১
মহা উপদেশ (‘আদী ইবন মুসাফিরের অনুসারীদের এর কাছে লেখা চিঠি)
লেখকঃ শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন তাইমিয়্যাহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২
অনুবাদকের ভূমিকা
إِنَّ الْحَمْد للهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُـوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا ، مَنْ يَّهْدِهِ اللهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُّضْلِلِ اللهُ فَلاَ هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لاَّ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
“নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর নিকট আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্টতা ও আমাদের কর্মসমূহের খারাবী থেকে আশ্রয় কামনা করি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই। আর যাকে গোমরাহ করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ারও কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার ওপর, তার পরিবার-পরিজন ও তার সাহাবীগণের ওপর এবং যারা কিয়ামত অবধি ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করেন তাদের ওপর।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় বান্দাদের প্রতি অধিক দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি তার বান্দাদের যে কোনো উপায়ে ক্ষমা করতে ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন।
আমরা সরল পথে চলতে চাই, হক জানতে চাই। অথচ সুপথ পেতে হলে রব হিসেবে আল্লাহকে মানতে হবে, তাগূতকে বর্জন করতে হবে, জীবনাদর্শ হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে হবে এবং তাকে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে মানতে হবে। রাসূলের জীবনেই আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে বাতিল আদর্শ পরিত্যাগ করতে হবে।
‘মহা উপদেশ’ গ্রন্থটির মূল আরবী শিরোনাম হলো ‘আল ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা’-এর লেখক হলেন বৈপ্লবিক সংস্কারক আল্লামা তাকী উদ্দীন আহমাদ ইবন আব্দুল হালীম ইবন তাইমিয়্যাহ। তিনি এ বইটি বিশেষ একটি পেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে লিখেন।
পঞ্চম শতাব্দীতে ইরাকের মূসেল শহরে শাইখ ‘আদী ইবন মুসাফির আল-উমুবী আল-হাক্কারী রহ. নামে একজন প্রখ্যাত আলেমে দীন বসবাস করতেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আলেম ছিলেন। আল্লাহর নেক বান্দাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেক বান্দা। কুরআন ও সুন্নাহের অনুসারী বড় বড় শাইখদের মধ্যে তিনিও ছিলেন অন্যতম। তৎকালীন সময়ে উম্মতের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল আলোচিত এবং তার প্রশংসা ছিল উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে তার একটি ভালো প্রভাব ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা ও সম্মান ছিল তা সীমা ছড়িয়ে যায় এবং অতি উৎসাহীরা একটি গোমরাহ দলে পরিণত হয়। ফলে তাদের অত্যধিক বাড়াবাড়ি এমন আকার ধারণ করে যা তাদের শাইখ ‘আদী যে সত্যের ওপর ছিলেন এবং কুরআন-সুন্নাহ ও সঠিক ইসলামী আকীদা ধারক-বাহক ছিলেন তার প্রতি তাদের ভালোবাসা তার বিরুদ্ধে চলে যায়। ফলে মুসলিম আলেম যারা বিশুদ্ধ আকীদার অধিকারী তাদের ওপর দায়িত্ব হয়ে দাড়ায় তারা যেন তাদের আকীদাকে সংশোধন করে দেয় এবং যারা সত্য থেকে দূরে সরে গেছে তাদের সঠিক পথের ওপর পরিচালনা করে এবং তাদের সঠিক পথের ওপর ফিরিয়ে আনে।
এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করার জন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. এগিয়ে আসেন। তিনি ‘আদী ইবন মুসাফির রহ. অনুসারীদের নিকট একটি পত্র লিখেন। তাতে তিনি তাদের পূর্বসূরি মাশাইখগণ যাদের তারা অনুসরণ করছে, যাদের চলার পথে তারা হাঁটছে তারা যে সত্যের ওপর ছিল তা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন। আরও জানিয়ে দেন যে, তাদের জন্য উচিৎ হচ্ছে তারা যেন কুরআন ও সুন্নাহকে মজবুত করে ধরে। এ ছাড়াও তিনি এ রিসালাটিতে তাদের পথভ্রষ্টতা ও পথভ্রষ্টতার কারণসমূহ সম্পর্কে তাদের সতর্ক করেন। যাতে করে যে জীবিত থাকে সে যেন দলীলের ভিত্তিতেই জীবিত থাকে আর যে মারা যায় সেও যেমন দলীলের ভিত্তিতে মারা যায়। তারপর এ রিসালাটি ‘আল ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। রিসালাটি মাজমু‘আয়ে ফাতওয়ায়ে ইবন তাইমিয়্যাহ-এর তৃতীয় খণ্ডে পাওয়া যায়। তবে রিসালাটি যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাই প্রতিটি মুসলিমের জন্য বিষয়গুলো জানা থাকা খুবই জরুরি। এ রিসালাটিতে ইসলামী আকীদাগুলো তুলে ধরা হয়েছে যা জানা থাকা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরয। এ ছাড়াও আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্বকে খুব সুন্দরভাবে আলোচনা করেছেন। এ বইটিতে মুসলিম জাতির বিভিন্ন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, কুরআন ও হাদীসের আলোকে তার সমাধান কি হতে পারে বিজ্ঞ লেখক তা নির্ণয় করে দিয়েছেন। বইটিতে প্রথমে তিনি এ উম্মতের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতকে ইসলামী শরী‘আতের মতো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান ও দীন দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সমস্ত উম্মত ও জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন -তা আলোচনা করেছেন। এ উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতকে সামষ্টিক গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করেছেন। কুরআন ও সূন্নাহ যে উম্মতের চলার একমাত্র পাথেয় এবং ইসলামী শরী‘আতের একমাত্র মানদণ্ড ও প্রমাণ তা এ কিতাবে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নবী রাসূল, আসমানী কিতাব, ফিরিশতা সম্পর্কে মুসলিমদের আকীদা বিশ্বাস কি হওয়া উচিৎ তার একটি সমাধান এ বইটিতে আলোচনা করা হয়। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের ইবাদাত, মু‘আমালাত, মু‘আশারাতসহ এমন কিছু বাকী রাখেন নি যে বিষয়ে সংক্ষেপে এ বইটি আলোচনা করা হয় নি। তৎকালীন যুগের বিভিন্ন ফিতনা, বিবাদ ও মতানৈক্য বইটিতে তুলে ধরে এ সব ফিতনা বিবাধের ক্ষেত্রে আহলে সূন্নাত ওয়াল জামা‘আত যে একটি মধ্যপন্থী উম্মত তা এখানে তুলে ধরা হয়। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ গবেষণা করে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, আল্লাহ তা‘আলার পথে দাওয়াত দেওয়া ওয়াজিব।
আল্লামা ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. যে উদ্দেশ্যে মুসলিম জাতিকে উপদেশ প্রদান করেছেন তা যদি আজকের মুসলিম বিশ্ব গ্রহণ করে তাহলেই মুসলিম জাতি ফিরে পাবে তাদের হারানো ঐতিহ্য, গঠিত হবে সার্বজনীন বিশ্ব ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। নিরসন হবে হাজারো বছরের দলীয় ফাসাদ, হাঙ্গামা ও পরস্পর কাঁদা ছোড়া-ছুড়ির নোংরা পথ। প্রতিষ্ঠিত হবে এক ও অখণ্ডিত মুসলিম সমাজ। বইটির গুরুত্ব মুসলিম ভাইদের জন্য কত যে অপরিসীম তা কাগজ কলমে লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে বর্তমান ফিতনা ফ্যাসাদের যুগে বইটি ইসলামী গবেষক ও দা‘ঈ ভাইদের আত্মার বিশেষ খোরাক, চলার পথের পাথেয়। তাই বাংলা ভাষাভাষী ভাইদের হাতে বইটি তুলে দেওয়া খুবই জরুরি। কারণ, আমাদের দেশে বিদ‘আত, শির্কের যে ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে তা হতে জাতিকে রক্ষা করতে এ অসাধারণ বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এ ছাড়াও দলাদলি, মারামারি, কাটাকাটি, বিভক্তি ইত্যাদি নিরসনে একটি সার্বজনীন সমাধান এ বই থেকে গ্রহণ করা যাবে। তাই বইটি অনুবাদ করার এ মহৎ কাজটি আঞ্জাম দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করি যাতে করে এ দ্বারা বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম ভাইয়েরা উপকৃত হন। এ বইটির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অনেকেই করেছেন। তবে আমি যাদের লিখিত ব্যাখ্যা অনুসরণ করে বইটি অনুবাদ করেছি, তারা হলেন মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আন-নামির ও উসমান জুম‘আহ দামীরীয়্যাহ। তারা তাদের ব্যাখ্যায় কুরআনের প্রয়োজনীয় আয়াতগুলো উল্লেখ করেছেন। যেখানে আয়াতটি সংক্ষেপে আনা হয়েছে সেখানে তা বুঝানো জন্য পুরো আয়াতটি তুলে ধরেছেন। এ ছাড়াও হাদীসের তাখরীজসহ বিভিন্ন মাশায়েখদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের উভয়কে উত্তম বিনিময় দান করুন। তবে আমি আমার অনুবাদে তাদের ব্যাখ্যা ও টিকাসমূহ সম্পূর্ণ এখানে নিয়ে আসে নি। আমি শুধু প্রয়োজনীয় আয়াত, গুরুত্বপূর্ণ হাদীসের তাখরীজ হাদীস সহ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এ ছাড়াও যে বিষয়টিকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি সে বিষয়টিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহ তা‘আলার নিকট কামনা করি আল্লাহ যেন এ প্রচেষ্টাকে কবুল করেন এবং এর দ্বারা মুসলিম উম্মাহকে উপকৃত করেন। আমীন।
জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের
“নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহর নিকট আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্টতা ও আমাদের কর্মসমূহের খারাবী থেকে আশ্রয় কামনা করি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই। আর যাকে গোমরাহ করেন, তাকে হিদায়াত দেওয়ারও কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার ওপর, তার পরিবার-পরিজন ও তার সাহাবীগণের ওপর এবং যারা কিয়ামত অবধি ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করেন তাদের ওপর।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় বান্দাদের প্রতি অধিক দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি তার বান্দাদের যে কোনো উপায়ে ক্ষমা করতে ও তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন।
আমরা সরল পথে চলতে চাই, হক জানতে চাই। অথচ সুপথ পেতে হলে রব হিসেবে আল্লাহকে মানতে হবে, তাগূতকে বর্জন করতে হবে, জীবনাদর্শ হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে হবে এবং তাকে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে মানতে হবে। রাসূলের জীবনেই আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে বাতিল আদর্শ পরিত্যাগ করতে হবে।
‘মহা উপদেশ’ গ্রন্থটির মূল আরবী শিরোনাম হলো ‘আল ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা’-এর লেখক হলেন বৈপ্লবিক সংস্কারক আল্লামা তাকী উদ্দীন আহমাদ ইবন আব্দুল হালীম ইবন তাইমিয়্যাহ। তিনি এ বইটি বিশেষ একটি পেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে লিখেন।
পঞ্চম শতাব্দীতে ইরাকের মূসেল শহরে শাইখ ‘আদী ইবন মুসাফির আল-উমুবী আল-হাক্কারী রহ. নামে একজন প্রখ্যাত আলেমে দীন বসবাস করতেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আলেম ছিলেন। আল্লাহর নেক বান্দাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেক বান্দা। কুরআন ও সুন্নাহের অনুসারী বড় বড় শাইখদের মধ্যে তিনিও ছিলেন অন্যতম। তৎকালীন সময়ে উম্মতের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল আলোচিত এবং তার প্রশংসা ছিল উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তা‘আলা মানুষের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে তার একটি ভালো প্রভাব ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা ও সম্মান ছিল তা সীমা ছড়িয়ে যায় এবং অতি উৎসাহীরা একটি গোমরাহ দলে পরিণত হয়। ফলে তাদের অত্যধিক বাড়াবাড়ি এমন আকার ধারণ করে যা তাদের শাইখ ‘আদী যে সত্যের ওপর ছিলেন এবং কুরআন-সুন্নাহ ও সঠিক ইসলামী আকীদা ধারক-বাহক ছিলেন তার প্রতি তাদের ভালোবাসা তার বিরুদ্ধে চলে যায়। ফলে মুসলিম আলেম যারা বিশুদ্ধ আকীদার অধিকারী তাদের ওপর দায়িত্ব হয়ে দাড়ায় তারা যেন তাদের আকীদাকে সংশোধন করে দেয় এবং যারা সত্য থেকে দূরে সরে গেছে তাদের সঠিক পথের ওপর পরিচালনা করে এবং তাদের সঠিক পথের ওপর ফিরিয়ে আনে।
এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালন করার জন্য শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. এগিয়ে আসেন। তিনি ‘আদী ইবন মুসাফির রহ. অনুসারীদের নিকট একটি পত্র লিখেন। তাতে তিনি তাদের পূর্বসূরি মাশাইখগণ যাদের তারা অনুসরণ করছে, যাদের চলার পথে তারা হাঁটছে তারা যে সত্যের ওপর ছিল তা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন। আরও জানিয়ে দেন যে, তাদের জন্য উচিৎ হচ্ছে তারা যেন কুরআন ও সুন্নাহকে মজবুত করে ধরে। এ ছাড়াও তিনি এ রিসালাটিতে তাদের পথভ্রষ্টতা ও পথভ্রষ্টতার কারণসমূহ সম্পর্কে তাদের সতর্ক করেন। যাতে করে যে জীবিত থাকে সে যেন দলীলের ভিত্তিতেই জীবিত থাকে আর যে মারা যায় সেও যেমন দলীলের ভিত্তিতে মারা যায়। তারপর এ রিসালাটি ‘আল ওয়াসিয়্যাতুল কুবরা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। রিসালাটি মাজমু‘আয়ে ফাতওয়ায়ে ইবন তাইমিয়্যাহ-এর তৃতীয় খণ্ডে পাওয়া যায়। তবে রিসালাটি যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাই প্রতিটি মুসলিমের জন্য বিষয়গুলো জানা থাকা খুবই জরুরি। এ রিসালাটিতে ইসলামী আকীদাগুলো তুলে ধরা হয়েছে যা জানা থাকা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরয। এ ছাড়াও আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার গুরুত্বকে খুব সুন্দরভাবে আলোচনা করেছেন। এ বইটিতে মুসলিম জাতির বিভিন্ন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, কুরআন ও হাদীসের আলোকে তার সমাধান কি হতে পারে বিজ্ঞ লেখক তা নির্ণয় করে দিয়েছেন। বইটিতে প্রথমে তিনি এ উম্মতের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতকে ইসলামী শরী‘আতের মতো এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান ও দীন দেওয়ার মাধ্যমে তাদেরকে সমস্ত উম্মত ও জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন -তা আলোচনা করেছেন। এ উম্মতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ তা‘আলা এ উম্মতকে সামষ্টিক গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করেছেন। কুরআন ও সূন্নাহ যে উম্মতের চলার একমাত্র পাথেয় এবং ইসলামী শরী‘আতের একমাত্র মানদণ্ড ও প্রমাণ তা এ কিতাবে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নবী রাসূল, আসমানী কিতাব, ফিরিশতা সম্পর্কে মুসলিমদের আকীদা বিশ্বাস কি হওয়া উচিৎ তার একটি সমাধান এ বইটিতে আলোচনা করা হয়। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের ইবাদাত, মু‘আমালাত, মু‘আশারাতসহ এমন কিছু বাকী রাখেন নি যে বিষয়ে সংক্ষেপে এ বইটি আলোচনা করা হয় নি। তৎকালীন যুগের বিভিন্ন ফিতনা, বিবাদ ও মতানৈক্য বইটিতে তুলে ধরে এ সব ফিতনা বিবাধের ক্ষেত্রে আহলে সূন্নাত ওয়াল জামা‘আত যে একটি মধ্যপন্থী উম্মত তা এখানে তুলে ধরা হয়। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ গবেষণা করে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, আল্লাহ তা‘আলার পথে দাওয়াত দেওয়া ওয়াজিব।
আল্লামা ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. যে উদ্দেশ্যে মুসলিম জাতিকে উপদেশ প্রদান করেছেন তা যদি আজকের মুসলিম বিশ্ব গ্রহণ করে তাহলেই মুসলিম জাতি ফিরে পাবে তাদের হারানো ঐতিহ্য, গঠিত হবে সার্বজনীন বিশ্ব ইসলামী ভ্রাতৃত্ব। নিরসন হবে হাজারো বছরের দলীয় ফাসাদ, হাঙ্গামা ও পরস্পর কাঁদা ছোড়া-ছুড়ির নোংরা পথ। প্রতিষ্ঠিত হবে এক ও অখণ্ডিত মুসলিম সমাজ। বইটির গুরুত্ব মুসলিম ভাইদের জন্য কত যে অপরিসীম তা কাগজ কলমে লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে বর্তমান ফিতনা ফ্যাসাদের যুগে বইটি ইসলামী গবেষক ও দা‘ঈ ভাইদের আত্মার বিশেষ খোরাক, চলার পথের পাথেয়। তাই বাংলা ভাষাভাষী ভাইদের হাতে বইটি তুলে দেওয়া খুবই জরুরি। কারণ, আমাদের দেশে বিদ‘আত, শির্কের যে ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে তা হতে জাতিকে রক্ষা করতে এ অসাধারণ বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এ ছাড়াও দলাদলি, মারামারি, কাটাকাটি, বিভক্তি ইত্যাদি নিরসনে একটি সার্বজনীন সমাধান এ বই থেকে গ্রহণ করা যাবে। তাই বইটি অনুবাদ করার এ মহৎ কাজটি আঞ্জাম দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করি যাতে করে এ দ্বারা বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম ভাইয়েরা উপকৃত হন। এ বইটির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অনেকেই করেছেন। তবে আমি যাদের লিখিত ব্যাখ্যা অনুসরণ করে বইটি অনুবাদ করেছি, তারা হলেন মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আন-নামির ও উসমান জুম‘আহ দামীরীয়্যাহ। তারা তাদের ব্যাখ্যায় কুরআনের প্রয়োজনীয় আয়াতগুলো উল্লেখ করেছেন। যেখানে আয়াতটি সংক্ষেপে আনা হয়েছে সেখানে তা বুঝানো জন্য পুরো আয়াতটি তুলে ধরেছেন। এ ছাড়াও হাদীসের তাখরীজসহ বিভিন্ন মাশায়েখদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের উভয়কে উত্তম বিনিময় দান করুন। তবে আমি আমার অনুবাদে তাদের ব্যাখ্যা ও টিকাসমূহ সম্পূর্ণ এখানে নিয়ে আসে নি। আমি শুধু প্রয়োজনীয় আয়াত, গুরুত্বপূর্ণ হাদীসের তাখরীজ হাদীস সহ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এ ছাড়াও যে বিষয়টিকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি সে বিষয়টিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আল্লাহ তা‘আলার নিকট কামনা করি আল্লাহ যেন এ প্রচেষ্টাকে কবুল করেন এবং এর দ্বারা মুসলিম উম্মাহকে উপকৃত করেন। আমীন।
জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের