hadith book logo

যেসব কারণে ইবাদাত বরবাদ হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৫

কবরের উপর দরগাহ বা মাযার স্থাপন করা

মৃত ব্যক্তি যত বড় ওলী-বুযুর্গ কিংবা কামেল লোকই হোক না কেন তার কবরের উপর ছাউনি দিয়ে দরগাহ বা মাযার স্থাপন করা, কবরে বাতি জ্বালানো বিদআত। ওলীগণের মাযারকে বড় করা এবং এর উপর গম্বুজ নির্মাণ করা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাজ্য। হাদীসে এসেছে,

عَنْ جَابِرٍ قَالَ نَهٰى رَسُوْلُ اللهِ - - اَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ وَاَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ وَاَنْ يُبْنٰى عَلَيْهِ

জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে কবর বড় করা, পাকা বানানো, এর উপর ঘর নির্মাণ করা এবং এর উপর বসা থেকে নিষেধ করেছেন। [সহীহ মুসলিম, হা/২২৮৯।]

যখন নবী ﷺ এ থেকে বারণ করেছেন তাহলে এমন কে আছে, যে এ নিষিদ্ধ জিনিসের মধ্যে মঙ্গল বা উপকার প্রমাণ করতে পারে?

গম্বুজ ভূপতিত করার নির্দেশ :

عَنْ اَبِىْ الْهَيَّاجِ الْاَسَدِىِّ قَالَ قَالَ لِىْ عَلِىُّ بْنُ اَبِىْ طَالِبٍ اَ لَا اَبْعَثُكَ عَلٰى مَا بَعَثَنِىْ عَلَيْهِ رَسُوْلُ اللهِ - - اَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا اِلَّا طَمَسْتَهٗ وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا اِلَّا سَوَّيْتَهٗ

আবুল হাইয়াজ আল আছাদী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী (রাঃ) আমাকে বলেছেন, আমি কি তোমাকে ঐ কাজের জন্য প্রেরণ করব না, যে কাজের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে প্রেরণ করেছিলেন। আর তা ছিল ছবি ও মূর্তিকে ধ্বংস করে দেয়া এবং এসবের কোন কিছু অবশিষ্ট না রাখা; আর সমস্ত উঁচু কবরকে মাটির সাথে সমান করে দেয়া। [সহীহ মুসলিম, হা/২২৮৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৩৬৬।]

ইমাম নববী (রহ.) বলেন,

اَنَّ السُّنَّةَ اَنَّ الْقَبْرَ لَا يُرْفَعُ عَلَى الْاَرْضِ رَفْعًا كَثِيْرًا ، وَلَا يُسَنَّمُ ، بَلْ يُرْفَعُ نَحْوَ شِبْرٍ وَيُسَطَّحُ

কবরের সুন্নাত নিয়ম হলো, এটা জমিন থেকে অর্ধ হাতের চেয়ে বেশি উঁচু হবে না। বরং শুধু অর্ধহাত পরিমাণ উঁচু হবে এবং উপর সমান করে দেবে। [শরহে মুসলিম, ৩/৩৮৯।]

আল্লামা ইবনে হাজার মক্কী (মৃতঃ ৯৭৪ হিঃ) লিখেন,

تَجِبُ الْمُبَادَرَةُ اِلٰى هَدْمِهَا وَهَدْمِ الْقُبَابِ الَّتِىْ عَلَيْهَا

ঐ সমস্ত উঁচু কবরসমূহ এবং কবরের উপর যে গম্বুজ এবং স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে তা ভেঙ্গে দেয়া ওয়াজিব।

মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেন,

وَيَجِبُ الْهَدْمُ وَلَوْ كَانَ مَسْجِدًا

কবরের উপর সৌধ তা মসজিদ আকারে হলেও ভেঙ্গে ফেলা ওয়াজিব। [মিরকাত, ২/৩৭২।]

যেকোন কবরকে কেন্দ্র করে দরগাহ বা মাযার স্থাপন করা এবং তাতে যেকোন রকমের বাতি জ্বালানো ও নাম লেখা শুধু বিদআতই নয় বরং এসব কাজকে কেন্দ্র করে বর্তমানে মুসলিম জাতির বিরাট অংশ শিরকের মতো পাপে জড়িয়ে পড়েছে।

হাদীসে মাযার করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং উঁচু কবরকে ভেঙ্গে সমান করে দিতে বলা হয়েছে। তাই কোন মাযার ভেঙ্গে দিলে আউলিয়া-বুযুর্গদের সাথে কোন বেয়াদবী করা হয় না বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণীকে মান্য করা হয়। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণীকে মান্য করা হলো ঈমানের দাবি।

মাযারের দান বাক্স :

বিভিন্ন মাযারের নামে দান বাক্সে যে টাকা পয়সা দেয়া হয় তা শরীয়াতের দৃষ্টিতে সবই অবৈধ তথা হারাম। উক্ত টাকা পয়সা মসজিদ, মাদ্রাসায় খরচ করা জায়েয হবে না। বর্তমানে আমাদের দেশে এই শিরকজনিত কাজের ঢল নেমে গেছে। সুতরাং মাযারের নামে এ সমস্ত বাক্স কায়েম করা থেকে সকলেরই বিরত থাকা ওয়াজিব।

অবশ্য মসজিদ, মাদ্রাসায় প্রয়োজনের ভিত্তিতে যদি বাক্স স্থাপন করা হয়, তাহলে তা মাযার থেকে দূরবর্তী কোন জায়গায় মাদ্রাসা বা মসজিদের স্পষ্ট নাম উল্লেখ করে স্থাপন করতে হবে।

قَالَ فِى الدُّرِّ الْمُخْتَارِ وَالْعِلْمُ اَنَّ النَّذْرَ الَّذِىْ يَقَعُ لِلْاَمْوَاتِ مِنْ اَكْثَرِ الْعَوَامِ وَمَا يُؤْخَذُ مِنَ الدَّرَاهِمِ وَالشَّمْعِ وَالزَّيْتِ وَنَحْوِهٖ اِلَى الْاَوْلِيَاءِ الْكِرَامِ تَقَرُّبَا اِلَيْهِمْ فَهُوَ بِالْاِجْمَاعِ بَاطِلٌ وَحَرَامٌ

দুররে মুখতারের মধ্যে রয়েছে, এটা জানা বিষয় যে, যেসকল মান্নত মৃত ব্যক্তির জন্য করা হয়, যা অধিকাংশ মূর্খ লোকেরা করে থাকে এবং যেসকল দান, তৈল এবং আরো অন্যান্য যা কিছু ওলী-আউলিয়াদের নামে গ্রহণ করা হয় তাদের নৈকট্য লাভের জন্য তা ইজমা দ্বারা বাতিল এবং হারাম। [ফতোয়ায়ে শামী, পৃঃ ১৭০।]

কবরে বাতি জ্বালানো :

কবরের মধ্যে বাতি জ্বালানো, মোমবাতি, বিজলী বাতি ইত্যাদি জ্বালানোর কোন ভিত্তি শরীয়াতে নেই; বরং সত্য ধর্ম এ জাতীয় নোংরা চালচলনের বিরোধিতা করে। তিরমিযীর শরাহ উরফুস সাজী কিতাবে রয়েছে,

اَلْغُلُوُّ الَّذِيْ كَانَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ مِنْ إِيْقَادِ النَّارِ

অর্থাৎ কবরে আগুন দেয়া জাহেলী যুগের বাড়াবাড়ি। [উরফুস সাজী, ২/৪০৮।]

সুতরাং বুঝা গেল যে, কবরওয়ালা যে-ই হোন না কেন, কবরে বাতি জ্বালানো নিষিদ্ধ।