hadith book logo

ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব

লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২২

ইসলামী রাষ্ট্রে অন্য ধর্মের তৎপরতা নিষিদ্ধ কেন?

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট কিছু দেশ নিজ ভূখন্ডে অন্য ধর্ম ও মতবাদ প্রচার নিষিদ্ধ করেছে দু’টি প্রধান কারণে:

প্রথম. এসব দেশের সব বা অধিকাংশ নাগরিকই ধর্ম হিসেবে ইসলামকে বেছে নিয়েছে। আর ইসলাম এমন একটি ধর্মবিশ্বাস যার পূর্ণ আনুগত্য অত্যন্ত জরুরী। এটি এমন শরী‘আত যা তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং অন্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও নির্ধারণ করে। ইসলামের কয়েকটি মৌলিক বিশ্বাস এমন:

মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা রয়েছেন। তিনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা। তিনিই শুরু এবং তিনিই শেষ। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮, ১১৬; সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৩।]

স্রষ্টা কেবল একজন আর তিনি ছাড়া কেউই ইবাদাত বা উপাসনার যোগ্য নয়।

সৃষ্টিজীবের প্রয়োজন ও সমস্যা জানার জন্য তাঁর কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না।

আল্লাহ তা‘আলা মানুষ ও জিনকে কিছু গুণে ঋব্ধ করেছেন। যেমন, বিবেক-বুদ্ধি এবং ভালো-মন্দ পছন্দের একরকম স্বাধীনতা। উপরন্তু তিনি তাদেরকে সুস্থ প্রকৃতিতে এবং রাসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন, তাতে হিদায়াতে সুসজ্জিত করেছেন। ফলে তারা তাদের সাময়িক জীবনের যাবতীয় কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতপর তারা চিরস্থায়ী জীবনে তথা জান্নাত বা জাহান্নামে সেসব কর্মের ফলাফল ভোগ করবে।

মুকাল্লাফ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি মাখলুক তথা জিন ও মানুষ যথাসাধ্য সর্বশেষ নবী মহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর প্রেরিত আল্লাহর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মানতে বাধ্য।

ইসলামের এসব মৌলিক বিশ্বাস জানার পাশাপাশি আমরা এও জানি যে বর্তমানের ধর্ম ও মতবাদগুলো ইসলামের এসব মৌলিক চেতনার কোনো না কোনোটি কিংবা একাধিক ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এটা তো অনস্বীকার্য যে, বিরুদ্ধ চিন্তার প্রসার নাগরিকদের নিরাপত্তাকে শুধু সাময়িক জীবনে নয়; চিরস্থায়ী জীবনেও হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।

দ্বিতীয়. সাধারণত কোনো দেশের সব নাগরিক সাবালক হয় না। একটি দেশে অনেক নাগরিকই এমন থাকে যারা এখনো সাবালক হয় নি বা যাদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটে নি। এরা নিজেকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের আদর্শ ও চেতনা বিনাশী চিন্তা ও মতাদর্শ থেকে রক্ষা করতে পারে না। এ জন্য প্রয়োজন তাদের অপরের সহযোগিতা। মূলত তাদের সাহায্যার্থেই রাষ্ট্র এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। যেমন আমরা দেখি এদেশের যেসব নাগরিক সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অন্য দেশে বসবাস করছে, তাদেরকে সে দেশের নিয়ম মেনে চলতে হয়। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তরে যে ব্যক্তি গবেষণার জন্য অনৈসলামি চিন্তা ও মতাদর্শ সম্পর্কে জানতে চায় তার জন্য তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রই সে ব্যবস্থা করে দেয়।

এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। কেননা আন্তর্জাতিক সনদসমূহও মানুষের শিক্ষার অধিকারের মধ্যে পিতা বা বৈধ অভিভাবকের জন্য সন্তানের শিক্ষার বিষয় পছন্দ করার অধিকার সংরক্ষণ করে। [আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ, ধারা: ৩/২৬; সামাজিক, সাস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত বিশেষ আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ: ৩/১৩।]

তেমনি এও স্বাভাবিক যে অনেক রাষ্ট্রই তার রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে এমন সব তৎপরতা নিষিদ্ধ করে যাকে সে দেশ তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোয় অশুভ এবং তার আভ্যন্তরীণ শান্তি ও নাগরিকের নিরাপত্তায় প্রভাব সৃষ্টিকারী মনে করে। যদিও এসব কার্যক্রমের প্রভাব কেবল সাময়িক পার্থিব জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। সব দেশই এমনটি করে থাকে। এমনকি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশগুলোও। অতএব যেসব চিন্তা ও কর্মের প্রভাব শুধু দুনিয়ার সাময়িক জীবন পর্যন্ত সীমিত নয়; বরং আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবন পর্যন্ত প্রলম্বিত তার ব্যাপারে কেন এমন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে না? আর যেহেতু এর ক্ষতিকারিতা আখিরাতের অবশ্যম্ভাবী জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত ফলে তা জাতিসংঘের নীতিরও সমার্থক। কেননা জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহের ধর্মীয় স্বাধীনতা সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর।

যদিও অনৈসলামি ধর্মীয় মতবাদ প্রচার-তৎপরতা নিষিদ্ধ থাকে তথাপি সকল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ তার অমুসলিম নাগরিকদের নিজেদের বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং তাদের ধর্মীয় বিধিবিধান পালন ও বাস্তবায়নের পূর্ণ অনুমতি দিয়ে থাকে। যাবৎ তা সংখ্যাগরিষ্ঠের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। একমাত্র মক্কা নগরীই এর ব্যতিক্রম। ইসলামের বিশেষ পবিত্র স্থান হিসেবে এর প্রবেশাধিকার কেবল মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত।