১
ফিতনাতুত-তাকফীর
লেখকঃ শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ), শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায (রহ), শায়খ সফিউর রহমান মুবারকপুরী (রহ), বিভিন্ন মুফাসসির ও মুহাদ্দিসদের (রহ) উদ্ধৃতি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৬
হাকিম (শাসক) ও মাহকুম (প্রজা/শাসিত)-এর প্রতি তাকফীর
আমি আলোচ্য কথাগুলো আমার কাছে প্রশ্নকারী ভাইদের কাছ থেকে পেয়েছি যারা পূর্বে জামাআতুত তাকফীরের অন্তর্ভুক্ত ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের হিদায়াত দিয়েছেন। আমি তাদের কাছে জানতে চাই, আপনারা অনেক হাকিম (শাসক)-কে কাফির গণ্য করেন। কিন্তু আপনারা ইমাম, খতীব, মুয়াজ্জিন ও মাসজিদের খাদেমদেরকেও তাকফীর কেন করেন? এমনকি আপনারা ইলমে শরীআতের উস্তাদ যারা বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান করছেন তাদের প্রতিও তাকফীর করেন!!
তারা উত্তরে এটাই বলেন যে, কেননা এই লোকেরা ঐ হাকিম (শাসক) ও তাদের শাসনতন্ত্রের প্রতি রাযী, অথচ তা আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত শরীআতের বিরোধী।
আমি তাদের বলি : যদি এই রাযী বা সন্তুষ্টি আন্তরিকভাবে হয়ে থাকে তবে তো এই আমালী কুফর প্রকৃতপক্ষে ই‘তিক্বাদী কুফরে পরিণত হয়। সুতরাং যদি কোন হাকিম (শাসক/বিচারক) আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা না করে এবং এটা মনে করে যে, এই হুকুম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশি উপযোগী। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের বিধি-বিধান বর্তমান যামানার জন্য উপযোগী নয়, তবে নিঃসন্দেহে তার এই কুফর- কুফরে ই‘তিক্বাদী এবং কখনই তা কুফরে আমালী নয়। আর কেউ যদি এই ধারণার প্রতি রাযী বা সন্তুষ্ট থাকে তবে সে কাফির। [.এই আক্বীদা রাখা সত্ত্বেও লোকেরা আমাকে ‘যামানার মুরজিয়া’ (মুরজিয়াতুল আসর) বলে তুহমাত (অপবাদ) দেয়া শুরু করেছে- শায়েখ আলবানী। (উর্দু অনুবাদক)]
কিন্তু আপনারা যে সমস্ত শাসক পশ্চিমা আইন দ্বারা কম বা বেশি বিধান জারি করছে- তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কখনই এটা বলবে না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আইন দ্বারা শাসন চালানো জরুরি এবং ইসলাম অনুযায়ী শাসন চালান জায়েয নয়। বরং তারা এভাবেও বলবে না যে, আল্লাহ’র নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন চালানোর সম্ভব হচ্ছে না। কেননা এটা বললে তারা নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে।
এখন আমি যদি শাসিত প্রজাসাধারণ- যার মধ্যে উলামা ও নেককার ব্যক্তিগণ রয়েছেন তাদের প্রসঙ্গে আসি, সেক্ষেত্রেও বলব যে, আপনারা কেন তাদের প্রতি তাকফির করছেন? সম্ভবত এই কারণে যে, তারা ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপন করছে। অথচ ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপনের ব্যাপারে আপনারাও (জামাআতুত তাকফীর) হুবহু তাদেরই মত। পার্থক্য এতুটুকু যে, আপনারা শাসকদের কাফির ঘোষণা করছেন। পক্ষান্তরে আলেমগণ এটা বলছেন না যে, তারা দ্বীন থেকে মুরতাদ হয়ে গেছে। বরং তারা বলেন : আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত শরীআত দ্বারা শাসন চালান ওয়াজিব এবং আমলগত কারণে কোনটির বিরোধিতার জন্য এটা জরুরি নয় যে, সেই আলেম বা হাকিম/শাসক দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে।
সংশয় : একবার বা কয়েকবার আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি না করলে কাফির হয় না। কিন্তু বারবার বা সবসময় আল্লাহ তাআলা’র বিধানের বিরোধী হুকুম জারি করলে কাফির হয়ে যায়।
বিতর্ককারীদের মধ্যে যাদের গোমরাহী ও ভুল-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে, আমি তাদের একটি পক্ষকে জিজ্ঞাসা করি : আমরা কখন একজন কালেমায়ে শাহাদাতের ( اشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله ) দাবিদার যারা সালাতও আদায় করে তাদের দ্বীন থেকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করব?
মূলতঃ এ ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি একটি দিকে থাকবে। আর তা হল – আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করাই দ্বীন থেকে মুরতাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদিও এই তাকফীরকারীরা নিজের মুখ থেকে এই জবাব দিবে না- তবে মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই।
এই প্রশ্ন তাদের সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় এবং তাদের থেকে কোন জবাব পাওয়া যায় না। তখন আমি তাদের নিম্নোক্ত উদাহরণটি উপস্থাপন করি যা তাদের নির্বাক করে দেয়। যেমন আমি তাদের বলেছি- ‘‘একজন হাকিম (শাসক/বিচারক) তিনি শরীআত মোতাবেক ফায়সালা করবেন এবং এটাই তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কোন একটি ফায়সালাতে তিনি বিচ্যূত হয়ে শরীআত বিরোধী ফায়সালা দেন- অর্থাৎ কোন যালিমকে হক্ব দিয়ে দিলেন এবং মাযলুমকে বঞ্চিত করলেন। বলুন তো- এটা কি ‘হুকুম বিগয়রি মা-আনযালাল্লাহ’ নয়?
আপনারা কি বলবেন সে কুফর তথা মুরতাদ হওয়ার কুফর করেছে?’’
তারা জবাব দিল : না।
আমি বললাম : কেন না, সে তো আল্লাহ’র শরীআতের বিরোধিতা করেছে।
তারা জবাব দিল : এটা তো কেবল একবার সংঘটিত হয়েছে।
আমি বললাম : খুব ভাল। যদি এই হাকিম দ্বারা দ্বিতীয়বার শরীআতের বিরোধিতা হয়, কিংবা ভিন্ন কোন ব্যাপারে সংঘটিত হয় যা শরীআতের বিরোধি- তাহলে সে কি কাফির হবে?
আমি তিন-চার বার তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কখন তাকে কাফির বলব? তারা এর কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে পারল না যে, কতবার শরীআতের খেলাফ হলে সে কাফির বলে গণ্য হবে।
যখন আমি উক্ত বক্তব্যটি ভিন্নভাবে বললাম : যদি আপনারা এটা মনে করেন যে, সে একটি শরীআত বিরোধী হুকুমকে উত্তম হিসাবে অব্যাহত রাখে এবং ইসলামী হুকুমের অবমাননা প্রকাশ করে, সেক্ষেত্রে আপনারা তার প্রতি মুরতাদের হুকুম লাগাতে পারেন। যখন অন্যক্ষেত্রে আপনারা তাকে শরীআতের বিরোধী ফায়সালা করতে দেখবেন তখন জিজ্ঞাসা করবেন- হে শায়খ! আপনি কেন আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানের বিরোধী ফায়সালা করছেন? সে তখন ক্বসম করে বলবে- ‘‘আমি ভয়ে এটা করেছি বা নিজের প্রাণের হুমকি ছিল, কিংবা আমি ঘুষ নিয়েছে প্রভৃতি।’’ শেষোক্ত অজুহাতটি পূর্বের দু’টি থেকেও নিকৃষ্ট। এরপরেও আপনারা এটা বলতে পারেন না যে, সে কাফির- যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজেই ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ নিজের অন্তরের গোপন কুফর প্রকাশ করে, তথা যখন আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করা জায়েয নয় বলে মানে- কেবল তখনই আপনারা বলতে পারেন সে মুরতাদ-কাফির।
তারা উত্তরে এটাই বলেন যে, কেননা এই লোকেরা ঐ হাকিম (শাসক) ও তাদের শাসনতন্ত্রের প্রতি রাযী, অথচ তা আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত শরীআতের বিরোধী।
আমি তাদের বলি : যদি এই রাযী বা সন্তুষ্টি আন্তরিকভাবে হয়ে থাকে তবে তো এই আমালী কুফর প্রকৃতপক্ষে ই‘তিক্বাদী কুফরে পরিণত হয়। সুতরাং যদি কোন হাকিম (শাসক/বিচারক) আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত বিধান মোতাবেক ফায়সালা না করে এবং এটা মনে করে যে, এই হুকুম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশি উপযোগী। পক্ষান্তরে কুরআন ও সুন্নাতের বিধি-বিধান বর্তমান যামানার জন্য উপযোগী নয়, তবে নিঃসন্দেহে তার এই কুফর- কুফরে ই‘তিক্বাদী এবং কখনই তা কুফরে আমালী নয়। আর কেউ যদি এই ধারণার প্রতি রাযী বা সন্তুষ্ট থাকে তবে সে কাফির। [.এই আক্বীদা রাখা সত্ত্বেও লোকেরা আমাকে ‘যামানার মুরজিয়া’ (মুরজিয়াতুল আসর) বলে তুহমাত (অপবাদ) দেয়া শুরু করেছে- শায়েখ আলবানী। (উর্দু অনুবাদক)]
কিন্তু আপনারা যে সমস্ত শাসক পশ্চিমা আইন দ্বারা কম বা বেশি বিধান জারি করছে- তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কখনই এটা বলবে না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আইন দ্বারা শাসন চালানো জরুরি এবং ইসলাম অনুযায়ী শাসন চালান জায়েয নয়। বরং তারা এভাবেও বলবে না যে, আল্লাহ’র নাযিলকৃত আইন অনুযায়ী শাসন চালানোর সম্ভব হচ্ছে না। কেননা এটা বললে তারা নিঃসন্দেহে কাফির হয়ে যাবে।
এখন আমি যদি শাসিত প্রজাসাধারণ- যার মধ্যে উলামা ও নেককার ব্যক্তিগণ রয়েছেন তাদের প্রসঙ্গে আসি, সেক্ষেত্রেও বলব যে, আপনারা কেন তাদের প্রতি তাকফির করছেন? সম্ভবত এই কারণে যে, তারা ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপন করছে। অথচ ঐ হুকুমাতের অধীনে জীবন-যাপনের ব্যাপারে আপনারাও (জামাআতুত তাকফীর) হুবহু তাদেরই মত। পার্থক্য এতুটুকু যে, আপনারা শাসকদের কাফির ঘোষণা করছেন। পক্ষান্তরে আলেমগণ এটা বলছেন না যে, তারা দ্বীন থেকে মুরতাদ হয়ে গেছে। বরং তারা বলেন : আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত শরীআত দ্বারা শাসন চালান ওয়াজিব এবং আমলগত কারণে কোনটির বিরোধিতার জন্য এটা জরুরি নয় যে, সেই আলেম বা হাকিম/শাসক দ্বীন ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হবে।
সংশয় : একবার বা কয়েকবার আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি না করলে কাফির হয় না। কিন্তু বারবার বা সবসময় আল্লাহ তাআলা’র বিধানের বিরোধী হুকুম জারি করলে কাফির হয়ে যায়।
বিতর্ককারীদের মধ্যে যাদের গোমরাহী ও ভুল-ত্রুটিগুলো সুস্পষ্ট হয়েছে, আমি তাদের একটি পক্ষকে জিজ্ঞাসা করি : আমরা কখন একজন কালেমায়ে শাহাদাতের ( اشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله ) দাবিদার যারা সালাতও আদায় করে তাদের দ্বীন থেকে মুরতাদ হিসাবে গণ্য করব?
মূলতঃ এ ব্যাপারে তাদের দৃষ্টি একটি দিকে থাকবে। আর তা হল – আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা না করাই দ্বীন থেকে মুরতাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যদিও এই তাকফীরকারীরা নিজের মুখ থেকে এই জবাব দিবে না- তবে মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এটাই।
এই প্রশ্ন তাদের সংশয়ের মধ্যে ফেলে দেয় এবং তাদের থেকে কোন জবাব পাওয়া যায় না। তখন আমি তাদের নিম্নোক্ত উদাহরণটি উপস্থাপন করি যা তাদের নির্বাক করে দেয়। যেমন আমি তাদের বলেছি- ‘‘একজন হাকিম (শাসক/বিচারক) তিনি শরীআত মোতাবেক ফায়সালা করবেন এবং এটাই তার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কোন একটি ফায়সালাতে তিনি বিচ্যূত হয়ে শরীআত বিরোধী ফায়সালা দেন- অর্থাৎ কোন যালিমকে হক্ব দিয়ে দিলেন এবং মাযলুমকে বঞ্চিত করলেন। বলুন তো- এটা কি ‘হুকুম বিগয়রি মা-আনযালাল্লাহ’ নয়?
আপনারা কি বলবেন সে কুফর তথা মুরতাদ হওয়ার কুফর করেছে?’’
তারা জবাব দিল : না।
আমি বললাম : কেন না, সে তো আল্লাহ’র শরীআতের বিরোধিতা করেছে।
তারা জবাব দিল : এটা তো কেবল একবার সংঘটিত হয়েছে।
আমি বললাম : খুব ভাল। যদি এই হাকিম দ্বারা দ্বিতীয়বার শরীআতের বিরোধিতা হয়, কিংবা ভিন্ন কোন ব্যাপারে সংঘটিত হয় যা শরীআতের বিরোধি- তাহলে সে কি কাফির হবে?
আমি তিন-চার বার তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, কখন তাকে কাফির বলব? তারা এর কোন সংখ্যা নির্দিষ্ট করতে পারল না যে, কতবার শরীআতের খেলাফ হলে সে কাফির বলে গণ্য হবে।
যখন আমি উক্ত বক্তব্যটি ভিন্নভাবে বললাম : যদি আপনারা এটা মনে করেন যে, সে একটি শরীআত বিরোধী হুকুমকে উত্তম হিসাবে অব্যাহত রাখে এবং ইসলামী হুকুমের অবমাননা প্রকাশ করে, সেক্ষেত্রে আপনারা তার প্রতি মুরতাদের হুকুম লাগাতে পারেন। যখন অন্যক্ষেত্রে আপনারা তাকে শরীআতের বিরোধী ফায়সালা করতে দেখবেন তখন জিজ্ঞাসা করবেন- হে শায়খ! আপনি কেন আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানের বিরোধী ফায়সালা করছেন? সে তখন ক্বসম করে বলবে- ‘‘আমি ভয়ে এটা করেছি বা নিজের প্রাণের হুমকি ছিল, কিংবা আমি ঘুষ নিয়েছে প্রভৃতি।’’ শেষোক্ত অজুহাতটি পূর্বের দু’টি থেকেও নিকৃষ্ট। এরপরেও আপনারা এটা বলতে পারেন না যে, সে কাফির- যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজেই ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ নিজের অন্তরের গোপন কুফর প্রকাশ করে, তথা যখন আল্লাহ তাআলা’র নাযিলকৃত হুকুম মোতাবেক ফায়সালা করা জায়েয নয় বলে মানে- কেবল তখনই আপনারা বলতে পারেন সে মুরতাদ-কাফির।