hadith book logo

সংক্ষিপ্ত ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব

লেখকঃ সাইয়্যেদ মাহমূদ শুকরী আলূসী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫২

৫০। জিবত ও তাগুতের উপর ঈমান

‘জিবত’ প্রতিমার নাম। পারিভাষিক অর্থে আল্লাহ ব্যতীত সকল মা’বুদকেই বুঝানো হয়। ‘তাগুত’ অর্থ সকল ধরণের বাতিল। চাই সে মা’বুদ হোক বা অন্য কিছু। এ দু’টির উপরে ঈমান আনার অর্থ দু’ধরণের হতে পারে। দু’টিকেই প্রকৃত অর্থে মা’বুদ বা উপাস্য বলে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর ইবাদতে তাদেরকে শরীক করা। দুই-উক্ত ‘জিবত’ ও ‘তাগুত’ প্রসূত সকল প্রকারের বাতিল মতাদর্শের অনুসরণ করা। তবে প্রথমোক্ত ব্যাখ্যাই অধিক সংগত। এজন্য যে, তারা আল্লাহর সংগে উক্ত দুই বস্তুকে শরীক করতো এবং সিজদা করতো।

প্রতিমা ও তাগুতের উপর ঈমান আনা এবং মুসলিমদের উপর মুশরিকদের প্রাধান্য দেওয়া জাহেলী যুগের অন্যতম রীতি ছিল। আল্লাহ ইয়াহূদীদের সম্পর্কে বলেন-

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آَمَنُوا سَبِيلًا . ( سورة النساء : 51)

আপনি কি লক্ষ্য করেননি এসব লোকদের দিকে? যারা কিতাবের কিছু অংশ পেয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত) তারা (আল্লাহকে মানার দাবী করা সত্ত্বেও) জিবত ও তাগুতের প্রতি ঈমান এনেছে এবং কাফিরদেরকে বলছে যে, তোমরা মুমিন-মুসলিমদের চাইতে অধিকতর সৎপথ প্রাপ্ত। (সূরা আন-নিসা, ৪: আয়াত ৫১)

উপরোক্ত আয়াতটির শানে নুযূলঃ ওহুদ যুদ্ধে বিপর্যয়ের পর পূনরায় রাসূলুল্লাহ সা. এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য কুরাইশদের সংগে আঁতাত করার দুরভিসন্ধি নিয়ে হুয়াই ইবন আখতাব ও কা‘আব ইবন আশরাফ নামক দুই ইয়াহূদী নেতা তাদের সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি ভংগ করে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হয় এবং কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। আবু সুফিয়ান তাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দান করেন। সঙ্গী অন্যান্য ইয়াহূদীকে কুরাইশদের বিভিন্ন লোকের বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করে। তখন মক্কাবাসীরা তাদেরকে প্রশ্ন করে যে, তোমরা কিতাবধারী, মুহাম্মদও কিতাব আনয়নকারী। অতএব তোমরা যে আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করতে আসোনি, তা আমরা কেমন করে বুঝবো ? অতএব তোমরা যদি আমাদেরকে তোমদের সংগে নিয়ে যুদ্ধে বের হতে চাও, তাহলে এই দু’টি প্রতিমার নিকট সিজদা করো এবং এদের উপর ঈমান আনো। কা‘আব তাই-ই করলো। অতঃপর সে মক্কাবাসীকে লক্ষ্য করে বলল, তোমাদের মধ্যে ত্রিশজন ও আমাদের ত্রিশজন এসে কাবাঘরের সংগে স্ব-স্ব বুক চেপে ধরে দাঁড়াবে এবং শপথ পড়বে এই বলে যে এই মহিমান্বিত গৃহের মালিকের নামে শপথ করছি যে, আমরা সকলে সর্বশক্তি নিয়ে মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো। তার প্রস্তাব মতে সবাই তাই করলো। পরিশেষে আবু সুফিয়ান কা‘আবকে বলেন যে, আপনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর কিতাব (তাওরাত) পড়ে থাকেন এবং অন্যকে শিখিয়ে থাকেন। আমরা মুর্খ, কিছুই জানি না। আচ্ছা বলুন তো মুহাম্মাদ ও আমাদের মধ্যে কে সঠিক পথে বা সত্যের নিকটবর্তী পথে আছে ? কা‘আব বলে- বেশ, তাহলে আপনাদের ধর্মের ব্যাখ্যা দিন। আবু সুফিয়ান বললেন- আমরা আমাদের সেরা উটগুলিকে হাজীদের জন্য যবেহ করে থাকি, তাদের দুধ পান করাই, মেহমানদারী করি, কয়েদীদের মুক্ত করি, আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করি, আমাদের প্রতিপালকের এই গৃহ (কাবাগৃহ) সংস্কার করি ও তাওয়াফ করি এবং সবশেষে আমরা পবিত্র হারামের অধিবাসী।

পক্ষান্তরে মুহাম্মদ তার বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আমাদের দ্বীন হলো প্রাচীন ও মুহাম্মদের দ্বীন হলো নূতন। এসব শুনে কা‘আব উত্তরে বলল যে, আল্লাহর কসম! তোমরাই মুহাম্মদের চেয়ে অধিকতর হেদায়াতের পথে আছো। বলাবাহুল্য, এ পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।