hadith book logo

ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব

লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৩

বিবাহিত ব্যাভিচারিণীর প্রস্তরাঘাত দণ্ডের বাস্তবতা কী?

যিনা প্রসঙ্গে আলোচনায় এসে ঐ সমালোচনাগুলোরও পর্যালোচনা করা দরকার যেগুলো বিবাহিত নারী-পুরুষের যিনার শাস্তি রজম বা প্রস্তরাঘাতকে কেন্দ্র করে উত্থাপন করা হয়ে থাকে। বস্তুত মাসআলাটি মত বিরোধপূর্ণ।

একদল আলেম আছেন যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের অনুকরণে বিবাহিত নারী-পুরুষের প্রস্তরাঘাতদণ্ড বহাল রাখার প্রবক্তা। হাদীসে বর্ণিত সেই প্রস্তরাঘাত দণ্ডের দৃষ্টান্তগুলো হলো মাঈয আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রস্তরাঘাত [ইবন মাজাহ, হুদূদ; আহমদ, বাকিউল আনসার।] দণ্ডের ঘটনা, গামেদীয়া মহিলা সাহাবীর প্রস্তরাঘাত [আহমদ, বাকিউল আনসার।] দণ্ডের ঘটনা, জুহাইনিয়া মহিলা সাহাবীর প্রস্তরাঘাত [আহমদ, আল-বাসরিয়্যীন।] দণ্ডের ঘটনা এবং শুরাহার প্রস্তরাঘাত [আহমদ, আশারা মুবাশ্শারা জান্নাতী অধ্যায়।] দণ্ডের ঘটনা। পরন্তু এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তিও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন,

وَالثَّيِّبُ بِالثَّيِّبِ جَلْدُ مِائَةٍ وَالرَّجْمُ .

“বিবাহিত-বিবাহিতা যদি ব্যভিচার করে তবে একশ বেত্রাঘাত ও প্রস্তরাঘাত করা হবে”। [সহীহ মুসলিম, হুদূদ।]

এদিকে প্রস্তরাঘাত দণ্ডের আয়াতের লিখিতরূপ যদিও কুরআন শরীফ থেকে মানসূখ বা রহিত হয়েছে কিন্তু প্রস্তরাঘাত সংক্রান্ত আয়াতটি যে মানসূখ বা রহিত করা হয় নি এ ব্যাপারে উমার বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর উক্তি বিদ্যমান। [সহীহ বুখারী, হুদূদ অধ্যায়।]

অপরদিকে আরেকদল আলেমের মতে রজম বা প্রস্তরাঘাতের বিধানটি যতটা না মানুষকে সতর্ক ও সংযত করার জন্য তার চেয়ে বেশি ছিল ইসলামের সূচনা যুগে যখন ব্যভিচার খুব ব্যাপকতা লাভ করেছিল এর মাধ্যমে তাদের শাসানো। পরে গিয়ে যা রহিত হয়ে যায়। আর তা বুঝা যায় নিচের প্রমাণগুলো থেকে:

ইসলামে ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের সাক্ষ্যে শর্তগুলোকে অনেক বেশি কঠিন করা হয়েছে। বরং যে ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট শর্ত ছাড়া কারো বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের অপচেষ্টা চালাবে তাকে সতর্ক করার জন্য আশিটি বেত্রাঘাতের [সূরা আন-নূর, আয়াত: ০৪।] বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বামী অভিযোগ তুললে জনসম্মুখে কসমের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে স্ত্রীকে। [সূরা আন-নূর, আয়াত: ০৬-০৮।]

যতগুলো ঘটনায় যিনার হদ বা ব্যভিচারের দণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে ব্যতিক্রমহীনভাবে তার সবগুলোতেই দেখা যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হদ প্রয়োগ ঠেকাতে ‘যারপরনাই’ চেষ্টা করেছেন। যেমন, মাঈয আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘটনায় দেখা যায়, মাঈয রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন যিনার স্বীকারোক্তি দিয়ে বসেন, তিনি তখন চার চারবার মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তার গোত্রের লোকদেরকে তার জ্ঞান-বুদ্ধির স্বাভাবিকতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন এবং নানা অসুবিধাকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করানোর চেষ্টা চালান। তদুপরি তিনি তাঁর সঙ্গীদের বলেন, প্রস্তর নিক্ষেপকালে যখন সে পালাতে চেষ্টা করবে তখন যদি তোমরা তাকে ছেড়ে দিতে। তেমনি অন্তঃসত্তা গামেদীয়া মহিলার ক্ষেত্রেও তিনি বারবার তার শাস্তি ঠেকাতে চেষ্টা করেছেন। এমনকি তিনি তাকে গর্ভস্থ বাচ্চা জন্ম দিয়ে তার দুগ্ধপানের মেয়াদ শেষে অর্থাৎ দুই বছর পরে আসতে বলে ফিরিয়ে দেন। [আহমদ, বাকিউল আনসার।]

যিনা বা ব্যভিচার নামক অপরাধ একজনের দ্বারা সম্পাদিত হয় না। এর জন্যে প্রয়োজন হয় দু’ব্যক্তির। তথাপি কোনো অর্থগত বর্ণনাতেও পাওয়া যায় না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনোভাবে অপরপক্ষের পিছু নিয়েছেন। শুধু একটি ঘটনা এর ব্যতিক্রম। সে ঘটনায় স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে যিনাকারীর কাছ থেকে অর্থদণ্ড আদায় করেছে। এ মহিলাটি ছিল কুমারী। আর তার বিচার দায়ের করা হয়েছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমীপে। [সহীহ বুখারী, আপোস-মিমাংসার অধ্যায়।]

ব্যভিচারী স্ত্রীকে কয়েদ রাখার আয়াত পঠিতরূপে বহাল রেখে তার বিধান রহিত করা [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫।] থেকে এ কথাই অনুমিত হয় যে পঠিতরূপে প্রস্তরাঘাত দণ্ড রহিত হওয়া বিধান হিসেবে রহিত হওয়ার প্রমাণ।

এছাড়া ইসলামে এ ধরনের অনেক বক্তব্যই রয়েছে যেখানে উদ্দেশ্য কেবল তীব্রভাবে ধমক দেওয়া ও ভীতি প্রদর্শন করা। যেমন হাদীসে সুদখোর, উল্কি অংকনকারী ও এর আবেদনকারী মহিলাকে লানত বা অভিশাপ দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কিন্তু তাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে নিক্ষেপ করা উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের সতর্ক করা উদ্দেশ্য। [যেমন, সহীহ বুখারী, ব্যবসায়-বাণিজ্য অধ্যায়; চীনী, হাকীকত, পৃ২৪-২৫।]

তাছাড়া যে কেউ ইসলামের দণ্ডবিধি বিশেষত যিনার অপরাধ নিয়ে চিন্তা করবেন, তিনি দেখবেন আসলে এর সঙ্গে অনেক সামষ্টিক লাভালাভ জড়িত। কেননা যখন কেউ এভাবে রাখঢাক না করে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় যে চার চারজন ব্যক্তি তার চাক্ষুস বিবরণ দিতে পারে তখন সে শুধু ভিকটিমের নিকটাত্মীয়বর্গের মান-সম্মানেই আঘাত করে না, বরং সার্বজনীন রীতিনীতিকেও সে তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে।