১
যেসব কারণে ইবাদাত বরবাদ হয়
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৮
ইবাদাত গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তাবলি
ইবাদাত কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। তা হচ্ছে-
১. اَ لْاِيْمَانُ (আল ঈমান) তথা ঈমানের সকল বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।
২. اَ لْاِخْلَاصُ (আল ইখলাস) তথা ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা।
৩. اِتِّبَاعُ السُّنُّةِ (ইত্তিবাউস সুন্নাহ) তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ যে শরীয়াত নিয়ে এসেছে তার অনুসরণের মাধ্যমে ইবাদাত করা।
১. اَ لْاِيْمَانُ (আল ঈমান)
ঈমান ব্যতিত কোন ইবাদাত গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানকে শর্তারোপ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
﴿وَمَا مَنَعَهُمْ اَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ اِلَّاۤ اَنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَبِرَسُوْلِهٖ﴾
তাদের দান গ্রহণে বাধা কেবল এই ছিল যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করত। (সূরা তওবা- ৫৪)
যদি অমুসলিমের ক্ষেত্রে তাদের দানের মতো ইবাদাতও কবুল না হয়, তাহলে অন্যান্য ইবাদাত কীভাবে কবুল হবে? আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهٗ حَيَاةً طَيِّبَةًۚ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ اَجْرَهُمْ بِاَحْسَنِ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ﴾
মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে, অবশ্যই তাকে আমি পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব। (সূরা নাহল- ৯৭)
সুতরাং বুঝা গেল যে, মুমিন ছাড়া অন্য কারো সৎকর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তি যতই সৎকর্ম করুন না কেন যদি তার মধ্যে সঠিক ঈমান না থাকে, তবে তার সকল আমল বা ইবাদাত পরিত্যাজ্য হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
﴿وَمَنْ يَّكْفُرْ بِالْاِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهٗؗ وَهُوَ فِى الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ﴾
আর যে ব্যক্তি ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে, তার কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা মায়েদা- ৫)
ঈমান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন আমাদের বই ‘‘যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়’’।
২. اَ لْاِخْلَاصُ (আল ইখলাস)
اَلْاِخْلَاصُ (আল ইখলাস) হচ্ছে, সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা এবং নিয়তকে গাইরুল্লাহ থেকে পবিত্র করে ইবাদাতকে কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদন করা এবং তারই সামনে বিনয় প্রকাশ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَادْعُوْهُ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْن﴾
অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকেই আহবান করো। (সূরা মু’মিন- ৬৫)
﴿وَمَاۤ اُمِرُوْاۤ اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ ۚ حُنَفَآءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَۚ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ﴾
তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই করা হয়েছে যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। আর এটাই সঠিক ধর্ম। (সূরা বায়্যিনাহ- ৫)
﴿اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَ﴾
আমি আপনার প্রতি এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করুন। (সূরা যুমার- ২)
﴿قُلْ اِنِّۤيْ اُمِرْتُ اَنْ اَعْبُدَ اللهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَ﴾
বলো, অবশ্যই আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করি। (সূরা যুমার- ১১)
ইবাদাতের মধ্যে শিরক করা যাবে না :
﴿فَمَنْ كَانَ يَرْجُوْا لِقَآءَ رَبِّهٖ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهٖۤ اَحَدًا﴾
যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহফ- ১১০)
﴿قُلْ اِنَّمَاۤ اُمِرْتُ اَنْ اَعْبُدَ اللهَ وَلَاۤ اُشْرِكَ بِهٖ﴾
বলো, নিশ্চয় আমাকে আদেশ করা হয়েছে, যেন আমি আল্লাহর ইবাদাত করি এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করি। (সূরা রা‘দ- ৩৬)
আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না। শুধু তাঁরই বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধ পালন করতে হবে। কারণ নির্ভেজাল আনুগত্য পাওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া একনিষ্ঠভাবে অন্য কারো দাসত্ব করে, তাহলে সে ভ্রান্ত কাজ করে। অনুরূপভাবে সে যদি আল্লাহর দাসত্বের সাথে সাথে অন্য কারো দাসত্বের সংমিশ্রণ ঘটায়, তাহলে সেটাও সরাসরি ন্যায় ও সত্যের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে।
ব্যক্তির নিয়তের উপরই সকল আমলের সওয়াব নির্ভরশীল :
عَنْ عُمَرَ بْنَ الخَطَّابِ عَلَى الْمِنْبَرِ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : اِنَّمَا الْاَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَاِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوٰى ، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهٗ اِلٰى دُنْيَا يُصِيْبُهَا ، اَوْ اِلَى امْرَاَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهٗ اِلٰى مَا هَاجَرَ اِلَيْهِ
উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (রাঃ) বলেছেন, নিশ্চয় সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি কেবলমাত্র তা-ই পায়, যা সে নিয়ত করে। সুতরাং যার হিজরত হবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্য তার হিজরত আল্লাহ এবং রাসূলের জন্যই হবে। আর যার হিজরত হবে দুনিয়া অর্জনের জন্য অথবা কোন মহিলাকে বিয়ে করার জন্য, তার হিজরত সেদিকেই হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে। [সহীহ বুখারী, হা/১; সহীহ মুসলিম, হা/ ; আবু দাউদ, হা/২২০৩; ইবনে মাজাহ, হা/৪২২৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৮৮; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৮৪।]
যে ব্যক্তি ইখলাস নিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করবে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন :
عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ : مَنْ فَارَقَ الدُّنْيَا عَلَى الْاِخْلَاصِ لِلّٰهِ وَحْدَهٗ ، وَعِبَادَتِهٖ لَا شَرِيْكَ لَهٗ ، وَاِقَامِ الصَّلَاةِ ، وَاِيْتَاءِ الزَّكَاةِ ، مَاتَ وَاللهُ عَنْهُ رَاضٍ
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা যাবে যে, সে ইখলাস অর্জন করেছে, আল্লাহর ইবাদাতে কাউকে শরীক করেনি, সালাত কায়েম করেছে এবং যাকাত আদায় করেছে সে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উপর মৃত্যুবরণ করবে। [ইবনে মাজাহ, হা/৭০।]
আল্লাহ মানুষের আকৃতি দেখেন না বরং তার অন্তর দেখেন :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : اِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ اِلٰى صُوَرِكُمْ وَلَا اَمْوَالِكُمْ، وَلٰكِنْ اِنَّمَا يَنْظُرُ اِلٰى قُلُوْبِكُمْ وَاَعْمَالِكُمْ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারা বা তোমাদের সম্পদের দিকে লক্ষ্য করবেন না। বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমলের দিকে লক্ষ্য করবেন। [সহীহ মুসলিম, হা/৬৭০৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৮১৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৯৪; মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাওয়াহা, হা/৩৭৯।]
যার নিয়তে গলদ থাকবে হাশরের ময়দানে তা প্রকাশ পেয়ে যাবে :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ - : مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهٖ وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللهُ بِهٖ
আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কৃতকর্মের সুনামের জন্য লোকসমাজে ইচ্ছাপূর্বক প্রচার করে বেড়ায়, আল্লাহ তা‘আলাও (কিয়ামতের দিন) তার কৃতকর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকদেরকে জানিয়ে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে কোন সৎকাজ করবে, আল্লাহও (কিয়ামতের দিন) তার প্রকৃত উদ্দেশের কথা লোকদের মাঝে প্রকাশ করে দেবেন। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৬৬৭; সুনানুল কুবরা, হা/১১৬৩৬।]
ইখলাছবিহীন ইবাদাত আল্লাহ গ্রহণ করেন না :
عَنْ اَبِىْ اُمَامَةَ الْبَاهِلِىِّ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ اِلَى النَّبِىِّ فَقَالَ اَرَاَيْتَ رَجُلًا غَزَا يَلْتَمِسُ الْاَجْرَ وَالذِّكْرَ مَا لَهٗ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ : لَا شَىْءَ لَهٗ . فَاَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ يَقُوْلُ لَهٗ رَسُوْلُ اللهِ : لَا شَىْءَ لَهٗ . ثُمَّ قَالَ : اِنَّ اللهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ اِلَّا مَا كَانَ لَهٗ خَالِصًا وَابْتُغِىَ بِهٖ وَجْهُهٗ
আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সওয়াব এবং মানুষের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছে। তার প্রাপ্য কী? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে কিছুই পাবে না। লোকটি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনি তিনবারই বললেন, সে কিছুই পাবে না। অতঃপর রাসূলূল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্যই করা হয় এবং এর মাধ্যমে শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করা হয়। [সুনান নাসায়ী, হা/৩১৪০; সিলসিলাহ সহীহাহ, হা/৫২।]
عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ قَالَ تَفَرَّقَ النَّاسُ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ فَقَالَ لَهٗ نَاتِلُ أَهْلِ الشَّامِ أَيُّهَا الشَّيْخُ حَدِّثْنَا حَدِيثًا سَمِعْتَهٗ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ قَالَ نَعَمْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضٰى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا؟ قَالَ قَاتَلْتُ فِيْكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ حَتّٰى أُلْقِيَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهٗ وَقَرَأَ الْقُرْاٰنَ فَأُتِيَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا؟ قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهٗ وَقَرَأْتُ فِيْكَ الْقُرْاٰنَ . قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ عَالِمٌ . وَقَرَأْتَ الْقُرْاٰنَ لِيُقَالَ هُوَ قَارِئٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ حَتّٰى أُلْقِيَ فِي النَّارِ . وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهٖ فَأُتِيَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا؟ قَالَ مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيْلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيْهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيْهَا لَكَ قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ هُوَ جَوَادٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ
সুলাইমান ইবনে ইয়াসার (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকজন যখন আবু হুরায়রা (রাঃ) এর নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখন সিরিয়াবাসী নাতিল (রহ.) বললেন, হে শাইখ! আপনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট থেকে শুনেছেন এমন একটি হাদীস আমাদেরকে শুনান। তিনি বলেন, হ্যাঁ! (শুনাব)। আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন ব্যক্তি, যে শহীদ হয়েছিল। তাঁকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তাঁর নিয়ামতরাজির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে)। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এর বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি তোমারই পথে যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষপর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি এ জন্যই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে, তুমি বীর; আর (দুনিয়াতে) তা বলাও হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে যে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রদত্ত নিয়ামতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এত বড় নিয়ামত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এ জন্য যে, যাতে লোকেরা তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্যে যে, যাতে লোকে বলে- তুমি একজন ক্বারী; আর তা বলাও হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে, যাকে আল্লাহ তা‘আলা সচ্ছলতা এবং সম্পদ দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের কথা বলবেন। সে তা চিনতে পারবে (এবং স্বীকারোক্তিও করবে)। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এসব নিয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ? জবাবে সে বলবে, যেসব খাতে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পছন্দ কর, আমি সেসব খাতে তোমার সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি বরং এ জন্য তা করেছিলে, যাতে লোকে তোমাকে ‘দানবীর’ বলে অভিহিত করে; আর তা বলাও হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৫০৩২।]
যে ব্যক্তি ইখলাছ নিয়ে কাজ করবে সে প্রশান্তি লাভ করবে :
عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، اَنَّ النَّبِيَّ قَالَ : مَنْ كَانَتْ نِيَّتُهٗ طَلَبُ الْاٰخِرَةِ ، جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِيْ قَلْبِهٖ ، وَجَمَعَ لَهٗ شَمْلَهٗ ، وَاَتَتْهُ الدُّنْيَا ، وَهِيَ رَاغِمَةٌ ، وَمَنْ كَانَتْ نِيَّتُهٗ طَلَبُ الدُّنْيَا ، جَعَلَ اللهُ الْفَقْرَ بَيْنَ عَيْنَيْهِ ، وَشَتَّتَ عَلَيْهِ اَمْرَهٗ ، وَلَا يَأْتِيْهِ مِنْهَا اِلَّا مَا كُتِبَ لَهٗ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, যার উদ্দেশ্য হয় পরকালের সওয়াব অর্জন করা আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তরকে অমুখাপেক্ষী করে দেন এবং তার জন্য সবকিছু একত্র করে দেন। তখন দুনিয়া তার কাছে আসে অথচ সে দুনিয়ার প্রতি বিমুখ থাকে। আর যার উদ্দেশ্য হয় দুনিয়া অর্জন করা আল্লাহ তাকে মুখাপেক্ষী করে দেন এবং তার কাজকর্মকে ভিন্নমুখী করে দেন। কিন্তু দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই অর্জন করতে পারে যতটুকু তার জন্য বরাদ্ধ ছিল। [মু‘জামুল কাবীর লিত ত্বাবারানী, হা/৪৭৫৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/৪১৪২।]
তাফসীরে কুরতুবীতে আছে,
وَسُئِلَ الْحَسَنُ عَنِ الْاِخْلَاصِ وَالرِّيَاءِ فَقَالَ : مِنَ الْاِخْلَاصِ اَنْ تُحِبَّ اَنْ تَكْتُمَ حَسَنَاتَكَ وَلَا تُحِبُّ اَنْ تَكْتُمَ سَيِّئَاتَكَ، فَاِنْ اَظْهَرَ اللهُ عَلَيْكَ حَسَنَاتَكَ تَقُوْلُ هٰذَا مِنْ فَضْلِكَ وَاِحْسَانِكَ، وَلَيْسَ هٰذَا مِنْ فِعْلِيْ وَلَا مِنْ صَنِيْعِيْ
একদা হাসান বসরী (রহ.) কে ইখলাস ও রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, ইখলাস হচ্ছে ভালো কাজের গোপনীয়তা পছন্দ করা এবং মন্দ কাজের গোপনীয়তা পছন্দ না করা। এরপর যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমার আমল মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেন, তবে তুমি এ কথা বলো, হে আল্লাহ! এটা আপনার অনুগ্রহ ও কৃপা; আমার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফল নয়। [তাফসীরে কুরতুবী, সূরা কাহফের ১১০নং আয়াতের তাফসীর।]
যে আমল খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে এবং লোকমুখে সুখ্যাতি ও প্রশংসার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ থাকে না, সে আমল যদি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করে লোকের মাঝে প্রসিদ্ধ করে দেন এবং মানুষের মুখ দিয়ে প্রশংসা করিয়ে দেন, তবে এর সাথে রিয়ার কোন সম্পর্ক নেই।
عَنْ اَبِىْ ذَرٍّ قَالَ قِيْلَ لِرَسُوْلِ اللهِ اَرَاَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ : تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ
আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কী মতামত, যে সৎ আমল করে এবং লোকেরা তার প্রশংসা করে? তিনি বললেন, এটা মুমিনের অগ্রীম সুসংবাদ। [সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৪১৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬৬।]
৩. اِتِّبَاعُ السُّنُّةِ (ইত্তেবাউস সুন্নাহ)
ইত্তিবাউস সুন্নাহ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যে শরীয়াত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণে ইবাদাত করা। এর অর্থ নবী ﷺ যে কাজ যেভাবে করেছেন সে কাজ সেই নিয়মে করা, কোন প্রকার কমবেশি না করা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশনা বাদ দিয়ে অন্য কারো নির্দেশনা অনুযায়ী না করা।
আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে নবী ﷺ এর আনুগত্য করতে হবে :
﴿قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ ؕ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ﴾
বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা আলে ইমরান- ৩১)
এ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর ভালোবাসা পাওয়াকে নবী ﷺ এর আনুগত্যের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসবে, আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করবে এবং জান্নাতে যেতে চাইবে তাকে অবশ্যই নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ করতে হবে।
নবী ﷺ এর আদেশ-নিষেধ পালন করা উম্মতের জন্য অত্যাবশ্যক :
﴿وَمَاۤ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُۗ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْاۚ وَاتَّقُوا اللهَؕ اِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ﴾
রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে খুবই কঠোর। (সূরা হাশর- ৭)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) একবার বক্তৃতাকালে বললেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা অমুক অমুক ফ্যাশনকারিণী মহিলাকে লানত করেছেন।’’ এটা শুনে এক মহিলা বলল, এ কথা আপনি কোথায় পেয়েছেন? তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর কিতাব পড়ে থাকলে এ কথা অবশ্যই পেতে। তুমি কি এ আয়াত وَمَاۤ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا পড়েছ? সে বলল, হ্যাঁ, এ আয়াত তো আমি পড়েছি। আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, এরূপ কাজে লিপ্ত নারীদের উপর আল্লাহ তা‘আলা লানত করেছেন। তখন মাহিলাটি বলল, এখন আমি বুঝতে পারলাম। [সহীহ বুখারী, হা/৪৮৮৬, মুসলিম হা/৫৬৯৫।]
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، عَنِ النَّبِيِّ قَالَ : دَعُوْنِيْ مَا تَرَكْتُكُمْ اِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِسُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلٰى اَنْبِيَائِهِمْ فَاِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوْهُ ، وَاِذَا اَمَرْتُكُمْ بِاَمْرٍ فَأْتُوْا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমাকে প্রশ্ন করা ছেড়ে দাও, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে কিছু বলি (অর্থাৎ প্রয়োজন ছাড়া প্রশ্ন করো না)। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা অধিক প্রশ্ন এবং তাদের নবীদের সাথে মতভেদ করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই যখন আমি কোন বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে। আর যখন কোন বিষয়ে আদেশ করি, তখন যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের শক্তি সামর্থ্য থাকবে তা করবে। [সহীহ বুখারী, হা/৭২৮৮; সহীহ মুসলিম, হা/৩৩২১।]
নবী ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ না করলে আমল বাতিল হয়ে যাবে :
﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اَطِيْعُوا اللهَ وَاَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَلَا تُبْطِلُوْاۤ اَعْمَالَكُمْ﴾
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমলকে নষ্ট করে দিয়ো না। (সূরা মুহাম্মাদ- ৩৩)
এ আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী বুঝা যায় যে, আল্লাহর ইবাদাত করতে হবে আল্লাহর নির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশনা অনুযায়ী।
নবী ﷺ এর আনুগত্য না করা মানে তাকে অস্বীকার করা :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : كُلُّ أُمَّتِيْ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ، اِلَّا مَنْ اَبٰى . قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَنْ يَأْبٰى . قَالَ : مَنْ اَطَاعَنِيْ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ اَبٰى
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে শুধু ঐ ব্যক্তি ছাড়া যে অস্বীকার করবে। সাহাবায়ে কেরামগণ প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! কে অস্বীকার করে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, যে আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যে আমার আনুগত্য না করে অবাধ্য হবে সেই অস্বীকারকারী। [সহীহ বুখারী, হা/৭২৮০।]
১. اَ لْاِيْمَانُ (আল ঈমান) তথা ঈমানের সকল বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।
২. اَ لْاِخْلَاصُ (আল ইখলাস) তথা ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা।
৩. اِتِّبَاعُ السُّنُّةِ (ইত্তিবাউস সুন্নাহ) তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ যে শরীয়াত নিয়ে এসেছে তার অনুসরণের মাধ্যমে ইবাদাত করা।
১. اَ لْاِيْمَانُ (আল ঈমান)
ঈমান ব্যতিত কোন ইবাদাত গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা আমল কবুল হওয়ার জন্য ঈমানকে শর্তারোপ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
﴿وَمَا مَنَعَهُمْ اَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ اِلَّاۤ اَنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَبِرَسُوْلِهٖ﴾
তাদের দান গ্রহণে বাধা কেবল এই ছিল যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করত। (সূরা তওবা- ৫৪)
যদি অমুসলিমের ক্ষেত্রে তাদের দানের মতো ইবাদাতও কবুল না হয়, তাহলে অন্যান্য ইবাদাত কীভাবে কবুল হবে? আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ اَوْ اُنْثٰى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهٗ حَيَاةً طَيِّبَةًۚ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ اَجْرَهُمْ بِاَحْسَنِ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ﴾
মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে, অবশ্যই তাকে আমি পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব। (সূরা নাহল- ৯৭)
সুতরাং বুঝা গেল যে, মুমিন ছাড়া অন্য কারো সৎকর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তি যতই সৎকর্ম করুন না কেন যদি তার মধ্যে সঠিক ঈমান না থাকে, তবে তার সকল আমল বা ইবাদাত পরিত্যাজ্য হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
﴿وَمَنْ يَّكْفُرْ بِالْاِيْمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهٗؗ وَهُوَ فِى الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ﴾
আর যে ব্যক্তি ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে, তার কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা মায়েদা- ৫)
ঈমান সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন আমাদের বই ‘‘যেসব কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়’’।
২. اَ لْاِخْلَاصُ (আল ইখলাস)
اَلْاِخْلَاصُ (আল ইখলাস) হচ্ছে, সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা এবং নিয়তকে গাইরুল্লাহ থেকে পবিত্র করে ইবাদাতকে কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদন করা এবং তারই সামনে বিনয় প্রকাশ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَادْعُوْهُ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْن﴾
অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাতে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকেই আহবান করো। (সূরা মু’মিন- ৬৫)
﴿وَمَاۤ اُمِرُوْاۤ اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ ۚ حُنَفَآءَ وَيُقِيْمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَۚ وَذٰلِكَ دِيْنُ الْقَيِّمَةِ﴾
তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই করা হয়েছে যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে, সালাত কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। আর এটাই সঠিক ধর্ম। (সূরা বায়্যিনাহ- ৫)
﴿اِنَّاۤ اَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَ﴾
আমি আপনার প্রতি এ কিতাব সত্যসহ নাযিল করেছি। অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদাত করুন। (সূরা যুমার- ২)
﴿قُلْ اِنِّۤيْ اُمِرْتُ اَنْ اَعْبُدَ اللهَ مُخْلِصًا لَّهُ الدِّيْنَ﴾
বলো, অবশ্যই আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যে, আমি যেন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করি। (সূরা যুমার- ১১)
ইবাদাতের মধ্যে শিরক করা যাবে না :
﴿فَمَنْ كَانَ يَرْجُوْا لِقَآءَ رَبِّهٖ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهٖۤ اَحَدًا﴾
যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহফ- ১১০)
﴿قُلْ اِنَّمَاۤ اُمِرْتُ اَنْ اَعْبُدَ اللهَ وَلَاۤ اُشْرِكَ بِهٖ﴾
বলো, নিশ্চয় আমাকে আদেশ করা হয়েছে, যেন আমি আল্লাহর ইবাদাত করি এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করি। (সূরা রা‘দ- ৩৬)
আল্লাহর দাসত্বের সাথে অন্য কাউকে শরীক করা যাবে না। শুধু তাঁরই বিধিবিধান ও আদেশ-নিষেধ পালন করতে হবে। কারণ নির্ভেজাল আনুগত্য পাওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া একনিষ্ঠভাবে অন্য কারো দাসত্ব করে, তাহলে সে ভ্রান্ত কাজ করে। অনুরূপভাবে সে যদি আল্লাহর দাসত্বের সাথে সাথে অন্য কারো দাসত্বের সংমিশ্রণ ঘটায়, তাহলে সেটাও সরাসরি ন্যায় ও সত্যের পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে।
ব্যক্তির নিয়তের উপরই সকল আমলের সওয়াব নির্ভরশীল :
عَنْ عُمَرَ بْنَ الخَطَّابِ عَلَى الْمِنْبَرِ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : اِنَّمَا الْاَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَاِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوٰى ، فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهٗ اِلٰى دُنْيَا يُصِيْبُهَا ، اَوْ اِلَى امْرَاَةٍ يَنْكِحُهَا، فَهِجْرَتُهٗ اِلٰى مَا هَاجَرَ اِلَيْهِ
উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (রাঃ) বলেছেন, নিশ্চয় সমস্ত আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তি কেবলমাত্র তা-ই পায়, যা সে নিয়ত করে। সুতরাং যার হিজরত হবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্য তার হিজরত আল্লাহ এবং রাসূলের জন্যই হবে। আর যার হিজরত হবে দুনিয়া অর্জনের জন্য অথবা কোন মহিলাকে বিয়ে করার জন্য, তার হিজরত সেদিকেই হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে। [সহীহ বুখারী, হা/১; সহীহ মুসলিম, হা/ ; আবু দাউদ, হা/২২০৩; ইবনে মাজাহ, হা/৪২২৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৮৮; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৮৪।]
যে ব্যক্তি ইখলাস নিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করবে আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট থাকবেন :
عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ : مَنْ فَارَقَ الدُّنْيَا عَلَى الْاِخْلَاصِ لِلّٰهِ وَحْدَهٗ ، وَعِبَادَتِهٖ لَا شَرِيْكَ لَهٗ ، وَاِقَامِ الصَّلَاةِ ، وَاِيْتَاءِ الزَّكَاةِ ، مَاتَ وَاللهُ عَنْهُ رَاضٍ
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা যাবে যে, সে ইখলাস অর্জন করেছে, আল্লাহর ইবাদাতে কাউকে শরীক করেনি, সালাত কায়েম করেছে এবং যাকাত আদায় করেছে সে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির উপর মৃত্যুবরণ করবে। [ইবনে মাজাহ, হা/৭০।]
আল্লাহ মানুষের আকৃতি দেখেন না বরং তার অন্তর দেখেন :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : اِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ اِلٰى صُوَرِكُمْ وَلَا اَمْوَالِكُمْ، وَلٰكِنْ اِنَّمَا يَنْظُرُ اِلٰى قُلُوْبِكُمْ وَاَعْمَالِكُمْ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারা বা তোমাদের সম্পদের দিকে লক্ষ্য করবেন না। বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমলের দিকে লক্ষ্য করবেন। [সহীহ মুসলিম, হা/৬৭০৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৮১৪; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৯৪; মুসনাদে ইসহাক ইবনে রাওয়াহা, হা/৩৭৯।]
যার নিয়তে গলদ থাকবে হাশরের ময়দানে তা প্রকাশ পেয়ে যাবে :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ - : مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهٖ وَمَنْ رَاءَى رَاءَى اللهُ بِهٖ
আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কৃতকর্মের সুনামের জন্য লোকসমাজে ইচ্ছাপূর্বক প্রচার করে বেড়ায়, আল্লাহ তা‘আলাও (কিয়ামতের দিন) তার কৃতকর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্যের কথা লোকদেরকে জানিয়ে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে কোন সৎকাজ করবে, আল্লাহও (কিয়ামতের দিন) তার প্রকৃত উদ্দেশের কথা লোকদের মাঝে প্রকাশ করে দেবেন। [সহীহ মুসলিম, হা/৭৬৬৭; সুনানুল কুবরা, হা/১১৬৩৬।]
ইখলাছবিহীন ইবাদাত আল্লাহ গ্রহণ করেন না :
عَنْ اَبِىْ اُمَامَةَ الْبَاهِلِىِّ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ اِلَى النَّبِىِّ فَقَالَ اَرَاَيْتَ رَجُلًا غَزَا يَلْتَمِسُ الْاَجْرَ وَالذِّكْرَ مَا لَهٗ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ : لَا شَىْءَ لَهٗ . فَاَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ يَقُوْلُ لَهٗ رَسُوْلُ اللهِ : لَا شَىْءَ لَهٗ . ثُمَّ قَالَ : اِنَّ اللهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ اِلَّا مَا كَانَ لَهٗ خَالِصًا وَابْتُغِىَ بِهٖ وَجْهُهٗ
আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! এক ব্যক্তি আল্লাহর কাছে সওয়াব এবং মানুষের কাছে সুনাম অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছে। তার প্রাপ্য কী? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে কিছুই পাবে না। লোকটি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনি তিনবারই বললেন, সে কিছুই পাবে না। অতঃপর রাসূলূল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্যই করা হয় এবং এর মাধ্যমে শুধু তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করা হয়। [সুনান নাসায়ী, হা/৩১৪০; সিলসিলাহ সহীহাহ, হা/৫২।]
عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ قَالَ تَفَرَّقَ النَّاسُ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ فَقَالَ لَهٗ نَاتِلُ أَهْلِ الشَّامِ أَيُّهَا الشَّيْخُ حَدِّثْنَا حَدِيثًا سَمِعْتَهٗ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ قَالَ نَعَمْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ يَقُوْلُ : إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضٰى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ فَأُتِيَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا؟ قَالَ قَاتَلْتُ فِيْكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ . قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ قَاتَلْتَ لِأَنْ يُقَالَ جَرِيءٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ حَتّٰى أُلْقِيَ فِي النَّارِ وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهٗ وَقَرَأَ الْقُرْاٰنَ فَأُتِيَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا؟ قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهٗ وَقَرَأْتُ فِيْكَ الْقُرْاٰنَ . قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ عَالِمٌ . وَقَرَأْتَ الْقُرْاٰنَ لِيُقَالَ هُوَ قَارِئٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ حَتّٰى أُلْقِيَ فِي النَّارِ . وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهٖ فَأُتِيَ بِهٖ فَعَرَّفَهٗ نِعَمَهٗ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيْهَا؟ قَالَ مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيْلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيْهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيْهَا لَكَ قَالَ كَذَبْتَ وَلٰكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ هُوَ جَوَادٌ . فَقَدْ قِيْلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهٖ فَسُحِبَ عَلٰى وَجْهِهٖ ثُمَّ أُلْقِيَ فِي النَّارِ
সুলাইমান ইবনে ইয়াসার (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকজন যখন আবু হুরায়রা (রাঃ) এর নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখন সিরিয়াবাসী নাতিল (রহ.) বললেন, হে শাইখ! আপনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট থেকে শুনেছেন এমন একটি হাদীস আমাদেরকে শুনান। তিনি বলেন, হ্যাঁ! (শুনাব)। আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন ব্যক্তি, যে শহীদ হয়েছিল। তাঁকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তাঁর নিয়ামতরাজির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে)। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এর বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি তোমারই পথে যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষপর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি এ জন্যই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে, তুমি বীর; আর (দুনিয়াতে) তা বলাও হয়েছে। এরপর নির্দেশ দেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে যে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রদত্ত নিয়ামতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এত বড় নিয়ামত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এ জন্য যে, যাতে লোকেরা তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্যে যে, যাতে লোকে বলে- তুমি একজন ক্বারী; আর তা বলাও হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে, যাকে আল্লাহ তা‘আলা সচ্ছলতা এবং সম্পদ দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের কথা বলবেন। সে তা চিনতে পারবে (এবং স্বীকারোক্তিও করবে)। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, এসব নিয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ? জবাবে সে বলবে, যেসব খাতে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পছন্দ কর, আমি সেসব খাতে তোমার সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি বরং এ জন্য তা করেছিলে, যাতে লোকে তোমাকে ‘দানবীর’ বলে অভিহিত করে; আর তা বলাও হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে এবং সে অনুযায়ী তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৫০৩২।]
যে ব্যক্তি ইখলাছ নিয়ে কাজ করবে সে প্রশান্তি লাভ করবে :
عَنْ اَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، اَنَّ النَّبِيَّ قَالَ : مَنْ كَانَتْ نِيَّتُهٗ طَلَبُ الْاٰخِرَةِ ، جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِيْ قَلْبِهٖ ، وَجَمَعَ لَهٗ شَمْلَهٗ ، وَاَتَتْهُ الدُّنْيَا ، وَهِيَ رَاغِمَةٌ ، وَمَنْ كَانَتْ نِيَّتُهٗ طَلَبُ الدُّنْيَا ، جَعَلَ اللهُ الْفَقْرَ بَيْنَ عَيْنَيْهِ ، وَشَتَّتَ عَلَيْهِ اَمْرَهٗ ، وَلَا يَأْتِيْهِ مِنْهَا اِلَّا مَا كُتِبَ لَهٗ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন, যার উদ্দেশ্য হয় পরকালের সওয়াব অর্জন করা আল্লাহ তা‘আলা তার অন্তরকে অমুখাপেক্ষী করে দেন এবং তার জন্য সবকিছু একত্র করে দেন। তখন দুনিয়া তার কাছে আসে অথচ সে দুনিয়ার প্রতি বিমুখ থাকে। আর যার উদ্দেশ্য হয় দুনিয়া অর্জন করা আল্লাহ তাকে মুখাপেক্ষী করে দেন এবং তার কাজকর্মকে ভিন্নমুখী করে দেন। কিন্তু দুনিয়া থেকে সে ততটুকুই অর্জন করতে পারে যতটুকু তার জন্য বরাদ্ধ ছিল। [মু‘জামুল কাবীর লিত ত্বাবারানী, হা/৪৭৫৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/৪১৪২।]
তাফসীরে কুরতুবীতে আছে,
وَسُئِلَ الْحَسَنُ عَنِ الْاِخْلَاصِ وَالرِّيَاءِ فَقَالَ : مِنَ الْاِخْلَاصِ اَنْ تُحِبَّ اَنْ تَكْتُمَ حَسَنَاتَكَ وَلَا تُحِبُّ اَنْ تَكْتُمَ سَيِّئَاتَكَ، فَاِنْ اَظْهَرَ اللهُ عَلَيْكَ حَسَنَاتَكَ تَقُوْلُ هٰذَا مِنْ فَضْلِكَ وَاِحْسَانِكَ، وَلَيْسَ هٰذَا مِنْ فِعْلِيْ وَلَا مِنْ صَنِيْعِيْ
একদা হাসান বসরী (রহ.) কে ইখলাস ও রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, ইখলাস হচ্ছে ভালো কাজের গোপনীয়তা পছন্দ করা এবং মন্দ কাজের গোপনীয়তা পছন্দ না করা। এরপর যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমার আমল মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেন, তবে তুমি এ কথা বলো, হে আল্লাহ! এটা আপনার অনুগ্রহ ও কৃপা; আমার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফল নয়। [তাফসীরে কুরতুবী, সূরা কাহফের ১১০নং আয়াতের তাফসীর।]
যে আমল খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে এবং লোকমুখে সুখ্যাতি ও প্রশংসার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ থাকে না, সে আমল যদি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করে লোকের মাঝে প্রসিদ্ধ করে দেন এবং মানুষের মুখ দিয়ে প্রশংসা করিয়ে দেন, তবে এর সাথে রিয়ার কোন সম্পর্ক নেই।
عَنْ اَبِىْ ذَرٍّ قَالَ قِيْلَ لِرَسُوْلِ اللهِ اَرَاَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ : تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ
আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কী মতামত, যে সৎ আমল করে এবং লোকেরা তার প্রশংসা করে? তিনি বললেন, এটা মুমিনের অগ্রীম সুসংবাদ। [সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৯১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৪১৭; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬৬।]
৩. اِتِّبَاعُ السُّنُّةِ (ইত্তেবাউস সুন্নাহ)
ইত্তিবাউস সুন্নাহ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যে শরীয়াত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণে ইবাদাত করা। এর অর্থ নবী ﷺ যে কাজ যেভাবে করেছেন সে কাজ সেই নিয়মে করা, কোন প্রকার কমবেশি না করা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশনা বাদ দিয়ে অন্য কারো নির্দেশনা অনুযায়ী না করা।
আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে নবী ﷺ এর আনুগত্য করতে হবে :
﴿قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ ؕ وَاللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ﴾
বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা আলে ইমরান- ৩১)
এ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর ভালোবাসা পাওয়াকে নবী ﷺ এর আনুগত্যের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসবে, আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করবে এবং জান্নাতে যেতে চাইবে তাকে অবশ্যই নবী মুহাম্মাদ ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ করতে হবে।
নবী ﷺ এর আদেশ-নিষেধ পালন করা উম্মতের জন্য অত্যাবশ্যক :
﴿وَمَاۤ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُۗ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْاۚ وَاتَّقُوا اللهَؕ اِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ﴾
রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা হতে বিরত থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে খুবই কঠোর। (সূরা হাশর- ৭)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) একবার বক্তৃতাকালে বললেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা অমুক অমুক ফ্যাশনকারিণী মহিলাকে লানত করেছেন।’’ এটা শুনে এক মহিলা বলল, এ কথা আপনি কোথায় পেয়েছেন? তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর কিতাব পড়ে থাকলে এ কথা অবশ্যই পেতে। তুমি কি এ আয়াত وَمَاۤ اٰتَاكُمُ الرَّسُوْلُ فَخُذُوْهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوْا পড়েছ? সে বলল, হ্যাঁ, এ আয়াত তো আমি পড়েছি। আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, এরূপ কাজে লিপ্ত নারীদের উপর আল্লাহ তা‘আলা লানত করেছেন। তখন মাহিলাটি বলল, এখন আমি বুঝতে পারলাম। [সহীহ বুখারী, হা/৪৮৮৬, মুসলিম হা/৫৬৯৫।]
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ ، عَنِ النَّبِيِّ قَالَ : دَعُوْنِيْ مَا تَرَكْتُكُمْ اِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِسُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلٰى اَنْبِيَائِهِمْ فَاِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوْهُ ، وَاِذَا اَمَرْتُكُمْ بِاَمْرٍ فَأْتُوْا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমাকে প্রশ্ন করা ছেড়ে দাও, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে কিছু বলি (অর্থাৎ প্রয়োজন ছাড়া প্রশ্ন করো না)। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা অধিক প্রশ্ন এবং তাদের নবীদের সাথে মতভেদ করার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই যখন আমি কোন বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি, তখন তোমরা তা থেকে বিরত থাকবে। আর যখন কোন বিষয়ে আদেশ করি, তখন যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের শক্তি সামর্থ্য থাকবে তা করবে। [সহীহ বুখারী, হা/৭২৮৮; সহীহ মুসলিম, হা/৩৩২১।]
নবী ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ না করলে আমল বাতিল হয়ে যাবে :
﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اَطِيْعُوا اللهَ وَاَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَلَا تُبْطِلُوْاۤ اَعْمَالَكُمْ﴾
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমলকে নষ্ট করে দিয়ো না। (সূরা মুহাম্মাদ- ৩৩)
এ আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী বুঝা যায় যে, আল্লাহর ইবাদাত করতে হবে আল্লাহর নির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নির্দেশনা অনুযায়ী।
নবী ﷺ এর আনুগত্য না করা মানে তাকে অস্বীকার করা :
عَنْ اَبِيْ هُرَيْرَةَ، اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : كُلُّ أُمَّتِيْ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ، اِلَّا مَنْ اَبٰى . قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَنْ يَأْبٰى . قَالَ : مَنْ اَطَاعَنِيْ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ اَبٰى
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে শুধু ঐ ব্যক্তি ছাড়া যে অস্বীকার করবে। সাহাবায়ে কেরামগণ প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! কে অস্বীকার করে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, যে আমার আনুগত্য করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যে আমার আনুগত্য না করে অবাধ্য হবে সেই অস্বীকারকারী। [সহীহ বুখারী, হা/৭২৮০।]