১
মহা উপদেশ (‘আদী ইবন মুসাফিরের অনুসারীদের এর কাছে লেখা চিঠি)
লেখকঃ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩৮
বন্ধুত্ব ও শত্রুতার স্বরূপ:
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসতে নির্দেশ দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ও তাদের বিরোধিতা করা মুমিনের ওপর ওয়াজিব করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلۡيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوۡلِيَآءَۘ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمۡ فَإِنَّهُۥ مِنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥١ فَتَرَى ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ يُسَٰرِعُونَ فِيهِمۡ يَقُولُونَ نَخۡشَىٰٓ أَن تُصِيبَنَا دَآئِرَةٞۚ فَعَسَى ٱللَّهُ أَن يَأۡتِيَ بِٱلۡفَتۡحِ أَوۡ أَمۡرٖ مِّنۡ عِندِهِۦ فَيُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَآ أَسَرُّواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ نَٰدِمِينَ ٥٢ وَيَقُولُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَهَٰٓؤُلَآءِ ٱلَّذِينَ أَقۡسَمُواْ بِٱللَّهِ جَهۡدَ أَيۡمَٰنِهِمۡ إِنَّهُمۡ لَمَعَكُمۡۚ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فَأَصۡبَحُواْ خَٰسِرِينَ ٥٣ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِي ٱللَّهُ بِقَوۡمٖ يُحِبُّهُمۡ وَيُحِبُّونَهُۥٓ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَٰفِرِينَ يُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآئِمٖۚ ذَٰلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ ٥٤ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱلَّذِينَ يُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَهُمۡ رَٰكِعُونَ ٥٥ وَمَن يَتَوَلَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ فَإِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡغَٰلِبُونَ ٥٦﴾ [ المائدة : ٥١، ٥٦ ]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করিও না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। আল্লাহ তা‘আলা যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তদেরকে দেখবে সত্বর তারা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহূদী ও খ্রিস্টান মুশরিকদের) মাঝে গিয়ে বলবে, আমাদের ভয় হয় আমরা বিপদের চক্করে পড়ে না যাই। হয়তো আল্লাহ তা‘আলা বিজয় দান করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু দিবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিল তার কারণে লজ্জিত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরা কি তারাই যারা আল্লাহ তা‘আলার নামে শক্ত কসম খেয়ে বলত যে, তারা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে আছে। তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে, যার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য হতে কেউ তার দীন হতে ফিরে গেলে সত্বর আল্লাহ তা‘আলা এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন আর তারাও তাকে ভালবাসবে, তারা মুমিনদের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে যুদ্ধ করবে, কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে তারা ভয় করবে না, এটা আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ-যাকে ইচ্ছে তিনি দান করেন এবং আল্লাহ তা‘আলা প্রাচুর্যের অধিকারী, সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু আল্লাহ তা‘আলা, তার রাসূল ও মুমিনগণ যারা সালাত কায়িম করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছে অবনত হয়। যে কেউ আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল এবং ঈমানদারগণকে বন্ধরূপে গ্রহণ করবে সে দেখতে পাবে যে আল্লাহ তা‘আলার দলই বিজয়ী হবে। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫১-৫৬]
আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মুমিনের বন্ধু হলো আল্লাহ তা‘আলা, তার রাসুল ও তার প্রতি ঈমানদার বান্দাগণ। এ বিশেষণটি প্রতিটি মুমিন যে এ গুণে গুণান্বিত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। চাই সে তার বংশের, দেশের, মাযহাবের অথবা স্বীয় দলভুক্ত হোক বা না হোক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ﴾ [ التوبة : ٧١ ]
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭১]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَهَاجَرُواْ وَجَٰهَدُواْ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلَّذِينَ ءَاوَواْ وَّنَصَرُوٓاْ أُوْلَٰٓئِكَ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يُهَاجِرُواْ مَا لَكُم مِّن وَلَٰيَتِهِم مِّن شَيۡءٍ حَتَّىٰ يُهَاجِرُواْۚ وَإِنِ ٱسۡتَنصَرُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ فَعَلَيۡكُمُ ٱلنَّصۡرُ إِلَّا عَلَىٰ قَوۡمِۢ بَيۡنَكُمۡ وَبَيۡنَهُم مِّيثَٰقٞۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٧٢ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍۚ إِلَّا تَفۡعَلُوهُ تَكُن فِتۡنَةٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَفَسَادٞ كَبِيرٞ ٧٣ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَهَاجَرُواْ وَجَٰهَدُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلَّذِينَ ءَاوَواْ وَّنَصَرُوٓاْ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ حَقّٗاۚ لَّهُم مَّغۡفِرَةٞ وَرِزۡقٞ كَرِيمٞ ٧٤ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنۢ بَعۡدُ وَهَاجَرُواْ وَجَٰهَدُواْ مَعَكُمۡ فَأُوْلَٰٓئِكَ مِنكُمۡۚ وَأُوْلُواْ ٱلۡأَرۡحَامِ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلَىٰ بِبَعۡضٖ فِي كِتَٰبِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمُۢ ٧٥﴾ [ الانفال : ٧٢، ٧٦ ]
“যারা ঈমান এনেছে, (দীনের জন্যে) হিজরত করেছে, নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য করেছে, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করে নি, তারা হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের কোনো দায়িত্ব তোমার ওপর নেই, তবে তারা যদি দীনের ব্যাপারে তোমাদের নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয় তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য, কিন্তু তোমাদের ও যে জাতির মধ্যে মৈত্রী চুক্তি রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নয়। তোমরা যা কর আল্লাহ তা‘আলা তা দেখেন। আর যারা কুফরি করে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। যদি তোমরা তা [মুমিনদের পরস্পরের বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করা ও কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা] না কর তবে দুনিয়াতে ফিতনা ও মহা-বিপর্যয় দেখা দিবে। যারা ঈমান এনেছে, (দীনের জন্যে) হিজরত করেছে এবং আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য-সহযোগিতা করেছে- তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। আর যারা পরে ঈমান এনেছে ও হিজরত করেছে আর তোমাদের সাথে একত্র হয়ে জিহাদ করেছে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭২-৭৫]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِن طَآئِفَتَانِ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱقۡتَتَلُواْ فَأَصۡلِحُواْ بَيۡنَهُمَاۖ فَإِنۢ بَغَتۡ إِحۡدَىٰهُمَا عَلَى ٱلۡأُخۡرَىٰ فَقَٰتِلُواْ ٱلَّتِي تَبۡغِي حَتَّىٰ تَفِيٓءَ إِلَىٰٓ أَمۡرِ ٱللَّهِۚ فَإِن فَآءَتۡ فَأَصۡلِحُواْ بَيۡنَهُمَا بِٱلۡعَدۡلِ وَأَقۡسِطُوٓاْۖ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ ٩﴾ [ الحجرات : ٩ ]
“মুমিনদের দু’দল লড়াইয়ে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে আর সুবিচার করবে। আল্লাহ তা‘আলা ন্যায়-বিচারকারীদের ভালোবাসেন”। [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ৯]
সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم كمثل الجسد الواحد إذا اشتكى منه عضو تداعي له سائر الجسد بالحمى والسهر»
“পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়া অনুগ্রহের ক্ষেত্রে মুমিনের উদাহরণ হলো এক ও অখণ্ডিত দেহ। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন সমস্ত শরীর তার জন্যে বিনিদ্র ও ব্যথায় আক্রান্ত হয়”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৮]
সহীহ হাদীসে অনুরূপ আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا»
“একজন মুমিন আর একজন মুমিনের জন্য প্রাচীরের ন্যায়। যার একাংশ অপর অংশকে সু-দৃঢ় করে। অতঃপর তিনি একহাতের অঙ্গুলিগুলো অপর হাতের অঙ্গুলির মধ্যে প্রবেশ করালেন”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৮২]
অনুরূপ সহীহ হাদীসে আরো বর্ণিত আছে,
«والذي نفسي بيده لايؤمن أحدكم حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه»
“যার হাতে আমার জীবন তার শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের জন্য যা ভালোবাসে অপরের জন্য তা-ই ভালো না বাসে”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭২]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«المسلم أخو المسلم لا يسلمه ولا يظلمه»
“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তাকে (বিপদের সময়) অন্যের নিকট সোপর্দ করতে পারে না ও তার প্রতি অত্যাচারও করতে পারে না”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭৮]
কুরআন ও হাদীসে এরূপ বহু দলীল বিদ্যমান, যাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা বলা হয়েছে।
এরই ভিত্তিতে আল্লাহ তা‘আলা এক মুমিন অপর মুমিনের বন্ধু বা সাহায্যকারী হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন। পরস্পর পরস্পরকে ভাই ভাই বানিয়ে দিয়েছেন। একে অপরকে সাহায্যকারী, অনুগ্রহকারী ও দয়াশীল হিসেবে পরিণত করেছেন। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ঐক্য স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং দলাদলি ও মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ ١٠٣﴾ [ ال عمران : ١٠٣ ]
“তোমরা সমবেতভাবে আল্লাহ তা‘আলার রজ্জুকে সু-দৃঢ়ভাবে ধারণ কর ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়ো না”। [আল আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَكَانُواْ شِيَعٗا لَّسۡتَ مِنۡهُمۡ فِي شَيۡءٍۚ إِنَّمَآ أَمۡرُهُمۡ إِلَى ٱللَّهِ ١٥٩﴾ [ الانعام : ١٥٩ ]
“নিশ্চয় যারা নিজেদের দীনকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে নিয়েছে আর দলে দলে ভাগ হয়ে গেছে, তাদের কোনো কাজের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহ তা‘আলার ওপর ন্যস্ত”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৯]
বড়ই পরিতাপের বিষয়! কীভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের লোকেরা বিভিন্ন দল ও বিবিধ মতভেদে বিভক্ত হয়েছে। দলের স্বার্থেই কেবল ধারণা প্রসূত জ্ঞান ও প্রবৃত্তির চরিতার্থে কোনো লোক এক দলকে ভালোবাসে ও অপর দলকে শত্রু মনে করে অথচ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ মর্মে কোনো প্রমাণ তাদের নিকট নেই।
অথচ আল্লাহ তা‘আলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন, যারা এ ধরনের দলাদলিতে লিপ্ত হবে।
বস্তুত এ সব তো খারেজীদের ন্যায় বিদ‘আতী দলের কর্ম যা মুসলিমদের এক ও অখণ্ডিত জামা‘আতকে বিভক্ত করেছে এবং তাদের ভিন্নমত পোষণকারীদের রক্তপাত করাকে হালাল হিসাবে গ্রহণ করেছে।
পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আল্লাহ তা‘আলার রজ্জু (কুরআন ও সুন্নাহ)-কে সু-দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে। এ সব কাজ তারা করে না।
যারা এসব দলাদলি করে থাকে, তাদের সেখানে সর্বনিম্ন ক্ষতি তো এটা ধরে নেওয়া যায় যে, কোনো লোক সেখানে কেবল নিছক প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কাউকে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিচ্ছে, যদিও সে অপর লোকটি তার থেকে আরও বেশি তাকওয়ার অধিকারী।
অথচ ওয়াজিব হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলকে অগ্রাধিকার দেয় তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলের অনুসরণের বিষয়ে পশ্চাতে রয়েছে তাকে পিছিয়ে রাখা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলকে ভালোবাসে তাকে ভালোবাসা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলের সাথে শত্রুতা করে তার সঙ্গে শত্রুতা করা, আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল যা নির্দেশ দিয়েছেন মানুষকে সে নির্দেশই দেওয়া, আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল যে সব বিষয়ে নিষেধ করেছেন সে সব বিষয়েই নিষেধ করা, আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল যাতে খুশী থাকেন তাতেই খুশী থাকা। মুসলিমগণ হবেন একটি মহাশক্তি। কিভাবে তা সম্ভব যে, একজন মুসলিম ভাইয়ের বিরোধিতা করতে করতে তাকে কাফের বা গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করে। অনেক সময় এমনও হতে পারে সত্য তার সাথেই রয়েছে এবং সে-ই কিতাব ও সুন্নাহের অনুসারী। যদি তার মুসলিম ভাই কোনো বিষয়ে ভুলই হয়তো করে বসল; কেননা কেউ ভুল করলেই সে কাফির বা ফাসিক হয়ে যাবে না; বরং আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতের ত্রুটি ও ভুলে যাওয়া জনিত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় গ্রন্থে মুমিন ও রাসূলগণের দো‘আ প্রসঙ্গে বলেছেন-
﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ ٢٨٦﴾ [ البقرة : ٢٨٦ ]
“হে আমাদের ‘রব’! আমাদেরকে পাকড়াও করো না, যদি আমরা ভুল করি কিংবা ভুলে যাই”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬]
সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের দো‘আর উত্তরে বলেছেন, “আমি তাই করলাম।”
বিশেষ করে কখনো সময় দেখা যায়, যে তোমার সাথে একমত পোষণ করেছে, সে ইসলামের বিশেষ একটি অবস্থানে রয়েছে। যেমন, তোমাদের একজন শাফে‘ঈ রহ. মাযহাবের অনুসারী অথবা শেখ ‘আদী রহ.-এর অনুসারী। তারপর সে কোনো একটি বিধানে তাদের বিরোধিতা করছে এবং হতে পারে সত্য ও সঠিক বিষয়টি তার সাথেই রয়েছে, তখন কীভাবে শুধু এ কারণে তার জান-মাল, ইজ্জত-সম্মানকে হালাল মনে করা হবে বা লুন্ঠন করা হবে? অথচ আল্লাহ তা‘আলা একজন মুমিনের জান-মালের হিফাযত করাকে মুসলিম ও মুমিনের দায়িত্ব-কর্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিভিন্ন নতুন নতুন আবিষ্কৃত নাম যার কোনো ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহের কোথাও নেই সেগুলোকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্ত কীভাবে বৈধ হতে পারে?
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَتَّخِذُواْ ٱلۡيَهُودَ وَٱلنَّصَٰرَىٰٓ أَوۡلِيَآءَۘ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمۡ فَإِنَّهُۥ مِنۡهُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ٥١ فَتَرَى ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٞ يُسَٰرِعُونَ فِيهِمۡ يَقُولُونَ نَخۡشَىٰٓ أَن تُصِيبَنَا دَآئِرَةٞۚ فَعَسَى ٱللَّهُ أَن يَأۡتِيَ بِٱلۡفَتۡحِ أَوۡ أَمۡرٖ مِّنۡ عِندِهِۦ فَيُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَآ أَسَرُّواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ نَٰدِمِينَ ٥٢ وَيَقُولُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَهَٰٓؤُلَآءِ ٱلَّذِينَ أَقۡسَمُواْ بِٱللَّهِ جَهۡدَ أَيۡمَٰنِهِمۡ إِنَّهُمۡ لَمَعَكُمۡۚ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فَأَصۡبَحُواْ خَٰسِرِينَ ٥٣ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِي ٱللَّهُ بِقَوۡمٖ يُحِبُّهُمۡ وَيُحِبُّونَهُۥٓ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَٰفِرِينَ يُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآئِمٖۚ ذَٰلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ ٥٤ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱلَّذِينَ يُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَهُمۡ رَٰكِعُونَ ٥٥ وَمَن يَتَوَلَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ فَإِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡغَٰلِبُونَ ٥٦﴾ [ المائدة : ٥١، ٥٦ ]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদী ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করিও না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। আল্লাহ তা‘আলা যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে তুমি তদেরকে দেখবে সত্বর তারা তাদের (অর্থাৎ ইয়াহূদী ও খ্রিস্টান মুশরিকদের) মাঝে গিয়ে বলবে, আমাদের ভয় হয় আমরা বিপদের চক্করে পড়ে না যাই। হয়তো আল্লাহ তা‘আলা বিজয় দান করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু দিবেন যাতে তারা তাদের অন্তরে যা লুকিয়ে রেখেছিল তার কারণে লজ্জিত হবে। মুমিনগণ বলবে, এরা কি তারাই যারা আল্লাহ তা‘আলার নামে শক্ত কসম খেয়ে বলত যে, তারা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে আছে। তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে, যার ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য হতে কেউ তার দীন হতে ফিরে গেলে সত্বর আল্লাহ তা‘আলা এমন এক সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন আর তারাও তাকে ভালবাসবে, তারা মুমিনদের প্রতি কোমল আর কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহ তা‘আলার পথে যুদ্ধ করবে, কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে তারা ভয় করবে না, এটা আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ-যাকে ইচ্ছে তিনি দান করেন এবং আল্লাহ তা‘আলা প্রাচুর্যের অধিকারী, সর্বজ্ঞ। তোমাদের বন্ধু আল্লাহ তা‘আলা, তার রাসূল ও মুমিনগণ যারা সালাত কায়িম করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ তা‘আলার কাছে অবনত হয়। যে কেউ আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল এবং ঈমানদারগণকে বন্ধরূপে গ্রহণ করবে সে দেখতে পাবে যে আল্লাহ তা‘আলার দলই বিজয়ী হবে। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৫১-৫৬]
আল্লাহ তা‘আলা জানিয়ে দিচ্ছেন যে, মুমিনের বন্ধু হলো আল্লাহ তা‘আলা, তার রাসুল ও তার প্রতি ঈমানদার বান্দাগণ। এ বিশেষণটি প্রতিটি মুমিন যে এ গুণে গুণান্বিত সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। চাই সে তার বংশের, দেশের, মাযহাবের অথবা স্বীয় দলভুক্ত হোক বা না হোক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتُ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ﴾ [ التوبة : ٧١ ]
“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু”। [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৭১]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَهَاجَرُواْ وَجَٰهَدُواْ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلَّذِينَ ءَاوَواْ وَّنَصَرُوٓاْ أُوْلَٰٓئِكَ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۚ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يُهَاجِرُواْ مَا لَكُم مِّن وَلَٰيَتِهِم مِّن شَيۡءٍ حَتَّىٰ يُهَاجِرُواْۚ وَإِنِ ٱسۡتَنصَرُوكُمۡ فِي ٱلدِّينِ فَعَلَيۡكُمُ ٱلنَّصۡرُ إِلَّا عَلَىٰ قَوۡمِۢ بَيۡنَكُمۡ وَبَيۡنَهُم مِّيثَٰقٞۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٞ ٧٢ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٍۚ إِلَّا تَفۡعَلُوهُ تَكُن فِتۡنَةٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَفَسَادٞ كَبِيرٞ ٧٣ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَهَاجَرُواْ وَجَٰهَدُواْ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلَّذِينَ ءَاوَواْ وَّنَصَرُوٓاْ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ حَقّٗاۚ لَّهُم مَّغۡفِرَةٞ وَرِزۡقٞ كَرِيمٞ ٧٤ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنۢ بَعۡدُ وَهَاجَرُواْ وَجَٰهَدُواْ مَعَكُمۡ فَأُوْلَٰٓئِكَ مِنكُمۡۚ وَأُوْلُواْ ٱلۡأَرۡحَامِ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلَىٰ بِبَعۡضٖ فِي كِتَٰبِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمُۢ ٧٥﴾ [ الانفال : ٧٢، ٧٦ ]
“যারা ঈমান এনেছে, (দীনের জন্যে) হিজরত করেছে, নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য করেছে, তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করে নি, তারা হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের কোনো দায়িত্ব তোমার ওপর নেই, তবে তারা যদি দীনের ব্যাপারে তোমাদের নিকট সাহায্যপ্রার্থী হয় তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য, কিন্তু তোমাদের ও যে জাতির মধ্যে মৈত্রী চুক্তি রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে নয়। তোমরা যা কর আল্লাহ তা‘আলা তা দেখেন। আর যারা কুফরি করে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। যদি তোমরা তা [মুমিনদের পরস্পরের বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করা ও কাফিরদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা] না কর তবে দুনিয়াতে ফিতনা ও মহা-বিপর্যয় দেখা দিবে। যারা ঈমান এনেছে, (দীনের জন্যে) হিজরত করেছে এবং আল্লাহ তা‘আলার পথে জিহাদ করেছে আর যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সাহায্য-সহযোগিতা করেছে- তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। আর যারা পরে ঈমান এনেছে ও হিজরত করেছে আর তোমাদের সাথে একত্র হয়ে জিহাদ করেছে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত”। [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭২-৭৫]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِن طَآئِفَتَانِ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱقۡتَتَلُواْ فَأَصۡلِحُواْ بَيۡنَهُمَاۖ فَإِنۢ بَغَتۡ إِحۡدَىٰهُمَا عَلَى ٱلۡأُخۡرَىٰ فَقَٰتِلُواْ ٱلَّتِي تَبۡغِي حَتَّىٰ تَفِيٓءَ إِلَىٰٓ أَمۡرِ ٱللَّهِۚ فَإِن فَآءَتۡ فَأَصۡلِحُواْ بَيۡنَهُمَا بِٱلۡعَدۡلِ وَأَقۡسِطُوٓاْۖ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُقۡسِطِينَ ٩﴾ [ الحجرات : ٩ ]
“মুমিনদের দু’দল লড়াইয়ে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর একদল অপর দলকে আক্রমণ করলে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে আর সুবিচার করবে। আল্লাহ তা‘আলা ন্যায়-বিচারকারীদের ভালোবাসেন”। [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত: ৯]
সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«مثل المؤمنين في توادهم وتراحمهم وتعاطفهم كمثل الجسد الواحد إذا اشتكى منه عضو تداعي له سائر الجسد بالحمى والسهر»
“পারস্পরিক সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও দয়া অনুগ্রহের ক্ষেত্রে মুমিনের উদাহরণ হলো এক ও অখণ্ডিত দেহ। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন সমস্ত শরীর তার জন্যে বিনিদ্র ও ব্যথায় আক্রান্ত হয়”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৮]
সহীহ হাদীসে অনুরূপ আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«المؤمن للمؤمن كالبنيان يشد بعضه بعضا»
“একজন মুমিন আর একজন মুমিনের জন্য প্রাচীরের ন্যায়। যার একাংশ অপর অংশকে সু-দৃঢ় করে। অতঃপর তিনি একহাতের অঙ্গুলিগুলো অপর হাতের অঙ্গুলির মধ্যে প্রবেশ করালেন”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৮২]
অনুরূপ সহীহ হাদীসে আরো বর্ণিত আছে,
«والذي نفسي بيده لايؤمن أحدكم حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه»
“যার হাতে আমার জীবন তার শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের জন্য যা ভালোবাসে অপরের জন্য তা-ই ভালো না বাসে”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭২]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«المسلم أخو المسلم لا يسلمه ولا يظلمه»
“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তাকে (বিপদের সময়) অন্যের নিকট সোপর্দ করতে পারে না ও তার প্রতি অত্যাচারও করতে পারে না”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭৮]
কুরআন ও হাদীসে এরূপ বহু দলীল বিদ্যমান, যাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা বলা হয়েছে।
এরই ভিত্তিতে আল্লাহ তা‘আলা এক মুমিন অপর মুমিনের বন্ধু বা সাহায্যকারী হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন। পরস্পর পরস্পরকে ভাই ভাই বানিয়ে দিয়েছেন। একে অপরকে সাহায্যকারী, অনুগ্রহকারী ও দয়াশীল হিসেবে পরিণত করেছেন। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ঐক্য স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং দলাদলি ও মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ ١٠٣﴾ [ ال عمران : ١٠٣ ]
“তোমরা সমবেতভাবে আল্লাহ তা‘আলার রজ্জুকে সু-দৃঢ়ভাবে ধারণ কর ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইয়ো না”। [আল আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَكَانُواْ شِيَعٗا لَّسۡتَ مِنۡهُمۡ فِي شَيۡءٍۚ إِنَّمَآ أَمۡرُهُمۡ إِلَى ٱللَّهِ ١٥٩﴾ [ الانعام : ١٥٩ ]
“নিশ্চয় যারা নিজেদের দীনকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করে নিয়েছে আর দলে দলে ভাগ হয়ে গেছে, তাদের কোনো কাজের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহ তা‘আলার ওপর ন্যস্ত”। [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫৯]
বড়ই পরিতাপের বিষয়! কীভাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের লোকেরা বিভিন্ন দল ও বিবিধ মতভেদে বিভক্ত হয়েছে। দলের স্বার্থেই কেবল ধারণা প্রসূত জ্ঞান ও প্রবৃত্তির চরিতার্থে কোনো লোক এক দলকে ভালোবাসে ও অপর দলকে শত্রু মনে করে অথচ আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এ মর্মে কোনো প্রমাণ তাদের নিকট নেই।
অথচ আল্লাহ তা‘আলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘোষণা করেছিলেন, যারা এ ধরনের দলাদলিতে লিপ্ত হবে।
বস্তুত এ সব তো খারেজীদের ন্যায় বিদ‘আতী দলের কর্ম যা মুসলিমদের এক ও অখণ্ডিত জামা‘আতকে বিভক্ত করেছে এবং তাদের ভিন্নমত পোষণকারীদের রক্তপাত করাকে হালাল হিসাবে গ্রহণ করেছে।
পক্ষান্তরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আল্লাহ তা‘আলার রজ্জু (কুরআন ও সুন্নাহ)-কে সু-দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে। এ সব কাজ তারা করে না।
যারা এসব দলাদলি করে থাকে, তাদের সেখানে সর্বনিম্ন ক্ষতি তো এটা ধরে নেওয়া যায় যে, কোনো লোক সেখানে কেবল নিছক প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কাউকে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিচ্ছে, যদিও সে অপর লোকটি তার থেকে আরও বেশি তাকওয়ার অধিকারী।
অথচ ওয়াজিব হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলকে অগ্রাধিকার দেয় তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলের অনুসরণের বিষয়ে পশ্চাতে রয়েছে তাকে পিছিয়ে রাখা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলকে ভালোবাসে তাকে ভালোবাসা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূলের সাথে শত্রুতা করে তার সঙ্গে শত্রুতা করা, আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল যা নির্দেশ দিয়েছেন মানুষকে সে নির্দেশই দেওয়া, আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল যে সব বিষয়ে নিষেধ করেছেন সে সব বিষয়েই নিষেধ করা, আল্লাহ তা‘আলা ও তার রাসূল যাতে খুশী থাকেন তাতেই খুশী থাকা। মুসলিমগণ হবেন একটি মহাশক্তি। কিভাবে তা সম্ভব যে, একজন মুসলিম ভাইয়ের বিরোধিতা করতে করতে তাকে কাফের বা গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করে। অনেক সময় এমনও হতে পারে সত্য তার সাথেই রয়েছে এবং সে-ই কিতাব ও সুন্নাহের অনুসারী। যদি তার মুসলিম ভাই কোনো বিষয়ে ভুলই হয়তো করে বসল; কেননা কেউ ভুল করলেই সে কাফির বা ফাসিক হয়ে যাবে না; বরং আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতের ত্রুটি ও ভুলে যাওয়া জনিত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় গ্রন্থে মুমিন ও রাসূলগণের দো‘আ প্রসঙ্গে বলেছেন-
﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذۡنَآ إِن نَّسِينَآ أَوۡ أَخۡطَأۡنَاۚ ٢٨٦﴾ [ البقرة : ٢٨٦ ]
“হে আমাদের ‘রব’! আমাদেরকে পাকড়াও করো না, যদি আমরা ভুল করি কিংবা ভুলে যাই”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬]
সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের দো‘আর উত্তরে বলেছেন, “আমি তাই করলাম।”
বিশেষ করে কখনো সময় দেখা যায়, যে তোমার সাথে একমত পোষণ করেছে, সে ইসলামের বিশেষ একটি অবস্থানে রয়েছে। যেমন, তোমাদের একজন শাফে‘ঈ রহ. মাযহাবের অনুসারী অথবা শেখ ‘আদী রহ.-এর অনুসারী। তারপর সে কোনো একটি বিধানে তাদের বিরোধিতা করছে এবং হতে পারে সত্য ও সঠিক বিষয়টি তার সাথেই রয়েছে, তখন কীভাবে শুধু এ কারণে তার জান-মাল, ইজ্জত-সম্মানকে হালাল মনে করা হবে বা লুন্ঠন করা হবে? অথচ আল্লাহ তা‘আলা একজন মুমিনের জান-মালের হিফাযত করাকে মুসলিম ও মুমিনের দায়িত্ব-কর্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিভিন্ন নতুন নতুন আবিষ্কৃত নাম যার কোনো ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহের কোথাও নেই সেগুলোকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্ত কীভাবে বৈধ হতে পারে?