hadith book logo

সংক্ষিপ্ত ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব

লেখকঃ সাইয়্যেদ মাহমূদ শুকরী আলূসী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩১

২৯। আল্লাহর নাম ও গুণাবলী বিকৃত করা

জাহেলী যুগের লোকদের এ স্বভাব ছিল। আল্লাহ তার প্রতিবাদ করে বলেন-

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ﴿180﴾ ( سورة الأعراف : 180)

‘উত্তম নামসমূহ আল্লাহর জন্যই, তোমরা তাঁকে সে সকল নামেই ডাকো এবং যারা তাঁর নামসমূহ বিকৃত করেছে তাদেরকে পরিত্যাগ করো। তারা অতিসত্ত্বর তাদের কৃতকর্মের ফল পাবে’। (সূরা আ‘রাফ, ৭ : আয়াত ১৮০)

আল্লাহর নাম বিকৃত করা অর্থ তাঁকে এমন নামে ডাকা যা উদ্দেশ্য নয়। অথবা যার দ্বারা কোনো বাজে অর্থ কল্পনা করা যেতে পারে। যেমন- কোনো বেদুঈনের ডাক ‘ইয়া আবাল মাকারিম’ (হে দানশীলদের পিতা) ‘ইয়া আবয়াদাল ওয়াজহি’ (হে সফেদ চেহারার অধিকারী) ‘‘ইয়া সাখিইউ’ (হে দাতা) প্রভৃতি। এগুলো তারা তাদের ধারণা মাফিক বলতো। প্রকৃত অর্থে এগুলো আল্লাহর নাম নয়। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

كَذَلِكَ أَرْسَلْنَاكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَتْلُوَ عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَنِ قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ ﴿30﴾ ( سورة الرعد : 30)

‘ইতোপূর্বে বিভিন্ন জাতির নিকট যেমন (নবী) পাঠিয়েছিলাম, তেমনি আপনাকেও একটি জাতির নিকট পাঠিয়েছি, কেবল আমার অহীসমূহ তিলাওয়াত করে শুনাবার জন্য। অথচ তারা ‘রহমান’ কে অস্বীকার করেছে। আপনি বলে দিন যে, ‘তিনিই আমার প্রতিপালক’। তিনি ব্যতীত আমার অন্য কোনো ইলাহ বা মা’বুদ নেই। তাঁর উপরই আমি নির্ভর করি এবং তাঁর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন’। (সূরা আর-রা’দ, ১৩ : আয়াত ৩০)

কাতাদাহ, ইবনু জুরায়েজ ও মুকাতিল হতে বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত আয়াতটি মক্কায় মুশরিকদের সম্পর্কে নাযিল হয়। হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পক্ষ হতে আলী রা. লিখিত পত্রে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ দেখে তাদের প্রতিনিধি সোহায়েল ইবন আমর বলে ওঠে আমরা ‘রহমান’ বলে কাউকে জানি না। কোনো কোন তাফসীরকারের মতে আবু জেহেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘ইয়া আল্লাহ’ ইয়া রহমান’ বলতে শুনে বলে ওঠে যে, ‘মুহাম্মাদ আমাদেরকে বহু মা’বুদের উপাসনা করতে নিষেধ করে, অথচ সে নিজে দুই মা’বুদকে ডাকছে। জওয়াবে উক্ত আয়াত নাযিল হয়। কারো কারো মতে- যখন কাফিরদেরকে বলা হলো ‘তোমরা রহমানকে সিজদা করো’ তখন তারা বলে ‘রহমান’ কি বস্তু ? এই সময় উক্ত আয়াত নাযিল হয়।

এভাবে আল্লাহর নামসমূহ বিকৃত করার সাথে সাথে তারা আল্লাহর গুণাবলীরও বিকৃত অর্থ গ্রহণ করেছিল। যেমন- আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী প্রভৃতি আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- একদা আমি কা’বা শরীফের আড়ালে বসেছিলাম। এমন সময় একজন কুরায়শী ও দু’জন ছাকাফী অথবা একজন ছাকাফী ও দু’জন কুরায়শী সেখানে এলো। বিরাট দেহধারী ছিল তারা। কিন্তু মগজে কিছুই ছিল না। তাদের একজন বলল, ‘আচ্ছা আমাদের এই নীরব কথাবার্তা কি আল্লাহ শুনতে পাচ্ছেন’? উত্তরে অন্যজন বলল, যদি আমরা জোরে বলি তাহলে শুনতে পাবেন নইলে পাবেন না’। আরেকজন বলল, যদি তিনি আমাদের কথাবার্তার কিছু অংশ শুনে ফেলেন, তাহলে তিনি সবই শুনে নিবেন’। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি এই ঘটনা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট বর্ণনা করলে নিম্নের আয়াত নাযিল হয়-

وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴿21﴾ وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلَا أَبْصَارُكُمْ وَلَا جُلُودُكُمْ وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللَّهَ لَا يَعْلَمُ كَثِيرًا مِمَّا تَعْمَلُونَ ﴿22﴾ وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنْتُمْ بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴿23﴾ ( سورة حم السجدة : 21-23)

‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর শত্রুরা স্ব-স্ব গাত্র চর্মকে লক্ষ্য করে বলবে, কেন তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ ? উত্তরে তারা বলবে, আল্লাহ আমাদেরকে কথা বলবার ক্ষমতা দিয়েছেন, যেমন অন্য সকল বস্তুকে তিনি দিয়েছেন। তিনিই তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাঁর কাছেই তোমরা সবাই ফিরে যাবে। তোমাদের চক্ষু, কর্ণ ও গাত্রচর্ম তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে, এই ভয়ে তোমরা সংগোপনে কথা বলে থাকো। আসলে তোমরা মনে করে থাকো যে, তোমরা যা করো তার বেশীকিছু আল্লাহ জানেন না। এটা প্রতিপালক সম্পর্কে তোমাদের একটা ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। এই ধারণাই তোমাদেরকে ধ্বংস করবে। অতঃপর তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা হা-মীম সিজদাহ, ৪১: আয়াত ২১-২৩)

উপরোক্ত আলোচনায় আল্লাহর (শ্রবনকারী, দর্শনকারী প্রভৃতি) গুণাবলী সম্পর্কে তাদের বিকৃত অর্থ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেল। প্রিয় পাঠক ! আপনি ভাল করেই জানেন যে, মুসলিম কালাম শাস্ত্রবিদগণের [এখানে বিশেষ করে অদ্বৈতবাদী মুসলিম দার্শনিক ও তাদের অনুসারী তথাকথিত মারেফতী পরী ফকিরদের কথাই বলা হয়েছে। (অনুবাদক)না, শুধু তা নয়, বরং এখানে জাহমিয়া, মু‘তাযিলা, আশায়েরা ও মাতুরিদিয়্যা সম্প্রদায়কেও বুঝানো হয়েছে। [সম্পাদক]] মধ্যে অধিকাংশ আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জাহেলী যুগের লোকদের চাইতেও অধিক বিকৃত ধারণা করে থাকেন। তারা আল্লাহর এমন সব নাম রেখেছেন, যার কোনো দলীল আল্লাহ নাযিল করেননি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে থাকেন- আল্লাহর নিজস্ব কোনো গুণ নেই। কেউ বলেন, ‘গুণাবলী তার সত্ত্বা হতে পৃথক বস্তু।’ কেউ বলেন, আল্লাহর কিতাবসমূহ আল্লাহর কালাম নয়। তারা ‘কালামে নাফসী’ নামে আল্লাহর পৃথক কালাম প্রমাণ করতে চান। তারা বলেন যে, আল্লাহ কখনোই কোনো নবীর সংগে কালাম করেননি। এইরূপ বহু ধরনের ইলহাদ ও বাজে বিতর্কে তাদের বই-কিতাবসমূহ পরিপূর্ণ করা হয়েছে। তাঁরা দাবী করেন যে, উপরোক্ত আয়াত কেবলমাত্র জাহেলী যুগের লোকদের জন্য। অথচ তারা একথা বুঝতে নারাজ যে, এ আয়াত সমস্ত মানবজাতিকে শামিল করে। আল্লাহ যাকে দেখবার মত চোখ ও বুঝবার মত মগজ দিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই ঐ সব লোকদের বই-পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট দলীলসমূহ দ্বারা রচিত হকপন্থী আলেম- বিদ্বানদের বই-কিতাবসমূহ পড়বেন এবং আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় লাভে ধন্য হবেন।