hadith book logo

সংক্ষিপ্ত ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব

লেখকঃ সাইয়্যেদ মাহমূদ শুকরী আলূসী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩০

২৮। হালাল বস্তুকে হারাম করে ‘ইবাদতে লিপ্ত হওয়া

জাহেলী যুগে এটা প্রচলিত ছিল (যেমন তারা তাওয়াফের সময় কাপড় পরতো না, হজ্জের মওসুমে চর্বি খেতো না ইত্যাদি)। আল্লাহ এ সবের প্রতিবাদ করে বলেন-

يَا بَنِي آَدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ﴿31﴾ قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آَمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآَيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ ﴿32﴾ قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ ﴿33﴾ ( سورة الأعراف : 31-33)

‘হে বনী আদম! প্রত্যেক ছালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোষাক পরিধান করো। তোমরা নিয়মিত আহার করো, পান করো, কিন্তু অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালবাসেন না। (হে নবী) আপনি বলে দিন, আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্য সম্ভার ও বিশুদ্ধ জীবিকা সৃষ্টি করেছেন তাকে তাদের জন্য কে হারাম করেছে ? বলে দিন, এ সবই মুমিনদের জন্য, তাদের পার্থিব জীবনে ও বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে। এইরূপে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমরা নিদর্শনগুলি বিশদভাবে বিবৃত করি। (হে নবী) আপনি বলে দিন যে, আমার প্রভু নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন যাবতীয় প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, সকল প্রকারের পাপকার্য, অসংগত বিরোধিতা এবং আল্লাহর সাথে শির্ক- যে সম্পর্কে কোনো দলিল তিনি নাযিল করেননি এবং নিষিদ্ধ করেছেন, আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলা, যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই’। (সূরা আ‘রাফ, ৭: আয়াত ৩১-৩৩)

প্রথম আয়াতটি নাযিলের কারণ হলো যে, বেদুঈন আরবদের অনেকে উলংগ হয়ে পবিত্র কাবাঘর ‘তাওয়াফ’ (প্রদক্ষিণ) করতো। এমনকি মেয়েরাও উলংগ হয়ে অনুরূপ করতো এবং গান গেতো। যার কিছু উদ্ধৃতি পূর্বে দেওয়া হয়েছে। কালবী বলেন যে, হজ্জের মওসুমে আরবরা বেঁচে থাকার মত যৎসামান্য আহার করতো। তা হজ্জের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই সময়ে কোনো চর্বিযুক্ত খাবার খেতো না। এ অবস্থায় মুসলিমরা আল্লাহর নবীকে বললেন যে, আমরাই তো হজ্জের সম্মান রক্ষার অধিক হকদার। তখন আল্লাহ উপরোক্ত আয়াত নাযিল করেন।

দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, মানুষের কল্যাণ ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সৃষ্ট সূতী, কাতান, রেশমী প্রভৃতি বস্ত্রসমূহ এবং খাসী ও গরুর গোস্ত, চর্বি, দুধ প্রভৃতি যাবতীয় হালাল খাদ্যসমূহ তাদের জন্য সব সময়ই হালাল। মু’মিনদের জন্য এগুলো খাছ এজন্য বলা হয়েছে যে, আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা সর্বাধিক। সুতরাং এ সকল নিয়ামতের প্রকৃত হকদার তারাই। তবে অবিশ্বাসীরাও এসব ভোগ করতে পারবে সাধারণভাবে মুমিনদের অনুসরণে। অবশ্য পরকালীন জীবনে এ সমস্ত সৌন্দর্য সম্ভার উপভোগের অধিকারী হবেন কেবলমাত্র মুমিনরাই।

তৃতীয় আয়াতে ‘প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতার’ ব্যাখ্যায় কোনো কোন মুফাসসীর ‘প্রকাশ্য ও গোপন ব্যাভিচার’ বলেছেন। আরবরা প্রকাশ্য ব্যাভিচার অপছন্দ করতো। কিন্তু গোপনে একাজে অভ্যস্ত ছিল। মুজাহিদ বলেন, ‘প্রকাশ্য অশ্লীলতা’ অর্থে ‘উলঙ্গ তাওয়াফ’ এবং ‘গোপন অশ্লীলতা’ অর্থে ব্যাভিচার বুঝানো হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ‘প্রকাশ্য’ অর্থে পুরুষদের দিবসে উলংগ তাওয়াফ বুঝানো হয়েছে।

‘পাপকর্ম’ বলতে সব ধরনের পাপাচার বুঝানো হয়েছে। তবে কেউ কেউ আরবদের কবিতায় ব্যবহৃত উক্ত শব্দের প্রচলিত অর্থের দিকে খেয়াল করে এখানে ‘মদের’ অর্থ করেছেন। [ نهانا رسول الله أن نقرب الزنا ، وأن نشرب الإثم الذي يوجب الوزرا .অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যিনার নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন এবং নিষেধ করেছেন মদ্য পান করতে, যার দ্বারা গুনাহ, অপরিহার্য।]

‘শির্ক- যে সম্পর্কে কোনো দলীল আল্লাহ নাযিল করেননি’ এর দ্বারা আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করা এবং তাঁর সম্বন্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বুঝানো হয়েছে। যেমন- তারা নিজেদের অপকর্মের সমর্থনে যুক্তি দেখিয়ে বলতো যে-

﴿وَٱللَّهُ أَمَرَنَا بِهَاۗ ﴾ [ الاعراف : ٢٨ ]

‘আল্লাহ আমাদের এসব করতে বলেছেন’। (সূরা আ’রাফ, ৭: আয়াত ২৮)

একথা সবারই জানা যে, আমাদের যামানার সুফী ছাহেবদের মধ্যে জাহেলী যুগের ঐ সকল স্বভাব ঢুকে পড়েছে। তাঁরা লোকদের কাছে নিজেদের সুফীগিরি দেখানোর জন্য ভাল পোষাক ও ভাল খাবার ত্যাগ করেন। তাঁরা নিঃসঙ্গভাবে হুজরায় ও খানকায় বসে নিজেদের কপোলকল্পিত বিভিন্ন বিদ‘আতী তরীকায় মুরাকাবা-মুশাহাদা, ইশ্ক ও যিকরে মশগুল থাকেন। অথচ তাঁরা জানেন না যে, এর দ্বারা তারা আল্লাহ বর্ণিত ঐ সমস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন- ‘‘যারা তাদের সারাটি জীবন বরবাদ করেছে অথচ ভাবছে যে, তারা অত্যন্ত ভাল কাজ করছে’’। (সূরা কাহাফ, ১৮ : আয়াত ১০৪)