hadith book logo

ইসলামের সমালোচনা ও তার জবাব

লেখকঃ ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৬

ইসলাম কীভাবে সন্ত্রাস প্রতিরোধ করে

ইসলাম প্রধানত তিন উপায়ে হুমকি, সন্ত্রাস বা বাড়াবাড়ির প্রতিরোধ করে:

প্রথমত: বাল্যকাল থেকেই সুশিক্ষা প্রদান করা। যুলুম ও বাড়াবাড়ি হারাম, এর প্রতিরোধ জরুরি এবং ন্যায় ও সাম্যের ঝান্ডাবাহী হবার চেতনায় গড়ে তোলা।

দ্বিতীয়ত: যেসব কারণ ও সমস্যা থেকে সন্ত্রাস ও সীমালঙ্ঘনের সূচনা সেসব নির্মূল করা। আর তা সবার প্রাপ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায় বিচার, ইনসাফের আচরণ, ভালো ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা এবং বৈষম্যহীনভাবে জীবনোপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে। এ জন্যই ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক দুর্ভিক্ষ ও মন্বান্তরের বছর চোরের হাত কাটার বিধান কার্যকর স্থগিত করা আশ্চর্যের কিছু নয়। এও বিচিত্র নয় যে তিনি কয়েকজন দাসকে ক্ষমা করে দেন যারা একটি উষ্ট্রী চুরি করে নিজেদের জঠর জ্বালা মেটাতে তা জবাই করেছিল। বরং তিনি তাদের মুনিবকে তাদের অনাহারের রাখার জন্য ভৎর্সনা করেন। ঐ উষ্ট্রীর মূল্যও তিনি পরিশোধ করে দেন বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। [মুসনাদ শাফেঈ: ১/২২৪।]

অতএব শুধু সন্ত্রাসের অভিযোগ আর একেঅপরকে দোষারোপ পর্যন্ত সীমিত থাকলে হবে না। দুষ্কৃতিকারী ও সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির আগে এর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে। তাও করতে হবে নির্মূল। আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অপরিকল্পিত ও এলোপাতাড়ি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাই। যা নির্যাতিতকে কেবল নিরাশ ও হতাশ করে। প্রায় ক্ষেত্রেই যার শিকার হয় নির্দোষ ও নিরস্ত্র ব্যক্তি। অথচ তারা যে সন্ত্রাস ও আগ্রাসনের মোকাবেলা করে আসছে এবং হাজার হাজার নিরপরাধ লোক যার শিকারে পরিণত হচ্ছে, তাকে উপেক্ষা করা হয়।

সন্ত্রাসের শিকার কতিপয় দেশ কখনো সন্ত্রাসের জন্য অজ্ঞাত পক্ষকে দোষারোপ করে। অথচ এর কারণকে উপেক্ষা করে। ঘটিত সন্ত্রাস তো কখনো ঐ সন্ত্রাসের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াতেও হয়ে থাকে যার মাধ্যমে এ দেশ মূলতঃ শত্রুকে অব্যাহতভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। এসব দেশ কখনো সন্ত্রাস দমনে কঠিনতর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করে এবং প্রকান্তরে আগুনে ঘি ঢালে। অথচ একেবারে হাতের সমাধানকে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করে। আর কিছু নয়; সন্ত্রাসের উৎসগুলোকে বন্ধ করে দেওয়াই হাতের কাছের সমাধান।

কখনো দেখা যায় রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তার বিভিন্ন বাহিনীর সূত্র (যেমন গোয়েন্দা বাহিনী বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রাণালয়ের কতিপয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা বিদেশে কর্মরত আমলাদের) সরবরাহকৃত ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এসব কর্মকর্তার উচিৎ প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনে আরও বেশি সচেষ্ট হওয়া। নিরপেক্ষ সূত্র ও সূত্রের সুবিস্তৃত ঘাঁটিগুলো কী বলছে তা জানা এবং সীমিত সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। কারণ, এ সূত্র কখনো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বিভ্রান্ত করে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বৈরী শক্তি তার বেঁধে দেওয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণে নানা উপায়ে চাপ প্রয়োগ করে। এই নিন্দনীয় ও অনৈতিক পন্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভুল তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করানো, অর্থ দিয়ে প্ররোচিত করা, বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের অবমাননাকর ও অসুবিধাজনক অবস্থায় ফেলা, অতঃপর তাদের মাধ্যমে তাদের হুমকি দেওয়া এবং অপরাধ সংগঠিত করে শত্রুদের দিকে তার দায় চাপানো।

এখানেই আসে জাতির বিদ্বান শ্রেণির ভূমিকার প্রসঙ্গ। তাদেরই কর্তব্য জাতি ও জাতীয় নেতৃত্বকে আলোকিত করতে প্রয়াসী হওয়া। যাতে তারা কখনো রাতের ষড়যন্ত্র, সূক্ষ্ম চক্রান্ত কিংবা ভাসাভাসা যুক্তিতে বিভ্রান্ত না হন। এসব শাসক জাতিকে অযৌক্তিক ও স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত হজম করতে এসব ব্যবহার করে থাকেন।

তৃতীয়ত: অন্যায় থেকে নিবারণ করে এমন শাস্তি নির্ধারণ করা। তবে এ শাস্তি নির্ধারিত হবে অকাট্য প্রমাণাদির মাধ্যমে অভিযুক্তকরণ এবং পুঙ্ঘানুপুঙ্খ জেরা-তদন্তের পর। সেখানে বিচারকের জন্য ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি অস্বীকার করারও অবকাশ থাকবে। কেননা তদন্তে অবহেলা করার পর নিরপরাধ লোকদের ওপর শাস্তি প্রয়োগ অথবা অনুমোদিত সীমা ছাড়িয়ে প্রতিশোধস্পৃহা থেকে শাস্তি প্রদান প্রায় ক্ষেত্রেই প্রতিশোধমূলক এলোপাতারি সন্ত্রাস উস্কে দেয়।