১
ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব
লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৬
জাতীয়তা ও ধর্মে বিভিন্নতা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
ইসলাম তো সেই মদীনায় গড়ে ওঠা [ইবন হিশাম: ২/১০৭-১০৮।] রাষ্ট্র থেকেই বিভিন্নতাকে রাজনৈতিক ঐক্যের অন্যতম উপাদান মনে করে এসেছে। তাইতো তাতে নানা জাতি (আনসার, মুহাজির ও ইয়াহূদী) এবং নানা ধর্মের (মুসলিম, খ্রিস্টান, ইয়াহূদী ও মূর্তিপূজক) শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল।
ইসলাম মানুষের ব্যক্তি-অধিকার ও সামষ্টিক অধিকার সংরক্ষণ করে, তারা সংখ্যাগুরু হোক চাই সংখ্যালঘু। এদের সবার সঙ্গে ইসলাম ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে তাদের প্রত্যেকের যোগ্য পার্থক্যানুসারে। তাই দলকে যা দেয় ব্যক্তিকে তা দেয় না। যৌথ ব্যাপারলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠকে যেসব অধিকার দেওয়া হয় সংখ্যলঘিষ্ঠকে তা দেওয়া হয় না। কেননা সাধারণ ব্যাপারসমূহ যেখানে বিভিন্নতার প্রতি লক্ষ্য রাখা অসম্ভব অথচ সেখানে একতা বজায় রাখাও অবশ্যক, তাতে সংখ্যাগুরুকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ ইসলাম একান্ত প্রয়োজন না পড়লে দলের প্রয়োজনের চেয়ে ব্যক্তির প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দেয়। [চীনী, আল-আমনুল ফিকরী ওয়াল-আনযিমা।]
বস্তুত ইসলামের প্রাথমিক যুগগুলোতে ব্যবহৃত পরিভাষা ‘যিম্মী’ শব্দটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে আধুনিক যুগে বহুল প্রচলিত পরিভাষা ‘সংখ্যালঘু’র প্রায় সমার্থ বুঝায়। শব্দদ্বয়ের মধ্যে একমাত্র তফাত হলো, যিম্মী পরিভাষাটি ধর্মীয় পার্থক্য নির্দেশ করে। পক্ষান্তরে সংখ্যালঘুর অর্থ আরও ব্যাপক। কখনো জন্মসূত্রে গুণ যেমন রক্ত-বংশের প্রতি আবার কখনো অর্জিত গুণ যেমন ভাষা ও ধর্মের বিভিন্নতার প্রতি নির্দেশ করে।
ব্যক্তি পর্যায়ে (যেমন, ইবাদাত) ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে (যেমন, বিবাহ ও উত্তরাধিকার) ইসলাম সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরু বিরচিত সংবিধানে প্রদত্ত সাধারণ নীতির আলোকে যোগ্য অধিকার প্রদান করে।
তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রদেয় ‘জিযিয়া’কে বর্তমানের রাষ্ট্রীয় করগুলোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের যে তাদের সম্পদের সর্বোচ্চ ৫% প্রদান করতে হয়, তা গণতান্ত্রিক দেশে প্রদেয় করের কিয়দাংশ মাত্র। উপরন্তু ইসলামী রাষ্ট্রে নারী, শিশু, পাগল, দরিদ্র, বয়োবৃদ্ধ ও দুরারোগ্য ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এ জিযিয়ার আওতামুক্ত। [ইমাম আবূ ইউসুফ, পৃ. ১২৯-১৩০; চীনী, হাকীকা, পৃ. ৬৪।]
ইসলাম সংখ্যাগুরুদের বিশেষত্ব মেনে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণেও বদ্ধপরিকর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«أَلاَ مَنْ ظَلَمَ مُعَاهِدًا، أَوِ انْتَقَصَهُ، أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ، أَوْ أَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ ، فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» .
“জেনে রাখো, যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিতে থাকা ব্যক্তির ওপর যুলুম করবে, তার অধিকার হরণ করবে, তার ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপাবে বা তার অমতে কিছু নেবে, কিয়ামতের দিন আমিই তার বিবাদী হবো।” এখানে মু‘আহিদ বা চুক্তিতে থাকা ব্যক্তির অর্থ ব্যাপক। এতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিরাপত্তায় থাকা সব ব্যক্তিই অন্তর্ভুক্ত। চাই তিনি অমুসলিম নাগরিক হোন অথবা সে দেশেরই নাগরিক। [আবূ দাউদ, খারাজ অধ্যায়; আসকালানী: ১২/২৭০-২৭২।]
মুসলিম শাসকদের এসব নীতি অবলম্বনের ফলেই মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে যুগযুগ ধরে অমুসলিমরা বসবাস করেছে বরং সেখানে তারা স্থায়ীভাবে আবাস গেড়েছে অথচ সেসব দেশের শাসনদণ্ড ছিল মুসলিমদের বাদশাদের হাতে। এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হিন্দুস্তান বা ভারতবর্ষ, যেখানে প্রায় সাত শতাব্দী রাজ্য পরিচালনা করেছে মুসলিরা অথচ তার কোনো নাগরিককেই ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় নি। এ জন্যই এতে অবাক হবার কিছু নেই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা তাদের হিন্দু ধর্ম নিয়েই সংখ্যগরিষ্ঠ থেকে গেছে। আবার অন্যদিকে দেখা যায় দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেমন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় কোনো মুসলিম সৈন্যদল অভিযান পরিচালনা করেনি অথচ এর অধিকাংশ বাসিন্দাই ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে। [নায়েক পৃ, ১৪।] শুধু তাই নয়, একসময় উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোই খ্রিস্টানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ পলায়নপর ইহুদীদের সর্বোত্তম আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেছিল। [মিসারী, আল-ইতিযার আনিল মাযী।]
ইসলাম মানুষের ব্যক্তি-অধিকার ও সামষ্টিক অধিকার সংরক্ষণ করে, তারা সংখ্যাগুরু হোক চাই সংখ্যালঘু। এদের সবার সঙ্গে ইসলাম ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে তাদের প্রত্যেকের যোগ্য পার্থক্যানুসারে। তাই দলকে যা দেয় ব্যক্তিকে তা দেয় না। যৌথ ব্যাপারলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠকে যেসব অধিকার দেওয়া হয় সংখ্যলঘিষ্ঠকে তা দেওয়া হয় না। কেননা সাধারণ ব্যাপারসমূহ যেখানে বিভিন্নতার প্রতি লক্ষ্য রাখা অসম্ভব অথচ সেখানে একতা বজায় রাখাও অবশ্যক, তাতে সংখ্যাগুরুকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ ইসলাম একান্ত প্রয়োজন না পড়লে দলের প্রয়োজনের চেয়ে ব্যক্তির প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দেয়। [চীনী, আল-আমনুল ফিকরী ওয়াল-আনযিমা।]
বস্তুত ইসলামের প্রাথমিক যুগগুলোতে ব্যবহৃত পরিভাষা ‘যিম্মী’ শব্দটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে আধুনিক যুগে বহুল প্রচলিত পরিভাষা ‘সংখ্যালঘু’র প্রায় সমার্থ বুঝায়। শব্দদ্বয়ের মধ্যে একমাত্র তফাত হলো, যিম্মী পরিভাষাটি ধর্মীয় পার্থক্য নির্দেশ করে। পক্ষান্তরে সংখ্যালঘুর অর্থ আরও ব্যাপক। কখনো জন্মসূত্রে গুণ যেমন রক্ত-বংশের প্রতি আবার কখনো অর্জিত গুণ যেমন ভাষা ও ধর্মের বিভিন্নতার প্রতি নির্দেশ করে।
ব্যক্তি পর্যায়ে (যেমন, ইবাদাত) ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে (যেমন, বিবাহ ও উত্তরাধিকার) ইসলাম সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগুরু বিরচিত সংবিধানে প্রদত্ত সাধারণ নীতির আলোকে যোগ্য অধিকার প্রদান করে।
তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের প্রদেয় ‘জিযিয়া’কে বর্তমানের রাষ্ট্রীয় করগুলোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের যে তাদের সম্পদের সর্বোচ্চ ৫% প্রদান করতে হয়, তা গণতান্ত্রিক দেশে প্রদেয় করের কিয়দাংশ মাত্র। উপরন্তু ইসলামী রাষ্ট্রে নারী, শিশু, পাগল, দরিদ্র, বয়োবৃদ্ধ ও দুরারোগ্য ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এ জিযিয়ার আওতামুক্ত। [ইমাম আবূ ইউসুফ, পৃ. ১২৯-১৩০; চীনী, হাকীকা, পৃ. ৬৪।]
ইসলাম সংখ্যাগুরুদের বিশেষত্ব মেনে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণেও বদ্ধপরিকর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«أَلاَ مَنْ ظَلَمَ مُعَاهِدًا، أَوِ انْتَقَصَهُ، أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ، أَوْ أَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ ، فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» .
“জেনে রাখো, যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিতে থাকা ব্যক্তির ওপর যুলুম করবে, তার অধিকার হরণ করবে, তার ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপাবে বা তার অমতে কিছু নেবে, কিয়ামতের দিন আমিই তার বিবাদী হবো।” এখানে মু‘আহিদ বা চুক্তিতে থাকা ব্যক্তির অর্থ ব্যাপক। এতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিরাপত্তায় থাকা সব ব্যক্তিই অন্তর্ভুক্ত। চাই তিনি অমুসলিম নাগরিক হোন অথবা সে দেশেরই নাগরিক। [আবূ দাউদ, খারাজ অধ্যায়; আসকালানী: ১২/২৭০-২৭২।]
মুসলিম শাসকদের এসব নীতি অবলম্বনের ফলেই মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে যুগযুগ ধরে অমুসলিমরা বসবাস করেছে বরং সেখানে তারা স্থায়ীভাবে আবাস গেড়েছে অথচ সেসব দেশের শাসনদণ্ড ছিল মুসলিমদের বাদশাদের হাতে। এরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হিন্দুস্তান বা ভারতবর্ষ, যেখানে প্রায় সাত শতাব্দী রাজ্য পরিচালনা করেছে মুসলিরা অথচ তার কোনো নাগরিককেই ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয় নি। এ জন্যই এতে অবাক হবার কিছু নেই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা তাদের হিন্দু ধর্ম নিয়েই সংখ্যগরিষ্ঠ থেকে গেছে। আবার অন্যদিকে দেখা যায় দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যেমন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় কোনো মুসলিম সৈন্যদল অভিযান পরিচালনা করেনি অথচ এর অধিকাংশ বাসিন্দাই ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে। [নায়েক পৃ, ১৪।] শুধু তাই নয়, একসময় উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোই খ্রিস্টানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ পলায়নপর ইহুদীদের সর্বোত্তম আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেছিল। [মিসারী, আল-ইতিযার আনিল মাযী।]