১
অন্তর বিধ্বংসী বিষয় প্রবৃত্তির অনুসরণ
লেখকঃ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জেদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪০
প্রবৃত্তির চিকিৎসা
মানুষ যখন তার প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে যাবে তাকে অবশ্যই পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। সে যখন তার প্রবৃত্তির চিকিৎসার প্রতি মনোযোগ দেবে, তখন হতে পারে আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তার প্রতি অনুগ্রহ করবে এবং তাকে নেককার লোকদের সাথে সম্পৃক্ত করবে। আমরা নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী কিছু চিকিৎসার কথা আলোচনা করব।
এক. তাওবা ও দো‘আ করা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট তাওবা ও প্রার্থনা করা যাতে আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তাকে প্রবৃত্তির অনিষ্ঠতা থেকে হেফাজত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পূর্ব মনীষীদের আদর্শ ছিল, তারা আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের নিকট তাওবা করত এবং আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের দরবারে দো‘আ করতেন। গুণাহ হতে তাওবা করা প্রবৃত্তির অনিষ্ঠতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল সা. নিজে দৈনিক অসংখ্য বার আল্লাহর দরবারে তাওবা করতেন এবং উম্মতদের তাওবা করার প্রতি উদ্ভুদ্ধ করেন। রাসূল সা. বলেন, যারা গুণাহ হতে তাওবা করেন, তারা যেন কোন গুণাহ করেন নাই।
কুতবা ইব্ন মালেক রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন-
« اللَّهُمَّ إنِي أَعُوذُ بكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأخْلَا قِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ »
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট খারাপ চরিত্র হতে আশ্রয় প্রার্থণা করছি এবং খারাপ আমল ও প্রবৃত্তি হতে আশ্রয় প্রার্থণা করছি”।
ওমর ইব্ন আব্দুল আজীজ রহ. খালেদ ইব্ন সাফওয়াকে বলেন, তুমি আমাকে সংক্ষিপ্ত ওয়াজ ও নছিহত কর। তখন সে বলল, হে আমীরুল মুমিন! অনেক মানুষকে আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের পর্দা ধোঁকায় ফেলছে, আর তাদের প্রশংসা তাদেরকে বিপদে ফেলছে। তোমার সম্পর্কে তোমার জানাকে অন্যের অজানা যেন পরাভূত করতে না পারে। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আমাকে এবং তোমাকে আমাদের গুনাহসমূহ গোপন রাখার মাধ্যমে ধোঁকায় পড়া থেকে হেফাজত করুন! মানুষের প্রশংসায় খুশি হওয়া থেকে হেফাজত করুন। আর আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আমাদের উপর যা ফরজ করেছেন, তাতে যাতে আমরা পিছপা না হই এবং কোন প্রকার দুর্বলতা প্রদর্শন না করি। আর আমরা যাতে আমাদের প্রবৃত্তির প্রতি না ঝুঁকি। এ কথা শোনে তিনি ক্রন্দন করেন এবং বলেন, আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আমাকে এবং তোমাকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হেফাজত করুন।
ইব্রাহীম তাইমী রহ. স্বীয় দো‘আয় বলতেন, হে আল্লাহ! তোমার কিতাব এবং তোমার নবীর সুন্নত দ্বারা আমাদেরকে হক সম্পর্কে মতবিরোধ করা থেকে হেফাজত কর। হে আল্লাহ! তোমার পথ নির্দেশকে আমাদের জীবনে পাথেয় বানিয়ে দাও। আর তোমার অনুকরণ ছাড়া প্রবৃত্তির অনুকরণ হতে আমাদের রক্ষা কর। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের আরও রক্ষা কর গোমরাহি ও পথভ্রষ্টটা হতে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের যাবতীয় কর্মে সন্দেহ পোষণ করা, হঠকারীতা, ঝগড়া-বিবাদ ও উল্টা-পাল্টা করা হতে রক্ষা কর।
দুই. প্রবৃত্তির পরিপন্থী বস্তু দ্বারা অন্তর পূর্ণ থাকা:
মনে রাখতে হবে মানবাত্মা কখনোই খালি থাকে না; তাকে যদি আমরা ঈমান ও আমলের নুর দিয়ে পরিপূর্ণ না করি, তাহলে তা অবশ্যই শিরক ও কুফরের অন্ধকারে পরিপূর্ণ হবে। তাতে কুফর শিরক ও বিদআত স্থান করে নেবে। আমাদের অবশ্যই অন্তরকে পরিপূর্ণ রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। আর তা হল আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের উপর ঈমান আনার মাধ্যমে অন্তরকে ঈমানের নুরের দ্বারা পরিপূর্ণ রাখা এবং অন্তর থেকে গাইরুল্লাহ মহব্বতকে দূর করা। আর গাইরুল্লাহর মহব্বতকে অন্তরে কোন প্রকার স্থান না দেয়া। নি:সন্দেহে একটি কথা যায় যে, আল্লাহর মহব্বতকে অন্তরে স্থান দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়া যায়। আর যখন মানবাত্মা আল্লাহর মহব্বতে পরিপূর্ণ হবে, তখন মানুষের অন্তর থেকে যাবতীয় খারাপ চাহিদা দূর হয়ে যাবে।
তিন. আলেম ওলামা ও সালে-হীনদের সাথে উঠা-বসা করা:
আল্লামা ইব্ন আব্দুল কাবী রহ. বলেন,
وََخالطِْ إذَِا خَالَطتَّ كُلَّ مُوَفَّقٍ مِنَ العُلَمَاءِ أَهْلِ التُّقَى وَالتَّسَدُّدِ
يُفِيدُكَ مِنْ عِلْمٍ وَيَنْهَاكَ عَنْ هَوىً فَصَاحِبْهُ تْهدَى مِنْ هُدَاهُ وَتَرْشُدِ
وَإيَاكَ وَالهَمَّازَ إِنْ قُمْتَ عَنْهُ وَالبَذِيِّ فَإنَِّ المَرْءَ باِلمَرْءِ يَقْتَدِي
وََلا تَصَحبِ الحَمْقَى فَذُو الجَهْلِ إِنْ يَرُمْ صَلَاحاً لشْيءٍ يَا أَخَا الحَزْمِ يُفْسِدِ
অর্থ, যখন তুমি কারো সাথে উঠবস করতে চাও, তবে তুমি আলেম ওলামা, মুত্তাকী, পরহেজগার এবং আল্লাহ যাদের কবুল করেছেন তাদের সাথে উঠবস কর। তারা তাদের ইলম দ্ধারা তোমার উপকার করবে এবং তোমাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হতে নিষেধ করবে। আর তুমি খারাপ ও গোমরাহ লোকদের অনুসরণ করা হতে বিরত থাক। কারণ, মানুষ মানুষের দ্ধারা প্রভাবিত হয়। তুমি যখন খারাপ ও গোমরাহ লোকদের সাথে উঠবস করবে তখন তোমাদের মধ্যে তাদের গোমরাহী ও খারাপ প্রভাব বিস্তার করবে। আর তুমি কোন জাহেল, অজ্ঞ ও আহমক লোকের সাথে মিশবে না। তাদের সাথে মিশলে তুমি তাদের মতই হবে। কারণ, একজন জাহেলের কাজ হল, তুমি যখন কোন বিষয়ে সংশোধন চাইবে তখন সে তা ধ্বংস করে দেবে, তোমাকে সংশোধন হতে দেবে না।
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রহ. কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্যের পর এসব বিষয়গুলোর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির কু-মন্ত্রণা হতে মুক্তি পেতে পারে। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিতে ডুবে আছে, তার দ্বারা কি তা থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব? তাকে বলা হবে, অবশ্যই সম্ভব! আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তাওফিক ও তার সাহায্য থাকলে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। নিম্নে আমরা বিষয়গুলো আলোচনা করব:
এক. একজন স্বাধীন ও সাহসী লোকের সাহস ও প্রত্যয় যা তার আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নফসের বিরুদ্ধে কাজ করে। এ ধরনের সাহসী লোক দ্ধারা প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকা সম্ভব।
দুই. ধৈর্য ধারণে সাহসিকতার পরিচয় দেয়া। যখন তার নফস কোন খারাপ কিছু চায়, তখন তা থেকে বিরত থাকার তিক্ততার উপর ধৈর্যধারণ করা।
তিন. আত্মার শক্তি একজন মানুষকে সাহসিকতার যোগান দেয় এবং তাকে সঠিক পথে চলার জন্য উৎসাহ প্রদান করে। আর সাহসিকতা পুরোই হল, প্রতিকুল মুহূর্তের সাময়িক ধৈর্য। আর সবচেয়ে উত্তম জীবন যা একজন বান্দা লাভ করে তা হল, ধৈর্যের দ্বারা জীবন লাভ করা। ধৈর্যের মাধ্যমে যে জীবন লাভ করা যায় তাকে সমৃদ্ধ জীবন লাভ করা বলা চলে।
চার. উত্তম পরিণতির জায়গা কোনটি তা পর্যবেক্ষণ করা এবং সৎ সাহসের মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করা।
পাঁচ. প্রবৃত্তির অনুসরণ করা শাস্তি নিয়ে চিন্তা করা:
প্রবৃত্তির পূজা করার কারণে ভীষণ যন্ত্রণা ও শাস্তি কি তা পর্যবেক্ষণ করা। যখন সে তার শাস্তি সম্পর্কে জানতে পারবে তখন সে প্রবৃত্তির অনুসরণ হতে অবশ্যই বিরত থাকবে।
ছয়. প্রবৃত্তির বিরোধিতা করার ফলাফল নিয়ে চিন্তা করা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট বিশেষ মর্যাদার স্থানে তাকে নিয়ে যাওয়া এবং মানুষের অন্তরে তার সম্মান ও মর্যাদা প্রতিস্থাপন করা। আর এটি তার জন্য অধিক উত্তম ও প্রশান্তি প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করার মজা হতে।
সাত. পাপাচার বা গুনাহের মজার উপর পাক-পবিত্র থাকা, সম্মান বজায় রাখার যে মজা তাকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে।
আট. দুশমনের উপর বিজয় লাভ, দুশমনকে প্রতিহত করা ও তাকে অপমান অপদস্থ করে ক্ষোভ, রাগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়ার আনন্দ উপভোগ করা। কারণ, শয়তান যখন তার আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে না পারে, তখন সে বিক্ষুব্ধ ও হতাশাগ্রস্ত হয়। আর আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তার বান্দা থেকে পছন্দ করে যেন সে তার দুশমন শয়তানকে অপমান অপদস্থ করে। যেমন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার মহা কিতাব আল-কুরআনে এরশাদ করেন-
﴿ مَا كَانَ لِأَهۡلِ ٱلۡمَدِينَةِ وَمَنۡ حَوۡلَهُم مِّنَ ٱلۡأَعۡرَابِ أَن يَتَخَلَّفُواْ عَن رَّسُولِ ٱللَّهِ وَلَا يَرۡغَبُواْ بِأَنفُسِهِمۡ عَن نَّفۡسِهِۦۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ لَا يُصِيبُهُمۡ ظَمَأٞ وَلَا نَصَبٞ وَلَا مَخۡمَصَةٞ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَطَُٔونَ مَوۡطِئٗا يَغِيظُ ٱلۡكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنۡ عَدُوّٖ نَّيۡلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُم بِهِۦ عَمَلٞ صَٰلِحٌۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٢٠﴾ [ سورة التوبة : 120 [.
মদীনার অধিবাসী ও তার আশপাশের মরুবাসীদের জন্য সংগত নয় যে, রাসূলুল্লাহ থেকে পেছনে থেকে যাবে এবং রাসূলের জীবন অপেক্ষা নিজদের জীবনকে অধিক প্রিয় মনে করবে। এটা এ কারণে যে, তাদেরকে আল্লাহর পথে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধায় আক্রান্ত করে এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফিরদের ক্রোধ জন্মায় এবং শত্রুদেরকে তারা ক্ষতিসাধন করে, তার বিনিময়ে তাদের জন্য সৎকর্ম লিপিবদ্ধ করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। [সূরা তাওবা, আয়াত: ১২০]
সত্যিকার মহব্বতের আলামত হল, মাহবুবের দুশমনকে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং তাদের অপমান করা।
নয়. এ কথা বিশ্বাস করা যে, প্রবৃত্তির বিরোধিতা করা দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মানকে বৃদ্ধি করে। একজন বান্দাকে বাহ্যিক ও বাতেনী উভয় প্রকার সম্মানে ভূষিত করে। অপরদিকে যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের সম্মানহানি ঘটে এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে তারা অপমান, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়।
এক. তাওবা ও দো‘আ করা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট তাওবা ও প্রার্থনা করা যাতে আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তাকে প্রবৃত্তির অনিষ্ঠতা থেকে হেফাজত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পূর্ব মনীষীদের আদর্শ ছিল, তারা আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের নিকট তাওবা করত এবং আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের দরবারে দো‘আ করতেন। গুণাহ হতে তাওবা করা প্রবৃত্তির অনিষ্ঠতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল সা. নিজে দৈনিক অসংখ্য বার আল্লাহর দরবারে তাওবা করতেন এবং উম্মতদের তাওবা করার প্রতি উদ্ভুদ্ধ করেন। রাসূল সা. বলেন, যারা গুণাহ হতে তাওবা করেন, তারা যেন কোন গুণাহ করেন নাই।
কুতবা ইব্ন মালেক রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন-
« اللَّهُمَّ إنِي أَعُوذُ بكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأخْلَا قِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ »
“হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট খারাপ চরিত্র হতে আশ্রয় প্রার্থণা করছি এবং খারাপ আমল ও প্রবৃত্তি হতে আশ্রয় প্রার্থণা করছি”।
ওমর ইব্ন আব্দুল আজীজ রহ. খালেদ ইব্ন সাফওয়াকে বলেন, তুমি আমাকে সংক্ষিপ্ত ওয়াজ ও নছিহত কর। তখন সে বলল, হে আমীরুল মুমিন! অনেক মানুষকে আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের পর্দা ধোঁকায় ফেলছে, আর তাদের প্রশংসা তাদেরকে বিপদে ফেলছে। তোমার সম্পর্কে তোমার জানাকে অন্যের অজানা যেন পরাভূত করতে না পারে। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আমাকে এবং তোমাকে আমাদের গুনাহসমূহ গোপন রাখার মাধ্যমে ধোঁকায় পড়া থেকে হেফাজত করুন! মানুষের প্রশংসায় খুশি হওয়া থেকে হেফাজত করুন। আর আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আমাদের উপর যা ফরজ করেছেন, তাতে যাতে আমরা পিছপা না হই এবং কোন প্রকার দুর্বলতা প্রদর্শন না করি। আর আমরা যাতে আমাদের প্রবৃত্তির প্রতি না ঝুঁকি। এ কথা শোনে তিনি ক্রন্দন করেন এবং বলেন, আল্লাহ রাব্বূল আলামীন আমাকে এবং তোমাকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে হেফাজত করুন।
ইব্রাহীম তাইমী রহ. স্বীয় দো‘আয় বলতেন, হে আল্লাহ! তোমার কিতাব এবং তোমার নবীর সুন্নত দ্বারা আমাদেরকে হক সম্পর্কে মতবিরোধ করা থেকে হেফাজত কর। হে আল্লাহ! তোমার পথ নির্দেশকে আমাদের জীবনে পাথেয় বানিয়ে দাও। আর তোমার অনুকরণ ছাড়া প্রবৃত্তির অনুকরণ হতে আমাদের রক্ষা কর। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের আরও রক্ষা কর গোমরাহি ও পথভ্রষ্টটা হতে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের যাবতীয় কর্মে সন্দেহ পোষণ করা, হঠকারীতা, ঝগড়া-বিবাদ ও উল্টা-পাল্টা করা হতে রক্ষা কর।
দুই. প্রবৃত্তির পরিপন্থী বস্তু দ্বারা অন্তর পূর্ণ থাকা:
মনে রাখতে হবে মানবাত্মা কখনোই খালি থাকে না; তাকে যদি আমরা ঈমান ও আমলের নুর দিয়ে পরিপূর্ণ না করি, তাহলে তা অবশ্যই শিরক ও কুফরের অন্ধকারে পরিপূর্ণ হবে। তাতে কুফর শিরক ও বিদআত স্থান করে নেবে। আমাদের অবশ্যই অন্তরকে পরিপূর্ণ রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। আর তা হল আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের উপর ঈমান আনার মাধ্যমে অন্তরকে ঈমানের নুরের দ্বারা পরিপূর্ণ রাখা এবং অন্তর থেকে গাইরুল্লাহ মহব্বতকে দূর করা। আর গাইরুল্লাহর মহব্বতকে অন্তরে কোন প্রকার স্থান না দেয়া। নি:সন্দেহে একটি কথা যায় যে, আল্লাহর মহব্বতকে অন্তরে স্থান দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের নৈকট্য লাভে ধন্য হওয়া যায়। আর যখন মানবাত্মা আল্লাহর মহব্বতে পরিপূর্ণ হবে, তখন মানুষের অন্তর থেকে যাবতীয় খারাপ চাহিদা দূর হয়ে যাবে।
তিন. আলেম ওলামা ও সালে-হীনদের সাথে উঠা-বসা করা:
আল্লামা ইব্ন আব্দুল কাবী রহ. বলেন,
وََخالطِْ إذَِا خَالَطتَّ كُلَّ مُوَفَّقٍ مِنَ العُلَمَاءِ أَهْلِ التُّقَى وَالتَّسَدُّدِ
يُفِيدُكَ مِنْ عِلْمٍ وَيَنْهَاكَ عَنْ هَوىً فَصَاحِبْهُ تْهدَى مِنْ هُدَاهُ وَتَرْشُدِ
وَإيَاكَ وَالهَمَّازَ إِنْ قُمْتَ عَنْهُ وَالبَذِيِّ فَإنَِّ المَرْءَ باِلمَرْءِ يَقْتَدِي
وََلا تَصَحبِ الحَمْقَى فَذُو الجَهْلِ إِنْ يَرُمْ صَلَاحاً لشْيءٍ يَا أَخَا الحَزْمِ يُفْسِدِ
অর্থ, যখন তুমি কারো সাথে উঠবস করতে চাও, তবে তুমি আলেম ওলামা, মুত্তাকী, পরহেজগার এবং আল্লাহ যাদের কবুল করেছেন তাদের সাথে উঠবস কর। তারা তাদের ইলম দ্ধারা তোমার উপকার করবে এবং তোমাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হতে নিষেধ করবে। আর তুমি খারাপ ও গোমরাহ লোকদের অনুসরণ করা হতে বিরত থাক। কারণ, মানুষ মানুষের দ্ধারা প্রভাবিত হয়। তুমি যখন খারাপ ও গোমরাহ লোকদের সাথে উঠবস করবে তখন তোমাদের মধ্যে তাদের গোমরাহী ও খারাপ প্রভাব বিস্তার করবে। আর তুমি কোন জাহেল, অজ্ঞ ও আহমক লোকের সাথে মিশবে না। তাদের সাথে মিশলে তুমি তাদের মতই হবে। কারণ, একজন জাহেলের কাজ হল, তুমি যখন কোন বিষয়ে সংশোধন চাইবে তখন সে তা ধ্বংস করে দেবে, তোমাকে সংশোধন হতে দেবে না।
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রহ. কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাহায্যের পর এসব বিষয়গুলোর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির কু-মন্ত্রণা হতে মুক্তি পেতে পারে। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিতে ডুবে আছে, তার দ্বারা কি তা থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব? তাকে বলা হবে, অবশ্যই সম্ভব! আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তাওফিক ও তার সাহায্য থাকলে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। নিম্নে আমরা বিষয়গুলো আলোচনা করব:
এক. একজন স্বাধীন ও সাহসী লোকের সাহস ও প্রত্যয় যা তার আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নফসের বিরুদ্ধে কাজ করে। এ ধরনের সাহসী লোক দ্ধারা প্রবৃত্তি থেকে বিরত থাকা সম্ভব।
দুই. ধৈর্য ধারণে সাহসিকতার পরিচয় দেয়া। যখন তার নফস কোন খারাপ কিছু চায়, তখন তা থেকে বিরত থাকার তিক্ততার উপর ধৈর্যধারণ করা।
তিন. আত্মার শক্তি একজন মানুষকে সাহসিকতার যোগান দেয় এবং তাকে সঠিক পথে চলার জন্য উৎসাহ প্রদান করে। আর সাহসিকতা পুরোই হল, প্রতিকুল মুহূর্তের সাময়িক ধৈর্য। আর সবচেয়ে উত্তম জীবন যা একজন বান্দা লাভ করে তা হল, ধৈর্যের দ্বারা জীবন লাভ করা। ধৈর্যের মাধ্যমে যে জীবন লাভ করা যায় তাকে সমৃদ্ধ জীবন লাভ করা বলা চলে।
চার. উত্তম পরিণতির জায়গা কোনটি তা পর্যবেক্ষণ করা এবং সৎ সাহসের মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করা।
পাঁচ. প্রবৃত্তির অনুসরণ করা শাস্তি নিয়ে চিন্তা করা:
প্রবৃত্তির পূজা করার কারণে ভীষণ যন্ত্রণা ও শাস্তি কি তা পর্যবেক্ষণ করা। যখন সে তার শাস্তি সম্পর্কে জানতে পারবে তখন সে প্রবৃত্তির অনুসরণ হতে অবশ্যই বিরত থাকবে।
ছয়. প্রবৃত্তির বিরোধিতা করার ফলাফল নিয়ে চিন্তা করা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট বিশেষ মর্যাদার স্থানে তাকে নিয়ে যাওয়া এবং মানুষের অন্তরে তার সম্মান ও মর্যাদা প্রতিস্থাপন করা। আর এটি তার জন্য অধিক উত্তম ও প্রশান্তি প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ করার মজা হতে।
সাত. পাপাচার বা গুনাহের মজার উপর পাক-পবিত্র থাকা, সম্মান বজায় রাখার যে মজা তাকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে।
আট. দুশমনের উপর বিজয় লাভ, দুশমনকে প্রতিহত করা ও তাকে অপমান অপদস্থ করে ক্ষোভ, রাগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়ার আনন্দ উপভোগ করা। কারণ, শয়তান যখন তার আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে না পারে, তখন সে বিক্ষুব্ধ ও হতাশাগ্রস্ত হয়। আর আল্লাহ রাব্বূল আলামীন তার বান্দা থেকে পছন্দ করে যেন সে তার দুশমন শয়তানকে অপমান অপদস্থ করে। যেমন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার মহা কিতাব আল-কুরআনে এরশাদ করেন-
﴿ مَا كَانَ لِأَهۡلِ ٱلۡمَدِينَةِ وَمَنۡ حَوۡلَهُم مِّنَ ٱلۡأَعۡرَابِ أَن يَتَخَلَّفُواْ عَن رَّسُولِ ٱللَّهِ وَلَا يَرۡغَبُواْ بِأَنفُسِهِمۡ عَن نَّفۡسِهِۦۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ لَا يُصِيبُهُمۡ ظَمَأٞ وَلَا نَصَبٞ وَلَا مَخۡمَصَةٞ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَطَُٔونَ مَوۡطِئٗا يَغِيظُ ٱلۡكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنۡ عَدُوّٖ نَّيۡلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُم بِهِۦ عَمَلٞ صَٰلِحٌۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٢٠﴾ [ سورة التوبة : 120 [.
মদীনার অধিবাসী ও তার আশপাশের মরুবাসীদের জন্য সংগত নয় যে, রাসূলুল্লাহ থেকে পেছনে থেকে যাবে এবং রাসূলের জীবন অপেক্ষা নিজদের জীবনকে অধিক প্রিয় মনে করবে। এটা এ কারণে যে, তাদেরকে আল্লাহর পথে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধায় আক্রান্ত করে এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফিরদের ক্রোধ জন্মায় এবং শত্রুদেরকে তারা ক্ষতিসাধন করে, তার বিনিময়ে তাদের জন্য সৎকর্ম লিপিবদ্ধ করা হয়। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। [সূরা তাওবা, আয়াত: ১২০]
সত্যিকার মহব্বতের আলামত হল, মাহবুবের দুশমনকে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং তাদের অপমান করা।
নয়. এ কথা বিশ্বাস করা যে, প্রবৃত্তির বিরোধিতা করা দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মানকে বৃদ্ধি করে। একজন বান্দাকে বাহ্যিক ও বাতেনী উভয় প্রকার সম্মানে ভূষিত করে। অপরদিকে যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের সম্মানহানি ঘটে এবং গোপনে ও প্রকাশ্যে তারা অপমান, অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়।