১
ফিতনাতুত-তাকফীর
লেখকঃ শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ), শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহ), শায়খ সফিউর রহমান মুবারকপুরী (রহ), বিভিন্ন মুফাসসির ও মুহাদ্দিসদের (রহ) উদ্ধৃতি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১০
শাসক বা বিচারককে কখন কাফির গণ্য করা যাবে?
-কামাল আহমাদ
১.আল্লাহর বিধানকে বিকৃতিকারী এবং মনগড়া (মাযহাবী ও তরীক্বার) বিধানকে আল্লাহর বিধান বলে প্রচারকারী কাফির :
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَا تَشْتَرُوا بِآَيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
‘‘তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য ও নগণ্য বিনিময়ে বিক্রি করো না। যারা আল্লাহ’র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।’’ (সূরা মায়িদা : ৪৪ আয়াত)
আয়াতটির শানে-নুযূলে প্রমাণিত হয়েছে, ইয়াহুদীরা রজমের বিধানকে পরিবর্তন করে ভিন্ন বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বলেছিল।
এমর্মে অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ
‘‘অতএব, তাদের জন্য আফসোস! যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, যেন এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে। অতএব তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম), তাদের কিতাব লেখার জন্য এবং তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম) তাদের উপার্জনের জন্য।’’ (সূরা বাক্বারাহ : ৭৯ আয়াত)
সুতরাং প্রমাণিত হল, যখন কোন আলেম বা হাকিম বা অন্য যে কেউ এমন কোন বিধান, মাসআলা বা ফাতওয়া দেয়- যা আল্লাহ নাযিল করেননি। অথচ জনগণের মাঝে তা আল্লাহর বিধান হিসাবে প্রচার করে। তখনই কেবল উক্ত আয়াতগুলোর হুকুম প্রযোজ্য। যা বিভিন্ন মাযহাবী ফিক্বাহ, ফাতওয়া ও সূফীদের তরীক্বাতে দেখা যায়। অথচ সেগুলোর পক্ষে আল্লাহ তাআলা কিছুই নাযিল করেননি। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, মুজাহিদ পরিচয় দানকারী বিচ্ছিন্ন গ্রুপগুলো কুরআন-হাদীস বিরোধী ও ভুলে ভরা মাযহাবী ফিক্বাহ ও ফাতওয়ার কিতাবকে বাতিল আখ্যায়িত করে না। অথচ উক্ত ফিক্বাহ ও ফাতওয়ার কিতাবগুলোর দাবি হল, সেগুলোতে উদ্ধৃত বিধানগুলো আল্লাহর বিধান বা ইসলামী বিধান। পক্ষান্তরে প্রচলিত মুসলিম শাসকেরা রাষ্ট্র যখন কোন আইন জারি করে সেটাকে আল্লাহর বিধান বা ইসলামী বিধান আখ্যায়িত না করে বলে- এটা সংসদ বা তোমাদের বর্তমান উলূল আমরের নির্দেশ - যে সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস নিরব। সেক্ষেত্রে ঐ আইনকে কীভাবে শিরক বা কুফর বলা যাবে!?
উল্লেখ্য উক্ত আয়াতের শুরুতে নবী ও আলেমদেরকে কিতাবের হেফাযতকারী গণ্য করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِن كِتَابِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ
‘‘রব্বানী ও আহবারদেকে আল্লাহর কিতাবের হেফাযত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল আর তারা ছিল এর (তাওরাতের) উপর সাক্ষী।’’ [সূরা মায়িদা : ৪৪]
সূরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতটির সাধারণ মর্ম থেকে বুঝা যায়, আলেমরা কিতাবের যে বিকৃতি ঘটিয়ে সেগুলোকে ‘আল্লাহর বিধান’ বলে প্রচার করে- তাদের ঐ কাজকে কুফর এবং তা জারি বাস্তবায়নকারীকে কাফির বলা হয়েছে।
কুরআন ইয়াহুদী আলেমদের আল্লাহর কিতাবের বিকৃতি ও ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে যত আলোচনা করেছে, ততটা শাসকদের নিয়ে আলোচনা করেনি। এ পর্যায়ে যেসব শাসক আল্লাহর বিধান বিকৃত, গোপন বা পরিবর্তন না করে কেবল হুকুমগুলো জারি করছে না, তাদের সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স) সরাসরি আমাদের পথ-নির্দেশনা বা হেদায়াত দিয়েছেন। যেমন : নবী (স) বলেছেন :
ألا من ولي عليه وال فرآه يأتي شيئا من معصية الله فليكره ما يأتي من معصية الله ولا ينزعن يدا من طاعة .
‘‘সাবধান! যে ব্যক্তিকে তোমাদের উপর শাসক নিযুক্ত করা হয়, আর যদি তার মধ্যে আল্লাহর নাফরমানীর কোন কিছু পরিলক্ষিত হয়, তখন তোমরা তার সেই আল্লাহর নাফরমানীর কাজটিকে ঘৃণার সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু তার আনুগত্য হতে হাত গুটাতে পারবে না।’’[সহীহ মুসলিম ৪৬৯৮ (৬৫/১৮৫৫), মিশকাত ৩৬৭০]
অন্যত্র রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
لاَطَاعَةَ فِيْ مَعْصِيَةٍ اِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوْفِ ‘‘নাফরমানীর ব্যাপারে ইতাআত নেই। ইতাআত কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে।’’ [. সহীহ : সহীহ বুখারী ৭২৫৭, সহীহ মুসলিম ৪৬৫৯ (৩৯/১৮৪০), মিশকাত ৩৬৬৫ নং।]
অর্থাৎ আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত না করে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে কিছু জারি করলে- সেটা কোন নিষিদ্ধ বিষয় না হলে - শাসকের আনুগত্য ফরয। আর নিষিদ্ধ বিষয় হলে - ঐ বিষয়ে শাসকের আনুগত্য ত্যাগ করা ফরয। পক্ষান্তরে যখন শাসকও কোন বিধানকে আল্লাহর বিধান হিসেবে চালায় বা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে - তখন সে উল্লিখিত আলেমদের মতো কাফির হয়। এ সম্পর্কে ইবনু আব্বাস (রা) বলেন :
كَانَتْ مُلُوكٌ بَعْدَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِ الصَّلَاة وَالسَّلَامُ بَدَّلُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَكَانَ فِيهِمْ مُؤْمِنُونَ يَقْرَءُونَ التَّوْرَاةَ قِيلَ لِمُلُوكِهِمْ مَا نَجِدُ شَتْمًا أَشَدَّ مِنْ شَتْمٍ يَشْتِمُونَّا هَؤُلَاءِ إِنَّهُمْ يَقْرَءُونَ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ
‘‘ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-এর পর এমন কয়েকজন বাদশাহ ছিলেন, যারা তাওরাত এবং ইঞ্জিলে পরিবর্তন সাধন করেন। তাদের মধ্যে এমন কিছু ঈমানদার লোকও ছিলেন, যারা তাওরাত পাঠ করতেন। তখন তাদের বাদশাহদেরকে বলা হল, এ সকল লোক আমাদেরকে যে গালি দিচ্ছে, এর চেয়ে কঠিন গালি আর কী হতে পারে? তারা পাঠ করে : ‘যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দ্বারা মীমাংসা করে না, তারা কাফির’ ...।’’ [নাসাঈ (ইফা) ৫৩৯৯- মওকুফ সহীহ (আলবানী, তাহক্বীক্ব নাসাঈ ৫৪০০]
বুঝা গেল, সাহাবী ইবনু আব্বাস (রা)-এর কাছে কাফির শব্দটি কিতাব বিকৃতিরকারীদের সাথে প্রযোজ্য। হোক সে শাসক বা আলিম।
২. আল্লাহর বিধান জারি না করলে ঐ আলেম বা শাসক জালিম ও ফাসিক :
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنفَ بِالْأَنفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ ۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
‘‘তাওরাতে আমি ইহুদীদের জন্য এ বিধান লিখে দিয়েছিলাম যে প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সব রকমের যখমের জন্য সমপর্যায়ের বদলা। তারপর যে ব্যক্তি ঐ শাস্তি সাদকা করে দেবে তা তার জন্য কাফ্ফারায় পরিণত হবে। আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালেম।’’ [সূরা মায়িদা : ৪৫]
পূর্বের ৪৪ নং আয়াতে কিতাবের হুকুম গোপন বা বিকৃতকারীদেরকে কাফির বলা হয়েছে। আর ৪৫ নং আয়াতে বিধান জারি না করলে - তাদেরকে জালিম বলা হয়েছে, কিন্তু কাফির বলা হয়নি। আবার ৪৭ নং আয়াতেও বিধান জারি না করলে ফাসিক বলা হয়েছে। যেমন : আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنجِيلِ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فِيهِ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
‘‘ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিত, আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন। তদানুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক্ব।’’ [সূরা মায়িদা : ৪৭]
বুঝা গেল :
সূরা মায়েদার ৪৪ নং আয়াতটি কিতাব বিকৃতি বা ভ্রান্ত ব্যাখ্যাকারীদেরকে কাফির বলা হয়েছে। যেমন- মুসলিমদের মাঝে প্রসিদ্ধ ও বহুল ব্যবহৃত কোন কোন ফিক্বহ ও ফাতওয়ার কিতাবের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। অথচ মুজাহিদ গ্রুপগুলো এ ব্যাপারে কোন সংস্কারমূলক কাজ করেন না। বরং উক্ত বিকৃতি বা ভুলকে মেনে নেয়। তারা নিজেদেরকে ক্ষমতার মসনদের একমাত্র যোগ্য মনে করায় এ ধরনের বিকৃত সংগঠনের প্রসার হচ্ছে। মুসলিমদের ফিক্বহী আইনের বিকৃতির কথা বললে, তারা আগে ক্ষমতা যাওয়ার কথা বলে পরে শূরা বা সংসদের সেগুলোর সংশোধন হওয়ার মুলা ঝুলিয়ে সমর্থক ও কর্মী সংগ্রহ করে। যার ফলাফল হল, তারা নিজেদেরকে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক সংস্কারে পথ বন্ধ করে রাখে।
সূরা মায়েদা ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াতে - যারা আল্লাহর বিধান জারি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা সেটা জারি করে না - তাদেরকে জালিম ও ফাসিক বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে নবী (স) শাসকদের আনুগত্য অব্যাহত রাখতে বলেছেন।
৩.আল্লাহ তাআলা’র প্রতি মিথ্যারোপ এবং অস্বীকার করার কারণে : আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ ۚ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ
‘‘তার চেয়ে অধিক যালেম কে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলবে এবং তার কাছে সত্য আগমনের পর তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। কাফিরদের বাসস্থান কি জাহান্নাম নয়? (সূরা যুমার : ২৪ আয়াত)
এখানেও আল্লাহ তাআলা’র সাথে আক্বীদা, আমল বা বিধানকে সম্পর্কিত করার সাথে কাফির শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ নিমণরূপ :
ক) আক্বীদা : আল্লাহ তাআলা’র যাত ও সিফাত সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিষয়গুলো হুবহু গ্রহণ না করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতিহীন নিজস্ব বা দলীয় বা তরীক্বার বা মাযহাবী ব্যাখ্যা প্রদান করা।
খ) আমল : এমন সব বিদআতি আমলের সৃষ্টি করা যা আল্লাহ তাআলা হুকুম দেননি কিংবা তাঁর রসূল (স) -এর নির্দেশ ও আমলে পাওয়া যায়নি। কিন্তু নিজেরা শাব্দিক তরজমার মাধ্যমে আবিষ্কার করে - সেটা আল্লাহর বিধানের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া। কিংবা এমনসব আমল যেগুলো আল্লাহ নাযিল না করা সত্ত্বেও সেগুলো ইসলামী আমল হিসেবে চালু আছে। যেমন- (১) অযুতে নিয়্যাত ফরয নয়, সুন্নাত বা মুস্তাহাব। পক্ষান্তরে সলাতে নিয়্যাত করা ফরয়। (২) সলাতের প্রথম দুই রাকআত যে কোন ক্বিরআত করা ফরয, সূরা ফাতিহা পাঠ সুন্নাত। পরবর্তী শেষ এক/দুই রাকআতে- তিনবার সুবহানাল্লাহ পরিমান দাঁড়ান ফরয আর সূরা ফাতিহা বা যে কোন ক্বিরাআত করা সুন্নাত বা মুস্তাহাব। (৩) সলাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠের পর বায়ু ত্যাগ করলে - সলাত পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।- এগুলোর কোনটিই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
গ) বিধি-বিধান : যুগোপযোগী বিভিন্ন কারণে মানুষের প্রয়োজনে আইন রচনা করতে হয়। সেগুলোর ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীসে কোন ইশারা ইঙ্গিত না থাকার কারণে বিধি-বিধান জারি করার প্রয়োজন হয়। এ সমস্ত বিষয়কে আল্লাহ বা রসূলের সাথে সম্পর্কিত করলেও কাফির হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে এগুলো উলূল আমর, শূরা (সংসদ), খলীফা, আমীর বা শাসকের আনুগত্য বা অনুসরণ বললে - কাফির হবে না। অথচ সেই আইনগুলো কুরআন সুন্নাহর বিরোধী না হলে - মুসলিমরা মানতে বাধ্য।
৪.হারামকৃত বস্তুকে হালাল এবং হালালকৃত বস্তুকে হারাম ঘোষণা করার কারণে :
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ
‘‘তোমাদের মুখ থেকে সাধারণভাবে যেসব মিথ্যা বের হয়ে আসে, তেমনি করে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করে তারা সফল হবে না।’’ (সূরা নাহাল : ১১৬ আয়াত)
৫.বিচারক, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশদেরকে হালাল ও হারাম করার হক্বদার গণ্য করার কারণে :
আল্লাহ তাআলা বলেন : اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
‘‘তারা তাদের আহবার (আলেম) ও রুহবান (সূফী)-দের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে।’’ (সূরা তাওবা : ৩১ আয়াত)
নবী (স) আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন :
أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ
‘‘এমন নয় যে, তারা এদের ইবাদত করত। বরং এরা যদি তাদের জন্য কিছু হালাল করে দিত তখন তারা তা হালাল বলে গ্রহণ করত; এরা যখন কোন কিছু হারাম বলে স্থির করতো তখন তারাও তা হারাম বলে গ্রহণ করতো।’’ [.হাসান : তিরমিযী- তাফসীরুল কুরআন, সূরা তাওবা। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত তিরমিযী হা/৩০৯৫]]
এখানে হালাল বা হারাম নির্ধারণ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা নাযিলকৃত বা ইলাহী হুকুম গণ্য করাকে চূড়ান্ত কুফর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কাফির হওয়ার বিভিন্ন কারণ ও শর্ত রয়েছে। এখানে আমরা কেবল আল্লাহর বিধান জারি করা ও না করার ক্ষেত্রে কাফির হওয়ার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ উল্লেখ করলাম।
১.আল্লাহর বিধানকে বিকৃতিকারী এবং মনগড়া (মাযহাবী ও তরীক্বার) বিধানকে আল্লাহর বিধান বলে প্রচারকারী কাফির :
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَا تَشْتَرُوا بِآَيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
‘‘তোমরা আমার আয়াতকে সামান্য ও নগণ্য বিনিময়ে বিক্রি করো না। যারা আল্লাহ’র নাযিলকৃত আইন দ্বারা বিচার করে না, তারাই কাফির।’’ (সূরা মায়িদা : ৪৪ আয়াত)
আয়াতটির শানে-নুযূলে প্রমাণিত হয়েছে, ইয়াহুদীরা রজমের বিধানকে পরিবর্তন করে ভিন্ন বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বলেছিল।
এমর্মে অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ
‘‘অতএব, তাদের জন্য আফসোস! যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, যেন এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ উপার্জন করতে পারে। অতএব তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম), তাদের কিতাব লেখার জন্য এবং তাদের জন্য ওয়েল (জাহান্নাম) তাদের উপার্জনের জন্য।’’ (সূরা বাক্বারাহ : ৭৯ আয়াত)
সুতরাং প্রমাণিত হল, যখন কোন আলেম বা হাকিম বা অন্য যে কেউ এমন কোন বিধান, মাসআলা বা ফাতওয়া দেয়- যা আল্লাহ নাযিল করেননি। অথচ জনগণের মাঝে তা আল্লাহর বিধান হিসাবে প্রচার করে। তখনই কেবল উক্ত আয়াতগুলোর হুকুম প্রযোজ্য। যা বিভিন্ন মাযহাবী ফিক্বাহ, ফাতওয়া ও সূফীদের তরীক্বাতে দেখা যায়। অথচ সেগুলোর পক্ষে আল্লাহ তাআলা কিছুই নাযিল করেননি। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, মুজাহিদ পরিচয় দানকারী বিচ্ছিন্ন গ্রুপগুলো কুরআন-হাদীস বিরোধী ও ভুলে ভরা মাযহাবী ফিক্বাহ ও ফাতওয়ার কিতাবকে বাতিল আখ্যায়িত করে না। অথচ উক্ত ফিক্বাহ ও ফাতওয়ার কিতাবগুলোর দাবি হল, সেগুলোতে উদ্ধৃত বিধানগুলো আল্লাহর বিধান বা ইসলামী বিধান। পক্ষান্তরে প্রচলিত মুসলিম শাসকেরা রাষ্ট্র যখন কোন আইন জারি করে সেটাকে আল্লাহর বিধান বা ইসলামী বিধান আখ্যায়িত না করে বলে- এটা সংসদ বা তোমাদের বর্তমান উলূল আমরের নির্দেশ - যে সম্পর্কে কুরআন ও হাদীস নিরব। সেক্ষেত্রে ঐ আইনকে কীভাবে শিরক বা কুফর বলা যাবে!?
উল্লেখ্য উক্ত আয়াতের শুরুতে নবী ও আলেমদেরকে কিতাবের হেফাযতকারী গণ্য করা হয়েছে। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِن كِتَابِ اللَّهِ وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاءَ
‘‘রব্বানী ও আহবারদেকে আল্লাহর কিতাবের হেফাযত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল আর তারা ছিল এর (তাওরাতের) উপর সাক্ষী।’’ [সূরা মায়িদা : ৪৪]
সূরা মায়িদার ৪৪ নং আয়াতটির সাধারণ মর্ম থেকে বুঝা যায়, আলেমরা কিতাবের যে বিকৃতি ঘটিয়ে সেগুলোকে ‘আল্লাহর বিধান’ বলে প্রচার করে- তাদের ঐ কাজকে কুফর এবং তা জারি বাস্তবায়নকারীকে কাফির বলা হয়েছে।
কুরআন ইয়াহুদী আলেমদের আল্লাহর কিতাবের বিকৃতি ও ভুল ব্যাখ্যা নিয়ে যত আলোচনা করেছে, ততটা শাসকদের নিয়ে আলোচনা করেনি। এ পর্যায়ে যেসব শাসক আল্লাহর বিধান বিকৃত, গোপন বা পরিবর্তন না করে কেবল হুকুমগুলো জারি করছে না, তাদের সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স) সরাসরি আমাদের পথ-নির্দেশনা বা হেদায়াত দিয়েছেন। যেমন : নবী (স) বলেছেন :
ألا من ولي عليه وال فرآه يأتي شيئا من معصية الله فليكره ما يأتي من معصية الله ولا ينزعن يدا من طاعة .
‘‘সাবধান! যে ব্যক্তিকে তোমাদের উপর শাসক নিযুক্ত করা হয়, আর যদি তার মধ্যে আল্লাহর নাফরমানীর কোন কিছু পরিলক্ষিত হয়, তখন তোমরা তার সেই আল্লাহর নাফরমানীর কাজটিকে ঘৃণার সাথে অপছন্দ কর, কিন্তু তার আনুগত্য হতে হাত গুটাতে পারবে না।’’[সহীহ মুসলিম ৪৬৯৮ (৬৫/১৮৫৫), মিশকাত ৩৬৭০]
অন্যত্র রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন :
لاَطَاعَةَ فِيْ مَعْصِيَةٍ اِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوْفِ ‘‘নাফরমানীর ব্যাপারে ইতাআত নেই। ইতাআত কেবল ন্যায়সঙ্গত কাজে।’’ [. সহীহ : সহীহ বুখারী ৭২৫৭, সহীহ মুসলিম ৪৬৫৯ (৩৯/১৮৪০), মিশকাত ৩৬৬৫ নং।]
অর্থাৎ আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত না করে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে কিছু জারি করলে- সেটা কোন নিষিদ্ধ বিষয় না হলে - শাসকের আনুগত্য ফরয। আর নিষিদ্ধ বিষয় হলে - ঐ বিষয়ে শাসকের আনুগত্য ত্যাগ করা ফরয। পক্ষান্তরে যখন শাসকও কোন বিধানকে আল্লাহর বিধান হিসেবে চালায় বা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে - তখন সে উল্লিখিত আলেমদের মতো কাফির হয়। এ সম্পর্কে ইবনু আব্বাস (রা) বলেন :
كَانَتْ مُلُوكٌ بَعْدَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِ الصَّلَاة وَالسَّلَامُ بَدَّلُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَكَانَ فِيهِمْ مُؤْمِنُونَ يَقْرَءُونَ التَّوْرَاةَ قِيلَ لِمُلُوكِهِمْ مَا نَجِدُ شَتْمًا أَشَدَّ مِنْ شَتْمٍ يَشْتِمُونَّا هَؤُلَاءِ إِنَّهُمْ يَقْرَءُونَ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ
‘‘ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-এর পর এমন কয়েকজন বাদশাহ ছিলেন, যারা তাওরাত এবং ইঞ্জিলে পরিবর্তন সাধন করেন। তাদের মধ্যে এমন কিছু ঈমানদার লোকও ছিলেন, যারা তাওরাত পাঠ করতেন। তখন তাদের বাদশাহদেরকে বলা হল, এ সকল লোক আমাদেরকে যে গালি দিচ্ছে, এর চেয়ে কঠিন গালি আর কী হতে পারে? তারা পাঠ করে : ‘যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দ্বারা মীমাংসা করে না, তারা কাফির’ ...।’’ [নাসাঈ (ইফা) ৫৩৯৯- মওকুফ সহীহ (আলবানী, তাহক্বীক্ব নাসাঈ ৫৪০০]
বুঝা গেল, সাহাবী ইবনু আব্বাস (রা)-এর কাছে কাফির শব্দটি কিতাব বিকৃতিরকারীদের সাথে প্রযোজ্য। হোক সে শাসক বা আলিম।
২. আল্লাহর বিধান জারি না করলে ঐ আলেম বা শাসক জালিম ও ফাসিক :
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنفَ بِالْأَنفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ ۚ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
‘‘তাওরাতে আমি ইহুদীদের জন্য এ বিধান লিখে দিয়েছিলাম যে প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সব রকমের যখমের জন্য সমপর্যায়ের বদলা। তারপর যে ব্যক্তি ঐ শাস্তি সাদকা করে দেবে তা তার জন্য কাফ্ফারায় পরিণত হবে। আর যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী ফায়সালা করে না তারাই জালেম।’’ [সূরা মায়িদা : ৪৫]
পূর্বের ৪৪ নং আয়াতে কিতাবের হুকুম গোপন বা বিকৃতকারীদেরকে কাফির বলা হয়েছে। আর ৪৫ নং আয়াতে বিধান জারি না করলে - তাদেরকে জালিম বলা হয়েছে, কিন্তু কাফির বলা হয়নি। আবার ৪৭ নং আয়াতেও বিধান জারি না করলে ফাসিক বলা হয়েছে। যেমন : আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الْإِنجِيلِ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فِيهِ ۚ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
‘‘ইঞ্জিলের অধিকারীদের উচিত, আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন। তদানুযায়ী ফয়সালা করা। যারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক্ব।’’ [সূরা মায়িদা : ৪৭]
বুঝা গেল :
সূরা মায়েদার ৪৪ নং আয়াতটি কিতাব বিকৃতি বা ভ্রান্ত ব্যাখ্যাকারীদেরকে কাফির বলা হয়েছে। যেমন- মুসলিমদের মাঝে প্রসিদ্ধ ও বহুল ব্যবহৃত কোন কোন ফিক্বহ ও ফাতওয়ার কিতাবের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। অথচ মুজাহিদ গ্রুপগুলো এ ব্যাপারে কোন সংস্কারমূলক কাজ করেন না। বরং উক্ত বিকৃতি বা ভুলকে মেনে নেয়। তারা নিজেদেরকে ক্ষমতার মসনদের একমাত্র যোগ্য মনে করায় এ ধরনের বিকৃত সংগঠনের প্রসার হচ্ছে। মুসলিমদের ফিক্বহী আইনের বিকৃতির কথা বললে, তারা আগে ক্ষমতা যাওয়ার কথা বলে পরে শূরা বা সংসদের সেগুলোর সংশোধন হওয়ার মুলা ঝুলিয়ে সমর্থক ও কর্মী সংগ্রহ করে। যার ফলাফল হল, তারা নিজেদেরকে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক সংস্কারে পথ বন্ধ করে রাখে।
সূরা মায়েদা ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াতে - যারা আল্লাহর বিধান জারি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা সেটা জারি করে না - তাদেরকে জালিম ও ফাসিক বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে নবী (স) শাসকদের আনুগত্য অব্যাহত রাখতে বলেছেন।
৩.আল্লাহ তাআলা’র প্রতি মিথ্যারোপ এবং অস্বীকার করার কারণে : আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ ۚ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَافِرِينَ
‘‘তার চেয়ে অধিক যালেম কে আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা বলবে এবং তার কাছে সত্য আগমনের পর তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। কাফিরদের বাসস্থান কি জাহান্নাম নয়? (সূরা যুমার : ২৪ আয়াত)
এখানেও আল্লাহ তাআলা’র সাথে আক্বীদা, আমল বা বিধানকে সম্পর্কিত করার সাথে কাফির শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ নিমণরূপ :
ক) আক্বীদা : আল্লাহ তাআলা’র যাত ও সিফাত সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিষয়গুলো হুবহু গ্রহণ না করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতিহীন নিজস্ব বা দলীয় বা তরীক্বার বা মাযহাবী ব্যাখ্যা প্রদান করা।
খ) আমল : এমন সব বিদআতি আমলের সৃষ্টি করা যা আল্লাহ তাআলা হুকুম দেননি কিংবা তাঁর রসূল (স) -এর নির্দেশ ও আমলে পাওয়া যায়নি। কিন্তু নিজেরা শাব্দিক তরজমার মাধ্যমে আবিষ্কার করে - সেটা আল্লাহর বিধানের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া। কিংবা এমনসব আমল যেগুলো আল্লাহ নাযিল না করা সত্ত্বেও সেগুলো ইসলামী আমল হিসেবে চালু আছে। যেমন- (১) অযুতে নিয়্যাত ফরয নয়, সুন্নাত বা মুস্তাহাব। পক্ষান্তরে সলাতে নিয়্যাত করা ফরয়। (২) সলাতের প্রথম দুই রাকআত যে কোন ক্বিরআত করা ফরয, সূরা ফাতিহা পাঠ সুন্নাত। পরবর্তী শেষ এক/দুই রাকআতে- তিনবার সুবহানাল্লাহ পরিমান দাঁড়ান ফরয আর সূরা ফাতিহা বা যে কোন ক্বিরাআত করা সুন্নাত বা মুস্তাহাব। (৩) সলাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠের পর বায়ু ত্যাগ করলে - সলাত পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।- এগুলোর কোনটিই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়।
গ) বিধি-বিধান : যুগোপযোগী বিভিন্ন কারণে মানুষের প্রয়োজনে আইন রচনা করতে হয়। সেগুলোর ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ হাদীসে কোন ইশারা ইঙ্গিত না থাকার কারণে বিধি-বিধান জারি করার প্রয়োজন হয়। এ সমস্ত বিষয়কে আল্লাহ বা রসূলের সাথে সম্পর্কিত করলেও কাফির হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে এগুলো উলূল আমর, শূরা (সংসদ), খলীফা, আমীর বা শাসকের আনুগত্য বা অনুসরণ বললে - কাফির হবে না। অথচ সেই আইনগুলো কুরআন সুন্নাহর বিরোধী না হলে - মুসলিমরা মানতে বাধ্য।
৪.হারামকৃত বস্তুকে হালাল এবং হালালকৃত বস্তুকে হারাম ঘোষণা করার কারণে :
وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَٰذَا حَلَالٌ وَهَٰذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ ۚ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ
‘‘তোমাদের মুখ থেকে সাধারণভাবে যেসব মিথ্যা বের হয়ে আসে, তেমনি করে আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা আরোপ করে বলো না যে, এটা হালাল এবং ওটা হারাম। নিশ্চয় যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করে তারা সফল হবে না।’’ (সূরা নাহাল : ১১৬ আয়াত)
৫.বিচারক, আলেম-উলামা, পীর-দরবেশদেরকে হালাল ও হারাম করার হক্বদার গণ্য করার কারণে :
আল্লাহ তাআলা বলেন : اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
‘‘তারা তাদের আহবার (আলেম) ও রুহবান (সূফী)-দের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে।’’ (সূরা তাওবা : ৩১ আয়াত)
নবী (স) আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন :
أَمَا إِنَّهُمْ لَمْ يَكُونُوا يَعْبُدُونَهُمْ وَلَكِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا أَحَلُّوا لَهُمْ شَيْئًا اسْتَحَلُّوهُ وَإِذَا حَرَّمُوا عَلَيْهِمْ شَيْئًا حَرَّمُوهُ
‘‘এমন নয় যে, তারা এদের ইবাদত করত। বরং এরা যদি তাদের জন্য কিছু হালাল করে দিত তখন তারা তা হালাল বলে গ্রহণ করত; এরা যখন কোন কিছু হারাম বলে স্থির করতো তখন তারাও তা হারাম বলে গ্রহণ করতো।’’ [.হাসান : তিরমিযী- তাফসীরুল কুরআন, সূরা তাওবা। আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [তাহক্বীক্বকৃত তিরমিযী হা/৩০৯৫]]
এখানে হালাল বা হারাম নির্ধারণ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা নাযিলকৃত বা ইলাহী হুকুম গণ্য করাকে চূড়ান্ত কুফর হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। কাফির হওয়ার বিভিন্ন কারণ ও শর্ত রয়েছে। এখানে আমরা কেবল আল্লাহর বিধান জারি করা ও না করার ক্ষেত্রে কাফির হওয়ার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ উল্লেখ করলাম।