hadith book logo

ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব

লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

ভূমিকা

প্রশংসা ও স্তুতি সব মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্রতে প্রেরিত আল্লাহর সকল নবী-রাসূলের ওপর। আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হোন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৌভাগ্যবান প্রত্যেক সাহাবী, সকল নবী-রাসূলের প্রত্যেক একনিষ্ঠ সঙ্গী-সাথী এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাদের অনুসরণকারী প্রতিটি মানুষের ওপর।

উদ্দেশ্যপূর্ণ ও উদ্দেশ্যহীন প্রচলিত নিরেট ভ্রান্তিবিলাসের অন্যতম হলো, মানুষের সসীম ও সীমিত বোধশক্তিতে নির্ভর করে অসীম জ্ঞানী আল্লাহর প্রণীত আইন ও বিচারের প্রামাণ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। অথচ মানুষের শ্রবণ, দর্শন ও ঘ্রাণেন্দ্রিয় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্র ব্যবহারের পরও আমাদের আনুষঙ্গিক ও পারিপার্শ্বিক জীবনের অনেক কিছুই বুঝতে অক্ষম।

বস্তুতঃ আমরা যে জ্ঞান অর্জন করি তা প্রামাণ্যকরণের দু’টি পদ্ধতি রয়েছে: আল-মানহাজুন নাকলী বা বর্ণিত পদ্ধতি এবং আল-মানহাজুল আকলী বা অর্জিত পদ্ধতি। বর্ণিত পদ্ধতি নির্ভর করে বর্ণনাকারীর প্রামাণিকতার ওপর। চাই তিনি একজন হন বা বহুজন, চাই এ বর্ণনার পরম্পরায় ব্যক্তি থাকুন বা দল। পক্ষান্তরে অর্জিত পদ্ধতি নির্ভর করে প্রধানত আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতার ওপর।

তবে বিশেষত প্রামাণ্যতার বিষয়টি যখন সামনে আসে প্রত্যক্ষভাবে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত তথ্য যেমন, পবিত্র গ্রন্থাবলি নিয়ে, তখন সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় গ্রন্থের প্রচারক ঐ নবী-রাসূলের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বর্ণিত পদ্ধতির প্রমাণ থাকলে তাকে প্রাধান্য দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। অর্জিত পদ্ধতির কথা আসে এরপরে। কারণ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের ইতিহাস সামনে রাখলে আমরা দেখতে পাই, মানুষ প্রকৃতিতে অনাদিকাল থেকে বিরাজমান অনেক কিছুই বুঝতে পারে নি। যুগ-যুগান্তরের সাধনা আর বিরামহীন প্রচেষ্টার পরই কেবল তার সম্পর্কে ক্রমান্বয়ে ধারণা লাভ করেছে। এরপরও স্রষ্টার গড়া মহাবিশ্বের অনেক কিছুই দুর্বোধ্য ও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে, মানুষের সীমিত জ্ঞান সেসব চিনতে পারে নি। সক্ষম হয় নি সেগুলোকে বুঝতে বা তার প্রকৃতি আবিষ্কার করতে।

অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও কিন্তু আমাদের ভেতরে সংশয় ও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তারপরও যে সূত্র মারফত তা আমাদের কাছে পৌঁছেছে তার ওপর আস্থার কারণে আমরা তাতে আস্থাবান হই। অর্থাৎ আমরা এ জন্য সেটাকে গ্রহণ করি না যে সাধারণ অর্জিত জ্ঞান তার অস্তিত্ব প্রমাণ করছে, বরং আমরা তা মেনে নেই বর্ণিত জ্ঞান ঐ বস্তুটির অস্তিত্ব প্রমাণ করার কারণে।

আরেকটি নগ্ন ভুল এই যে, মানুষ তার মহান স্রষ্টার ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ বিধানের একটি সীমিত অংশ সম্পর্কে জানার পর নিজের অপর্যাপ্ত তথ্য ও অসম্পূর্ণ বোধশক্তির ওপর নির্ভর করে এই ক্ষুদে অংশের সমালোচনার স্পর্ধা দেখায়। এ ভুলের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায় যখন এটি হয় কোনো পবিত্র উদ্ধৃতি, স্রষ্টার সঙ্গে যার সম্পৃক্ততা অকাট্য বা প্রায় অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আর মানুষ এই ভুল তথা একটি পবিত্র উদ্ধৃতিকে তার পূর্বাপর বা প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে সমালোচনা কিন্তু অজ্ঞতা হেতু করে না। এটি করে বরং তার প্রতি অবজ্ঞা বা ভিন্নমতের প্রতি পক্ষপাত দেখাতে গিয়ে।

এমন ভুলের একটি উদাহরণ হলো, কোনো গবেষকের কোনো আসমানী আইন নিয়ে কেবল পার্থিব জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিংবা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া ও চিরস্থায়ী আখিরাতের মধ্যে সম্পর্ক মাথায় না রেখে আলোচনা করা। কেননা, পার্থিব জীবন আখিরাত জীবনের ক্ষেত ছাড়া কিছুই নয়। দুনিয়াতে আমরা যা চাষ করবো, সে সামান্যরই ফসল উঠাবো আখিরাতে। আর আখিরাতে যে ফসল উঠাবো তা দিয়েই আমরা পার পাবো।

এর আরেক উদাহরণ জীবনের অন্য ক্ষেত্রের আইনের সঙ্গে এবং আখিরাতের সঙ্গে একটি আইনের সম্পর্ক বিবেচনায় না নিয়ে গবেষকের পার্থিব জীবন সংক্রান্ত কোনো ইসলামী আইনের সমালোচনা করা। যে ব্যক্তি অজ্ঞতা বা অবজ্ঞাবশত কোনো ইসলামী আইনের প্রকৃতি ও পূর্বাপর সম্পর্কে না জেনে আলোচনা করেন তিনি ঐ ব্যক্তির ন্যায় যিনি একটি পূর্ণাঙ্গ বিধানের পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অংশগুলোর একটির মূল্যায়ন করেন তার সম্পূরক অংশ সম্পর্কে না জেনেই। এ ব্যক্তি আসলে ঐ ব্যক্তির মতো যে বলে রাত বা রাতের আধাঁরের কী দরকার? এটি আমাদের মধ্যে ভীতি ও ত্রাস জাগিয়ে দেয়। আমাদেরকে কষ্ট করে আলোর ব্যবস্থা করতে হয়। অথচ সে এ কথা ভুলে যায়, যদি রাত ও অন্ধকার না থাকতো তাহলে আমরা দিন ও আলো চিনতাম না। দিন ও আলোর মূল্যও বুঝতে পারতাম না।

এসব ভুলের যোগফলে এ ধরনের গবেষকগণ এমন বক্তব্য উদ্ধার করেন, যা ঐ উদ্ধৃতি বা বাণীর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি যখন পবিত্র কোনো উদ্ধৃতির সমালোচনা বা মূল্যায়ন করেন, তখন তাকে প্রথমে অবশ্যই জেনে নিতে হবে বিধানটিতে এর ভূমিকা কী। তারপরই কেবল তিনি এর প্রশংসা বা সমালোচনা করবেন।

গ্রন্থটি প্রণীত হয়েছে দু’টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে:

আকীদা, ইবাদাত, আইন, মানবাধিকার, ইসলাম-প্রচার, উগ্রবাদ-চরমপন্থা ও নারীর মর্যাদা-অধিকার বিষয়ে ইসলামের অবস্থান এবং উগ্রবাদের অর্থ ও ইসলামী শরী‘আকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত ইসলামের নানা উষ্ণ সমালোচনার জবাব প্রদান।

যুক্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে ইসলামের সামষ্টিক বিষয়সমূহের পরিচয় উপস্থাপন এবং কিছু ভাইয়ের কতিপয় জোরালো প্রস্তাবে সাড়া দান।

লেখক এতে নিম্নোক্ত পদ্ধতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন:

শুধু অমুসলিম নয়, মুসলিমদের মুখেও অধিক উচ্চারিত প্রশ্নগুলোকে বাছাই করা হয়েছে।

আলোচনার জন্য উত্থাপিত বিষয়ের ব্যাখ্যায় অতি সংক্ষেপে বাস্তব কিছু দৃষ্টান্তেরও সাহায্য নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নকলী দলীলাদি বা বর্ণিত প্রমাণসমূহ তুলে ধরায় যথাসম্ভব মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা হয়েছে।

সুস্পষ্ট বিরোধ ছাড়া মতবিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে কেবল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতই উল্লেখ করা হয়েছে।

যেসব বিষয়ে বিরোধ সুস্পষ্ট সেসবে পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ এবং তার যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন অনির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বিরত থাকা হয়েছে।

বক্ষমান গ্রন্থটি আমি মূলতঃ নিজের পঠন-অধ্যয়ন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছি। যেসব গ্রন্থ থেকে আমি উপকৃত হয়েছি, তার লেখকদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আর শুরু ও শেষের সব প্রশংসাই আল্লাহর জন্য। তাঁর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন এ গ্রন্থটি প্রকাশের পথে নানাভাবে যারা সাহায্য করেছেন, তাদেরকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করেন এবং এর দ্বারা তাঁর বান্দাদের উপকৃত করেন।

ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী

মদীনা মুনাওয়ারা ০১/০৬/১৪৩০ হিজরী