hadith book logo

সংক্ষিপ্ত ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব

লেখকঃ সাইয়্যেদ মাহমূদ শুকরী আলূসী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৯

৩৭। আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে অন্যের দিকে সম্পর্কিত করা

যেমন আল্লাহ বলেন-

يَعْرِفُونَ نِعْمَةَ اللَّهِ ثُمَّ يُنْكِرُونَهَا وَأَكْثَرُهُمُ الْكَافِرُونَ . ( سورة النحل : 83)

‘তারা আল্লাহর অনুগ্রহসমূহ জ্ঞাত আছে। কিন্তু সেগুলিকে তারা অস্বীকার করে। উহাদের অধিকাংশই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী’। (সূরা আন-নাহল, ১৬: আয়াত ৮৩)

এর আগে ৭৮ হতে ৮২ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ মানুষের প্রতি তাঁর নেয়ামতসমূহের বর্ণনা দিয়ে বলেন-

وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ﴿78﴾ أَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ مُسَخَّرَاتٍ فِي جَوِّ السَّمَاءِ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا اللَّهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ﴿79﴾ وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ سَكَنًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ جُلُودِ الْأَنْعَامِ بُيُوتًا تَسْتَخِفُّونَهَا يَوْمَ ظَعْنِكُمْ وَيَوْمَ إِقَامَتِكُمْ وَمِنْ أَصْوَافِهَا وَأَوْبَارِهَا وَأَشْعَارِهَا أَثَاثًا وَمَتَاعًا إِلَى حِينٍ ﴿80﴾ وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِمَّا خَلَقَ ظِلَالًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنَ الْجِبَالِ أَكْنَانًا وَجَعَلَ لَكُمْ سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيلَ تَقِيكُمْ بَأْسَكُمْ كَذَلِكَ يُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْلِمُونَ ﴿81﴾ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ﴿82﴾ ( سورة النحل : 78-82)

‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ হতে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় দান করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। তারা কি লক্ষ্য করে না পাখীকুলের দিকে, যারা আকাশে বিচরণ করে? আল্লাহই ওদেরকে শুন্যে ধরে রাখেন। অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য। আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলিকে তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং পশুর চামড়া হতে তোমাদের জন্য তাবুর ব্যবস্থা করেছেন, যাতে ভ্রমণকালে তোমরা তা সহজে বহন করতে পারো। এবং অবস্থানকালে সহজে খাটাতে পারো। তিনি চুতস্পদ জন্তুসমূহের পশম, লোম ও কেশ হতে তোমাদের কিছু কালের ব্যবহার্য হিসাবে গৃহ সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা, পাহাড়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং পরিধেয় বস্ত্রের সংস্থান করেছেন, যা তোমাদেরকে উত্তাপ হতে রক্ষা করে। তিনি তোমদেরকে যুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য বর্মের ব্যবস্থা করেছেন। এইভাবে তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামতসমূহ পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা মুসলিম বা আত্মসমর্পনকারী হও। এরপরেও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে হে নবী, পরিষ্কারভাবে বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া ব্যতীত আপনার আর কিছুই করার নেই’। (সূরা আন-নাহল, ১৬: আয়াত ৭৮-৮২)

উপরোক্ত নেয়ামতসমূহকে জেনে শুনেও জাহেলরা অস্বীকার করে থাকে। তারা ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খালেছ করে না। অথচ তারা ভালভাবেই জানে যে, এসব নেয়ামত আল্লাহ দিয়েছেন। ইবনে জারীর প্রমুখ মুজাহিদ হতে বর্ণনা করেন যে, তাদের অস্বীকারের ধরণ ছিল এই প্রকারের যে, ‘আমরা এসব আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি’। কেউ কেউ বলতো ‘যদি অমুক না থাকতো, তাহলে আমার অমন বিপদ ঘটে যেতো। অথচ ‘যদি অমুক না থাকতো তাহলে আমার অমন বিপদ ঘটতো না’। কেউ বলতো ‘এটি তাদের দেব-দেবীদের সুপারিশে হয়েছে। কেউ এমনও বলতো যে, আমাদের মধ্যে আল্লাহর নেয়ামত হিসাবে মুহাম্মাদ আছে’। অর্থাৎ তারা সত্যিকারের নবী হিসাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানতো। কিন্তু স্বীকার করতো না।

এখানে ইনকার বা অস্বীকার অর্থাৎ মূল স্রষ্টার দিকে সম্বন্ধ না করে আসবাব বা কার্যকারকসমূহের দিকে সম্পর্কিত করা। তাদের অধিকাংশই অস্বীকারকারী, একথা কয়েকটি কারণে বলা হয়েছে। যেমন- তাদের মধ্যে কেউ কেউ কমবুদ্ধি হওয়ার কারণে হক চিনতে পারে না। কেউ এমন আছে যারা যুক্তি প্রমাণের দিকে খেয়াল করে না, যদ্বারা উদ্দেশ্য হাছিল সম্ভব হয়। কেউ এমন আছে, শৈশব অবস্থা বা অন্য কারণে যাদের উপর শরীয়তের আদেশ-নিষেধাবলী জারি করার যোগ্য বিবেচিত হয় না। এজন্য সকলকে অস্বীকারকারী না বলে অধিকাংশকে অস্বীকারকারী বলা হয়েছে।

সূরা ওয়াকেয়ার ৮১-৮২ আয়াতে উপরোক্ত মর্ম ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

أَفَبِهَذَا الْحَدِيثِ أَنْتُمْ مُدْهِنُونَ ﴿81﴾ وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُونَ ﴿82﴾ ( سورة الواقعة : 81-82)

‘তোমরা কি এইসব কথার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করবে এবং সৃষ্টিকেই সবকিছু ধরে নিবে ? অথচ (একথা গুলিকে) মিথ্যা মনে করলে ?

মুসলিম শরীফে ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে একবার বৃষ্টি হলে তিনি ইরশাদ করলেন যে, আজ কেউ শুকরগুযার ও কেউ কাফির হিসাবে প্রভাতে উঠেছে। কেননা, লোকদের কেউ বলেছে, ইহা আল্লাহর পক্ষ হতে রহমত হিসাবে এসেছে। আবার কেউ বলেছে যে, অমুক নক্ষত্রের কারণে বৃষ্টি হয়েছে’।

এই উপলক্ষে উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়।

মোটকথা, নেয়ামতসমূহকে উহার মূল সৃষ্টিকর্তার দিকে সম্বন্ধিত না করাই হলো মূলতঃ আল্লাহকে অস্বীকার করা। বৃষ্টি বা নক্ষত্রের ব্যাপারে আরবদের ধারণা ও এ সম্পর্কে তাদের রচিত বহু কবিতা রয়েছে।