hadith book logo

ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব

লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

ইসলামী শরী‘আ ও বাস্তবতার সম্পর্ক

এটা ঠিক মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা যে সুস্থ প্রকৃতি ও অর্জিত জ্ঞান দান করেছেন তা তাদেরকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের গুটিকয়ের রহস্য অনুধাবন করতে সমর্থ করে। তাই বলে তারা আল্লাহর সব বিধানের রহস্য উদ্ধার বা পরিপূর্ণ জ্ঞানের দাবী করতে পারে না। অন্য কথায় বলতে গেলে, আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের গুটিকয়ের রহস্য অনুধাবন না করতে পারা পরিবর্তিত বাস্তবতায় তার অগ্রহণযোগ্যতা বা অকার্যকারিতার প্রমাণ নয়।

যিনি গভীর দৃষ্টিতে ইসলামের বিধান এমনকি ইবাদাতের দিকে তাকাবেন, তিনি লক্ষ্য করবেন ইসলামের বক্তব্য এবং বাস্তবতার মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব খুব স্পষ্ট। যেমন, পানির দুষ্প্রাপ্যতায় অযু-গোসলের জন্য তায়াম্মুমই যথেষ্ট। তেমনি মুকীম ব্যক্তিকে যোহর, আসর ও এশা চার রাকাত আদায় করতে হয়, অথচ মূসাফিরের জন্য এ ওয়াক্তগুলোতে শুধু দু’রাকাত আদায়ই যথেষ্ট।

যিনি ধারাবাহিকভাবে অহী নাযিলের দিকে এবং শরী‘আতের অনেকগুলো বিধানের দিকে দৃষ্টিপাত করবেন, তিনিও ইসলামের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব সুস্পষ্ট দেখতে পাবেন। ইসলামের বিধানগুলো আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে ২৩ বছর সময়কালে এবং মদকে হারাম করা হয়েছে কয়েকটি পর্যায়ে। একইভাবে এ প্রবণতা প্রতিভাত হয় অনেক বিষয়ে সঙ্গত কারণে মুসলিম আইন বিশারদদের মাঝে সঙ্গত বিরোধের মধ্য দিয়ে।

ইসলামের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে পারস্পরিক প্রভাবকে যুক্ত করা হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের ‘নাসেখ’ ও ‘মানসুখ’-এর সঙ্গে, যেখানে একই বাস্তবতায় নতুন বিধান পুরাতন বিধানকে রহিত করে দেয়।

প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সুস্পষ্ট বক্তব্যধারী নির্দিষ্ট কোনো বিধান বাতিল করা আর বাস্তবায়নের শর্ত পূরণ না হওয়ায় কোনো বিধান বাস্তবায়ন স্থগিত করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রসিদ্ধ যেসব অবস্থায় বিধান রহিত না হওয়া সত্ত্বেও তার প্রয়োগ স্থগিত করা হয়েছিল তার অন্যতম হলো আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে যাকাতের অংশের মধ্য থেকে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর ‘মুআল্লাফাতু কুলুব’ বা যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের অংশ প্রদান স্থগিত করা। কারণ কিছু কিছু কাফের ইসলামকে প্রত্যাখ্যান অব্যাহত রাখা সত্ত্বেও ‘যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয়’ অংশের সুযোগ গ্রহণ করে আসছিল। অথচ ততদিনে সত্যের বিজয় সুনিশ্চিত এবং ইসলাম তার অনুসারীদের নিয়ে শক্তিশালী হয়েছিল। [নাহবী, শূরা: পৃ. ৪৩৮।] উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ঠিক একইভাবে দুর্ভিক্ষ ও মন্বান্তরের বছর চোরের হাত কাটার বিধান স্থগিত করেছিলেন। [মুসনাদ শাফেঈ: ১/২২৪।]

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এক্ষেত্রে বিধান বাতিল করেন নি, যেমন বুঝতে ভালোবাসেন অনেকে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়। তিনি যখন একটি অরহিত বিধানের বাস্তবায়নের শর্ত অনুপস্থিত দেখেন তখন তার প্রয়োগ স্থগিত করেন মাত্র। এ থেকে জানা গেল কোনো বিধান বাতিল হওয়া আর কিছু শর্ত না পাওয়ায় তার প্রয়োগ স্থগিত করার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান।

এখানে আরেকটি সন্দেহের অপনোদন জরুরি। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু যে বনী তাগলাব গোত্রের খ্রিস্টানদের ‘জিযয়া’ নামক কর অবকাশে সম্মতি দিয়েছিলেন তার মাধ্যমে কিন্তু তিনি আরোপিত কর (ফরয জিযিয়া) বাতিল করেন নি, বরং তা করেছিলেন এর নাম বদলে পরিমাণ সংশোধনের অভিপ্রায়ে। কারণ, তিনি তাদের থেকে যাকাতের দ্বিগুণ উসুল করেছিলেন। [আবূ ইউসুফ: পৃ. ১২৯-১৩০।] সুতরাং বিধান বাতিল করা আর জনস্বার্থে বিধানে ঈষৎ পরিবর্তন আনা এক নয়।

বর্তমানে ইসলামী দেশগুলো মুসলিম নাগরিকের ওপর যে কর আরোপ করে তা অনেক সময় তার এক বছর অতিবাহিত হওয়া সঞ্চিত পুরো অর্থের সমান হয়। এ ক্ষেত্রে তাকে যাকাত দিতে হবে না। আবার কখনো তা তার কিছু সম্পদের ওপর আরোপ হয়। এ ক্ষেত্রে তার যাকাতের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হবে। যেমন অমুসলিম নাগরিকদের ওপর আরোপিত জিযয়া নামক কর কখনো তার বার্ষিক কর বা অন্য কোনো করের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর এটি কদাচিতই জিযয়ার অনুরূপ হয়।