবিতদের কান্নাকাটির কারণে মৃতদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। [সহীহ বুখারী, হা/১২৯০; সহীহ মুসলিম, হা/২১৮৫অ]
عَنِ الْمُغِيْرَةِ قَالَ : سَمِعْتُ النَّبِيَّ يَقُوْلُ : اِنَّ كَذِبًا عَلَيَّ لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلٰى اَحَدٍ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهٗ مِنَ النَّارِ سَمِعْتُ النَّبِيَّ يَقُوْلُ : مَنْ نِيْحَ عَلَيْهِ يُعَذَّبُ بِمَا نِيْحَ عَلَيْه .
মুগীরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, নিশ্চয় আমার উপর মিথ্যারোপ করা তোমাদের কারো উপর মিথ্যারোপ করার সমান নয়। কাজেই যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে, সে যেন নিশ্চিতরূপে জাহান্নামে তার জায়গা করে নেয়। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি নবী ﷺ-কে এ কথাও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তির জন্য শোকাহত সুরে কাঁদা হয়, সেই কাঁদার কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। [সহীহ বুখারী, হা/১২৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮২২৭; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৪২১।]
তবে বিলাপ না করে বা শব্দ না করে দরদজনিত কারণে কারো মৃত্যুতে চোখ দিয়ে পানি পড়া দূষণীয় নয়। বরং এটা দয়া-ভালোবাসার নিদর্শন।
৪. মৃত ব্যক্তির শরীর চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা :
عَنِ عَائِشَةَ ، رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ، زَوْجَ النَّبِيِّ قَالَتْ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ حِينَ تُوُفِّيَ سُجِّيَ بِبُرْدٍ حِبَرَةٍ
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তিকাল করলে তাঁকে ‘হিবারা’ চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। [সহীহ বুখারী, হা/৫৮১৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৬৮৫১; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৪৬৯।]
৫. মৃত ব্যক্তির চোখ খোলা থাকলে তা বন্ধ করে দেয়া :
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ دَخَلَ رَسُوْلُ اللهِ عَلٰى اَبِىْ سَلَمَةَ وَقَدْ شَقَّ بَصَرُهٗ فَاَغْمَضَهٗ ثُمَّ قَالَ : اِنَّ الرُّوْحَ اِذَا قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ
উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু সালামার গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন তার চোখ খোলা ছিল। পরে তিনি তার চোখগুলো বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর বললেন, যখন জান কবজ করা হয় তখন চক্ষু তার অনুসরণ করে। [সহীহ মুসলিম, হা/২১৬৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৪৫৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৫৮৫; ইবনে হিববান, হা/৭০৪১; বায়হাকী, হা/৬৩৯৮।]
৬. মৃত ব্যক্তির কাফন দাফনে বিলম্ব না করা :
عَنْ عَلِيِّ بْنِ اَبِيْ طَالِبٍ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : ثَلَاثٌ يَا عَلِيُّ لَا تُؤَخِّرْهُنَّ : اَلصَّلَاةُ اِذَا اٰنَتْ ، وَالْجَنَازَةُ اِذَا حَضَرَتْ ، وَالْاَيِّمُ اِذَا وَجَدَتْ كُفْؤًا
আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, হে আলী! তুমি তিনটি কাজে দেরী করো না। (এক) যখন নামাযের সময় হয়ে যায়। (দুই) যখন জানাযা উপস্থিত হয়। (তিন) যখন যুবক-যুবতীর উপযুক্ত জোড়া পাওয়া যায়। [মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/২৬৮৬; তিরমিযী, হা/১০৭৫।]
৭. মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার সময় এ দু‘আ পাঠ করা :
بِسْمِ اللهِ وَعَلٰى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ
উচ্চারণ : বিস্মিল্লা-হি ওয়া‘আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লা-হ।
অর্থ : আল্লাহর নামে এবং তাঁর রাসূলের মিল্লাতের উপর (লাশকে কবরে রাখছি)।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : كَانَ النَّبِيُّ إِذَا أَدْخَلَ الْمَيِّتَ الْقَبْرَ ، قَالَ : بِسْمِ اللهِ ، وَعَلٰى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ
ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হতো তখন নবী ﷺ উক্ত দু‘আ পাঠ করতেন। [ইবনে মাজাহ, হা/১৫৫০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৪৯৯০; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩১০৯; বায়হাকী, হা/৬৮৫২; মুসন্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/১১৮২৩;।]
৮. মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর তার জন্য খালেছভাবে দু‘আ করা : যেমন-
اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لَهٗ وَ ثَبِّتْهُ
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লাহু ওয়া সাববিতহু।
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং তাকে অবিচল রাখুন।
উসমান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন লাশকে দাফন করে অবসর গ্রহণ করতেন তখন বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো, তোমরা তার জন্য কবরে প্রতিষ্ঠিত থাকার দু‘আ করো। (অর্থাৎ সে যেন ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে)। কেননা এখন তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। [আবূ দাঊদ,হা/৩২২১; দাওয়াতুল কাবীর লিল বায়হাকী, হা/৬৩৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/ ৩৫১১।]
উল্লেখ্য যে, দাফনের পর উপরোক্ত দু‘আ ও এর সাথে জানাযার দু‘আগুলিও ব্যক্তিগতভাবে পড়া যায়।
তাছাড়া সবসময়ের জন্য যেকোন মুমিন বান্দা তার অন্য কোন মুমিন মৃত ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তিনি কীভাবে দু‘আ করতে হবে তাও শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তা হলো :
﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِاِخْوَانِنَا الَّذِيْنَ سَبَقُوْنَا بِالْاِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِيْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ﴾
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং আমাদের সেসব ভাইদেরকে ক্ষমা করুন, যারা আমাদের পূর্বে ঈমানের সাথে অগ্রগামী হয়েছে। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (সূরা হাশর- ১০)
৯. তিন দিনের বেশি শোক পালন না করা :
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ اَبِيْ سَلَمَةَ قَالَتْ دَخَلْتُ عَلٰى أُمِّ حَبِيْبَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ فَقَالَتْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : لَا يَحِلُّ لِاِمْرَاَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ تُحِدُّ عَلٰى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ اِلَّا عَلٰى زَوْجٍ اَرْبَعَةَ اَشْهُرٍ وَعَشْرًا
যায়নাব বিনতে উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী উম্মে হাবীবা (রাঃ) এর কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে মহিলা আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে মৃতের জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করবে। তবে তার স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১২৪৬; সহীহ বুখারী, হা/১২৮১; সহীহ মুসলিম, হা/৩৭৯৯; সুনানে নাসাঈ, হা/৩৫২৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৮০৮।]
১০. মৃত ব্যক্তির সাদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা চালু রাখা :
মৃত ব্যক্তি যদি সাদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা রেখে যায় যেমন- রাস্তাঘাট তৈরি করা, পানির ব্যবস্থা করা কিংবা মসজিদ মাদ্রাসা স্থাপন করা, শিক্ষা সামগ্রীর ব্যবস্থা করা, চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা, দুঃস্থ ও ইয়াতীমের পুনর্বাসন করা ইত্যাদি, তাহলে এসব চালু রাখা উচিত। এগুলোর সওয়াব মৃত ব্যক্তি পাবে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ قَالَ إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ اِنْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهٗ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهٖ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُوْ لَهٗ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহﷺ বলেছেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিন ধরনের আমলের সওয়াব সর্বদা অব্যাহত থাকে। ১. সাদকায়ে জারিয়া। ২. ঐ ইলিম বা জ্ঞান যা দ্বারা মানুষের উপকার সাধিত হয়। ৩. সুসন্তান যে তার জন্য দু‘আ করে। [মুসলিম, হ/৪৩১০।]
১১. মৃত ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরয থাকলে তার পক্ষ থেকে হজ্জ করা :
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : كَانَ الْفَضْلُ رَدِيْفَ رَسُوْلِ اللهِ فَجَاءَتِ امْرَأَةٌ مِنْ خَثْعَمَ، فَجَعَلَ الْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا وَتَنْظُرُ إِلَيْهِ، وَجَعَلَ النَّبِيُّ يَصْرِفُ وَجْهَ الْفَضْلِ إِلَى الشِّقِّ الْاٰخَرِ فَقَالَتْ : يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّ فَرِيْضَةَ اللهِ عَلٰى عِبَادِهٖ فِي الْحَجِّ أَدْرَكَتْ أَبِيْ شَيْخًا كَبِيرًا، لَا يَثْبُتُ عَلَى الرَّاحِلَةِ، أَفَأَحُجُّ عَنْهُ قَالَ : نَعَمْ، وَذٰلِكَ فِيْ حَجَّةِ الْوَدَاعِ
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (বিদায় হজ্জের সময়) ফযল ইবনে আববাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আরোহীর পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। এ সময় খাস‘আম সম্প্রদায়ের এক নারী আসলে ফযল তার দিকে দেখছিলেন। মহিলাটিও তাকে দেখ ছিলো। নবী ﷺ বার বার ফযলের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে দিতে থাকলেন। অতঃপর মহিলাটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ ! আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত হজ্জ আমার বৃদ্ধ পিতার উপর ফরয হয়েছে। তিনি আরোহীর উপর ঠিক হয়ে বসে থাকতে পারেন না। অতএব আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? নবী ﷺ বললেন, হ্যাঁ, পার। এটি ছিল বিদায় হজ্জের সময়কার ঘটনা। [সহীহ বুখারী, হা/১৫১৩।]
১২. মৃত ব্যক্তির কোন ঋণ থাকলে তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা :
মৃত ব্যক্তির যে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাকি থাকে তা দ্বারা তার দেনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা। সেক্ষেত্রে স্ত্রীর দেনমোহরও দেনার মধ্যে গণ্য হবে যদি তা পূর্বে আদায় না করা হয়।
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ : نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهٖ , حَتّٰى يُقْضٰى عَنْهُ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনের আত্মা ঋণের কারণে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়। [তিরমিযী, হা/১০৭৯; ইবনে মাজাহ, হা/২৪১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৬৭৭; ইবনে হিববান, হা/৩০৬১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/২২১৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৮১১।]
১৩. মৃত ব্যক্তির কোন (শরীয়াত সম্মত) অসিয়ত করে থাকলে তার পক্ষ থেকে তা পূর্ণ করা :
দেনা পরিশোধের পর যে সম্পত্তি বাকি থাকে তা হতে ঐ ব্যক্তির অসিয়ত পূর্ণ করা।
১৪. বাকি সম্পত্তি কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা করা :
﴿مِنْ ۢبَعْدِ وَصِيَّةٍ يُّوْصٰى بِهَاۤ اَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَآرٍّۚ وَصِيَّةً مِّنَ اللهِ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَلِيْمٌ﴾
(ওয়ারিসরা অংশ পাবে) অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর (অবশিষ্ট সম্পদ থেকে)। (তবে শর্ত হচ্ছে) অসিয়ত যেন কারো জন্য ক্ষতিকর না হয়- এ বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সহনশীল। (সূরা নিসা- ১২)
১৫. মৃত ব্যক্তির জন্য কবর যিয়ারত করা :
কবর যিয়ারতের দু‘আ :
اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ اَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَاِنَّا اِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلَاحِقُوْنَ ‐ اَسْاَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ
উচ্চারণ : আসসালা-মু ‘আলাইকুম আহলাদ দিয়া-রি মিনাল মু‘মিনীনা ওয়ালমুসলিমীন, ওয়াইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লালা-হিকূন, আসআলুল্লা-হা লানা ওয়ালাকুমুল ‘আ-ফিয়াহ্।
অর্থ : হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলমান! তোমাদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক, আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ। আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। [সহীহ মুসলিম, হা/২৩০২; সুনানে নাসাঈ, হা/২০৪০; ইবনে মাজাহ, হা/১৫৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৮৯; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৭১১০; বায়হাকী, হা/৭০০৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/১১৯০৯।]
১. কারো মৃত্যুর সংবাদ শোনার সাথে সাথে নিচের দু‘আ পাঠ করা :
اِنَّا لِلّٰهِ وَاِنَّا اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ
উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি ওয়াইন্না ইলাইহি রা-জি‘উন।
অর্থ : আমরা আল্লাহর জন্যই আর আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।
(সূরা বাকারা- ১৫৬)
কোন মুসলিমের মৃত্যুর সংবাদে হাদীসে নিচের দু‘আটিও পাঠ করার কথা বলা হয়েছে,
اِنَّا لِلّٰهِ وَاِنَّا اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ ‐ اَللّٰهُمَّ أْجُرْنِىْ فِىْ مُصِيْبَتِىْ وَاخْلُفْ لِىْ خَيْرًا مِّنْهَا
উচ্চারণ : ইন্না লিল্লা-হি ওয়াইন্না ইলাইহি রা-জি‘উন। আল্লা-হুম্মা’জুরনী ফীমুসীবাতী ওয়াখ্লুফলী খায়রাম মিনহা।
অর্থ : আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর নিকটই আমাদের প্রত্যাবর্তন। হে আল্লাহ! আমার বিপদে আমাকে প্রতিদান দাও এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করো।
উম্মে সালামা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যদি কোন মুসলিমের উপর কোন বিপদ আসে এবং উক্ত দু‘আ পড়ে, তাহলে আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করবেন। [সহীহ মুসলিম, হা/২১৬৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৬৭৭; তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৩৪৯০;।]
২. শোকের আঘাতের শুরুতেই ধৈর্যধারণ করা :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : يَقُوْلُ اللهُ تَعَالٰى مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِيْ جَزَاءٌ اِذَا قَبَضْتُ صَفِيَّهٗ مِنْ اَهْلِ الدُّنْيَا ثُمَّ احْتَسَبَهٗ اِلَّا الْجَنَّةُ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কোন মু’মিন ব্যক্তির প্রিয়জনকে দুনিয়া থেকে তুলে নেয়ার সময় সে যদি ধৈর্যধারণ করে, তবে অবশ্যই জান্নাত তার বিনিময় হবে। [সহীহ বুখারী, হা/৬৪২৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৩৮২; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৫৪৮।]
৩. মৃত ব্যক্তির জন্য অযথা কান্নাকাটি না করে দু‘আ করা :
عَنْ اَبِيْ بُرْدَةَ ، عَنْ اَبِيْهِ ، قَالَ : لَمَّا أُصِيْبَ عُمَرُ ، جَعَلَ صُهَيْبٌ يَقُوْلُ وَاَخَاهُ فَقَالَ عُمَرُ اَمَا عَلِمْتَ اَنَّ النَّبِيَّ قَالَ : اِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذَّبُ بِبُكَاءِ الْحَىِّ
আবু বুরদা (রহ.) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন উমর (রাঃ) মুমূর্ষ অবস্থায় ছিলেন তখন সুহাইব (রাঃ) বলতে লাগলেন, হায় ভাই! হায় ভাই! তখন উমর (রাঃ) বললেন, তুমি কি জান না যে, নবী ﷺ বলেছেন, জীবিতদের কান্নাকাটির কারণে মৃতদেরকে শাস্তি দেয়া হয়। [সহীহ বুখারী, হা/১২৯০; সহীহ মুসলিম, হা/২১৮৫অ]
عَنِ الْمُغِيْرَةِ قَالَ : سَمِعْتُ النَّبِيَّ يَقُوْلُ : اِنَّ كَذِبًا عَلَيَّ لَيْسَ كَكَذِبٍ عَلٰى اَحَدٍ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهٗ مِنَ النَّارِ سَمِعْتُ النَّبِيَّ يَقُوْلُ : مَنْ نِيْحَ عَلَيْهِ يُعَذَّبُ بِمَا نِيْحَ عَلَيْه .
মুগীরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, নিশ্চয় আমার উপর মিথ্যারোপ করা তোমাদের কারো উপর মিথ্যারোপ করার সমান নয়। কাজেই যে ব্যক্তি আমার উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করবে, সে যেন নিশ্চিতরূপে জাহান্নামে তার জায়গা করে নেয়। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি নবী ﷺ-কে এ কথাও বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তির জন্য শোকাহত সুরে কাঁদা হয়, সেই কাঁদার কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। [সহীহ বুখারী, হা/১২৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮২২৭; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৭৪২১।]
তবে বিলাপ না করে বা শব্দ না করে দরদজনিত কারণে কারো মৃত্যুতে চোখ দিয়ে পানি পড়া দূষণীয় নয়। বরং এটা দয়া-ভালোবাসার নিদর্শন।
৪. মৃত ব্যক্তির শরীর চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা :
عَنِ عَائِشَةَ ، رَضِيَ اللهُ عَنْهَا ، زَوْجَ النَّبِيِّ قَالَتْ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ حِينَ تُوُفِّيَ سُجِّيَ بِبُرْدٍ حِبَرَةٍ
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তিকাল করলে তাঁকে ‘হিবারা’ চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। [সহীহ বুখারী, হা/৫৮১৪; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৬৮৫১; শারহুস সুন্নাহ, হা/১৪৬৯।]
৫. মৃত ব্যক্তির চোখ খোলা থাকলে তা বন্ধ করে দেয়া :
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ دَخَلَ رَسُوْلُ اللهِ عَلٰى اَبِىْ سَلَمَةَ وَقَدْ شَقَّ بَصَرُهٗ فَاَغْمَضَهٗ ثُمَّ قَالَ : اِنَّ الرُّوْحَ اِذَا قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ
উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আবু সালামার গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন তার চোখ খোলা ছিল। পরে তিনি তার চোখগুলো বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর বললেন, যখন জান কবজ করা হয় তখন চক্ষু তার অনুসরণ করে। [সহীহ মুসলিম, হা/২১৬৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৪৫৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৫৮৫; ইবনে হিববান, হা/৭০৪১; বায়হাকী, হা/৬৩৯৮।]
৬. মৃত ব্যক্তির কাফন দাফনে বিলম্ব না করা :
عَنْ عَلِيِّ بْنِ اَبِيْ طَالِبٍ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : ثَلَاثٌ يَا عَلِيُّ لَا تُؤَخِّرْهُنَّ : اَلصَّلَاةُ اِذَا اٰنَتْ ، وَالْجَنَازَةُ اِذَا حَضَرَتْ ، وَالْاَيِّمُ اِذَا وَجَدَتْ كُفْؤًا
আলী ইবনে আবু তালেব (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, হে আলী! তুমি তিনটি কাজে দেরী করো না। (এক) যখন নামাযের সময় হয়ে যায়। (দুই) যখন জানাযা উপস্থিত হয়। (তিন) যখন যুবক-যুবতীর উপযুক্ত জোড়া পাওয়া যায়। [মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/২৬৮৬; তিরমিযী, হা/১০৭৫।]
৭. মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার সময় এ দু‘আ পাঠ করা :
بِسْمِ اللهِ وَعَلٰى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ
উচ্চারণ : বিস্মিল্লা-হি ওয়া‘আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লা-হ।
অর্থ : আল্লাহর নামে এবং তাঁর রাসূলের মিল্লাতের উপর (লাশকে কবরে রাখছি)।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : كَانَ النَّبِيُّ إِذَا أَدْخَلَ الْمَيِّتَ الْقَبْرَ ، قَالَ : بِسْمِ اللهِ ، وَعَلٰى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ
ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হতো তখন নবী ﷺ উক্ত দু‘আ পাঠ করতেন। [ইবনে মাজাহ, হা/১৫৫০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৪৯৯০; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩১০৯; বায়হাকী, হা/৬৮৫২; মুসন্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/১১৮২৩;।]
৮. মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর তার জন্য খালেছভাবে দু‘আ করা : যেমন-
اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لَهٗ وَ ثَبِّتْهُ
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লাহু ওয়া সাববিতহু।
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং তাকে অবিচল রাখুন।
উসমান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন লাশকে দাফন করে অবসর গ্রহণ করতেন তখন বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো, তোমরা তার জন্য কবরে প্রতিষ্ঠিত থাকার দু‘আ করো। (অর্থাৎ সে যেন ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে)। কেননা এখন তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। [আবূ দাঊদ,হা/৩২২১; দাওয়াতুল কাবীর লিল বায়হাকী, হা/৬৩৬; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/ ৩৫১১।]
উল্লেখ্য যে, দাফনের পর উপরোক্ত দু‘আ ও এর সাথে জানাযার দু‘আগুলিও ব্যক্তিগতভাবে পড়া যায়।
তাছাড়া সবসময়ের জন্য যেকোন মুমিন বান্দা তার অন্য কোন মুমিন মৃত ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তিনি কীভাবে দু‘আ করতে হবে তাও শিখিয়ে দিয়েছেন। আর তা হলো :
﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِاِخْوَانِنَا الَّذِيْنَ سَبَقُوْنَا بِالْاِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِيْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِيْمٌ﴾
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং আমাদের সেসব ভাইদেরকে ক্ষমা করুন, যারা আমাদের পূর্বে ঈমানের সাথে অগ্রগামী হয়েছে। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আপনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। (সূরা হাশর- ১০)
৯. তিন দিনের বেশি শোক পালন না করা :
عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ اَبِيْ سَلَمَةَ قَالَتْ دَخَلْتُ عَلٰى أُمِّ حَبِيْبَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ فَقَالَتْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : لَا يَحِلُّ لِاِمْرَاَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ تُحِدُّ عَلٰى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ اِلَّا عَلٰى زَوْجٍ اَرْبَعَةَ اَشْهُرٍ وَعَشْرًا
যায়নাব বিনতে উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী উম্মে হাবীবা (রাঃ) এর কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে মহিলা আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার জন্য এটা বৈধ নয় যে, সে মৃতের জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করবে। তবে তার স্বামী মারা গেলে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১২৪৬; সহীহ বুখারী, হা/১২৮১; সহীহ মুসলিম, হা/৩৭৯৯; সুনানে নাসাঈ, হা/৩৫২৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৮০৮।]
১০. মৃত ব্যক্তির সাদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা চালু রাখা :
মৃত ব্যক্তি যদি সাদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা রেখে যায় যেমন- রাস্তাঘাট তৈরি করা, পানির ব্যবস্থা করা কিংবা মসজিদ মাদ্রাসা স্থাপন করা, শিক্ষা সামগ্রীর ব্যবস্থা করা, চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা, দুঃস্থ ও ইয়াতীমের পুনর্বাসন করা ইত্যাদি, তাহলে এসব চালু রাখা উচিত। এগুলোর সওয়াব মৃত ব্যক্তি পাবে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ قَالَ إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ اِنْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهٗ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهٖ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُوْ لَهٗ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহﷺ বলেছেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিন ধরনের আমলের সওয়াব সর্বদা অব্যাহত থাকে। ১. সাদকায়ে জারিয়া। ২. ঐ ইলিম বা জ্ঞান যা দ্বারা মানুষের উপকার সাধিত হয়। ৩. সুসন্তান যে তার জন্য দু‘আ করে। [মুসলিম, হ/৪৩১০।]
১১. মৃত ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরয থাকলে তার পক্ষ থেকে হজ্জ করা :
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : كَانَ الْفَضْلُ رَدِيْفَ رَسُوْلِ اللهِ فَجَاءَتِ امْرَأَةٌ مِنْ خَثْعَمَ، فَجَعَلَ الْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا وَتَنْظُرُ إِلَيْهِ، وَجَعَلَ النَّبِيُّ يَصْرِفُ وَجْهَ الْفَضْلِ إِلَى الشِّقِّ الْاٰخَرِ فَقَالَتْ : يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّ فَرِيْضَةَ اللهِ عَلٰى عِبَادِهٖ فِي الْحَجِّ أَدْرَكَتْ أَبِيْ شَيْخًا كَبِيرًا، لَا يَثْبُتُ عَلَى الرَّاحِلَةِ، أَفَأَحُجُّ عَنْهُ قَالَ : نَعَمْ، وَذٰلِكَ فِيْ حَجَّةِ الْوَدَاعِ
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (বিদায় হজ্জের সময়) ফযল ইবনে আববাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আরোহীর পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। এ সময় খাস‘আম সম্প্রদায়ের এক নারী আসলে ফযল তার দিকে দেখছিলেন। মহিলাটিও তাকে দেখ ছিলো। নবী ﷺ বার বার ফযলের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে দিতে থাকলেন। অতঃপর মহিলাটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ ! আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত হজ্জ আমার বৃদ্ধ পিতার উপর ফরয হয়েছে। তিনি আরোহীর উপর ঠিক হয়ে বসে থাকতে পারেন না। অতএব আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? নবী ﷺ বললেন, হ্যাঁ, পার। এটি ছিল বিদায় হজ্জের সময়কার ঘটনা। [সহীহ বুখারী, হা/১৫১৩।]
১২. মৃত ব্যক্তির কোন ঋণ থাকলে তার পক্ষ থেকে তা আদায় করা :
মৃত ব্যক্তির যে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাকি থাকে তা দ্বারা তার দেনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা। সেক্ষেত্রে স্ত্রীর দেনমোহরও দেনার মধ্যে গণ্য হবে যদি তা পূর্বে আদায় না করা হয়।
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ : نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهٖ , حَتّٰى يُقْضٰى عَنْهُ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুমিনের আত্মা ঋণের কারণে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়। [তিরমিযী, হা/১০৭৯; ইবনে মাজাহ, হা/২৪১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৬৭৭; ইবনে হিববান, হা/৩০৬১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/২২১৯; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১৮১১।]
১৩. মৃত ব্যক্তির কোন (শরীয়াত সম্মত) অসিয়ত করে থাকলে তার পক্ষ থেকে তা পূর্ণ করা :
দেনা পরিশোধের পর যে সম্পত্তি বাকি থাকে তা হতে ঐ ব্যক্তির অসিয়ত পূর্ণ করা।
১৪. বাকি সম্পত্তি কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা করা :
﴿مِنْ ۢبَعْدِ وَصِيَّةٍ يُّوْصٰى بِهَاۤ اَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَآرٍّۚ وَصِيَّةً مِّنَ اللهِ وَاللهُ عَلِيْمٌ حَلِيْمٌ﴾
(ওয়ারিসরা অংশ পাবে) অসিয়ত পালন ও ঋণ পরিশোধের পর (অবশিষ্ট সম্পদ থেকে)। (তবে শর্ত হচ্ছে) অসিয়ত যেন কারো জন্য ক্ষতিকর না হয়- এ বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সহনশীল। (সূরা নিসা- ১২)
১৫. মৃত ব্যক্তির জন্য কবর যিয়ারত করা :
কবর যিয়ারতের দু‘আ :
اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ اَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالْمُسْلِمِيْنَ وَاِنَّا اِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلَاحِقُوْنَ ‐ اَسْاَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ
উচ্চারণ : আসসালা-মু ‘আলাইকুম আহলাদ দিয়া-রি মিনাল মু‘মিনীনা ওয়ালমুসলিমীন, ওয়াইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লালা-হিকূন, আসআলুল্লা-হা লানা ওয়ালাকুমুল ‘আ-ফিয়াহ্।
অর্থ : হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলমান! তোমাদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক, আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ। আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। [সহীহ মুসলিম, হা/২৩০২; সুনানে নাসাঈ, হা/২০৪০; ইবনে মাজাহ, হা/১৫৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৮৯; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৭১১০; বায়হাকী, হা/৭০০৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/১১৯০৯।]