hadith book logo

ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব

লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৪

ইসলাম ত্যাগকারী কি হত্যার যোগ্য?

আগেও বলা হয়েছে যে সাধারণ নিয়ম হলো ইসলাম গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা যাবে না। তবে কেউ যখন স্বেচ্ছায় নিজ ধর্ম হিসেবে ইসলামকে বেছে নেয়, তখন সে মূলত পুরো পার্থিব জীবনের মেয়াদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। আলেমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিচের বাক্যের জন্য এটিকেই যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ» .

“যে ব্যক্তি তার ধর্ম পরিবর্তন করবে তাকে হত্যা করো”। [সহীহ বুখারী, জিহাদ অধ্যায়।]

এটি আসলে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের মতো, যার মধ্য দিয়ে সে ঐ দেশের নিয়ম-কানূন, সৈন্যবাহিনীতে অংশগ্রহণ, কর প্রদান ও সে দেশের রীতি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের আদেশ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

বলাবাহুল্য যে, চুক্তি বা সন্ধির একটি বাধ্যতামূলক দিক রয়েছে। একবার চুক্তি বা সন্ধি সম্পাদিত হবার পর বিদ্যমান পক্ষগুলোর মধ্য থেকে কেবল একজন সেই চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে না। আর যিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনায় রাখবেন তিনি দেখবেন, এই বিধানটি এমন সময়ে প্রবর্তিত হয়েছে যখন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় আজকের মতো সুবিন্যস্ত ও সুরক্ষিত ছিল না। যার দ্বারা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে পার্থক্য নিরূপণ করা যায়। তৎকালে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই মানুষের বিভিন্ন দলের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব ছিল। [এটা সুবিদিত যে, মদীনায় একটি বহু জাতি-ধর্মের সাংবিধানিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। তবে সে রাষ্ট্র বর্তমানের মতো সুনির্দিষ্ট ও সুবিন্যস্ত ছিল না।]

ফলে তখন ইসলাম ও মুসলিমের শত্রুদের জন্য সহজেই গুপ্তচরবৃত্তি করা, ছদ্মবেশ ধরা এবং ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। এ কারণেই এমন বিধান প্রণয়ন জরুরী হয়ে পড়েছিল।

মানুষের একটি সীমিত দলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিচয় তাকে যেমন কিছু অধিকার প্রদান করে তেমনি তার ওপর কিছু দায়িত্বও অর্পণ করে। মানুষ যেমন নাগরিকত্বের অপব্যবহার করতে পারে তেমন এ পরিচয়ের অপব্যবহারও করতে পারে। আর অপরাপর জীবন ব্যবস্থার মতো ইসলামও কাউকে তার বিধান নিয়ে তামাশা করা বা তার অপব্যবহারের সুযোগ দিতে চায় না। এ পরিচয়ের অপব্যবহারের সুযোগ আমরা দেখতে পাই সূরা আলে ইমরানের একটি আয়াতে। আল্লাহ তা‘আলা এতে ইরশাদ করেন,

﴿وَقَالَت طَّآئِفَةٞ مِّنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ ءَامِنُواْ بِٱلَّذِيٓ أُنزِلَ عَلَى ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَجۡهَ ٱلنَّهَارِ وَٱكۡفُرُوٓاْ ءَاخِرَهُۥ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٧٢﴾ [ ال عمران : ٧٢ ]

“আর কিতাবীদের একদল বলে, ‘মুমিনদের উপর যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার প্রতি দিনের প্রথমভাগে ঈমান আন, আর শেষ ভাগে তার কুফুরী কর, যাতে তারা ফিরে আসে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭২]

তাই দেখা গেছে কিছু ইয়াহূদী মুমিনদের ধোঁকা দেওয়া এবং তাদের মাঝে ফিতনা ছড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্যে মুসলিমের ভেক ধরে ঘুরে বেড়াত। এর সঙ্গে যোগ করে আরও বলা যায়, ইসলাম হলো আসমানী রিসালত বা ঐশী প্রত্যাদেশের সর্বাধুনিক বরং সর্বশেষ সংস্করণ। ফলে ইহুদী বা খ্রিস্টান থেকে মুসলিমে রূপান্তর তো উত্তরণ ও উন্নতি। পক্ষান্তরে মুসলিম থেকে ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান হওয়া অধঃপতন ও উল্টো পথে চলার নামান্তর।

অন্যদিকে আবার মুসলিম ফিকহবিদগণ এই বক্তব্য-বিধান প্রয়োগ নিয়ে মতবিরোধও করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এ বক্তব্য যতটা প্রয়োগের তারচে বেশি ধমকের। তারা এ ব্যাপারে ইসলাম ত্যাগী মহিলার বিধানে মতবিরোধ এবং তাকে তাওবার আহ্বান জানানোর মেয়াদে মতবিরোধকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যদিও তার তওবার গুরুত্বের ব্যাপারে সবাই একমত। যেমন, কেউ এ সম্পর্কে বলেছেন, তাকে তার জীবনাবসান পর্যন্ত তওবার সুযোগ দিতে হবে। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿وَمَن يَرۡتَدِدۡ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَيَمُتۡ وَهُوَ كَافِرٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٢١٧ ﴾ [ البقرة : ٢١٧ ]

“আর যে তোমাদের মধ্য থেকে তাঁর দীন থেকে ফিরে যাবে, অতঃপর কাফির অবস্থায় মারা যাবে, বস্তুতঃ এদের আমলসমূহ দুনিয়া ও আখিরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২১৭]

এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِخَوَاتِيمِهَا»

“নিশ্চয় আমল কবুল করা হবে তার শেষ অবস্থা দেখে”। [সহীহ বুখারী, রিকাক অধ্যায়।]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

«إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ» .

“আল্লাহ তা‘আলা বান্দার তাওবা কবুল করেন যতক্ষণ না তার মৃত্যুর চূড়ান্ত অবস্থা শুরু হয়”। [আহমদ, অধিক বর্ণনাকারী সাহাবীদের হাদীস অধ্যায়।]

এ ছাড়া হাদীসে এসেছে,

«لاَ يَحِلُّ قَتْلُ مُسْلِمٍ إِلاَّ فِي إِحْدَى ثَلاَثِ خِصَالٍ : زَانٍ مُحْصَنٌ فَيُرْجَمُ ، وَرَجُلٌ يَقْتُلُ مُسْلِمًا مُتَعَمِّدًا ، وَرَجُلٌ يَخْرُجُ مِنَ الإِسْلاَمِ فَيُحَارِبُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَرَسُولَهُ ، فَيُقْتَلُ أَوْ يُصَلَّبُ ، أَوْ يُنْفَى مِنَ الأَرْضِ» .

“কোনো মুসলিমকে তিন কারণ ছাড়া হত্যা করা বৈধ নয়: বিবাহিত ব্যভিচারী, তাকে রজম করা হবে। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুসলিমকে হত্যা করে। এবং যে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিদ্রোহ করে। ফলে তাকে হত্যা করা হবে অথবা শূলিতে চড়ানো হবে অথবা দেশান্তরিত করা হবে। অর্থাৎ এ হাদীসে ধর্মত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অপরাধকেও যোগ করা হয়েছে”। [নাসায়ী: রক্ত হারাম অধ্যায়।]