hadith book logo

মহা উপদেশ (‘আদী ইবন মুসাফিরের অনুসারীদের এর কাছে লেখা চিঠি)

লেখকঃ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

পরিচ্ছেদ

ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলার দীন তথা জীবন ব্যবস্থা হলো বাড়াবাড়ি ও কঠোরতার মাঝে মধ্যপন্থা। আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের যে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে শয়তান দু‘টি জিনিষ তুলে ধরেছে যে কোনো একটি দ্বারা সফল হয় তাতে কোনো অসুবিধা নেই। এক- সীমালঙ্ঘন, দুই- শিথিলতা। এ দু’টি কোনটি দিয়ে সফলতা আসল তা তার দেখার বিষয় নয়।

ইসলাম আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত শাশ্বত দীন তথা জীবন ব্যবস্থা। এ দীন ব্যতীত আল্লাহ তা‘আলা কারও নিকট থেকে অন্য কিছু গ্রহণ করবেন না। অথচ ইসলামে দীক্ষিত অনেককেই শয়তান গ্রাস করেছে। এমনকি বহু লোককে ইসলামের অনেক বিধান থেকে শয়তান বিচ্যুত করেছে। বরং উম্মতের শীর্ষস্থানীয় বহু আবেদ ও তাকওয়া দীপ্ত গোষ্ঠীকে পদস্খলিত করেছে। তারা ইসলাম থেকে পরিষ্কার বের হয়ে গেছে; যেমন ধনুক থেকে তীর বের হয়ে যায়।

ক- অধিক ইবাদাত করার পরও দীন থেকে বের হয়ে যাওয়া:

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী প্রশাসনকে দীন থেকে বের হওয়া এসব ব্যক্তিদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ মর্মে আমীরুল মুমিনীন আলী, আবু সা‘ঈদ খুদরী, সাহল ইবন হানীফ, আবু যর গিফারী, সা‘আদ ইবন আবী ওয়াক্কাস, আব্দুল্লাহ ইবন উমার, ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমসহ প্রমুখ কর্তৃক বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্য গ্রন্থে সহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খারেজী সম্প্রদায়ের উল্লেখ পূর্বক তাদের বিবরণীতে বলেছেন-

«يحقر أحدكم صلاته مع صلاتهم، وصيامه مع صيامهم، وقراءته مع قراءتهم، يقرأون القرآن لا يجاوز حناجرهم، يمرقون من الإسلام كما يمرق السهم من الرمية، أينما لقيتموهم فاقتلوهم أو فقاتلوهم فإن في قتلهم أجرا عند الله لمن قتلهم يوم القيامة، لئن أدركتهم لأقتلنهم قتل عاد»

“তাদের সালাতের পাশে তোমাদের সালাত (সালাত) তোমাদের কাছেই তুচ্ছ বলে মনে হবে। তাদের সাওমের (রোযা) পাশে তোমাদের সাওম তোমাদের কাছেই তুচ্ছ বলে মনে হবে। তাদের কুরআন পাঠের পাশে তোমাদের কুরআন পাঠ তোমাদের নিকট তুচ্ছ মনে হবে। তারা কুরআন পাঠে রত থাকবে, কিন্তু কুরআন তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তীর যেমন ধনুক থেকে (দ্রুত) বেরিয়ে যায় তেমনি তারা ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে আবার বেরিয়ে যাবে। তোমরা যখন যেখানেই তাদেরকে পাবে তখন তাদেরকে হত্যা কর অথবা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। কারণ তাদেরকে যারা হত্যা করবে তাদের জন্যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার নিকট পুরস্কার থাকবে। আমি যদি তাদেরকে পাই তবে ‘আদ সম্প্রদায়কে যেভাবে নির্মূল করা হয়েছিল সেভাবেই আমি তাদেরকে হত্যা করে নির্মূল করব। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৬৬]

অপর বর্ণনায় এসেছে,

«شر قتيل تحت أديم السماء خير قتيل من قتلوه»

“আসমানের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট নিহত হলো এরাই। পক্ষান্তরে এদের হাতে যারা শহীদ হবে তারা হবে সর্বোত্তম নিহত”। [সহীহ বুখারী]

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

«لَوْ يَعْلَمُ الْجَيْشُ الَّذِينَ يُصِيبُونَهُمْ مَا قُضِيَ لَهُمْ عَلَى لِسَانِ نَبِيِّهِمْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَنَكَلُوا عَنِ الْعَمَلِ»

“খারেজীদের যারা হত্যা করে তারা যদি রাসূলের ভাষায় তাদের জন্য যা ফায়সালা করা হয়েছে তা জানত, তা হলে তারা আমল করা থেকে বিরত থাকত”। [সহীহ বুখারী: ৩৮৩/৬, সুনান আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭৬৮]

আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর খিলাফত আমলে যখন ঐসব খারিজীদের আবির্ভাব ঘটে তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত নির্দেশ মোতাবেক ও তাদেরকে হত্যার প্রতি উৎসাহ দানের ভিত্তিমূলক হাদীসের আলোকে সমকালীন মুসলিম নেতৃবৃন্দের মতৈক্য অনুযায়ী আলী রা. ও অন্যান্য সাহাবীগণ তাদেরকে হত্যা করেন। তাদের হত্যার ব্যাপারে ইসলামের সব নেতৃবৃন্দ একমত হন।

এমনভাবে রাষ্ট্রীয় নির্দেশে হত্যা করা হয় মুসলিমদের দল পরিত্যাগকারীদেরকে। আরো হত্যা করা হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ও শরী‘আতের বিরোধিতাকারী ও ভ্রান্ত প্রবৃত্তির পূজারী এবং বিদ‘আতের অনুসারীদেরকে।

খ- এমন বাড়াবাড়ি যা কুফুরির দিকে নিয়ে যায়:

এরই ভিত্তিতে মুসলিমগণ রাফেদ্বী সম্প্রদায়কেও হত্যা করে। কারণ, তারা ওই (খারেজী) ভ্রান্ত দলের চেয়েও নিকৃষ্ট। এরা তিন খলীফাসহ অন্যান্য শাসক ও শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ব্যক্তিত্বকে কাফির বলে আখ্যায়িত করে। তারা দাবী করে পৃথিবীতে কেবল তারাই ঈমানদার বাকী সবাই কাফির। তারা আরও কাফির বলে থাকে সেসব মুমিন লোকদেরকে, যারা আল্লাহ তা‘আলাকে আখিরাতে দেখতে পাবে বলে বিশ্বাস করে, অথবা আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলী রয়েছে বলে বিশ্বাস করে, তাঁর জন্য পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা ও পরিপূর্ণ ইচ্ছা শক্তির গুণ সাব্যস্ত করে। তারা যে বিদআতের ওপর প্রতিষ্ঠিত তার প্রতি ভিন্নমত পোষণকারীদেরকে তারা কাফির আখ্যায়িত করে।

তারা মোজা ছাড়াই দু পা মাসাহ করে। তারা তারকা উদয় হওয়া পর্যন্ত মাগরিবের সালাত ও ইফতার বিলম্ব করে। বিনা কারণে দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রিত করে পড়ে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে সর্বদা কুনুতে নাযিলাহ বা বদ-দো‘আ পাঠ করে। মাশরুম জাতীয় খাবারকে হারাম মনে করে, ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের দ্বারা যবাইকৃত পশু ও তাদের ভিন্নমত পোষণকারী মুসলিমদের দ্বারা জবাই করা পশুর গোস্ত হারাম ভাবে। কারণ তাদের নিকট এরা সবাই কাফির। তারা সাহাবীগণের বিষয়ে মারাত্মক কথা বলে- যা এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। এরূপ বিবিধ কারণে আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধানের আলোকে মুসলিমগণ তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।