১
যেসব কারণে ইবাদাত বরবাদ হয়
লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
ইবাদাতের গুরুত্ব
ইবাদাতের গুরুত্ব অনেক। আল্লাহ তা‘আলা মানুষ ও জিন জাতিকে তাঁর ইবাদাতের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ﴾
আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদাত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।
(সূরা যারিয়াত- ৫৬)
আল্লাহর আহবান :
﴿يَاۤ اَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ وَالَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ﴾
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদাত করো, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা বাক্বারা- ২১)
ইবাদাত হচ্ছে মানুষের প্রতি আল্লাহর হক বা অধিকার :
মানুষের প্রতি আল্লাহর হক বা অধিকার হচ্ছে কোন প্রকার শিরক না করে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা। হাদীসে এসেছে,
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ كُنْتُ رِدْفَ النَّبِيِّ لَيْسَ بَيْنِيْ وَبَيْنَهٗ اِلَّا مُؤْخِرَةُ الرَّحْلِ فَقَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . ثُمَّ سَارَ سَاعَةً ثُمَّ قَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . ثُمَّ سَارَ سَاعَةَ ثُمَّ قَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . قَالَ : هَلْ تَدْرِيْ مَا حَقُّ اللهِ عَلَى الْعِبَادِ . قَالَ قُلْتُ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ اَعْلَمُ . قَالَ : فَاِنَّ حَقَّ اللهِ عَلَى الْعِبَادِ اَنْ يَعْبُدُوْهُ وَلَا يُشْرِكُوْا بِهٖ شَيْئًا . ثُمَّ سَارَ سَاعَةً ثُمَّ قَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . قَالَ : هَلْ تَدْرِيْ مَا حَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللهِ اِذَا فَعَلُوْا ذٰلِكَ . قَالَ قُلْتُ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ اَعْلَمُ . قَالَ : اَنْ لَا يُعَذِّبَهُمْ
মু‘আয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সময় নবী ﷺ এর বাহনের পেছনে বসা ছিলাম। আমার ও নবী ﷺ এর মাঝে হাওদার কাঠের টুকরা ব্যতীত অন্য কোন ব্যবধান ছিল না। এমতাবস্থায় নবী ﷺ বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। অতঃপর তিনি কিছু দূর অগ্রসর হয়ে পুনরায় বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। অতঃপর তিনি কিছু দূর অগ্রসর হয়ে পুনরায় বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। তিনি বললেন, তুমি কি জান, বান্দার উপর আল্লাহর কী হক রয়েছে? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। নবী ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা তাঁর ইবাদাত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না। অতঃপর কিছু দূর চলার পর আবার বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। নবী ﷺ বললেন, তুমি কি জান, এগুলো করলে আল্লাহর কাছে বানদার কী হক আছে? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। নবী ﷺ বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তাকে শাস্তি দেবেন না। [সহীহ মুসলিম, হা/১৫৪।]
ইবাদাত করতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত :
﴿وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتّٰى يَاْتِيَكَ الْيَقِيْنُ﴾
হে নবী! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার কাছে নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদাত করতে থাকো। (সূরা হিজর- ৯৯)
ইবাদাতের সুযোগ খুঁজে বের করতে হবে :
﴿يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنَّ اَرْضِيْ وَاسِعَةٌ فَاِيَّايَ فَاعْبُدُوْنِ﴾
হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয় আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো। (সূরা আনকাবূত- ৫৬)
ইবাদাত করতে হবে দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সাথে :
﴿رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهٖؕ هَلْ تَعْلَمُ لَهٗ سَمِيًّا﴾
তিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক। সুতরাং তাঁরই ইবাদাত করো এবং তাঁর ইবাদাতে ধৈর্যশীল হও। তুমি কি তাঁর সমগুণসম্পন্ন কাউকে জান? (সূরা মারইয়াম- ৬৫)
ইবাদাতে অগ্রগামী হওয়ার জন্য নবী ﷺ এর তাকিদ :
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : بَادِرُوْا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِىْ كَافِرًا أَوْ يُمْسِىْ مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيْعُ دِيْنَهٗ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা আমলের ব্যাপারে দ্রুতগামী হও, অন্ধকার রাতের মতো ঘনিয়ে আসা ফিতনা আগমনের পূর্বে। তখন কোন ব্যক্তি সকাল করবে মুমিন অবস্থায় এবং সন্ধ্যা করবে কাফির অবস্থায়। আবার সন্ধ্যা করবে মুমিন অবস্থায় এবং সকাল করবে কাফির অবস্থায়। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের কারণে সে তার দ্বীনকে বিক্রি করে দেবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৩২৮।]
সকল নবীই মানুষকে ইবাদাতের দিকে আহবান করেছেন
আল্লাহ তা‘আলা যেসকল নবী পাঠিয়েছেন সকল নবীরই মূল দায়িত্ব ছিল মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহবান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِيْ كُلِّ اُمَّةٍ رَّسُوْلًا اَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ﴾
আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি (এ নির্দেশ দিয়ে যে) তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তাগুতকে বর্জন করবে। (সূরা নাহল- ৩৬)
﴿وَمَاۤ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا نُوْحِيْۤ اِلَيْهِ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنَاْ فَاعْبُدُوْنِ﴾
আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি, যার প্রতি এ ওহী করিনি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো। (সূরা আম্বিয়া- ২৫)
নূহ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿لَقَدْ اَرْسَلْنَا نُوْحًا اِلٰى قَوْمِه فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُه ﴾
আমি তো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই। (সূরা আ‘রাফ- ৫৯)
হুদ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿وَاِلٰى عَادٍ اَخَاهُمْ هُوْدًاؕ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗؕ اَفَلَا تَتَّقُوْنَ﴾
আমি আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা তাঁকে ভয় করবে না? (সূরা আ‘রাফ- ৬৫)
সালেহ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿وَاِلٰى ثَمُوْدَ اَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُه ﴾
সামূদ জাতির নিকট তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো। তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কোন ইলাহ্ নেই। (সূরা আ‘রাফ- ৭৩)
শুয়াইব (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿وَاِلٰى مَدْيَنَ اَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ﴾
আমি মাদইয়ানবাসীর নিকট তাদেরই ভাই শুয়াইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের জন্য অন্য কোন সত্য মাবুদ নেই। (সূরা আ‘রাফ- ৮৫)
ইয়াকূব (আঃ) এর সন্তানদের ঘোষণা :
﴿اَمْ كُنْتُمْ شُهَدَآءَ اِذْ حَضَرَ يَعْقُوْبَ الْمَوْتُ اِذْ قَالَ لِبَنِيْهِ مَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ ۢبَعْدِيْؕ قَالُوْا نَعْبُدُ اِلٰهَكَ وَاِلٰهَ اٰبَآئِكَ اِبْرَاهِيْمَ وَاِسْمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ اِلٰهًا وَّاحِدًاۚ وَنَحْنُ لَهٗ مُسْلِمُوْنَ﴾
তোমরা কি ঐ সময় উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকূবের মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং তিনি নিজ পুত্রদেরকে বলেছিলেন, আমার (মৃত্যুর) পর তোমরা কোন জিনিসের ইবাদাত করবে? তারা বলেছিল, আমরা আপনার ইলাহ্ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের মাবুদের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য এবং আমরা তাঁরই অনুগত থাকব। (সূরা বাক্বারা- ১৩৩)
ইউসুফ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ اَاَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُوْنَ خَيْرٌ اَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ‐ مَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِه ۤ اِلَّاۤ اَسْمَآءً سَمَّيْتُمُوْهَاۤ اَنْتُمْ وَاٰبَآؤُكُمْ مَّاۤ اَنْزَلَ اللهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍؕ اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ اَمَرَ اَلَّا تَعْبُدُوْاۤ اِلَّاۤ اِيَّاهُؕ ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ ﴾
হে কারাসঙ্গীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরাই রেখেছ। এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠাননি। বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁরই ইবাদাত করবে, আর এটাই শাশ্বত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। (সূরা ইউসুফ- ৩৯, ৪০)
ঈসা (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿اِنَّ اللهَ رَبِّيْ وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوْهُؕ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ আমার এবং তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদাত করো; এটাই সঠিক পথ। (সূরা আলে ইমরান- ৫১)
মুহাম্মাদ ﷺ এর দাওয়াত :
﴿قُلْ يَاۤ اَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا اِلٰى كَلِمَةٍ سَوَآءٍ ۢبَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ اَلَّا نَعْبُدَ اِلَّا اللهَ وَلَا نُشْرِكَ بِه شَيْئًا وَّلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا اَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللهِؕ فَاِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوا اشْهَدُوْا بِاَنَّا مُسْلِمُوْنَ﴾
বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা এমন একটি কালিমার দিকে এসো, যা তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে সমান। আর তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করব না এবং তার সাথে কোনকিছুকে শরীক স্থাপন করব না; আর আমাদের কেউ অপর কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করবে না। এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমরা মুসলিম। (সূরা আলে ইমরান- ৬৪)
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ﴾
আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদাত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।
(সূরা যারিয়াত- ৫৬)
আল্লাহর আহবান :
﴿يَاۤ اَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ وَالَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ﴾
হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদাত করো, যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা বাক্বারা- ২১)
ইবাদাত হচ্ছে মানুষের প্রতি আল্লাহর হক বা অধিকার :
মানুষের প্রতি আল্লাহর হক বা অধিকার হচ্ছে কোন প্রকার শিরক না করে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা। হাদীসে এসেছে,
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ قَالَ كُنْتُ رِدْفَ النَّبِيِّ لَيْسَ بَيْنِيْ وَبَيْنَهٗ اِلَّا مُؤْخِرَةُ الرَّحْلِ فَقَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . ثُمَّ سَارَ سَاعَةً ثُمَّ قَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . ثُمَّ سَارَ سَاعَةَ ثُمَّ قَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . قَالَ : هَلْ تَدْرِيْ مَا حَقُّ اللهِ عَلَى الْعِبَادِ . قَالَ قُلْتُ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ اَعْلَمُ . قَالَ : فَاِنَّ حَقَّ اللهِ عَلَى الْعِبَادِ اَنْ يَعْبُدُوْهُ وَلَا يُشْرِكُوْا بِهٖ شَيْئًا . ثُمَّ سَارَ سَاعَةً ثُمَّ قَالَ : يَا مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ . قُلْتُ لَبَّيْكَ رَسُوْلَ اللهِ وَسَعْدَيْكَ . قَالَ : هَلْ تَدْرِيْ مَا حَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللهِ اِذَا فَعَلُوْا ذٰلِكَ . قَالَ قُلْتُ اللهُ وَرَسُوْلُهٗ اَعْلَمُ . قَالَ : اَنْ لَا يُعَذِّبَهُمْ
মু‘আয ইবনে জাবাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সময় নবী ﷺ এর বাহনের পেছনে বসা ছিলাম। আমার ও নবী ﷺ এর মাঝে হাওদার কাঠের টুকরা ব্যতীত অন্য কোন ব্যবধান ছিল না। এমতাবস্থায় নবী ﷺ বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। অতঃপর তিনি কিছু দূর অগ্রসর হয়ে পুনরায় বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। অতঃপর তিনি কিছু দূর অগ্রসর হয়ে পুনরায় বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। তিনি বললেন, তুমি কি জান, বান্দার উপর আল্লাহর কী হক রয়েছে? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। নবী ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা তাঁর ইবাদাত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না। অতঃপর কিছু দূর চলার পর আবার বললেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি উপস্থিত আছি। নবী ﷺ বললেন, তুমি কি জান, এগুলো করলে আল্লাহর কাছে বানদার কী হক আছে? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। নবী ﷺ বললেন, আল্লাহ তা‘আলা তাকে শাস্তি দেবেন না। [সহীহ মুসলিম, হা/১৫৪।]
ইবাদাত করতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত :
﴿وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتّٰى يَاْتِيَكَ الْيَقِيْنُ﴾
হে নবী! যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার কাছে নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদাত করতে থাকো। (সূরা হিজর- ৯৯)
ইবাদাতের সুযোগ খুঁজে বের করতে হবে :
﴿يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنَّ اَرْضِيْ وَاسِعَةٌ فَاِيَّايَ فَاعْبُدُوْنِ﴾
হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয় আমার পৃথিবী প্রশস্ত; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো। (সূরা আনকাবূত- ৫৬)
ইবাদাত করতে হবে দৃঢ়তা ও ধৈর্যের সাথে :
﴿رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْاَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهٖؕ هَلْ تَعْلَمُ لَهٗ سَمِيًّا﴾
তিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক। সুতরাং তাঁরই ইবাদাত করো এবং তাঁর ইবাদাতে ধৈর্যশীল হও। তুমি কি তাঁর সমগুণসম্পন্ন কাউকে জান? (সূরা মারইয়াম- ৬৫)
ইবাদাতে অগ্রগামী হওয়ার জন্য নবী ﷺ এর তাকিদ :
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ : بَادِرُوْا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِىْ كَافِرًا أَوْ يُمْسِىْ مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيْعُ دِيْنَهٗ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা আমলের ব্যাপারে দ্রুতগামী হও, অন্ধকার রাতের মতো ঘনিয়ে আসা ফিতনা আগমনের পূর্বে। তখন কোন ব্যক্তি সকাল করবে মুমিন অবস্থায় এবং সন্ধ্যা করবে কাফির অবস্থায়। আবার সন্ধ্যা করবে মুমিন অবস্থায় এবং সকাল করবে কাফির অবস্থায়। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের কারণে সে তার দ্বীনকে বিক্রি করে দেবে। [সহীহ মুসলিম, হা/৩২৮।]
সকল নবীই মানুষকে ইবাদাতের দিকে আহবান করেছেন
আল্লাহ তা‘আলা যেসকল নবী পাঠিয়েছেন সকল নবীরই মূল দায়িত্ব ছিল মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহবান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِيْ كُلِّ اُمَّةٍ رَّسُوْلًا اَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ﴾
আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি (এ নির্দেশ দিয়ে যে) তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তাগুতকে বর্জন করবে। (সূরা নাহল- ৩৬)
﴿وَمَاۤ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا نُوْحِيْۤ اِلَيْهِ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنَاْ فَاعْبُدُوْنِ﴾
আমি তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি, যার প্রতি এ ওহী করিনি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো। (সূরা আম্বিয়া- ২৫)
নূহ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿لَقَدْ اَرْسَلْنَا نُوْحًا اِلٰى قَوْمِه فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُه ﴾
আমি তো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই। (সূরা আ‘রাফ- ৫৯)
হুদ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿وَاِلٰى عَادٍ اَخَاهُمْ هُوْدًاؕ قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗؕ اَفَلَا تَتَّقُوْنَ﴾
আমি আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তবুও কি তোমরা তাঁকে ভয় করবে না? (সূরা আ‘রাফ- ৬৫)
সালেহ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿وَاِلٰى ثَمُوْدَ اَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُه ﴾
সামূদ জাতির নিকট তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো। তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কোন ইলাহ্ নেই। (সূরা আ‘রাফ- ৭৩)
শুয়াইব (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿وَاِلٰى مَدْيَنَ اَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِّنْ اِلٰهٍ غَيْرُهٗ﴾
আমি মাদইয়ানবাসীর নিকট তাদেরই ভাই শুয়াইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের জন্য অন্য কোন সত্য মাবুদ নেই। (সূরা আ‘রাফ- ৮৫)
ইয়াকূব (আঃ) এর সন্তানদের ঘোষণা :
﴿اَمْ كُنْتُمْ شُهَدَآءَ اِذْ حَضَرَ يَعْقُوْبَ الْمَوْتُ اِذْ قَالَ لِبَنِيْهِ مَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ ۢبَعْدِيْؕ قَالُوْا نَعْبُدُ اِلٰهَكَ وَاِلٰهَ اٰبَآئِكَ اِبْرَاهِيْمَ وَاِسْمَاعِيْلَ وَاِسْحَاقَ اِلٰهًا وَّاحِدًاۚ وَنَحْنُ لَهٗ مُسْلِمُوْنَ﴾
তোমরা কি ঐ সময় উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকূবের মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং তিনি নিজ পুত্রদেরকে বলেছিলেন, আমার (মৃত্যুর) পর তোমরা কোন জিনিসের ইবাদাত করবে? তারা বলেছিল, আমরা আপনার ইলাহ্ এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের মাবুদের ইবাদাত করব। তিনি একক উপাস্য এবং আমরা তাঁরই অনুগত থাকব। (সূরা বাক্বারা- ১৩৩)
ইউসুফ (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ اَاَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُوْنَ خَيْرٌ اَمِ اللهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ‐ مَا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِه ۤ اِلَّاۤ اَسْمَآءً سَمَّيْتُمُوْهَاۤ اَنْتُمْ وَاٰبَآؤُكُمْ مَّاۤ اَنْزَلَ اللهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍؕ اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ اَمَرَ اَلَّا تَعْبُدُوْاۤ اِلَّاۤ اِيَّاهُؕ ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ وَلٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَ ﴾
হে কারাসঙ্গীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতগুলো নামের ইবাদাত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরাই রেখেছ। এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠাননি। বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁরই ইবাদাত করবে, আর এটাই শাশ্বত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। (সূরা ইউসুফ- ৩৯, ৪০)
ঈসা (আঃ) এর দাওয়াত :
﴿اِنَّ اللهَ رَبِّيْ وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوْهُؕ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيْمٌ﴾
নিশ্চয় আল্লাহ আমার এবং তোমাদের প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁরই ইবাদাত করো; এটাই সঠিক পথ। (সূরা আলে ইমরান- ৫১)
মুহাম্মাদ ﷺ এর দাওয়াত :
﴿قُلْ يَاۤ اَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا اِلٰى كَلِمَةٍ سَوَآءٍ ۢبَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ اَلَّا نَعْبُدَ اِلَّا اللهَ وَلَا نُشْرِكَ بِه شَيْئًا وَّلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا اَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللهِؕ فَاِنْ تَوَلَّوْا فَقُوْلُوا اشْهَدُوْا بِاَنَّا مُسْلِمُوْنَ﴾
বলো, হে আহলে কিতাব! তোমরা এমন একটি কালিমার দিকে এসো, যা তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে সমান। আর তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করব না এবং তার সাথে কোনকিছুকে শরীক স্থাপন করব না; আর আমাদের কেউ অপর কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করবে না। এরপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমরা মুসলিম। (সূরা আলে ইমরান- ৬৪)