hadith book logo

অন্তর বিধ্বংসী বিষয় প্রবৃত্তির অনুসরণ

লেখকঃ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জেদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

কখন প্রবৃত্তির কারণে মানবজাতিকে শাস্তি দেয়া হয়?

প্রবৃত্তি ও নফস মানবজাতির জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। মানবজাতি কখনোই এর বাহিরে থাকতে পারে না এবং সে তার প্রবৃত্তি মুক্ত হতে পারে না। আল্লাহ রাব্বূল আলামীন মানবজাতিকে নফস দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। মানুষ মানেই তার মধ্যে প্রবৃত্তি থাকবে, নফস থাকবে এবং চাহিদা থাকবে। এটি মানবজাতির জন্য কোন দোষণীয় বিষয় নয়। মানবজাতিকে শুধু তার নফস বা প্রবৃত্তির উপর কখনোই শাস্তি দেয়া হবে না। মানুষ যখন কোন কিছু চায় বা পছন্দ করে তা তার জন্য কোন অপরাধ নয় যে, তাকে এ কারণে তার উপর শাস্তি দিতে হবে। তবে কখন মানুষকে তার প্রবৃত্তির কারণে শাস্তি দেয়া হবে ?! এটি একটি যুগান্তকারী প্রশ্ন।

এছাড়াও আরেকটি প্রশ্ন হল, একজন মানুষ তার অন্তর বা আত্মা থেকে প্রবৃত্তি বা নফসের চাহিদাকে একেবারে সম্পূর্ণভাবে বের করে দিতে বা তা ফেলে দিতে নির্দেশিত কিনা? নাকি তার জন্য কিছু নিয়ম বা কায়দা-কানুন আছে?

এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং সমাধানের বিষয়। যুগে যুগে মানুষের মাঝে এ ধরনের প্রশ্ন বিভিন্নভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং বার বার তা মানুষের সামনে উঠে আসছে। ইসলামের বড় বড় মনীষীরাও যুগ যুগ ধরে এ সব প্রশ্নের যথার্থ সমাধান দিয়েছেন।

আল্লামা ইব্ন তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, মানবজাতিকে শুধু তার নফস বা প্রবৃত্তির উপর ভিত্তি করে কখনোই শাস্তি দেয়া হবে না, তাকে শাস্তি দেয়া হবে, প্রবৃত্তি ও নফসের অনুকরণ ও অনুসরণ করার উপর। যখন মানবাত্মা কোন কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে, কিন্তু সে তা না করে মানবাত্মাকে তা থেকে বিরত রাখে, তাহলে তাকে কোন প্রকার শাস্তি পেতে হবে না, বরং তার জন্য এ বিরত থাকা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত ও ইসলামী শরীয়তের নেক আমল বলে পরিগণিত হবে [মাজমুয়ায়ে ফাতওয়া ৬৩৫/১০]।

এ হল একজন সত্যিকার মুসলিমের অবস্থা। সর্বদা তার নফস তাকে বিভিন্ন খারাপ ও মন্দ কাজের নির্দেশ দিতে থাকে। আর সে তার নফসের সাথে যুদ্ধ করতে থাকে এবং নফসের নির্দেশ অমান্য ও বিরোধিতা করে আল্লাহকে ভয় করতে থাকে, যার মধ্যে এ ধরনের গুণ পাওয়া যাবে সে ব্যক্তিই হল সত্যিকার ঈমানদার ও প্রকৃত মুমিন। আর এ ধরনের ঈমানদারের জন্য রয়েছে জান্নাত ও উত্তম প্রতিদান।

আল্লাহ রাব্বূল আলামীন বলেন,

﴿ وَأَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِۦ وَنَهَى ٱلنَّفۡسَ عَنِ ٱلۡهَوَىٰ ٤٠ فَإِنَّ ٱلۡجَنَّةَ هِيَ ٱلۡمَأۡوَىٰ ٤﴾ [ سورة النازعات : 40-41 [.

“আর যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে, নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাসস্থল”। [সূরা নাজেয়াত, আয়াত: ৪০-৪১]

আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দুটি জিনিষকে স্পষ্ট করেন, এক-যারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে ভয় করে তার প্রবৃত্তির অবস্থান অনুযায়ী। শুধু ভয় করা যথেষ্ট নয়, বরং আল্লাহকে ভয় করতে হবে তার শান ও অবস্থান হিসেবে। দ্বিতীয়ত- এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে আর তা হল প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো হতে তাকে বিরত থাকতে হবে; মনে যা চায় তা করা হতে বিরত থাকতে হবে। নিজের নফস বা নফসের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হতে হবে। তখন তার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ঘোষণা হল জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল।

মোট কথা, প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী আমল করা ব্যতীত কাউকে কোন প্রকার শাস্তি দেয়া হবে না। কোন মানুষ যখন কোন গুনাহ করার ইচ্ছা করে বা তার গুনাহ করতে মনে চায়, শুধুমাত্র এর উপর তাকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না। তবে যদি লোকটি তার ইচ্ছা ও আকাঙ্খা অনুযায়ী আমল করে, তখন তাকে তার আমল ও প্রবৃত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَى، مُدْرِكٌ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ؛ فَالعَيْنَانِ زِنَاهمَا النَّظَرُ،وَالأُذُنَانِ زِنَاهمَا الاسْتِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الكَلَامُ، وَاليَدُ زِنَاهَا البَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الخُطَا، وَالقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ »

“আদম সন্তানদের জন্য ব্যভিচারের একটি অংশ অবশ্যই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, সে তার জীবদ্দশায় তা অবশ্যই অর্জন করবে। তার চক্ষুদ্বয়ের ব্যভিচার হল, খারাপ বস্তুর প্রতি দৃষ্টি, কর্ণদ্বয়ে ব্যভিচার হল, কোন খারাপ বা অশ্লীল কথার শ্রবণ, মুখের ব্যভিচার হল, শরীয়তের পরিপন্থী কথা, হাতের ব্যভিচার হল, নিষিদ্ধ কোন বস্তুকে স্পর্শ করা আর পায়ের ব্যভিচার হল কোন নিষিদ্ধ কাজের প্রতি অগ্রসর হওয়া। অন্তর আশা করে এবং ধাবিত হয়, লজ্জাস্থান তা সত্যে পরিণত করে অথবা মিথ্যায় পরিণত করে [মুসলিম [২৬৫৭]]।

হাদিস দ্বারা একটি কথা প্রমাণ হয়, মানুষের অন্তরে যখন কোন খারাপ বা নিষিদ্ধ কাজের উদ্রেক হয়, তার জন্য তাকে কোন প্রকার শাস্তি পেতে হবে না এবং তাকে তার জন্য ভালো বা খারাপ বলে মন্তব্য করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার অন্তরের কাজটিকে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা বাস্তবায়ন না করে। তার হাত পা মুখ যখন তার অন্তরের কোন কাজকে বাস্তবায়ন করবে তখন তার উপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধান চালু হবে।