১
মহা উপদেশ (‘আদী ইবন মুসাফিরের অনুসারীদের এর কাছে লেখা চিঠি)
লেখকঃ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৯
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত মধ্যপন্থী দল
অনুরূপভাবে দলসমূহের মধ্যেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত মধ্যপন্থী দল: দলসমূহের মধ্যেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত মধ্য পন্থী দল:
মুমিনগণ আল্লাহর নাম সিফাত ও আয়াতসমূহের বিষয়েও মধ্যপন্থী। তারা আহলে তা‘তিল তথা নির্গুণবাদী, যারা যারা আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহকে অর্থহীন করে, আর স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তারা তাকে অকার্যকর বলে আখ্যায়িত করে। [মু‘আত্তিলাহ: ঐ সব লোক যারা আল্লাহর সিফাতসমূহকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর সিফাতগুলো তার সত্বার সাথে থাকার কথাকে মানে না। আল্লাহর যে সব গুণ তার স্বয়ং সম্পন্নতা ও কামালিয়াতের ওপর প্রমাণ, তারা তা আল্লাহ থেকে অস্বীকার করে। সর্বপ্রথম ইসলামে এ ভ্রান্ত আকীদা যিনি চালু করেন, তার নাম জা‘আদ ইবন দিরহাম। আর তার থেকে এ বিষয়গুলো গ্রহণ করে তার ছাত্র জাহাম ইবন সাফওয়ান।] এমনকি তারা একগুলোকে অস্তিত্বহীন ও মৃতের সাথে তুলনা করে। মুমিনগণ তাদের (এই আহলে তা‘তীল) ও আহলে তামসীল [এর অর্থ সাদৃস্য স্থাপন করা। যেমন, একটি বস্তুকে আরেকটি বস্তুর সাথে তুলনা করা। উভয় বস্তুকে সমান মনে করা, কোন বস্তুকে অপর বস্তুর মতো করে তৈরি করা। সুতরাং আল্লাহর সিফাত ও গুণাবলী কখনো মাখলুকের সিফাত বা গুণাবলীর সাদৃশ্য হতে পারে না। কারণ, আল্লাহর সত্বা, সিফাত, নামসমূহ এবং কর্মে তার কোন দৃষ্টান্ত নেই, তার কোনো সাদৃশ্য নেই এবং তার কোনো তুলনা নেই। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١﴾ [ الشورى : ١١ ] তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] সাদৃশ্য স্থাপন করা দুই প্রকার: এক- সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তুলনা করা। যেমন, খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামকে এবং উযাইর আলাইহিস সালামকে এবং মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর সাথে তুলনা করে। দুই- স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা। যেমন, সাদৃশবাদীরা বলে, আল্লাহর আমাদের হাতের মতো হাত রয়েছে আর আমাদের কানের মতো কান রয়েছে। আর বস্তুত সব সাদৃশবাদীরাই মু‘আত্তিলা বা নির্গুণবাদী।] তথা স্বাদৃশ্যবাদীদের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে। এ আহলে তামসীল অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলা জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ও তাকে মাখলুকের সাথে তুলনা করে। (অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার উদাহরণ বর্ণনা করে এবং আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে আল্লাহ তা‘আলাকে সাদৃশ্য স্থাপন করে। [অনুবাদক]) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা‘আলার নাম ও গুণাবলী তেমনি যেমন তিনি তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে তার গুণাগুণ করেছেন; কোনো প্রকার তাহরীফ (বিকৃতি), অস্বীকার, তাকয়ীফ [তাকয়ীফ: কোনো বস্তুর নির্দিষ্ট ধরণ বর্ণনা করা বা ধরণ সাব্যস্ত করাকে তাকয়ীফ বলা হয়। কোনো বস্তুর ধরণ হলো, তার অবস্থা বা তার গুণাগুণ নির্ধারণ। আর আল্লাহর অবস্থা বা ধরণ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই তার স্বীয় ইলমে সংরক্ষণ করেছেন। এ বিষয়গুলো তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। কোনো মাখলুকের জন্য সে সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, গুণ সব সময় সত্বার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। সত্বার ধরণকেই যদি জানার সুযোগ না থাকে তাহলে তার সিফাতের ধরণ কীভাবে জানা সম্ভব হবে?। ইমাম মালেক রহ.কে ইস্তেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইস্তেওয়া ধরণ কি? উত্তরে তিনি বললেন, ইস্তেওয়া অবশ্যই প্রমাণিত ও তার অর্থ বিদিত, কিন্তু তার ধরণ অজ্ঞাত, এর ওপর বিশ্বাস ওয়াজিব এবং এর ধরণ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা বিদ‘আত।] (ধরণ) বর্ণনা করা ও উদাহরণ উপস্থাপন করা ছাড়া।
অনুরূপভাবে মুমিনগণ ‘আল্লাহর সৃষ্টি ও আদেশ’ অধ্যায়েও মধ্যপন্থী। তারা আল্লাহ তা‘আলার কুদরতকে অস্বীকারকারী ক্বাদারিয়্যা; যারা আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা, তার সার্বজনীন ইচ্ছা এবং তিনি যে সব কিছুর স্রষ্টা তার ওপর ঈমান রাখে না, অথচ তিনি সকল কিছুর স্রষ্টা। মুমিনগণ সে কাদারিয়্যা সম্প্রদায় ও জাবরিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে, কারণ এ জাবরিয়্যা সম্প্রদায় বলে, বান্দার কোনো কিছু করার ইচ্ছাশক্তি নেই, ক্ষমতা নেই, কোনো কর্ম নেই। তাই তারা, আল্লাহ তা‘আলার আদেশ, নিষেধ, সওয়াব ও শাস্তির সকল বিধান বাতিল ও অকার্যকর মনে করে। ফলে তারা ঐসব মুশরিকদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা‘আলা যদি চাইতেন তবে আমরা শির্ক করতাম না এবং আমাদের বাপ-দাদারাও করত না, আর কোনো জিনিসও আমরা হারাম করতাম না । এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشۡرَكُواْ لَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشۡرَكۡنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمۡنَا مِن شَيۡءٖۚ ١٤٨﴾ [ الانعام : ١٤٨ ]
“যারা শির্ক করে তারা বলে, আল্লাহ তা‘আলা যদি চাইতেন তবে আমরা শির্ক করতাম না এবং আমাদের বাপ-দাদারাও করত না, আর কোনো জিনিসও আমরা হারাম করতাম না”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৪৮]
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি বান্দাদের হিদায়াত দেওয়ার করার ক্ষমতা রাখেন এবং তাদের হৃদয় পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি আল্লাহ যা চান তা হয়, আর যা তিনি চান না, তা হয় না। তার রাজত্বে এমন কিছু সংঘটিত হয় না যার ইচ্ছা তিনি করেন নি। তার ইচ্ছা বাস্তবায়নে তিনি অপারগ বা অক্ষম নন। তিনি বস্তুনিচয়, গুণাগুণ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা।
আর তারা এ কথাও বিশ্বাস করে যে, বান্দার ক্ষমতা, ইচ্ছা ও কর্ম রয়েছে। সে ইচ্ছে মাফিক কাজ করতে পারে। তারা তাদেরকে বাধ্য বলে বিশ্বাস করে না। কারণ, বাধ্য বলা হয়, যাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বান্দাকে তার কর্মে স্বাধীন বানিয়েছেন। সুতরাং সে স্বাধীন, ইচ্ছাকারী। আল্লাহ তা‘আলা যেমনি তার স্রষ্টা, তেমনি তার এখতিয়ার-স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিরও স্রষ্টা। এ ক্ষমতায় আল্লাহর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং মহান আল্লাহ তা‘আলা এমন এক মহান সত্ত্বা, যার সত্ত্বা, গুণাবলী ও কার্যাবলীতে তার কোনো তুলনা নেই।
অনুরূপভাবে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত নাম-ধাম প্রদান করা (মুমিন-কাফির বলা), বিধি-বিধান, ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) ও ধমকী (হুমকি)র বিষয়েও মধ্যপন্থী। তারা চরমপন্থী তথা খারেজী, যারা মুসলিমদের মধ্যে কবীরাগুনাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকে আজীবন জাহান্নামী মনে করে, তাদের ঈমান থেকে সম্পূর্ণ খারিজ-বহিস্কার মনে করে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশকে অস্বীকার করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তথা মুমিনগণ সে খারেজী সম্প্রদায় ও মুরজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেও মাঝামাঝি অবস্থানে। এ মুরজিয়া সম্প্রদায় বলে থাকে, পাপীদের ঈমান আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের ঈমানের সমতুল্য। নেক আমল দীন ও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তিমূলক সতর্কবাণী ও শাস্তি প্রদানকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করে যে, পাপিষ্ঠ মুসলিমের মূল ঈমান সহ আংশিক ঈমান বিদ্যমান থাকে। তারা পূর্ণাঙ্গ মুমিন নন। তাদের সাথে এমন পরিপূর্ণ ঈমান নেই যদ্বারা তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত হবে। তবে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না; বরং যার হৃদয়ে শস্যদানা ও সরিষার দানা সমতুল্য ঈমান আছে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্যে সাফা‘আত সংরক্ষণ করেছেন।
অনুরূপভাবে মুমিনগণ, রাসূলুল্লাহর সাহাবীগণের বিষয়ে সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারী দলেরও মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছেন। কারণ সীমা লঙ্ঘনকারীরা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে থাকে। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তারা এ আক্বীদা পোষণ করে যে, উক্ত দু’জন ব্যতীত আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-ই একমাত্র নিষ্পাপ ইমাম। তারা বলে থাকে যে, সাহাবীগণ যুলুম-অত্যাচার ও পাপ কর্ম করেছেন। তারা পরবর্তী মুসলিম উম্মাহকে কাফির বলে থাকে। কখনো কখনো তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নবী ও ইলাহ বানিয়েছেন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতগণ সেই গালিয়া তথা শিয়া-রাফেযী সম্প্রদায় ও জাফিয়া তথা অসম্মানকারী সম্প্রদায়ের মাঝামাঝি অবস্থানে। জাফিয়া- অত্যাচারী দল, তারাই যারা এ আক্বীদা রাখে যে আলী ও উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উভয়-ই কাফির। তারা তাদেরকে ও তাদেরকে যারা ক্ষমতাসীন করেছেন তাদের রক্ত হালাল মনে করে। তাদেরকে গালি দেওয়া বৈধ মনে করে। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর খেলাফত ও ইমামত বিষয়ে অপবাদ দেয়, দুর্নাম ও গালি-গালাজ করে।
অনুরূপভাবে মুমিনগণ ‘সুন্নত অধ্যায়’ এর সকল বিষয়ে মধ্যপন্থী। কারণ, তারা আল্লাহ তা‘আলার কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসকে যথাযথ আঁকড়ে ধারণকারী। আর তারা পূর্ববর্তী-অগ্রগামী মুহাজির, আনসার ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাদের অনুসরণকারীগণ যে আদর্শের ওপর ছিলেন তারই ধারণকারী।
মুমিনগণ আল্লাহর নাম সিফাত ও আয়াতসমূহের বিষয়েও মধ্যপন্থী। তারা আহলে তা‘তিল তথা নির্গুণবাদী, যারা যারা আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহকে অর্থহীন করে, আর স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তারা তাকে অকার্যকর বলে আখ্যায়িত করে। [মু‘আত্তিলাহ: ঐ সব লোক যারা আল্লাহর সিফাতসমূহকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর সিফাতগুলো তার সত্বার সাথে থাকার কথাকে মানে না। আল্লাহর যে সব গুণ তার স্বয়ং সম্পন্নতা ও কামালিয়াতের ওপর প্রমাণ, তারা তা আল্লাহ থেকে অস্বীকার করে। সর্বপ্রথম ইসলামে এ ভ্রান্ত আকীদা যিনি চালু করেন, তার নাম জা‘আদ ইবন দিরহাম। আর তার থেকে এ বিষয়গুলো গ্রহণ করে তার ছাত্র জাহাম ইবন সাফওয়ান।] এমনকি তারা একগুলোকে অস্তিত্বহীন ও মৃতের সাথে তুলনা করে। মুমিনগণ তাদের (এই আহলে তা‘তীল) ও আহলে তামসীল [এর অর্থ সাদৃস্য স্থাপন করা। যেমন, একটি বস্তুকে আরেকটি বস্তুর সাথে তুলনা করা। উভয় বস্তুকে সমান মনে করা, কোন বস্তুকে অপর বস্তুর মতো করে তৈরি করা। সুতরাং আল্লাহর সিফাত ও গুণাবলী কখনো মাখলুকের সিফাত বা গুণাবলীর সাদৃশ্য হতে পারে না। কারণ, আল্লাহর সত্বা, সিফাত, নামসমূহ এবং কর্মে তার কোন দৃষ্টান্ত নেই, তার কোনো সাদৃশ্য নেই এবং তার কোনো তুলনা নেই। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ ١١﴾ [ الشورى : ١١ ] তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] সাদৃশ্য স্থাপন করা দুই প্রকার: এক- সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তুলনা করা। যেমন, খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামকে এবং উযাইর আলাইহিস সালামকে এবং মুশরিকরা তাদের মূর্তিগুলোকে আল্লাহর সাথে তুলনা করে। দুই- স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা। যেমন, সাদৃশবাদীরা বলে, আল্লাহর আমাদের হাতের মতো হাত রয়েছে আর আমাদের কানের মতো কান রয়েছে। আর বস্তুত সব সাদৃশবাদীরাই মু‘আত্তিলা বা নির্গুণবাদী।] তথা স্বাদৃশ্যবাদীদের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে। এ আহলে তামসীল অর্থাৎ যারা আল্লাহ তা‘আলা জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ও তাকে মাখলুকের সাথে তুলনা করে। (অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার উদাহরণ বর্ণনা করে এবং আল্লাহর সৃষ্ট জীবের সঙ্গে আল্লাহ তা‘আলাকে সাদৃশ্য স্থাপন করে। [অনুবাদক]) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা‘আলার নাম ও গুণাবলী তেমনি যেমন তিনি তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে তার গুণাগুণ করেছেন; কোনো প্রকার তাহরীফ (বিকৃতি), অস্বীকার, তাকয়ীফ [তাকয়ীফ: কোনো বস্তুর নির্দিষ্ট ধরণ বর্ণনা করা বা ধরণ সাব্যস্ত করাকে তাকয়ীফ বলা হয়। কোনো বস্তুর ধরণ হলো, তার অবস্থা বা তার গুণাগুণ নির্ধারণ। আর আল্লাহর অবস্থা বা ধরণ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই তার স্বীয় ইলমে সংরক্ষণ করেছেন। এ বিষয়গুলো তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। কোনো মাখলুকের জন্য সে সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, গুণ সব সময় সত্বার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। সত্বার ধরণকেই যদি জানার সুযোগ না থাকে তাহলে তার সিফাতের ধরণ কীভাবে জানা সম্ভব হবে?। ইমাম মালেক রহ.কে ইস্তেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, ইস্তেওয়া ধরণ কি? উত্তরে তিনি বললেন, ইস্তেওয়া অবশ্যই প্রমাণিত ও তার অর্থ বিদিত, কিন্তু তার ধরণ অজ্ঞাত, এর ওপর বিশ্বাস ওয়াজিব এবং এর ধরণ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা বিদ‘আত।] (ধরণ) বর্ণনা করা ও উদাহরণ উপস্থাপন করা ছাড়া।
অনুরূপভাবে মুমিনগণ ‘আল্লাহর সৃষ্টি ও আদেশ’ অধ্যায়েও মধ্যপন্থী। তারা আল্লাহ তা‘আলার কুদরতকে অস্বীকারকারী ক্বাদারিয়্যা; যারা আল্লাহ তা‘আলার পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা, তার সার্বজনীন ইচ্ছা এবং তিনি যে সব কিছুর স্রষ্টা তার ওপর ঈমান রাখে না, অথচ তিনি সকল কিছুর স্রষ্টা। মুমিনগণ সে কাদারিয়্যা সম্প্রদায় ও জাবরিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মাঝামাঝি অবস্থানে, কারণ এ জাবরিয়্যা সম্প্রদায় বলে, বান্দার কোনো কিছু করার ইচ্ছাশক্তি নেই, ক্ষমতা নেই, কোনো কর্ম নেই। তাই তারা, আল্লাহ তা‘আলার আদেশ, নিষেধ, সওয়াব ও শাস্তির সকল বিধান বাতিল ও অকার্যকর মনে করে। ফলে তারা ঐসব মুশরিকদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যারা বলে, আল্লাহ তা‘আলা যদি চাইতেন তবে আমরা শির্ক করতাম না এবং আমাদের বাপ-দাদারাও করত না, আর কোনো জিনিসও আমরা হারাম করতাম না । এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿سَيَقُولُ ٱلَّذِينَ أَشۡرَكُواْ لَوۡ شَآءَ ٱللَّهُ مَآ أَشۡرَكۡنَا وَلَآ ءَابَآؤُنَا وَلَا حَرَّمۡنَا مِن شَيۡءٖۚ ١٤٨﴾ [ الانعام : ١٤٨ ]
“যারা শির্ক করে তারা বলে, আল্লাহ তা‘আলা যদি চাইতেন তবে আমরা শির্ক করতাম না এবং আমাদের বাপ-দাদারাও করত না, আর কোনো জিনিসও আমরা হারাম করতাম না”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৪৮]
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ তা‘আলা সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। তিনি বান্দাদের হিদায়াত দেওয়ার করার ক্ষমতা রাখেন এবং তাদের হৃদয় পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি আল্লাহ যা চান তা হয়, আর যা তিনি চান না, তা হয় না। তার রাজত্বে এমন কিছু সংঘটিত হয় না যার ইচ্ছা তিনি করেন নি। তার ইচ্ছা বাস্তবায়নে তিনি অপারগ বা অক্ষম নন। তিনি বস্তুনিচয়, গুণাগুণ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের স্রষ্টা।
আর তারা এ কথাও বিশ্বাস করে যে, বান্দার ক্ষমতা, ইচ্ছা ও কর্ম রয়েছে। সে ইচ্ছে মাফিক কাজ করতে পারে। তারা তাদেরকে বাধ্য বলে বিশ্বাস করে না। কারণ, বাধ্য বলা হয়, যাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বান্দাকে তার কর্মে স্বাধীন বানিয়েছেন। সুতরাং সে স্বাধীন, ইচ্ছাকারী। আল্লাহ তা‘আলা যেমনি তার স্রষ্টা, তেমনি তার এখতিয়ার-স্বাধীন ইচ্ছা শক্তিরও স্রষ্টা। এ ক্ষমতায় আল্লাহর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং মহান আল্লাহ তা‘আলা এমন এক মহান সত্ত্বা, যার সত্ত্বা, গুণাবলী ও কার্যাবলীতে তার কোনো তুলনা নেই।
অনুরূপভাবে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত নাম-ধাম প্রদান করা (মুমিন-কাফির বলা), বিধি-বিধান, ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) ও ধমকী (হুমকি)র বিষয়েও মধ্যপন্থী। তারা চরমপন্থী তথা খারেজী, যারা মুসলিমদের মধ্যে কবীরাগুনাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরকে আজীবন জাহান্নামী মনে করে, তাদের ঈমান থেকে সম্পূর্ণ খারিজ-বহিস্কার মনে করে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশকে অস্বীকার করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তথা মুমিনগণ সে খারেজী সম্প্রদায় ও মুরজিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেও মাঝামাঝি অবস্থানে। এ মুরজিয়া সম্প্রদায় বলে থাকে, পাপীদের ঈমান আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের ঈমানের সমতুল্য। নেক আমল দীন ও ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা আল্লাহ তা‘আলার শাস্তিমূলক সতর্কবাণী ও শাস্তি প্রদানকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বিশ্বাস করে যে, পাপিষ্ঠ মুসলিমের মূল ঈমান সহ আংশিক ঈমান বিদ্যমান থাকে। তারা পূর্ণাঙ্গ মুমিন নন। তাদের সাথে এমন পরিপূর্ণ ঈমান নেই যদ্বারা তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত হবে। তবে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না; বরং যার হৃদয়ে শস্যদানা ও সরিষার দানা সমতুল্য ঈমান আছে সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের কবিরা গুনাহকারীদের জন্যে সাফা‘আত সংরক্ষণ করেছেন।
অনুরূপভাবে মুমিনগণ, রাসূলুল্লাহর সাহাবীগণের বিষয়ে সীমালঙ্ঘনকারী ও অত্যাচারী দলেরও মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছেন। কারণ সীমা লঙ্ঘনকারীরা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে থাকে। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে আবু বকর ও উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তারা এ আক্বীদা পোষণ করে যে, উক্ত দু’জন ব্যতীত আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-ই একমাত্র নিষ্পাপ ইমাম। তারা বলে থাকে যে, সাহাবীগণ যুলুম-অত্যাচার ও পাপ কর্ম করেছেন। তারা পরবর্তী মুসলিম উম্মাহকে কাফির বলে থাকে। কখনো কখনো তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে নবী ও ইলাহ বানিয়েছেন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতগণ সেই গালিয়া তথা শিয়া-রাফেযী সম্প্রদায় ও জাফিয়া তথা অসম্মানকারী সম্প্রদায়ের মাঝামাঝি অবস্থানে। জাফিয়া- অত্যাচারী দল, তারাই যারা এ আক্বীদা রাখে যে আলী ও উসমান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উভয়-ই কাফির। তারা তাদেরকে ও তাদেরকে যারা ক্ষমতাসীন করেছেন তাদের রক্ত হালাল মনে করে। তাদেরকে গালি দেওয়া বৈধ মনে করে। তারা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর খেলাফত ও ইমামত বিষয়ে অপবাদ দেয়, দুর্নাম ও গালি-গালাজ করে।
অনুরূপভাবে মুমিনগণ ‘সুন্নত অধ্যায়’ এর সকল বিষয়ে মধ্যপন্থী। কারণ, তারা আল্লাহ তা‘আলার কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসকে যথাযথ আঁকড়ে ধারণকারী। আর তারা পূর্ববর্তী-অগ্রগামী মুহাজির, আনসার ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাদের অনুসরণকারীগণ যে আদর্শের ওপর ছিলেন তারই ধারণকারী।