hadith book logo

যেসব কারণে ইবাদাত বরবাদ হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯

নামায সংক্রান্ত বিদআত

নামাযের জন্য নিয়ত পড়া :

আরবি বা নিজের মাতৃভাষায় মুখে উচ্চারণ করে নামাযের জন্য নিয়ত পড়া বিদআত। নামাযের জন্য নিয়ত করা ফরয, তবে তা আরবি বা অন্য কোন ভাষায় মুখে উচ্চারণ করে নয়। রবং তা হবে মনে মনে। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাযে দাঁড়িয়ে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করে পড়েছেন এমন কোন প্রমাণ হাদীসে বর্ণিত হয়নি। যারা বলেন, নিয়ত মনে মনে করতে হয় ঠিক, তবে আরবি বা নিজের মাতৃভাষায় বলা উত্তম- একথা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ শরীয়াতে এমন কোন বিষয় অবশিষ্ট নেই, যা আমল বা ইবাদাতের জন্য উত্তম অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা সাহাবায়ে কেরাম তা বর্ণনা করেননি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা সাহাবায়ে কেরাম যা উত্তম মনে করেননি উম্মতের মধ্যে আর কেউ তা উত্তম মনে করার প্রশ্নই ওঠে না।

জায়নামাযের দু‘আ পড়া :

নামায শুরু করার পূর্বে জায়নামাযে বা নামাযের জায়গায় দাঁড়িয়ে ‘‘ইন্নী ওয়াজ্জাহ্তু .....’’ এ দু‘আ পাঠ করা বিদআত। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ নামায শুরু করার পূর্বে জায়নামাযে বা নামাযের জায়গায় দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহ আকবার’ এ তাকবীর বলতেন। কিন্তু এর আগে কোন কিছু পড়েছেন বলে কোন হাদীসে প্রমাণিত নেই।

এ ক্ষেত্রে করণীয় :

নামাযের শুরুতে যেটা করণীয় তা হলো প্রথমে মনে মনে নিয়ত করতে হবে। অর্থাৎ কোন্ ওয়াক্তের কোন্ নামায পড়বে তা মনে মনে স্থির করবে। তারপর তাকবীর দিয়ে হাত বাঁধবে। তারপর সানা পাঠ করবে।

যে দু‘আটি জায়নামাযের দু‘আ হিসেবে পাঠ করা হয় সেটি মূলত কুরআনের একটি আয়াত। নবী ﷺ এ দু‘আর সাথে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দু‘আ একত্র করে তাকবীরে তাহরীমার পর সানা হিসেবে পাঠ করতেন। তাই তাকবীর বলার পূর্বে না পড়ে তাকবীর বলার পর সানা হিসেবে হাদীসে যেভাবে এসেছে সেভাবে দু‘আটি পাঠ করতে হবে। আলী (রাঃ) বলেন, নবী ﷺ নামায শুরু করার সময় তাকবীর বলতেন এবং এ দু‘আ পাঠ করতেন।

وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضَ حَنِيْفًا وَّمَا اَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ ، قُلْ اِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، -لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ ‐ اَللّٰهُمَّ اَنْتَ الْمَلِكُ لَا اِلٰهَ اِلَّا اَنْتَ . اَنْتَ رَبِّىْ وَاَنَا عَبْدُكَ ظَلَمْتُ نَفْسِىْ وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِىْ فَاغْفِرْ لِىْ ذُنُوْبِىْ جَمِيْعًا اِنَّهٗ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اَنْتَ، وَاهْدِنِىْ لِاَحْسَنِ الْاَخْلَاقِ لَا يَهْدِىْ لِاَحْسَنِهَا اِلَّا اَنْتَ، وَاصْرِفْ عَنِّىْ سَيِّئَهَا لَا يَصْرِفُ عَنِّىْ سَيِّئَهَا اِلَّا اَنْتَ، لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ كُلُّهٗ فِىْ يَدَيْكَ وَالشَّرُّ لَيْسَ اِلَيْكَ، اَنَا بِكَ وَاِلَيْكَ تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ اَسْتَغْفِرُكَ وَاَتُوْبُ اِلَيْكَ

উচ্চারণ : ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাসসামা-ওয়া-তি ওয়াল আরযা হানীফাওওয়ামা-আনা মিনাল মুশরিকীন। কুল ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহইয়া-ইয়া ওয়া মামা-তী লিল্লা-হি রাবিবল ‘আলামীন। লা-শারীকালাহু ওয়াবি যা-লিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লা-হুম্মা আনতাল মালিকু লা-ইলাহা ইল্লা আনতা। আনতা রাববী ওয়া আনা ‘আবদুকা যালামতু নাফসী ওয়া‘তারাফতু বিযানবী। ফাগফিরলী যুনূবী জামী‘আ। ইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা ওয়াহদিনী লিআহসানিল আখলা-ক। লা-ইয়াহদী লিআহসানিহা ইল্লা আনতা ওয়াসরিফ আন্নী সায়্যিআহা লা-ইয়াসরিফু আন্নী সায়্যিআহা ইল্লা আনতা। লাববাইকা ওয়া সা‘দাইকা ওয়াল খাইরু কুল্লুহু ফী ইয়াদাইক। ওয়াশশাররু লাইসা ইলাইক, আনা-বিকা ওয়া ইলাইক, তাবা-রাকতা ওয়া তা‘আ-লাইত। আসতাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইক।

অর্থ : আমি একনিষ্ঠভাবে ঐ সত্তার দিকে মুখ ফিরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই। এসব কাজের জন্যই আমি আদিষ্ট হয়েছি, আমি হলাম মুসলিমদের মধ্যে একজন। হে আল্লাহ! তুমিই মালিক, তুমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তুমি আমার রব এবং আমি তোমার দাস। আমি নিজের উপর অনেক অন্যায় করেছি এবং আমি আমার পাপের স্বীকৃতি দিচ্ছি। সুতরাং তুমি আমার সকল গোনাহ ক্ষমা করে দাও। কারণ তুমি ছাড়া গোনাহ ক্ষমা করার আর কেউ নেই। আর তুমি আমাকে সবচেয়ে উত্তম চরিত্র দান করো। কেননা উত্তম চরিত্র তুমি ছাড়া আর কেউ দান করতে পারে না। আর তুমি আমাকে খারাপ চরিত্র থেকে বাঁচিয়ে রাখো। কেননা তুমি ছাড়া কেউ মন্দ চরিত্র থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত। আমি তোমার সামনে হাযির। সকল কল্যাণ তোমারই হাতে। অমঙ্গল তোমার দিক থেকে নয়। আমি তোমার সাহায্যে তোমার দিকেই মনোনিবেশ করি। হে আল্লাহ! তুমি বরকতময় এবং মহান। আমি তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি এবং তোমার দিকে ফিরে আসি। [মুসলিম, হা/১৮৪৮।]

মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে নামায না পড়ে বয়ান শুনার জন্য বসে যাওয়া :

মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে বসে যাওয়া বা জুমু‘আর দিন মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে সুন্নাত নামায না পড়ে খুতবা শুনতে বসে যাওয়া কিংবা ইমাম কর্তৃক প্রথমে খুতবা শুনার জন্য সুন্নাত নামায পড়তে বাধা দেয়া এবং খুতবার পরেই সুন্নাত নামাযের জন্য সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া বিদআত।

এ ক্ষেত্রে করণীয় :

কোন ব্যক্তি যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন তার সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো তাহিয়্যাতুল মসজিদ এর দুরাক‘আত সালাত আদায় করা, এমনকি খুতবা চলাকালীন সময়ে হলেও, তারপর বসবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাহিয়্যাতুল মসজিদের দুরাক‘আত নামায কিংবা কোন সুন্নাত নামায না পড়ে বসতে নিষেধ করেছেন। এ ব্যাপারে নবী ﷺ এর স্পষ্ট নির্দেশ থাকার কারণে এ দুরাক‘আত নামায খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,

عَنْ اَبِىْ قَتَادَةَ بْنَ رِبْعِيٍّ الْانْصَارِيِّ ، قَالَ : قَالَ النَّبِيُّ اِذَا دَخَلَ اَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسْ حَتّٰى يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ

আবু কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে তখন সে যেন দুরাক‘আত সালাত আদায় করার পূর্বে না বসে। [সহীহ বুখারী, হা/১১৬৭; তিরমিযী, হা/৩১৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৭০৫; মু‘জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/৩২০৪; সুনানুল বায়হাকী, হা/৪৭০২।]

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ جَاءَ سُلَيْكٌ الْغَطَفَانِىُّ وَرَسُوْلُ اللهِ - - يَخْطُبُ فَقَالَ لَهُ : أَصَلَّيْتَ شَيْئًا قَالَ لَا . قَالَ : صَلِّ رَكْعَتَيْنِ تَجَوَّزْ فِيهِمَا

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সুলায়েক গাতফানী নামক এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করলেন। তখন নবী ﷺ খুতবা দিচ্ছিলেন। নবী ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কোন সালাত আদায় করেছ? তিনি বললেন, না। তখন নবী ﷺ বললেন, তুমি দুরাক‘আত নামায আদায় করো এবং সংক্ষেপ করো। [আবু দাউদ, হা/১১১৮; নাসাঈ, হা/১৪০৮।]

জুমু‘আর খুতবার সময় মসজিদের জন্য চাঁদা উঠানো :

জুমু‘আর দ্বিতীয় খুতবার সময় কোন টাকা-পয়সা উঠানো এবং কোন টাকা-পয়সা দেয়া বা নেয়া নাজায়েয। এ সময় কোন টাকা-পয়সা দেয়া-নেয়া তো দূরের কথা, বরং কোন কথা না বলাও ঠিক নয়। হাদীসে এসেছে,

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : اِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ اَنْصِتْ . يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالْاِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, জুমু‘আর দিন খুতবা চলাকালীন সময়ে তুমি যদি তোমার ভাইকে এ কথা বল যে, চুপ থাকো- তাহলেও তুমি অনর্থক কাজ করলে। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/২৩২; সহীহ মুসলিম, হা/২০০২; নাসাঈ, হা/১৪০২; ইবনে মাজাহ, হা/১১১০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৬৭২; ইবনে খুযাইমা, হা/১৮০৫; ইবনে হিববান, হা/২৭৯৩।]

এ ক্ষেত্রে করণীয় :

টাকা-পয়সা উঠানোর বিশেষ প্রয়োজন হলে নামাযের সালাম ফিরানোর পরপরই তার ব্যবস্থা করা যায়।